শূন্যতা

“হ্যালো, অধরা। বিশ্বাস করো ফেসবুকে যে মেসেজ তোমাকে পাঠানো হয়েছে তা আমি লিখিনি। তোমাকে আমার ভালো লাগে- এ কথাটি যে মেসেজে বলা হয়েছে এটা পুরোপুরি মিথ্যা।” অধরাকে কথাটা বলতে গিয়ে কন্ঠের  অসহায়ত্ব ভাবটা লুকোতে পারছিলাম  না আমি।

কিন্তু অসহায়ত্বটা অধরার মনে দাগ কাটা দূরে থাক, ও আরো চড়াও হয়ে উঠলো আমার উপর, “দেখো রুদ্র! স্ক্রিন শট দেখাবো তোমাকে?”

“আমিও বুঝছি না যে কীভাবে কী হলো! অনেক ভালো একটা মেয়ে তুমি। তোমাকে আমার ভালো লাগতেই পারে। কিন্তু জীবনসঙ্গী হিসেবে তোমাকে আমি পেতে চাই এটা আমি কেন লিখবো? বন্ধু হিসেবে পছন্দ করি তোমাকে, এটুকুই। আর তোমার জীবনে যে একজন আছে তা তো আমি জানি। জেনে শুনে এ পাগলামো কেন করবো, বলো? কোথাও একটা ভুল হচ্ছে।” 

“তোমার সাথে আমার আর কোনো কথাই বলতে ইচ্ছে করছে না।” বলে আমাকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই ফোনটা রেখে দিল অধরা।

ফোনটা হাতে নিয়ে জানালার ধারে গিয়ে বসলাম। দূর দিগন্তের লালচে আকাশটা আজ এতো ঘোলা লাগছে কেন! দীর্ঘ দুই বছরের বন্ধুত্বের বন্ধন আজ ফেসবুকের দুটো লেখার কাছে হেরে গেল ভাবতেই চোখটা ভিজে উঠলো। কীভাবে ওকে বিশ্বাস করাবো যে, আমি নিজেও জানি না কীভাবে কী ঘটলো! আমার থেকেও যার ভার্চুয়াল জগতের প্রতি বেশি বিশ্বাস তাকে আর বিশ্বাস করানোর প্রয়োজনই বা কী! চোখ মুছে উঠে দাঁড়ালাম। জীবনে আজ প্রথম বন্ধুত্বের প্রতি তীব্র এক বিতৃষ্ণা জন্ম নিলো মনে। মনটাকে একটু শান্ত করতে বাসা থেকে বের হলাম।

ভার্সিটিতে যাতয়াত করছি নিয়মিত। ক্লাস, পরীক্ষা কোনো কিছুর কমতি নেই। ব্যাস্ততা আর অবসর সব মিলেই জীবন চলছে জীবনের গতিতে। কিন্তু কেমন এর ছন্দপতনের ছোঁয়া আমাকে বিষণ্ন করে তোলে। সবকিছু থেকেও যেন নেই এমন একটা ভাব আচ্ছন্ন করে রেখেছে মনটা। বন্ধুদের সাথে আড্ডায় মশগুল হয়ে চা আর সিগেরেটের ধোঁয়ায় তর্কে আচ্ছন্ন  সময়েও আমার এই বিষণ্নতার ছায়া যেন কাটে না। অধরার সাথে দেখা হয় প্রায়ই, কথা হয় না। কথা বলতে ইচ্ছে করে, কিন্তু উৎসাহ নিয়ে এগিয়ে যাওয়া হয় না। বন্ধুত্বের দৃঢ় বন্ধনকে যে ঠুনকো বিশ্বাসের বলে কাঁচের মত কথার ধারে দু’টুকরো করে দিতে পারে, সে বন্ধনকে জোড়া দেবার জন্য তেমন আঠালো আগ্রহ আমার মনে জন্ম নেয় না। কিন্তু এতো সহজেই বন্ধনটা টুঁটে যাবে তাও যেন মেনে নিতে কষ্ট হয় আমার।

কথা হয়না ঠিকই। কিন্তু অধরাকে লক্ষ্য করি আমি নিয়মিতই। খুব যত্ন করেই লক্ষ্য করি। আমার মতো কোন শূন্যতার ছায়া হয়ত খুঁজে বেড়াই ওর দৃষ্টিতে। শুন্যতা কি সত্যিই রয়েছে ওর চাহনিতে? ওকে তো খুবই স্বাভাবিক দেখা যায়। আড্ডা দিচ্ছে বন্ধুদের সাথে, হাসি উপচে পড়ছে দু’ঠোঁটের কানায়। যাওয়া আসার পথে চোখাচোখি হলেও ভাবলেশহীন দৃষ্টি যেন ওর। যেন কোনো দিনই চিনতো না আমাকে। ভীষণ অবাক হই ওর আচরণে। তাহলে কি সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার বেদনাতে আমিই কাতর শুধু। এ কাতরতার তো কোনো যুক্তি নেই।আমার তো কোন ভুল ছিলো না। তবে আমি কেন কাতরাচ্ছি বেদনায়।

আনন্দ আর বেদনার মিশেলে কখন যে সময় পার হয়ে গেলো বুঝতেই পারলাম না।আজ অনার্সের শেষ বর্ষের ফল প্রকাশের দিন। সিঁড়ি দিয়ে উঠছিলাম ডিপার্টমেন্টে, হঠাৎ সামনে এসে পড়লো অধরা। পাশ কাটিয়ে চলে আসলাম। হঠাৎ বুকের মধ্যে হাহাকার করে উঠলো আমার। তিন বছর পূর্বের ছিন্ন বন্ধনের কাঁটা ঘা’টা যে শুকোয়নি এখন বুঝলাম। তিন বছর ধরে পরস্পরের মধ্যে কোনো বাক্য বিনিময় নেই, নেই কোনো ফোনালাপ। অধরা ফেসবুক থেকে সেদিন থেকে আমাকে ব্লক দিয়ে দিয়েছে। আমিও ঘৃণার আগুনে দগ্ধ করতে চেয়েছি ওকে, দৃষ্টিতেই যেন ভস্ম করে দিতে চাই ওকে। আমার দৃষ্টি আর মনের অগ্নিশিখা দিন দিন যেন ভয়ংকর হয়ে উঠতে চেয়েছে। হঠাৎ মনে হল অধরাকে নিয়ে এত কী ভাবছি আমি। এতো ভাববার কী আছে ওকে নিয়ে? নিজের উপরই বিরক্ত লাগলো। বিরক্তি নিয়েই তাকিয়ে দেখলাম অধরা কবীরের সাথে কথা বলছে করিডোরের অপর প্রান্তে দাঁড়িয়ে।

“অধরা, তোকে একটা কথা বলতে চাই।” কবীরের কন্ঠের দ্বিধান্বিত ভাবটা অধরার নজর এড়ালো না।

“কথা বলবি বল, এভাবে অনুমতি নিচ্ছিস কেন?” অনেকটা জেরা করার সুরেই প্রশ্নটা করলো অধরা।

“না, মানে কথাটা শোনার পর তুই রাগ করিস কি না।” একটু ভয়ে ভয়েই বললো কবীর। “রাগ করার মতো কথা হলে তো রাগ করতেই পারি।” সোজাসাপ্টা উত্তর অধরার। এরপর একটু বিরক্ত হয়েই বলল-

“কথা না বাড়িয়ে বল কী বলবি।”

“তার আগে কথা দে বিষয়টা জানার পর তুই ক্ষমা করবি আমাকে।”

মুচকি হেসে অধরা বললো –

“বন্ধুকে ক্ষমা না করে থাকা যায় নাকি?”

” তাহলে তুই রুদ্রকে ক্ষমা করতে পারছিস না কেন?”

“এটা আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার।” অধরার মুখটা কঠিন হয়ে উঠলো।

“আজ আনার্সের শেষ দিন।আজ তোকে একটা কথা না বলেই পারছি না।”

“এতো ভণিতা না করে যা বলবি বলে ফেল।” অধরার কন্ঠে স্পষ্ট বিরক্তি। 

“তিন বছর আগে ফেসবুকের যে লেখাটার জন্য তুই রুদ্রকে আজ দূরে ঠেলে দিয়েছিস সেই লেখাটা আমি লিখেছিলাম।”

“কী?” চিৎকার করে উঠলো অধরা।

“হুম, তোর সাথে মজা করতে আমি লিখেছিলাম কথাটা।” কবীরের চুপসে যাওয়া কন্ঠস্বরটা আরো তলিয়ে গেল যেন। 

এতোদিন কেন বলিসনি এ কথা?” প্রশ্নটা করেই দ্বিধান্বিত কন্ঠে অধরার লাগোয়া প্রশ্ন- 

“কিন্তু সেটা তো রুদ্রর আইডি থেকে লেখা হয়েছিলো!”

“হ্যাঁ, তা লেখা হয়েছিলো। সেদিন রুদ্র ওর রুমে ল্যাপটপে ফেসবুক একাউন্ট খোলা রেখেই নিচে গিয়েছিল আমাদের জন্য চা আনতে। সেদিন আমরা কয়েকজন দুষ্টুমি করে তোকে রুদ্রর ভালো লাগে- এ কথাটা মেসেজ করে তোকে পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু তুই যে এই মজাটাকে, এই দুষ্টুমিকে বাস্তবের বন্ধুত্ব থেকেও এতো গুরুত্ব দিবি তা আমরা ভাবিনি। আমরা তো ভেবেছিলাম রুদ্রকে তুই ভালো করেই চিনিস। রুদ্র যে এমন কাজ করার ছেলে না তা তোর চেয়ে ভালো আর কেউ জানে না। সত্যি কথাটা আমি এতদিন সাহস করে তোকে বলিনি এই ভয়ে যে তুই আমার সাথেও বন্ধুত্ব নষ্ট করে ফেলিস কিনা। কিন্তু আজ সিঁড়িতে তোর সাথে রুদ্রের দেখা হওয়ার পর,তার দৃষ্টির কাঠিন্য আমার অপরাধ বোধটাকে নাড়িয়ে দিলো। তাই আজ আর না বলে থাকতে পারলাম না। রুদ্র অবশ্য বুঝেছিলো যে কাজটা আমরাই করেছিলাম। চাইলে ও পারতো আমাদেরকে তোর সামনে নিয়ে গিয়ে প্রমাণ করতে। কিন্তু ও সেটা করে নি। হয়তো আমাদের বন্ধুত্ব নষ্ট হোক এটা রুদ্র চায়নি।”

অধরা নির্বাক নিশ্চুপ হয়ে শুনছিলো কবীরের কথাগুলো। কিছুই যেন ঠিকভাবে মাথায় ঢুকছিলো না অধরার। তাহলে এতো বড় ভুলের উপর দাঁড়িয়ে রুদ্রকে অপরাধীর কাঠগড়ায় নিয়ে শাস্তি পর্যন্ত দিয়ে দিয়েছে অধরা।

“অনেক অভিমানী ছেলে রুদ্র,কিন্তু বাস্তব জীবনের বন্ধুত্বকে অনেক গুরুত্ব দেয় ও। তুই যে ভার্চুয়াল জগতের ঠুনকো তামাশাকে এতো বড় করে দেখবি তা ওর কল্পনাতেই ছিলো না। বন্ধুদের সাথেই তো মজা করা যায়, তাই না!” কবীরের শেষ কথাগুলো কোনোটাই অধরার কানে পৌছালো বলে মনে হল না।

“কবীর, একটা কাজ করবি?” নিস্পৃহ কন্ঠে বলে উঠলো অধরা। 

“কী, বল।”

“রুদ্রকে বলিস আজ থেকে আমি সেদিনের অপেক্ষাতে আছি যেদিন আমাকে ও ক্ষমা করতে পারবে।” দূরে চায়ের কাপ হাতে দাঁড়িয়ে থাকা রুদ্রর দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বললো অধরা।

“গরম চায়ের কাপটা এক হাত থেকে অন্য হাতে নিয়ে পকেটে হাত ঢুকিয়ে ফোনটা বের করতে করতেই লাইনটা কেটে গেলো। কল না মিসড কল বুঝা গেলো না। কার কল দেখার আগেই হাতের মধ্যে ফোনটা আবার বেজে উঠলো। কবীর ফোন করেছে। ফোনটা রিসিভ করে হ্যালো বলতেই কবীর ও পাশ থেকে গর গর করে কথা বলে যেতে লাগলো। প্রথমে কিছুক্ষণ কথার পিঠে কথা বললেও কিছুক্ষণ পর খেয়াল করলাম আমি শুধু হ্যাঁ, হু করে যাচ্ছি। ” আচ্ছা, পরে কথা হবে” বলে ফোনটা রাখলাম। কবীর এতক্ষণ কী বললো ফোনে! এতটা দিন পর আজ সেই কথা। যে বিশ্বাস, যে বন্ধুত্ব ভাঙ্গার যন্ত্রণা নিয়ে প্রতিটি সকাল আমার ডিপার্টমেন্টে পদার্পণ হতো, প্রায় প্রতি ক্লাসের ফাঁকে যাকে দেখে আমার অভিমানের মাত্রাটা আরও তীব্রতর হতো, আজ তার এ অনুনয় আমার সবকিছুই এলোমেলো করে দিলো। তবে কী মুক্তি মিললো এ অসহ্য বেদনা-বিধুর স্মৃতি থেকে? কিন্তু হৃদয়ের মাঝে বন্ধুত্বের যে জায়গাটুকু জুড়ে সে ছিলো; আজ সে জায়গাটুকু যে শূণ্য। সেই শূন্যতা কি পূরণ করতে পারবো ক্ষমা দিয়ে?

কমেন্ট করুন

তাসনিম ফেরদৌস (শারমিন)

সেশনঃ  ২০১১ - ২০১২