জর্জ এডওয়ার্ড পেলহাম বক্স (ই.পি.বক্স)

পরিসংখ্যান পড়তে পড়তে পরিসংখ্যানবিদ হয়ে উঠতে হয়-এতদিন তো এটাই আমরা ভেবে এসেছিলাম আমরা। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় পাতায় এমন কিছু উজ্জ্বল অধ্যায় আছে যেখানে পরিসংখ্যান নিভৃতচারীর মতো উঠে এসেছে প্রয়োজনের প্রথম সারিতে আর এ কারণেই কেউ কেউ হয়ে উঠেছেন দুনিয়া কাঁপানো পরিসংখ্যানবিদ। আর তাইতো নিজের আত্মজীবনী ‘An Accidental Statistician’ শিরোনামে লিখে জর্জ ই.পি.বক্স খুব একটা ভুল  করেননি।  জর্জ ই.পি.বক্স বিখ্যাত তাঁর বক্স-কক্স ট্রান্সফর্মেশন, বক্স-জেনকিনস মেথডোলজি, বক্স-বেনকেন ডিজাইন এরকম অসংখ্য থিওরির জনক হিসেবে।

                ১৯১৯ সালে ইংল্যান্ডে জন্ম নেয়া জর্জ বক্স ইউনিভার্সিটি অফ লন্ডনে রসায়নে ব্যাচেলর ডিগ্রীর জন্য ভর্তি হন । রসায়নে যখন তিনি তার কোর্সের মাঝামাঝি, তখনই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয় এবং তাকে যুদ্ধে অংশগ্রহনের জন্য নির্দেশ দেয়া হয়।রসায়নে খুব দক্ষ হওয়ায়, ইংল্যান্ডের দক্ষিণ ব্রিটিশ আর্মি ইঞ্জিনিয়ারিং-এর এক্সপেরিমেন্টাল স্টেশনে তাকে নিযুক্ত করা হয় এবং  রাসায়নিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত বিভিন্ন বিষাক্ত গ্যাসের কার্যকারিতা নিয়ে কাজ করার দায়িত্ব দেয়া হয় । তিনি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রাণীর উপর পরীক্ষা শুরু করেন কিন্তু এ পরীক্ষার ফলাফল নানা রকম হলো এবং বক্স তখনই বুঝতে পারলেন যে, পরীক্ষণীয় উপাত্তের উপর ভিক্তি করে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব যতটা না রসায়নের কাজ, তার চেয়ে বেশি পরিসংখ্যানের কাজ। তখন তিনি কতৃপক্ষকে অনুরোধ করলেন তার প্রাপ্ত তথ্যকে ব্যাখ্যা করার জন্য একজন পরিসংখ্যানবিদকে তার সহকারি হিসেবে রাখার জন্য। কিন্তু দূর্ভাগ্যবশতঃ তখন কাউকেই পাওয়া যায় নি। বক্স অনুধাবন করলেন কাজগুলো শেষ করার জন্য যথেষ্ট পরিসংখ্যান তাকেই শিখতে হবে।

                ১৯৪২ সালের মতো একটা সময় নিশ্চয়ই পরিসংখ্যানের মতো একটা কোর্স বক্সকে শেখানোর জন্য জুৎসই ছিলো না । অবধারিতভাবেই বক্স কোর্সটি শিখতে ব্যর্থ হলেন। তিনি তখন যেটা সবচেয়ে উপযুক্ত মনে করলেন সেটা হলো -বাজার থেকে কিছু পরিসংখ্যানের বই কিনে নিজে শিখে ফেলা। তিনি তাই করলেন এবং সম্ভবত তার কাজে যতটুকু প্রয়োজন ছিল তার চেয়ে আরও বেশী শিখে ফেললেন । সবশেষে, তার পরিক্ষার শিক্ষণীয় এবং প্রয়োজনীয় একটা রিপোর্ট দিতে সক্ষম হলেন । এই সব প্রচেষ্টা প্রায় সময়ই অনেক কিছুর ভিঁড়ে ঢাকা পড়ে যায়, কিন্তু বক্সের ক্ষেত্রে তা আর হয়নি। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরপরই তাঁর অবদানের জন্য ব্রিটিশ এম্পায়ার পদকে তাকে ভূষিত করা হয় । এটার ফলে যেটা হলো বক্স রসায়নের থেকে পরিসংখ্যানের প্রতি আরো আগ্রহী হয়ে পড়লেন এবং পরবর্তীতে গাণিতিক পরিসংখ্যানে বিএসসি এবং মাস্টার্স সম্পন্ন করেন।

                      তার নিজের লেখা বইয়ে তিনি লিখেছেন-‘আমি যখন আমার ল্যাবে কাজ করি তখনই বিশ্বসেরা পরিসংখ্যানবিদ, রোনাল্ড ফিশার- এর সাথে দেখা করার জন্য চিঠি লিখি। আমি ভেবেছিলাম ফিশার সাহেব প্রচন্ড ব্যস্ত থাকবেন এবং স্বভাবতই আমি আমার চিঠির জবাব পাবো না । কিন্তু তিনি আমাকে অবাক করে দিয়ে আমাকে তার বাসায় আমন্ত্রণ জানালেন এবং সেই প্রথম আমার মত একজন অপরিচিত, জ্ঞানহীন, আর্মি  সার্জেন্ট একজন সত্যিকারের পরিসংখ্যানবিদের সাথে দেখা করার সুযোগ পেলো । সারাটা দিন তিনি মনোযোগের সাথে আমার কথা শুনলেন । আর এরপরই আমার মধ্যে কোন সন্দেহ রইল না যে-আমি একজন পরিসংখ্যানবিদ হতে যাচ্ছি।

                      এইভাবেই জন্ম হলো পরিসংখ্যানের একজন দিকপাল। পরবর্তীতে তিনি ফিশার সাহেবের পাঁচ কন্যার দ্বিতীয় মেয়েকে বিয়ে করেছিলেন ।

                       ছাত্রদের মধ্যে পরিসংখ্যান নিয়ে বিভিন্ন সমস্যা এবং ডেটা সেট নিয়ে ঘরোয়া আড্ডা-‘মানডে নাইট বিয়ার এন্ড স্ট্যাটিসটিক্স সেশন’ দিয়ে আগ্রহ তৈরি, খোলামেলা আলোচনা ও সমাধান করে তিনি বেশ সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন।

                       পরিসংখ্যান নিয়ে খ্যাতনামা সব থিউরির পাশাপাশি তিনি ব্যঙ্গ রচনা, লিরিক, গল্প তৈরী করতেন ।উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায়ঃ’There is no theorem like Bayes’ theorem/Like no theorem we know…’

                       তিনিই সাহস করে বলেছিলেন  পরিসংখ্যান নিয়ে বিখ্যাত উক্তিঃ ‘All models are wrong, but some are useful.’

                        এইতো কিছুদিন আগে,২০১৩ সালে ৯৩ বছর বয়সে বিংশ শতকের শ্রেষ্ঠ পরিসংখ্যানবিদদের মধ্যে অন্যতম, জর্জ বক্স আমাদের ছেড়ে চলে যান। তাঁর কর্ম, সাধনা আর প্রাপ্তির প্রতি রইল ‘প্যাপাইরাস’ পরিবারের অকুন্ঠ শ্রদ্ধা ও ভালবাসা।     

কমেন্ট করুন

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.