fbpx

স্মৃতির গোধুলিতে

কারো প্রেমে পড়ার মুহুর্ত, পৃথিবীতে সবচেয়ে সুন্দরতম মুহুর্তের  মধ্যে একটি। তারপরে যদি কোনো মুহুর্ত আমাকে রাখতে বলা হয় তবে অবশ্যই আমি সমুদ্রের কিনারায় বসে অস্তোন্মুখ সূর্য দেখার মুহুর্তকেই রাখব। কি, হয়ত ভাবছেন প্রেমিকা নিয়ে এমন মুহুর্ত তো সবারই পছন্দ। না না, একটু ভুল হলো যে। আমার ক্ষেত্রে একটু ভিন্ন যে বিষয়খানি। আমি আমার সঙ্গী হিসেবে প্রেমিকা নয় বরং আমার বন্ধুগুলোকে চাই যে। আচ্ছা ঐ দিনের ঘটনায় আসা যাক….

ঐদিনের তারিখটা আসলে মনে নেই। সকালটা খুবই মনোরম ছিল। সকাল থেকে কলাতলী বীচে বাদরামু শেষে দুপুরবেলা ফ্রেশ হলাম হোটেলে এসে।ক্ষুধায় পেটে হাইড্রোক্লোরিক এসিডের নিঃসরণ যেন বেড়ে গেল।যাই হোক চার বন্ধু মিলে চিংড়ি দিয়ে দুপুরের ভোজটা সেরে ফেললাম। এই কক্সবাজারের মধ্যে এখন পর্যন্ত এটাই ছিল বেস্ট খাবার।

দুপুরের খাবার দাবার সেরে টমটম নিয়ে চার বন্ধু বের হলাম। আমাদের পরিকল্পনা ছিল যতগুলা বীচ আছে একদম শেষের বীচে প্রথম যাব। তারপর আস্তে আস্তে ফেরার সময় সব বীচ দেখব এবং সবশেষে রেজুখাল সী-বীচে বসে চারজন বাংলার শেষ নবাব সিরাজউদ্দৌলার মত সূর্যাস্ত দেখব।

কিন্তু সব পরিকল্পনা কি আর বাস্তবায়ন হয়।অনেক সময় প্রকৃতি আপনার পরিকল্পনা নস্যাৎ করার জন্য উঠে পড়ে লাগে। তবে হ্যা, প্রকৃতি যে সবসময় নস্যাৎই করে এমন কিন্তু নয়। মাঝে মাঝে প্রকৃতি আমাদের নতুন অনেক অভিজ্ঞতা দেয়।আমাদের ক্ষেত্রেও এমনটাই হয়েছিল। প্রকৃতি আমাদের অন্য এক স্মৃতি উপহার দিয়েছিল। যেটা হয়ত আমরা চাইলেও কোনো সময় পারতাম না।

আমাদের হাতে সময় খুব একটা ছিল না। তাই প্রতিটা জায়গায়ই আমরা ধরুন ১০/১৫ মিনিট ব্যাপী ক্ষেপণ করছিলাম। আমরা চার বন্ধু আসলেও আজ সন্ধ্যায়ই আবার আমাদের দুজনকে ঢাকায় যেতে হবে, তাই এত তাড়াহুড়া। হবে মানে হবেই। কেন বলছি এত জোর দিয়ে,আমাদের একজন,উনি যাবেন উনার প্রিয়তমার সহিত সাক্ষাতের মনোরথে। সাক্ষাৎ না করলে হয়ত মেরেই ফেলবে। আর একজন ঐটা আমি নিজে। তারপরের দিন আমার ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষা। তো বুঝতেই পারছেন…. 

যাইহোক আমরা সবকিছুই মোটামুটি দেখছিলাম। ভালোই মজা, মাস্তি, উপভোগ করেছি। তারপর আমরা রওয়ানা দিলাম আমাদের শেষ গন্তব্য রেজুখাল বীচের উদ্দেশ্যে। যেখান থেকে আমরা নবাবের অনুভুতি নেব। আমরা চলতেই থাকলাম, চলতেই থাকলাম।কিন্তু রাস্তা যেন কোনোভাবেই শেষ হচ্ছিল না।ঘড়ির দিকে নজর দিলাম। দেখলাম যদি আমরা নবাবি অনুভুতি নিতে চাই তবে সূর্য মামাকে ছাড়াই অন্ধকারে বসে বসে নিতে হবে।

তারপর শৈবাল বলল, বন্ধু চল সামনে গাড়ি দাড় করাই। ঐখান থেকেই বরং সূর্যাস্ত দেখি। অগত্যা, কি আর করব। আর এদিকে সময়ও ছিল না। চারজন দিলাম দৌড়, এক দৌড়ে সমুদ্রের পাড়ে।

ঐখানে দাঁড়িয়ে দাড়িয়েই সূর্যাস্ত দেখলাম। তবে সত্যি কথা বলতে এর আগের দিন যেরকম ভালো লেগেছিল ঐদিন তেমন একটা ভালো লাগে নাই। মনটা কেমন যেন খারাপ হয়ে গেল। গিয়ে চারজন বসলাম টং এর দোকানে। মামাকে বললাম মামা চারটা দুধ চা দাও কড়া করে।

কিন্তু ভয়ংকর এক সৌন্দর্য আমাদের জন্য অপেক্ষা করতেছিল। এই সৌন্দর্য, প্রাণবন্ত, স্নিগ্ধতা গুটি কয়েক শব্দ দ্বারা ব্যক্ত করা অসম্ভব। চোখের কিনারায় আজও লেগে আছে ঐ ক্ষণিকের মুহুর্তখানি।

সূর্য তো অস্তোন্মুখিত হলো। কিন্তু যতই সময় যেতে লাগল, সৌন্দর্যের গভীরতা ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে লাগল। সেই আধারে আচ্ছন্ন গোধুলির মায়াবী মুহুর্ত কখনোই ভুলতে পারব না। চা আসতে দেরি হচ্ছিল বিধায় একটু রাগই হচ্ছিল। কিন্তু অপেক্ষার ফল মিষ্টি হয় জানতাম। কিন্তু এমন মিষ্টি আর অভিভূত হবে জানা ছিল না। ভাবতে ভাবতেই মামা চা নিয়ে এলো। আসল মুহুর্তখানি এখনো বাকি ছিল।

সামনে কেমন একটা ছোট্ট ভাঙা মাচা দেখা যাচ্ছিল। চারজন চা খেতে খেতে গেলাম ঐ মাচার উপর। মাচার উপর থেকে চারজন চায়ে চুমুক দিতে দিতে অস্তোন্মুখ গোধূলির অপরুপ সৌন্দর্য খানি উপভোগ করছিলাম। উফফফফফফ এ যেন চোখের শান্তি, মনের শান্তি, আত্নার শান্তি। এ রকম শান্তি মানুষ বারবার পেতে চাইবে বারবার,  হাজারবার।

আর একটা কথা, যেটা না বললেই নয় সেটা হলো “চা”। আমি একটি লাইনও বাড়িয়ে বলছি না। সত্যি বলছি, চায়ের স্বাদ অন্যরকম ছিল। কেমন একটা নেশা ধরে গেছিলো ঐ গোধুলির প্রতি। এমন অদ্ভুত স্বাদ আমাদের মুহুর্তগুলোকে আরও গাঢ় করে দিয়েছিল। উফফফফফফ ভাবলেই কেমন স্বপ্নের মত লাগে ঐ সন্ধ্যাখানা। কেমন একটা ঘোর যেন ছিল ঐ খানিকটা সময়।

আমরা ছিলাম ঐখানে, যতক্ষণ পর্যন্ত কিঞ্চিৎ পরিমান আলোও ছিল। অবশেষে ঐ আলোটুকুও নিভে গেল অন্ধকারের অতলে। আমাদেরও সময় ঘনিয়ে আসছিলো। অনিচ্ছা সত্ত্বেও উঠলাম, রওয়ানা দিলাম স্টেশনের উদ্দেশ্যে। 

পুরো রাস্তা জুড়ে আমরা কেউ একটা শব্দও করিনি। হয়ত অনেকেই ক্লান্ত ছিলাম। কিন্তু আমার মাথা থেকে ঐ ঘোর যেন কাটছিলোই না। সত্যি নেশা ধরে গেছে ঐ চা আর ঐ মুহুর্তের প্রতি।