“কেমন জীবন কাটলো, বাবা?” ‒ শীলা আহমেদ

সাক্ষাৎকার পরিচালনা ও সম্পাদনা : সাকিব ইবনে সালাম

জ্যোৎস্না রাতে চাঁদের আলোতে অথবা আষাঢ়-শ্রাবণের ঢলনামা বৃষ্টির বিলাসে এক জীবন কাটিয়ে দেয়া যায় ‒ সেটা শিখিয়েছেন আমাদের হুমায়ূন আহমেদ, বাংলা কথাসাহিত্যের সমার্থক একটা নাম। টানা চার দশক লিখে গেছেন। সৃষ্টি করেছেন অসংখ্য অনবদ্য চরিত্র। জীবনের কঠিন মারপ্যাঁচের কথাগুলো সহজ করে হাসিয়ে আবার কখনওবা কাঁদিয়ে অনর্গল বলে গেছেন স্বমহিমায়। ঠিক সাত বছর আগের এইদিনে তাঁর সৃষ্টির নেশায় বুঁদ হয়ে থাকা, বৃষ্টিবিলাসে মাতোয়ারা মানুষগুলো জানতে পারলো ‒ তিনি আর নেই। গল্পের জাদুকর চলে গেছেন পরপারে। কিন্তু রয়ে গেছে তাঁর কীর্তি।

আজ ১৯শে জুলাই। হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুবার্ষিকী। আমরা, প্যাপাইরাসের কয়েকজন মানুষ তাঁর আদরের কন্যা শীলা আহমেদের সাথে দিন দুয়েক আগে এক বৃষ্টির বিকেলে অসাধারণ একটা আড্ডা দেয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলাম। সেই প্রাণবন্ত আড্ডার মূল অংশ প্যাপাইরাসের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

সেই আড্ডায় শীলা আহমেদ আর তাঁর ছোট্ট মেয়ে আরিনার সাথে ছিলাম প্যাপাইরাসের পক্ষ থেকে ‒ আমি, তুহিন রানা, স্মৃতি তাইয়্যেবা মুক্তা, সুমাইয়া তারান্নুম‌ এবং সৈয়দা সামিয়া রহমান।

মেয়ে আরিনার সাথে শীলা আহমেদ
মেয়ে আরিনার সাথে শীলা আহমেদ

প্যাপাইরাস: কেমন আছেন?

শীলা আহমেদ: ভাল আছি।

প্যাপাইরাস: তো, আজকাল কী করছেন?

শীলা আহমেদ: এখন কিছুই করছি না। বাসায় বসে আছি। বাচ্চা পালা।

প্যাপাইরাস: তাহলে এই মুহূর্তে পুরোদস্তুর গৃহিণী?

শীলা আহমেদ: এই মুহূর্তে আসলে তাই! আমার কাজটা কয়েক মাস আগে শেষ হয়ে গেছে। এখন নতুন কোন কাজে ঢুকিনি। কাজেই এখন একটা ব্রেক। আর যখন বাচ্চা হয়ে যায়, তখন ব্রেক বলে কিছু নেই। তখন বাচ্চাই পালতে হবে। ব্রেক মানেই বাচ্চা পালা

প্যাপাইরাস: আমাদের অনেকের কাছেই সবচেয়ে পছন্দের লেখক হুমায়ূন আহমেদ স্যার। তিনি তো একাধারে লেখক, নাট্যকার, চলচিত্র নির্মাতা। আপনি তাঁকে কোনটা হিসেবে দেখতে পছন্দ করেন? মানে, লেখক হুমায়ূন আহমেদ? নাকি নাট্যকার, চলচিত্র নির্মাতা হিসাবে?

শীলা আহমেদ: লেখক। সবসময় লেখা পড়তেই বেশি পছন্দ করি।

প্যাপাইরাস: তাঁর লেখা সবচেয়ে প্রিয় বই কোনটা?

শীলা আহমেদ: এত বই প্রিয় যে আমি নাম বলে শেষ করতে পারবো না। কিন্তু সায়েন্স ফিকশনগুলো আমার বেশি পছন্দ। সায়েন্স ফিকশন খুব পছন্দের। মুক্তিযুদ্ধের বইগুলো খুবই পছন্দের। আর ধরো, আমার বাবার ছোটগল্প যেগুলো আছে ‒ ওগুলো খুব বেশি মানুষ পড়েনি। কিন্তু, তার ছোটগল্পগুলো আমার খুবই পছন্দের।

প্যাপাইরাস: হুমায়ূন আহমেদ অনেকগুলো অসাধারন জনপ্রিয় চরিত্রের জন্মদাতা। হিমু, মিসির আলি … নাম বলে শেষ করা যাবে না। আপনার কাছে কোন চরিত্রটা সবচেয়ে প্রিয়?

শীলা আহমেদ: সবগুলোই ভালো লাগে। হিমুও ভালো লাগে, মিসির আলিও ভালো লাগে। সবগুলোরই প্রথম দিকেরগুলো ভাল লাগে আমার কাছে। মনে হয় যখন ক্রিয়েট করেছে, তখন যেমন ছিল ‒ যেমন, প্রথম হিমুগুলো … ময়ূরাক্ষী …। একদম প্রথমদিকের হিমুর কয়েকটা। সেগুলো যত ভালো লেগেছে, পরের হিমুগুলা মনে হয়েছে যে, লিখে ফেলতে হয়েছে। আমার কাছে মনে হয়েছে খুব বেশি যত্ন নেই। মিসির আলিরটাও তাই। মিসির আলির প্রথমদিকের বইগুলো … দেবী, নিষাদ, নিশীথিনী … এগুলো যত সুন্দর, কী হবে একটা টেনশন আছে। পরের দিকেরগুলো আমার কাছে মনে হয়েছে ওরকম না। 

প্যাপাইরাস: বেশ কিছু লেখার মধ্যে আমরা এমন পেয়েছি যে, প্রথমে লেখার পরে আপনাকে পড়তে দিয়েছেন, তখন আপনি বলেছেন, কিছু চেইঞ্জ করলে ভাল হয় বা একটা মতামত দিয়েছেন …।

শীলা আহমেদ: না, আমার বাবার হতো কী … লিখতো, লিখে হাঁটাহাঁটি করতো। যখনই লিখতো, আমার বাবার একটা ছোট টুল ছিল, ওইটার ওপর লিখতো আর একটা পেপার ওয়েট বা কিছু দিয়ে … বা তার অ্যাশট্রেটা দিয়ে লেখাগুলো চাপা দিয়ে রাখতো। এই যে A4 পেইজগুলোয় সবসময় লিখতো। আলাদা আলাদা পেইজে। তো, লিখে যখন রাখতো, রেখে হাঁটাহাঁটি করতো, তখনই আমরা পড়ে ফেলতাম। আমি আর আমার বড় বোন। সে চাইতো, আমরা পড়ি। পড়া হলে বলত যে … কী, কেমন হয়েছে, কী মনে হচ্ছে … সবসময় এটা জিজ্ঞেস করতো। তো তখন আমরা বলতাম আর কী ‒ আমার বড় বোনও বলতো, আমিও বলতাম। তো আমাকে বেশি আদর করতো বলে হয়তোবা আমাকে বেশি গুরুত্ব দিতো (হাসি)।

প্যাপাইরাস: এমনিতে লেখকদের মধ্যে এই ধরণের টেন্ডেন্সি দেখা যায় যে, চেইঞ্জ করতে বলা হলে তার এগেইন্‌স্টে একটা লজিক দেন যে, এই কারণে এটা করা হয়েছে …।

শীলা আহমেদ: হ্যাঁ, হ্যাঁ। তাতো দিতোই। এখন এটা লেখক না শুধু, পৃথিবীর সবাই আমরা এরকম। আমাকে চ্যালেঞ্জ করা মাত্রই আমি আমার পক্ষের একটা যুক্তি দেবো, তাই না? 

প্যাপাইরাস: হ্যাঁ, তাতো বটেই। কিন্তু স্যারের ক্ষেত্রে রিঅ্যাকশন কেমন আসতো?

শীলা আহমেদ: (হাসি) রিঅ্যাকশন খুবই খারাপ। সে খুবই রাগি মানুষ ছিল। সে প্রচণ্ড রেগে যেতো। সমালোচনা তো সহ্যই করতে পারতোনা। খুবই রেগে যেতো, বকাবকি করতো। কিন্তু আলটিমেটলি চেইঞ্জ করতো।

প্যাপাইরাস: ভীষণ রকমের জনপ্রিয় প্রচুর বই আছে হুমায়ূন স্যারের। নাম বলে শেষ করা কঠিন। এরপরেও কিছু বইয়ের নাম যদি বলি ‒ যেমন, প্রিয়তমেষূ, মেঘ বলেছে যাব যাব, কবি, বহুব্রীহি, কোথাও কেউ নেই… মানে শেষ তো নেই! তারপরও তুমুল জনপ্রিয়। এখনও সবাই অন্তত কেউ গল্পটা বলতে পারুক বা না পারুক, দেখা যায় বইয়ের নামটা জানে। এগুলোর মধ্যে আপনাকে নাড়া দিয়ে গেছে এমন বই কোনগুলো? দুয়েকটা বইয়ের কথা যদি আলাদা করে বলতেন!

শীলা আহমেদ: সব বইই তো অনেক পছন্দের। প্রথমদিকের বইগুলোর মধ্যে। নবনী বইটা আমার খুব পছন্দ। নবনী খুব ফেভারিট একটা বই। আর কোনটা বলা যায়! বহুব্রীহি খুব ভালো। বড় বইয়ের মধ্যে, এইসব দিনরাত্রি খুবই পছন্দের একটা বই। আমার পড়া প্রথম কোন বড় বই হচ্ছে এইসব দিনরাত্রি। এগুলো আমার খুবই পছন্দের।

প্যাপাইরাস: আচ্ছা, একটা মজার জিনিস জানার ছিল। বইয়ে পড়েছি মঙ্গলবার ‒ সত্য দিবস! আপনাদের বাসায় কী আসলেই এই ধরণের কোন দিবস পালিত হতো?

শীলা আহমেদ: আমাদের বাসায় এরকম অনেক কিছু হতো। আমার বাবা খুবই মজার মানুষ ছিল। আমাদের ছোটবেলা খুবই মজার ছিল। তো এরকম বিভিন্ন দিবস থাকতো। যে গল্পগুলো লেখা, সেগুলো মোটামুটি সবই আমাদের বাসায় প্র্যাকটিস হওয়া বা বাসায় হওয়া জিনিস। আমাদের বাসায় আরও কিছু কিছু নিয়ম ছিল ‒ একদিন আমরা ভাত খেতাম না। আমরা যা ইচ্ছা খেতে পারবো। আবার কোন কোন দিন আমাদের স্বাধীন দিবস ছিল। আমরা তিন বোন সেদিন স্বাধীন হয়ে যেতাম। সেদিন আমরা যা ইচ্ছা তাই করতে পারতাম। আমরা একা বাইরেও চলে যেতে পারতাম। সেদিন বাবা-মা কিছু বলতো না। সকাল সাতটা থেকে সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত আমরা স্বাধীন। আমার বাবা একটা চিঠি লিখে দিত। হাতে লেখা থাকতো ‒ আজকে নোভা, শীলা, বিপাশা স্বাধীন। নিচে আমার বাবা-মা সাইন করতো। আর সেটা নিয়ে আমরা বিভিন্ন জায়গায় বেড়াতে যেতাম।

Papyrus - Sheila Ahmed Interview (4)

প্যাপাইরাস: আপনি তো বড় হয়েছেন শহীদুল্লাহ হলে শিক্ষকদের আবাসিক এলাকায়। কার্জন হলের ঐ এলাকাতো খুবই মনোরম, স্নিগ্ধ। তো আপনার সময় ওখানে কেমন কেটেছে? ঐ সময়ের কোন মজার কথা মনে পড়ে?

শীলা আহমেদ: আমরা তো শহীদুল্লাহ হলে খুবই মজা করেছি। আমার বাবা তো হাউজ টিউটর ছিল ওখানকার। ওখানে ছাত্ররা যে আমাদের কী আদর করতো! আর আমি তো প্রচণ্ড দুষ্টু ছিলাম। আমাদের একটা খেলনা ছিল প্লাস্টিকের। মানুষের মাথার মত। আমার বাবা অ্যামেরিকা থেকে এনে দিয়েছে। ওটার মুখে ছোট একটা ফুটো। চাপ দিলে থুথু বের হয়, আমরা ওটা দিয়ে সব ছাত্রদের মাথায় থুথু মারতাম (হাসি)। খুবই মজা করতাম আমরা। আর যত মোটরসাইকেল থাকতো আমরা কন্টিনিউয়াসলি মোটরসাইকেলের ওপর বসে থাকতাম। ছাত্রদের সাথে ঘুরতাম। আমরা খুবই মজার সময় কাটিয়েছি ওখানে। আমরা ওখানে সাইকেল চালাতাম। ভীষণ মজার সময় কাটাতাম ওখানে।

প্যাপাইরাস: ঐ সময়কার যারা স্টুডেন্ট ছিলেন, পরবর্তীতে আমরা শিক্ষক হিসেবে পেয়েছি, তাঁরা গল্প করতে করতে বলেছেন যে, হুমায়ুন স্যার বিকালে হলের ভেতর দিয়ে প্রায়ই সিগারেট খেতে খেতে হেঁটে যাচ্ছেন, খুবই অন্যমনস্ক। তো তারা খুব অবাক হতেন যে, এমন বিখ্যাত একটা লোক এভাবে হেঁটে যাচ্ছে! আপনাদের কি কখনও কিছু বলেনি এমন যে …

শীলা আহমেদ: তখনকার পরিবেশ এখনকার চেয়ে ভালো ছিল। এমন কিছু শুনিনি। অন্তত ইউনিভার্সিটি কোয়ার্টারের ভেতর না। হয়তো বাইরে বাবাকে খুব রেস্পেক্ট করতো, ভালোবাসতো দেখে বলে নাই। কিন্তু, আমরা প্রচণ্ড আদর পেয়েছি, অনেকদিন থেকেই দেখতো তো, আমরা ওখানে সবাই থাকতাম একসাথে। আর আমার বাবা সাধারণ মানুষের সাথে মিশে যাওয়া মানুষ। আলাদা হয়ে থাকা, এলিট হয়ে থাকা বা কারও সাথে মিশতে দিবে না এরকম না। আমরা প্রতিদিন নিচে নামতাম। আমরা কোথায় ঘুরছি না ঘুরছি সেরকম কোন নিয়ম নেই। শুধু নিয়ম হলো আজানের সময় তুমি বাসায় ফিরে আসবা।

প্যাপাইরাস: এমন গল্পও শুনেছি যে জোছনায় রাত দুইটার সময় সবাই হলের পুকুরে নেমে গিয়েছেন!

শীলা আহমেদ: হু হু, আমরা নেমে গিয়েছি। বৃষ্টি হলেও তো আমরা বাসায় কোনোদিনও বসে থাকিনি। আমরা নিচে নেমে যেতাম, হাঁটতাম, দৌড়াদৌড়ি করতাম। আমরা খুবই মজা করেছি। 

প্যাপাইরাস: ছোটবেলার আরেকটা কথা যেটা আমরা পড়েছিলাম স্যারের লেখা একটা বইতে, যে বইটা স্যারের তিন কন্যাকে উৎসর্গ করে লেখা। সেখানে লেখা ছিল যে, তিন কন্যা বেশ ভয় পেতেন, কে সবচেয়ে বেশি ভয় পেতেন? 

শীলা আহমেদ: আমি সবচেয়ে ভয় পেতাম, আমি এখনো সবচেয়ে বেশি ভয় পাই। আমার বাবা আমাদের প্রচণ্ড ভয় দেখাতো। ভয়ের সিনেমা বাধ্যতামূলক ছিল৷ ভয়ের সিনেমা দেখতেই হবে। ভয়ের গল্প যদি হয়, তাহলে তা শুনতেই হবে। বাবা প্রচুর আড্ডা দিতে পছন্দ করতো আর প্রচুর ভূতের গল্প বলতো। সারা রাত জেগে ভয়ের গল্প বলতো, এবং সেখানে বসে থাকতেই হবে। অনেকভাবে ভয় দেখাতো। খুবই মজা পেত মানুষকে ভয় দেখাতে৷ আমার বাবার অনেক মাস্ক ছিল। সে বিদেশ গেলে অনেক মাস্ক কিনতো। একটা ছিল গরিলার, মাথা থেকে পা পর্যন্ত। সে মানুষজনকে দাওয়াত দিতো, দাওয়াতে সব বন্ধু-বান্ধব আসতো, তখন অনেক ধরণের সিচুয়েশন ক্রিয়েট করার জন্য কেউ একজন গিয়ে লাইট বন্ধ করে দিবে তখন সে আস্তে আস্তে সেই মাস্কটা পরে হেঁটে যাবে। হঠাৎ করে লাইট বন্ধ করে দিবে, আর বাচ্চারা সেই চিল্লাচিল্লি শুরু করে দিবে। 

প্যাপাইরাস: আচ্ছা এই ভয়ের কথাই যখন আসলো, একটা বইয়ের কথা মনে পড়ে গেলো, “ভূত ভূতং ভূতৌ”। বইটার ভূমিকাতে এরকম লেখা আছে যে, হুমায়ুন স্যার বাসা থেকে রাগ করে বের হয়ে গিয়েছিলেন মানিব্যাগ ফেলে, সারারাত কমলাপুর রেলস্টেশনে ঘুরে আসার পর দেখেন যে আপনাদের একজনের প্রচণ্ড জ্বর, বাথটাবে ডুবিয়ে রেখেছে…।

শীলা আহমেদ: এই কাহিনীটা আমার বড় বোনের ছিল। সারারাত প্রচণ্ড জ্বর। হাই ফিভার, জ্বর আর কমে না, বাথটাবে ডুবিয়ে রাখলো। আমরা কেউ অসুস্থ হলে আমার বাবা অনেক কষ্ট পেতো। একটু পরপর এসে জিজ্ঞেস করতেন, বাবা কী অবস্থা, কেমন লাগছে? বাবা বাচ্চাদের প্রচণ্ড আদর করতো। নিজের বাচ্চাদের আরকি। তার আদরের প্রকাশটা অন্যরকম। যেমন আমি আমার বাচ্চাদের একটা কন্টিনিউয়াস কেয়ার নেই। ঠিকমত লেখাপড়া করছে কিনা, সব দিক দিয়ে সব কিছু পারছে নাকি। বাবা এরকম না। ক্যালকুলেটিভ কোনো মানুষ ছিলেন না। সবসময় চিন্তা করতেন না যে আমার বাচ্চারা লেখাপড়া করছে কিনা। বাবা কখনো পছন্দ করতেন না যে, বাচ্চারা সারাদিন পড়ালেখা করবে। বাচ্চারা পড়ার টেবিলে বসে থাকবে কেন? ওরা করবে দৌড়াদৌড়ি, খেলাধুলা৷ তার আদরটা এরকম ছিল যে, কোন একদিন গরমকালে আমার বড় বোন বলছিল, “ইশ্‌, যদি ভাপা পিঠা খেতে পারতাম!” আমার বাবা যে কথাটা শুনেছে তাও আমরা জানতাম না৷ সে বসে লিখছিল। বিকেলে সে কাকে বলে কোথা থেকে যেন এত্তগুলো ভাপা পিঠা নিয়ে আসলো। মানে কোনো একটা কথা আমরা মুখ দিয়ে বলেছি, আর বাবা সেটা করেনি, এরকম কখনো হয়নি। বাবা সবসময় বলতেন যে, তোমাদের জীবনে কী কোনো চাওয়া আছে, যা আমি পূর্ণ করি নাই? আমরা যা চাইতাম, পেয়ে যেতাম। 

প্যাপাইরাস: স্যার তো ছোটদের অনেক পছন্দ করতেন, তাদের নিয়ে লিখেছেন। এটা কি নিজের আগ্রহ থেকেই নাকি আপনাদের তিন বোনের চাপের কারনে? 

শীলা আহমেদ: না, সে নিজের আগ্রহ থেকেই লিখেছে। সে নিজে বাচ্চাদের যেমন পছন্দ করতো, বাচ্চাদের গল্প বলতেও পছন্দ করতো। সে ছোটবেলায় অনেক গল্প বলতো তো, সেই গল্পগুলাই বলতে বলতে হয়তো একসময় লিখতে ইচ্ছা হয়েছিল।

প্যাপাইরাস: তিনি তো শিশুতোষ গল্প লিখতেন৷ আপানারাও তা পড়ে এসেছেন। আপনার পরবর্তী প্রজন্মের কাছে এইগুলো কীভাবে তুলে ধরছেন বা ধরবেন? 

শীলা আহমেদ: আমার বাচ্চাদেরকে তো আমি আমার বাবার গল্প পড়ে শোনাই, যখন থেকে একটু বোঝার বয়স হয়৷ কিন্তু একটা সমস্যা কী, আমরা যেরকম বাংলা পারতাম, ওরা সেরকম পারে না। হতে পারে ওরা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ে। খুব ছোট বয়সে আমি পড়েছি ‘নীল হাতি’ আর ‘তোমাদের জন্য রূপকথা’। আমার কাছে খুবই মজা লেগেছে পড়ে। কিন্তু আমার বাচ্চাদের যখন আমি নীল হাতি পড়ে শোনালাম, একটা বাক্য বললে বলে “এটার অর্থ কী?” কোনো বাক্যের পুরো অর্থই বোঝে না৷ গল্প বলার মজাই শেষ৷ ওদের জন্য এটা কঠিন, তবুও আমি বড়গুলোকে পড়ে শোনাই৷

প্যাপাইরাস: এমনিতে আপনার মনে হয় না এই শিশুতোষ গল্পগুলো সহ অন্য বইগুলোও ইংরেজিতে অনুবাদ হওয়া দরকার? তাহলে আরও বেশি পাঠক পড়তে পারে? 

শীলা আহমেদ: হ্যাঁ, অনেক মনে হয় এটা। এইগুলো অনুবাদ হলে আমার বাচ্চারা পড়তে পারতো। অনেক বাচ্চা এখন ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ে। ওদের অনেক ভালো লাগতো।  

প্যাপাইরাস: ছোটোবেলায় স্যারের একটা গল্প পড়েছিলাম, ‘বোকা দৈত্য’। গল্পটা পড়ে কেঁদে দিয়েছিলাম সেই সময়৷ 

শীলা আহমেদ: হ্যাঁ, ঐটা তো খুবই সুন্দর৷ আমিও কেঁদে দিয়েছিলাম। আমার বাচ্চাদের শোনাই। ওরা স্বাভাবিক থাকে, আর আমি ওদিকে ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কাঁদি। 

প্যাপাইরাস: আচ্ছা, এখন একটা সিরিয়াস প্রশ্ন করি। অনেক লেখকদের তো রাইটার্স ব্লক চলে আসে। দেখা যাচ্ছে লিখতে পারছে না। দিনের পর দিন, সপ্তাহের পর সপ্তাহ, এমনকি বছরের পর বছরও হয়। কিন্তু স্যার প্রায় ৪০ বছরের লেখক ক্যারিয়ারে এতো এতো বই লিখে গেছেন, দুইশরও বেশি। এতো বই যে লিখতেন, কখনো কি রাইটার্স ব্লক আসেনি? 

শীলা আহমেদ: আমার বাবা অনেক সময় বলতেন যে হয়েছে, কিন্তু বড় হওয়ার পর আমি আসলে দেখিনি। তবে হতো অল্প সময়ের জন্য। লেখা পছন্দ হতো না, পছন্দ না হলে লেখা কাগজগুলো সব মুঠি করে নিয়ে ফেলে দিত৷ একটা লাইন লিখছে, পছন্দ হচ্ছে না, সাথে সাথে পেইজ ফেলে দিচ্ছে। তখন বুঝতাম যে ডিস্টার্বড্‌৷ কিন্তু দিনের পর দিন রাইটার্স ব্লক ‒ ঐটা দেখিনি৷ হয়তো আমার জন্মের আগে হতে পারে, কিন্তু আমি দেখিনি।

প্যাপাইরাস: সেই বিরক্তিকর সময়ে আপনাদের সাথে রিঅ্যাকশন কেমন ছিল? রাগ হতেন?

শীলা আহমেদ: রাগ হতেন। রাগ হওয়া মানে ছিল বকাবকি। বকাবকি করতো আর অনেক হাঁটাহাঁটি করতো তখন। আমার বাবা লেখার সময় এমনিই সবসময় হাঁটতো। এই একটুখানি লিখলেই পায়চারী করতেন। লেখার আগে কোনো প্লট ভাবতো যখন, কন্টিনিউয়াসলি হাঁটতো। শহীদুল্লাহ্ হলের বারান্দা গুলো অনেক বড় তো, এক মাথা থেকে আরেক মাথায় হাঁটতো,  সিগারেট খেতো আর প্লট ভাবতো। একটু পর পর চা খেতো। আর যখন কোনো লেখা পছন্দ হতো না, রাগারাগি করতো। আর আমরা বকা খেতাম আর কি! তখন ভয় পেতাম। সামনে যেতে চাইতাম না বেশি একটা। লুকিয়ে লুকিয়ে থাকতাম। নিজের ঘরে বসে থাকতাম। 

প্যাপাইরাস: স্যার কি কখনও আপনাকে লিখতে উৎসাহিত করেছিলেন? এমন হয়না যে, যারা খুব জনপ্রিয় লেখক, তাদের সন্তানদের মাঝেও ঐ পরিবেশে থাকতে থাকতে হয়তো লেখার ঝোঁক চলে আসছে এবং তারা লিখছেন? 

শীলা আহমেদ: না, ওভাবে কিছু হয়ে ওঠেনি। তবে নুহাশ খুব ভালো লেখে। নুহাশ তো ইংলিশ মিডিয়ামে পড়েছে, ওর ইংরেজি লেখা এতো ভালো, মুগ্ধ হয়ে যাওয়ার মতো। আমরা তো বাংলা মিডিয়াম, আমরা তো এতো ইংরেজি বই পড়িনি যতটা বাংলা পড়েছি। কিন্তু নুহাশের লেখা হচ্ছে খুব সহজ ইংরেজি, কঠিন লাগে না পড়তে। আমার বাবার লেখা পড়লে যেরকম হাহাকার অনুভুতি হয়, নুহাশের লেখা পড়লেও সেরকম অনুভুতি হয়। লিখতে পারে কিন্তু লেখক হিসেবে ওর ক্যারিয়ার গড়ার ইচ্ছা নাই।

প্যাপাইরাস: মধ্যবিত্ত পরিবারের স্ট্রাগল নিয়ে লেখা এবং স্যারের প্রথম লেখা বই ‘শঙ্খনীল কারাগার’ ‒ যদিও এটা দ্বিতীয় প্রকাশিত বই, সেটা মানুষ খুবই পছন্দ করলো উপন্যাস হিসেবে, পরবর্তীতে সিনেমা বানানো হলো, সেটাও মানুষ খুব পছন্দ করলো। তো আপনার কাছে কোনটা বেশি পছন্দ? বই নাকি সিনেমা?

শীলা আহমেদ: বই, আমার কাছে একশ বার বই। সিনেমার চেয়ে সবসময় বই পছন্দ।

প্যাপাইরাস: এখানে প্রথম চরিত্রের যখন ইন্ট্রোডাকশন ন্যারেট করে, রঞ্জু নাম। এখন রঞ্জু নামের ব্যবহার সহ অন্যান্য বিশেষ নামেরও অনেক ব্যবহার হয়েছে অনেক গল্পে অনেক জায়গায়, এই একই নামগুলো কেন?

শীলা আহমেদ: হ্যাঁ, আমার বাবার কাছে অনেক প্রিয় কিছু কমন নাম আছে। আরও যেমন ‒ আনিস, রঞ্জু। আনিস নামটা প্রচুর উপন্যাসে পাবা, আনিস নামের কোনো অভাব নাই। কিন্তু কেন প্রিয় সেটা বলতে পারবো না।

প্যাপাইরাস: এরকম যে বিভিন্ন নামের চরিত্র, সত্যিই কি ঐ নামের ঐরকম মানুষ আছে?

শীলা আহমেদ: আসলে এইসব মনে হয় খুব কমন নাম, কোনো এক্সেপশনাল নাম না। আনিস, রঞ্জু এই ধরনের নামগুলা মধ্যবিত্ত একটা পরিবারের প্রতিচ্ছবি দেয়, সেজন্য হতে পারে।

প্যাপাইরাস: খুব বিখ্যাত হয়ে গেছে কিছু চরিত্র। এই চরিত্রগুলোর মিল আপনার দেখা কোনো মানুষের মধ্যে আছে? কাদের সাথে এই ধরনের চরিত্রগুলো মেলে বলে আপনার মনে হয়? যেমন হিমু, মিসির আলি, শুভ্র …।

শীলা আহমেদ: এগুলো সব আমার বাবার সাথে মেলে। সবগুলোই আমার বাবার ভেতরের একেকটা সাইড।

প্যাপাইরাস: কিন্তু এই চরিত্রগুলো খুবই ভিন্ন ধরনের। একজন একরকম হলে তো আরেকজন অন্যরকম। হিমু যেমন খুব খাপছাড়া, আবার মিসির আলি খুবই লজিকাল। 

শীলা আহমেদ: হ্যাঁ, এগুলো একেকটা একেক ধরনের, কিন্তু সবগুলোই তার ভেতরের বিভিন্ন সাইড, এর বাইরে আর কিছুই না। হিমু তো সম্পূর্ণই তার ভেতরের একটা রূপ, আমার বাবাকে যারা চেনে তারা বলতে পারবে।

প্যাপাইরাস: যা হোক, আমরা মিস করে গেছি। আপনার কাছ থেকে এখন শুনে যতটুকু জানা যায়। আরেকটা জিনিস জানার ছিল, এই যে সেন্টমার্টিন দ্বীপটা,  দারুচিনি দ্বীপ নামে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন স্যার। তো সেন্টমার্টিন বা দারুচিনি দ্বীপ কেমন লাগে আপনার?

শীলা আহমেদ: খুবই সুন্দর। আমরা যখন গিয়েছি, ইদানিং যাইনি, যখন গিয়েছি তখন তো কেউ যায়নি, মানে আমরা যখন গিয়েছি তখন খুবই কষ্ট করে, ট্রলারে করে ছোট ছোট ইঞ্জিন দেওয়া বোটে করে। আমরা যখন যেতাম তখন কিচ্ছু নেই ওখানে, কেমন র একটা দ্বীপ, বাইরের কেউ যায়ই না। আমরা অনেকবার গিয়েছি ওখানে। আমার বাবা যখন জায়গা কিনবে ঠিক করেছে, ওটা ঠিক করার জন্যে আমরা অনেকবার গিয়েছি।

প্যাপাইরাস: ওখানকার মানুষ যারা ছিল, উপকূলের প্রান্তিক পর্যায়ের জেলে পরিবার। এরা তো স্যার এর লেখালেখি কখনো পড়েনি … স্যারকে কিভাবে দেখতো তারা?

শীলা আহমেদ: না, ওদের কাছে তো আমার বাবা কিছু না, ওদের কাছে কিছু মনে হয়নি …।

প্যাপাইরাস: যখন জানলো একজন লেখক তখন তাদের রিঅ্যাকশন কী ছিল? আপনাদেরকে কিভাবে আপ্যায়ন করল?

শীলা আহমেদ: না, ওরা নরমাল, ওরা ওরকম না, আন্তরিক। বাংলাদেশের সব জায়গায় গ্রামের মানুষ যেরকম। শহরের মানুষ দেখলে কী করবে? একটা ডাব খাওয়াবে, একটা কিছু করবে। ওরা ওরকম ভাবেই ট্রিট করত, খুবই আন্তরিক। বাংলাদেশের গ্রামের মানুষরা তো ভীষণ আন্তরিক। তাই না?

প্যাপাইরাস: আচ্ছা, এতোগুলো বই যারা পড়েছে মোটামুটি, তাদের দেখা যায় যে গল্পের নাম মনে আছে তো গল্প মনে নেই, গল্প মনে আছে তো গল্পের নাম মনে নেই …।

শীলা আহমেদ: তা তো অবশ্যই। আমি নিজে কয়টার নাম বলতে পারব!? আমি তো নিজেও পারব না। 

প্যাপাইরাস: স্যারের নিজেরও কি এমন হতো যে, নিজের গল্প নিজেরই মনে নেই?

শীলা আহমেদ: হ্যাঁ, হ্যাঁ, এরকম হতো।

প্যাপাইরাস: তাঁর লেখার প্রসেসটা কেমন ছিল? যে নিজের প্লটটা ভেঙ্গে গেল, বা হয়তোবা ওভারল্যাপ হয়ে যাচ্ছে কী না কখনও..।

শীলা আহমেদ: না, এটা না। সে একবার লিখলে একদম গটগট করে লিখে ফেলতো। লিখে শেষ করে সে কখনো রিভিশনও করতোনা। তার লিখার এমন কোন সিস্টেম নেই যে, আগের পেইজ পড়ে দেখবে, ভুল হল না ঠিক হল। লেখা শেষ মানে শেষ । ঐটা ঐভাবেই পুরো পাণ্ডুলিপি দিয়ে দিত। দ্বিতীয়বার কখনও পড়তো না। আর লিখতে গিয়ে কখনো প্লট ভুলে যাওয়া, এটা কখনও হয়নি। অনেক আগের বই ঐটা কোনটা ছিল, ধরো আমাদেরকে জিজ্ঞেস করতো। “বাবা, ওটা কোনটা ছিল” বা কেও হয়তো জিজ্ঞেস করলো যে ওটা কোনটা ছিল বলতো? এরকম ভাবে হয়তো আগের লিখা একটা ভুলে গিয়েছে। কিছু বললে বলতো বা কোনো প্রশ্ন থাকলে বইটা নিয়ে একটু দেখতো তখন। এরকম আর কি!

প্যাপাইরাস: এমনিতে আপনাদের বাসায় তো অনেক নামকরা লেখক, প্রকাশকরা আসতো, আসতেই থাকতো, আড্ডা দিতো সবসময়। তো কোন লেখকদেরকে আপনার কাছে খুব ভাল লেগেছে? যেমন, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় …।

শীলা আহমেদ: না না, আমাদের বাসায় খুব আসতো যেত না। আমার বাবার সাথে খুব ভাল সম্পর্ক ছিল। কিন্তু এতো বেশি বাংলাদেশে আসত না। আমাদের বাসায় অনেক এসেছে, এরকম না। একবার দু’বার আমাদের বাসায় বেড়াতে এসেছিল। আড্ডা হওয়ার মতন না। গল্পগুজব কিছুক্ষণ করেছে, খাওয়াদাওয়া করেছে এমন।

প্যাপাইরাস: এমনি অতিথি হিসেবে?

শীলা আহমেদ: অতিথি হিসেবে। ঐ যে আড্ডা দিত রেগুলার, বন্ধু হিসেবে আসতো ‒ ওরকম না। ওরকম আমরা দেখিনি। বাবাকে ভালবাসতো, বাবা যদি কলকাতা যেত, ইন্ডিয়া যেত, তখন তারাও অনেক আড্ডা দিত এরকম। আমাদের বাসায় দুই তিনবার এসেছে। শীর্ষেন্দুকে নিয়ে এসেছে আমার বাবা, শীর্ষেন্দু আমাদের খুব প্রিয় লেখক। সুনীল আর শীর্ষেন্দু। আবার, আমার বাবার একটা নিয়ম, যেই আসবে পা ছুঁয়ে সালাম করো। এই একটা সিস্টেম। আর আমরা এটা খুব অপছন্দ করতাম (হাসি)। যেই আসবে। ঢাকা ইউনিভার্সিটির স্যার ‒ পা ছুঁয়ে সালাম করো। শিক্ষক ‒ পা ছুঁয়ে সালাম করো। সবাইকে আমাদের পা ছুঁয়ে সালাম করতে হতো। এই সালাম না করলে আমরা খুব বকা খেতাম।

প্যাপাইরাস: এমনিতে ইউনিভার্সিটির পরিসরেই তো বড় হলেন। আবার এখন আছেনও তো এখানে। তো, এখন শহীদুল্লাহ হলে যেতে ইচ্ছা করে না মাঝে মাঝে? নস্টালজিয়া কাজ করে না?

শীলা আহমেদ: হ্যাঁ, আমি গিয়েছি তো কয়েকবার। গেলে আর আগের মতো লাগে না।  আগে শহীদুল্লাহ হলের গেইট দিয়ে ঢুকতাম, হাঁটতে হাঁটতে কতদূরে আমার বাসা! আর এখন মনে হয় এইটুক। ছোটবেলার দৃষ্টিভঙ্গিটা আলাদা। ছোটবেলায় মনে হতো বিশাল বাসা। 

প্যাপাইরাস: নাটকগুলা যে করা হতো, আপনারা কি দুইজন একসাথে বসে দেখার সময় পেতেন? 

শীলা আহমেদ: হ্যাঁ হ্যাঁ, আমরা দুইজন না। আমার বাবার নিয়ম ছিল যে ফুল ফ্যামিলি আমরা একসাথে, ফুল ফ্যামিলি মানে এক্সটেন্ডেন্ট ফ্যামিলি আর কি! সমস্ত ফুপু, চাচা, চাচী, ভাই, বোন, দাদি আমরা সবাই।

প্যাপাইরাস: নাটকগুলো দেখার সময় কখনো এমন হয়নি যে ‒ আহা এখানে এইভাবে করলে ভাল ছিল?

শীলা আহমেদ: এরকম … না এরকম না। সবাই এ্যাপ্রিশিয়েট করতো। 

প্যাপাইরাস: এঞ্জয় করতেন সবাই একসাথে?

শীলা আহমেদ: হ্যাঁ, খুব এঞ্জয় করতাম। 

প্যাপাইরাস: আর বাবার ডিরেকশনে আপনি অভিনয় করেছেন, যখন ভুল হচ্ছে বা ঠিক হচ্ছে তখন বাবার ডিরেকশন কী রকম ছিল? 

শীলা আহমেদ: প্রচণ্ড রাগী। মানে কোনো বাবা-মেয়ে বলে কথা নেই। আমার বাবার জীবনযাত্রা আলাদা। দর্শন আলাদা। বাইরে কোন ছেলে-মেয়ে আদর নেই। আর বাসার মধ্যে তুমি বাচ্চা, বাইরে না। বাইরে সবাই একই রকম। আমরা প্রচণ্ড বকা খেতাম। বাবা খুবই রাগী মানুষ ছিলেন। রেগে গিয়ে চিল্লাচিল্লি।

প্যাপাইরাস: বাবার সাথে শেষ কথা কী ছিল?

শীলা আহমেদ: বাবার সাথে আমার শেষ কথা হলো যখন সে ক্যান্সার হওয়ার পর দেশে আসলো তখন। তখন আমরা ভাই-বোনরা দেখতে গেলাম। তখন সে বললো ওখানে কিভাবে চিকিৎসা হচ্ছে এইসব গল্প করলো আরকি। এই …।

প্যাপাইরাস: এখন যদি উনি ফিরে আসতেন তবে প্রথমে কী বলতেন আপনি?

শীলা আহমেদ: এটাতো খুবই কঠিন প্রশ্ন করলে। (একটু ভেবে) এখন ফিরে আসলে তাকে আমি কী জিজ্ঞেস করতাম … জীবন কেমন কাটলো, বাবা?

প্যাপাইরাস: আপনারা যখন ঘুরতে যেতেন তখন কোন ভ্রমণ …।

শীলা আহমেদ: আমরা প্রচণ্ড ঘুরতে যেতাম। প্রতি মাসেই একবার করে ঘুরতে যেতাম। প্রত্যেক বছর একবার করে কক্সবাজার যেতাম।

প্যাপাইরাস: নুহাশ পল্লীতে আমরা গাছের ওপর একটা ঘর দেখি। ঐটার পেছনের কাহিনী কি?

শীলা আহমেদ: নুহাশ খুব ছোট ছিল তো, নুহাশের আগ্রহতেই বানানো ওটা।

প্যাপাইরাস: স্যারের প্রাকৃতিক ব্যপারগুলো ‒ জ্যোৎস্না বা বৃষ্টি খুব প্রিয় ছিল। আপনার কি প্রিয়?

শীলা আহমেদ: আমার বৃষ্টিই প্রিয় বেশি। 

প্যাপাইরাস: বাইরে এখন বৃষ্টি হচ্ছে অবশ্য …

শীলা আহমেদ: আর কোনো প্রশ্ন আছে? এতো কিছু ছাপবে কীভাবে, লিখবে কীভাবে? (হাসি)

প্যাপাইরাস: লিখতে হবে। আর কোন উপায় নাই। ওহ, কোন ছবি তোলা হলো না তো

শীলা আহমেদ: ছবি তুলবা? সাজগোজ করে আসব? ঠিক আছে। একটা সুন্দর জামা পরে আসি তাহলে … হ্যাঁ? 

(সংক্ষেপিত)

কয়েকটা ছবি তুলে অসম্ভব বন্ধুত্বপূর্ণ হুমায়ূনকন্যা শীলা আহমেদকে ধন্যবাদ জানিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলাম আমরা। ফুলার রোডে তখন বৃষ্টিতে ভেজা বাতাসের গন্ধ। দিনের আলো নিভে যাবে যাবে এমন অবস্থা। কিছুক্ষণ পরেই অন্ধকার নামার চেষ্টা করলে জ্যোৎস্নার আলো তাতে বাধা দিবে। জ্যোৎস্নাবিলাসী কিছু মানুষ সেই আলোতে ভিজে আনন্দিত হবে, অবাক হবে। হুমায়ূন আহমেদ যেমনটা হতেন। কে জানে, হয়তো পরপারে তাই হচ্ছেন এখন। তাঁর অবাক করা সৃষ্টিগুলো যতদিন আছে, ততদিন সেই প্রত্যাশা প্রত্যেকটা হুমায়ূনপ্রেমীই করে যাবে। আর বাংলা ভাষা যতদিন থাকবে ততদিন তাঁর সৃষ্টিও রয়ে যাবে।

পরপারে ভাল থাকবেন, প্রিয় হুমায়ূন আহমেদ।

শীলা আহমেদের সাথে প্যাপাইরাস পরিবারের সদস্যরা

কমেন্ট করুন