স্বপ্নগুলো তারা হয়ে জ্বলছে

আসসালাতু খাইরুম মিনান নাউম

আলাহু আকবার, আলাহু আকবার

পাশের মসজিদের থেকে ফজরের আজানের ধ্বনিতে অমিতের ঘুম ভেঙ্গে গেলো, পাশেই ঘুমিয়ে আছে রুমি।  রুমিকে জোরে ধাক্কা দিয়ে ঘুম থেকে উঠালো অমিত। রুমি উঠে বসে পড়লো, এদিকে অমিত ওয়াশরুমে চলে গেলো।

ওয়াশরুম থেকে অমিত ওযু করে রমে আসে দেখলো রুমি বসেই ঘুমাচ্ছে। অমিত এবার হাত ওযুর পানি রুমির মুখে ছিটালো। পনি মারতেই রুমি লাফিয়ে উঠে দাঁড়ালো। এবার ভদ্রছেলের মত সোজা ওযু করে দুইজন একসাথে নামাজ আদায় করলো।

অমিত আর রুমি দুইজনই ছোটবেলার খুব কাছের বন্ধু। একসাথে স্কুল এবং কলেজ জীবন পার করেছে। বর্তমানে একইসাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগে ভর্তি হয়েছে। সাধারণতঃ ১ম বর্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে কোনো সিট পাওয়া যায় না। সবাইকে হলের গণরুম অথবা হলের বারান্দায় থাকতে হয়, সৌভাগ্যক্রমে ওরা সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ছাত্র, হলের বারান্দায় থাকতে দুজনের তাই কোনো সমস্যাও হয় না। কিন্তু বর্ষাকালে বারান্দায় থাকাটা কিছুটা দুর্বিষহ। ওরা বর্ষাকালের তিন মাসের জন্য ভার্সিটির পার্শ্ববর্তী এলাকা চানখারপুলের একটা মেসে উঠেছে। ওটাকে মেস বললেও ভুল হবে।  একটা তিনতলা বিল্ডিং এর নিচের তলার একটা রুমে শুধু ব্যাচেলরদের জন্য ভাড়া দেওয়া হয়, ওখানেই ওরা থাকে। রুমে মোট ১২ জন থাকে এবং সকলের জন্য মাত্র একটা ওয়াশরুম।  প্রতিদিন সকালের প্রথম যুদ্ধ হলো ওয়াশরুম দখল।  তাই খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠার অভ্যাস মূলতঃ এই ওয়াশরুমকে ঘিরেই।

দুকাপ চা দিয়েই দুজনের প্রতিদিন সকালের নাস্তাটা হয়ে যায়। আর এই চা যে কোনো দোকানের চা হলে হবে না, শহীদ মিনারের পাশে কিছু অস্থায়ী ‘KFC’ আছে, সেখানকার চা-ই হলো ওদের নাস্তা।

সকাল ৮টায় ক্লাস শুরু হবে, ঘড়িতে আটটা বাজতে আর মাত্র পাঁচ মিনিট বাকি আছে। অমিত ঘড়ির দিকে তাকাতেই এক চুমুকে চা শেষ করে রুমিকে নিয়ে ডিপার্টমেন্টের দিকে চলে আসে। দুজনই চার তলা পর্যন্ত সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে দেখলো আকাশের মুখটা আজ ভার হয়ে এসেছে। চারপাশটা স্থবির হয়ে আছে।

“আজ মনে হয় বৃষ্টি হবে রে রুমি”।

রুমি বললো, ” বৃষ্টি হলে তো ভালোই, ফুটবল খেলব জাম্পেশ।”

কথা বলতে বলতে ক্লাসের সামনে চলে আসলো দু’জন।

প্রথমেই চেয়ারম্যান স্যারের ক্লাস। খুব মনোযোগ দিয়ে ক্লাস করছে আর স্যারের কথাগুলো ভাল করে বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করছে। ক্লাস প্রায় শেষের দিকে, স্যার হঠাৎ বললেন, “প্রতিবছর বিভিন্ন ডিপার্টমেন্ট থেকে শিক্ষা সফরে যাওয়া হয়। সামনের বছর আমরাও চেষ্টা করব।” একথা শুনে ক্লাসের সবাই হৈ হুলোর করে উঠলো।

রুমি চুপচাপ থাকে ক্লাসে, ওর মনের অনেক দিনের ইচ্ছা শিক্ষা সফরে যাবে। গ্রামের স্কুলে থাকতে কখনও কোথাও ওদের শিক্ষা সফরে নেওয়া হয়নি। গ্রাম থেকে শহরের কলেজে উঠলে বছর শেষে পুরো ক্লাস শিক্ষা সফরে সিলেট গিয়েছিলো, কিন্তু রুমি অসুস্থতার কারণে যেতে পারেনি, সাথে অমিতও রুমিকে ছেড়ে যায়নি।

ক্লাস শেষে রুমি অন্যমনষ্ক হয়ে নামছে, অমিতও নামছে পাশাপাশি। আজ অমিত ক্যালকুলাস পড়া বুঝেনি, তাই রুমিকে বলছে, “ক্যালকুলাসের Application of Derivative এর Optimization Problem কী যে করালো কিছুই বুঝলাম না। তুই কিছু বুঝেছিস ?”

অমিত দুইবার প্রশ্ন করলো কিন্তু রুমি কোনো উত্তর দিচ্ছে না। অমিতের ধাক্কায় রুমি বলে উঠলো, “হ্যাঁ, কী যেন বলছিলি ?”

অমিত প্রসঙ্গটা বাদ দিয়ে জিজ্ঞেস করলো, ” কী ভাবছিস ?”

“কিছু না, একটা বিষয়ে চিন্তা করছি ?”

অমিত উৎসাহ নিয়ে, “কী রে, বল না ?”

রুমি মুচকি হাসি দিয়ে বললো, “সিলেট যাবি ?”

অমিত মুখে অত্যন্ত আনন্দ নিয়ে বললো, “যাব মানে, আমি পারলে আজই যাব।”

রুমি বললো, ” না না, আজ কীভাবে যাব। সামনের মাসের টিউশনির টাকাটা হাতে পেলেই যাব।”

অমিতও রাজি। হেঁটে হেঁটে কার্জনের সামনে চলে আসতেই ঝুম বৃষ্টি শুরু হল। অমিত কিছুটা স্বাস্থ্য সচেতন, তাই দৌড় দিয়ে একটা রিকশায় উঠে পড়লো । রুমি রিকশায় না উঠে পড়লো। রুমি রিকশায় না উঠে ব্যাগটা অমিতকে দিয়ে পাঠিয়ে দিলো। বৃষ্টি হলে রুমি না ভিজে থাকতে পারে না। হতে পারে অন্যের দৃষ্টিতে এটা মানসিক সমস্যা কিন্তু রুমির জন্য পরম আনন্দ।

 বৃষ্টি কমে আসছে।  রুমি বাসায়ও পৌঁছে গেছে। ভিতরে গিয়ে দুপুরের খাওয়া শেষ করে প্রতিদিনের অভ্যাস সিগারেট টানা। অমিত এই অভ্যাস পছন্দ করে না। তাই রুমি একাই ছাদের রোলিং-এর উপর বসে সিগারেটে টান দিচ্ছে আর বৃষ্টির পানিতে কেবল স্নান করা সামনের আম গাছগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে।

রুমি সিগারেট খাওয়া শেষ করে ছাদের দরজায় আসতেই একটা ঝড়ো বাতাসে কোথা থেকে যেন একটা সিল্কের ওড়না উড়ে এসে মাথায় পড়লো। হাতে নিয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে কাউকে দেখতে না পেয়ে ছাদের একপাশে রেখে আবারও দরজার কাছে চলে আসলো।  এবার একটা মেয়েলী কণ্ঠে ডাক পড়লো, “এই যে ভাই, শুনছেন?”

রুমি ঘুরে তাকাতেই দেখলো পাশের বাসার ছাদ থেকে একটা মেয়ে হাত দিয়ে ইশারা করে ডাকছে। পাশের বাসা আর এ বাসার ছাদটা অনেকটাই মেশানো। কাছে যেতেই মেয়েটি বললো, “একটা ওড়না বাতাসে উঠে গেছে আপনাদের ছাদে। আপনি কি দেখেছেন?”

রুমি কথা না বলে ওড়নাটা এনে মেয়েটিকে দিয়ে দিলো। এদিকে আবারও বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে, রুমির সে দিকে কোন খেয়াল নেই। এক পলকে পাশের ছাদের দিকে তাকিয়েই আছে।

অমিত রুমিকে বৃষ্টিতে রুমে আসতে না দেখে নিজেই ছাদে চলে আসলো। ছাদে রুমিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জোরে চিৎকার করে ডাকছে। কিন্তু কোনো সাড়া না দেওয়ায় নিজেই বৃষ্টিতে ভিজে ওকে নিয়ে নিচে নামালো।

সকালে কালিপদ স্যারের ইনকোর্স পরীক্ষা আছে, সন্ধ্যায় দুইজনই পড়তে বসলো। কিন্তু রুমির আজ পড়াতে মনই বসছে না। কিন্তু অমিতের তাড়ায় দুইজন কোনো রকমের প্রস্তুতি নিয়ে ঘুমাতে গেলো।

পরদিন পরীক্ষা শেষ করে রুমিকে কোথাও দেখা গেলো না। অমিত অনেক খোঁজার পর না পেয়ে তামান্নাকে রুমির কথা জিজ্ঞেস করতেই বললো, “ওকে তো অনেক আগেই কার্জনে চলে যেতে দেখেছি।” অমিত বুঝলো রুমি বাসায় চলে গেছে। অমিত কিছুটা মন খারাপ করলো। আজ পর্যন্ত ওরা কিছু করলে দুইজন একে অপরকে না বলে কিছুই করেনি। কিন্তু আজ রুমি ওকে একা রেখেই চলে গেলো। এইসব চিন্তা করতে করতে বাসায় পৌঁছে গেলো, রুমে ঢুকে রুমিকে দেখতে পেলো না। রুমির জন্য কিছুটা চিন্তায় পড়লো অমিত। দুপুরের গোসল শেষে ছাদে কাপড় নাড়তে উঠে দেখলো রুমি ছাদে বসে বসে গান শুনছে। অমিত রেগে গিয়ে রুমিকে ধমক দিয়ে বললো, “তুই আজ না বলে চলে আসলি, এসে রুমেও নেই আর এখানে ধ্যান করছিস।”

রুমি বলল, “নারে, একজনের অপেক্ষায় আছি।” অতি উৎসাহ নিয়ে অমিত বললো, “কে রে?” হঠাৎ রুমি উঠে দাঁড়িয়ে পাশের ছাদে তাকাতেই দেখে কালকের মেয়েটি কাপড় নাড়ছে। রুমি তাকিয়েই আছে, অমিত ব্যাপারটি বুঝতে পারে, তাই কোনো কথা না বলে রুমির কানে “Carry  On” বলে চলে গেলো। মেয়েটি রুমিকে দেখে ছাদের কোণে আসে ধন্যবাদ বলল। রুমি একটু লজ্জা নিয়ে বললো, “না না। ধন্যবাদের কী আছে?”

এভাবে ওদের কথা প্রতিদিনই চলতে থাকে। মেয়েটির নাম মেঘলা। কলেজের ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে। আর যাই হোক রুমি আর মেঘলা যা কথা বলে তা রুমি অমিতের কাছে সব সময় শেয়ার করে থাকে।

দেখতে দেখতে ভার্সিটি বন্ধ হয়ে গেলো। সেদিন সন্ধ্যায় অমিত স্টুডেন্টের বাসা থেকে এসে বললো, “কবে যাবি?”

আকাশ থেকে পড়বার মত করে রুমি উত্তর দিলো, “কই যাব?”

অমিত রেগে বললো, “সিলেটে যাওয়ার কথা বলে এখন বলছিস কই যাব।”

রুমি মাথায় হাত দিয়ে বললো “মনেই ছিলো না, সমস্যা নেই কাল টিউশনির টাকা পাইছি, কালকেই যাব।”

আজকের বিকালের আকাশের পরিস্থিতি দেখে মনেই হবে না ঘড়িতে সময় বিকাল ৫টা। রুমি ছাদে আসার আগেই মেঘলা এসে অপেক্ষা করছে। আজ আর তেমন কথা হয়নি। রুমি সিলেট যাবে তাই মূলতঃ আজই শেষ দেখা হবে, আগামি কয়েকটা দিন কথা না বলে থাকতে হবে, তাই কথার থেকে নিরবতাই বেশি ছিলো।

রাতে ঘরে এসে রুমি নিজের ব্যাগ গুছিয়ে আগে আগেই ঘুমানোর জন্য শুয়ে পড়লো। জানালা দিয়ে আকাশ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। বিকেলের বৃষ্টির পর আকাশটা অনেক সুন্দর লাগছে। তাই রুমি অমিতকে আকাশের দিকে আঙ্গুল দিয়ে দেখাচ্ছে “দেখ দোস্ত, তারাগুলো কি সুন্দর করে জ্বলছে, ঠিক আমার মনের স্বপ্নগুলোর মত করে।” অমিত ঘুমিয়ে পড়েছে।

রাতে ভালো ঘুম হলো না। ভোরের আলো ফুটতেই রুমি ছাদে গিয়ে মেঘলার জন্য একটা চিঠি রেখে আসলো। চিঠিতে কয়েকটা লাইন ছিলো,

“তোমার সাথে আমার বন্ধুত্ব কয়েক সপ্তাহ আমি এই কয়েক দিনে তোমার অনেক কাছের মানুষ হওয়ার চেষ্টা করেছি কিন্তু মুখ ফুটে কিছুই বলতে পারিনি। আমি ফিরে আসলে কি তুমি আমাকে ফিরিয়ে দিবে?”

সকাল ৭টার মধ্যে আমিত আর রুমি রওনা হলো। ঘন্টা খানেকের মধ্যে বাস স্ট্যান্ডে পৌঁছে সিলেটের ২টা টিকিট নিলো। কিছুক্ষণের মধ্যে বাস ছেড়ে দিলো। অমিত জানালার পাশে বসেছিলো। শহুরে কোলাহল থেমে হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করছে রুমির। এত আরামে অমিত ঘুমিয়ে পড়েছে। রুমিও হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লো।

হঠাৎ এক আর্তনাদ, রুমি চোখ মেলে দেখলো ওদের বাসের সাথে একটা ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়েছে। পাশে অমিতের মাথা দিয়ে রক্ত ঝরছে। ওর নিজের অবস্থা খারাপ। নিজের চিন্তা না করে জানালা দিয়ে অমিতকে নামিয়ে দিলো। এবার নিজে নামবে। ঠিক পিছনে একটা বাচ্চা চিৎকার করে কাঁদছে। ততক্ষণে বাসের সামনের ইঞ্জিনে আগুন ধরে গেছে। রুমি আবার ভিতরে গিয়ে বাচ্চাটাকে নিচে দিয়ে নামার মূহুর্তে এক বিস্ফোরণ। বুম! অমিত চিৎকার করে শুধু একবার রুমির নাম বললো। বাতাসে কয়েকবার শুধু নামটা প্রতিধ্বনি হল।

তিন মাস পর, অমিত মেসে ফিরলো। বর্ষাকাল শেষ হয়েছে, হলে চলে যাবে। গতমাসে রুমির বাবা এসে ওর জিনিসপত্র সব নিয়ে গেছে। বিকালে ছাদ থেকে কাপড় আনতে গেলো অমিত, পাশের ছাদ থেকে মেঘলা ডাক দিয়ে এক টুকরো ভাঁজ করা কাগজ দিয়ে বললো “রুমি ভাইকে দিবেন”। অমিত কাগজটা খুলে দেখলো লেখা আছে ” আমি চিরকাল তোমার জন্য পথ চেয়ে থাকব”। রুমি ওর চিঠির বিষয়ে অমিতকে কিছুই বলে নি। কিন্তু মেঘলার চিঠি পড়ে নিজের চোখের পানি আর ধরে রাখতে পারলো না।

রাতে বিছানায় আজ একা অমিত শুয়ে আছে। পাশে আজ রুমি নেই। আকাশের তারাগুলো আজও জ্বলছে, তাই দেখে অমিতের কানে রুমির কথা গুলো বারবার বাজছে,“স্বপ্নগুলো ঐ দূর আকাশের তারার মত জ্বলছে তাই না বল, দোস্ত……………………..”

কমেন্ট করুন
শিক্ষার্থী | পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সেশন: ২০১৪ - ২০১৫

নঈমুল ইসলাম

সেশন: ২০১৪ - ২০১৫

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.