শিকল ভাঙার আর্তনাদ

ছেলেবেলা থেকেই আমি আমার ভাইয়াকে সব সময় ফলো করতাম, সেটা চুলের স্টাইল বা পোশাক যাই হোক না কেন, আর তাই ছোট বেলা থেকেই আমার কোনদিনও মেয়ে হয়ে ওঠা হয় নি। বন্ধুরা বলতো, “নিলু, তুই টমবয়ই রয়ে গেলি একদম!” তো এভাবেই ভাইয়ার টিশার্ট, জার্সি আর প্যান্ট পরে বড় হচ্ছিলাম। আমি অবশ্য আমার আপুকেও ভাইয়ার মতো ভালোবাসতাম। কিন্তু আমাদের তিন ভাইবোনের মধ্যে আপু আর ভাইয়া ছিলো পুরো সাপে-নেউলে; কেউ কারো সাথে কথা বলতো না। ঠিক কী কারণে ওরা রাগ করে ছিলো – আমার তা জানা নেই, আর তা নিয়ে তেমন ভাবতামও না।

        আমাদের পরিবারটা ছিলো একটা নিষ্প্রাণ পরিবার। আব্বু বেশির ভাগ সময় বিদেশে থাকায় আমরা থাকতাম আম্মুর সাথে। আব্বু দেশে থাকলেও আম্মু-আব্বু কথা বলতো খুব কম। সত্যি কথা বলতে আমার জীবনে আব্বুর অস্তিত্ব আমি তেমন বোধ করিনি কখনও; খুব সম্ভবত আপুকে নিয়েও আব্বু তেমন ভাবতেন না। আব্বুর জীবনের একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ মানুষ ছিলো ভাইয়া। আব্বু আপুকে বা আমাকে তেমন কোন হাত খরচ দিতেন না, কিন্তু ভাইয়ার ক্ষেত্রে দামি ফোন থেকে শুরু করে কোন আবদারই অপূর্ণ রাখতেন না। সে বয়সে আমার অবশ্য তেমন টাকার দরকার পড়তো না, তাই আমার এ ব্যাপারে অভিযোগও ছিলো না। আমার কোন অভিযোগ না থাকলেও আপুর নানা অভিযোগ ছিলো এ ব্যাপারে।

        আপু-ভাইয়ার সাথে আমার বয়সের পার্থক্যটা ছিলো একটু বেশি। আমি যখন ক্লাস ফাইভ-এ পড়ি ভাইয়া তখন মেডিকেল থার্ড ইয়ারে আর আপু বুয়েটে সেকেন্ড ইয়ারে পড়তো। সেবার পহেলা বৈশাখে আপু ভাইয়া দু’জনই আমাকে গিফট দিলো। আপু দিলো ফতুয়া আর ভাইয়া একটা শাড়ি। তখন আমি রীতিমতো টমবয়, শাড়ি দেখে কোন রকম উচ্ছাস হল না। ভাইয়াকে বললাম, “ভাইয়া, একটা ভালো কিছু কিনে দিতা”। ভাইয়া উত্তরে বলেছিলো বড় হয়ে যেন শাড়িটি পরি। আমিও তাই শাড়িটি তুলে রাখলাম যত্ন করে।

        এভাবেই দিন কেটে যাচ্ছিলো আমাদের। বৈশাখের ঐ ঘটনার প্রায় তিন বছর পর আপু হঠাৎ-ই বিয়ে করে ফেললো। পরিবারের পুরো সম্মতি না নিয়ে, বিয়ে হলো আপুর ইচ্ছায় ও আপুর পছন্দে। আপুর এ প্রেমের বিয়েতে আম্মুর আপত্তি ছিলো, আব্বুও দেশে আসেননি সে সময়। আপুর বিয়েতে আমি খুব মন খারাপও করেছিলাম, কিন্তু যেহেতু আমি ভাইয়াকে ফলো করতাম তাই ভাইয়ার মতো আমিও কাঁদিনি সবার সামনে। ভাইয়া ওর জমানো টাকায় খুব দামি একটা শাড়ি আপুকে উপহার দিয়েছিলো বিয়েতে, যদিও আপু জানতো এটা আম্মু দিয়েছে।

আপু যাবার পর আমি কিছুটা একা হয়ে গেলাম, ভাইয়াও পড়ালেখা নিয়ে ব্যস্ত থাকতো। এ সময় ভাইয়ার বান্ধবীরা প্রায়ই আমাদের বাসায় আসতো। আমি বুঝতাম ভাইয়ার গার্ল ফ্রেন্ড আছে, কিন্তু কোনটা যে গার্ল ফ্রেন্ড বুঝতাম না। আমি তখন ক্লাস এইট-এ পড়ি, একটু বড় হয়েছি আর সেই সাথে হয়েছি কিছুটা গোয়েন্দা স্বভাবের। ভাইয়ার মোবাইল ফোন লুকিয়ে লুকিয়ে ঘাঁটা আমার খুব প্রিয় কাজগুলোর একটা তখন। মোবাইলে নানাবিধ ঘাঁটাঘাঁটি করে আমি বুঝলাম ভাইয়ার গার্লফ্রেন্ড-এর নাম নিপা। ভাইয়ার ল্যাপটপে একদিন মেয়েটার ছবিও দেখলাম। বেশ মিষ্টি চেহারা!

        সেই বয়সে আমার অনেক বান্ধবীও কেমন জানি করতো – সবে টিন এইজ শুরু হয়েছে – যাকে দেখে তার-ই প্রেমে পড়ে যায়। ভাইয়া আমাকে কোচিং-এ দিয়ে আসতে গেলে আমার বান্ধবীরা ভাইয়ার দিকে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে থাকতো আর বড় বড় নিঃশ্বাস ফেলতো। যেহেতু আমি ছিলাম টম বয় তাই আমার প্রেম বিষয়ক আগ্রহ ছিলো কম। আর ভাইয়াকে যেহেতু আমি খুব ভালোবাসতাম তাই ভাইয়ার প্রতি আমার বান্ধবীদের এমন আচরণে খুব বিরক্ত হতাম, তবে ভাইয়া মনে হয় খুশি হতো ব্যাপারটায়।

        নিপা ভাইয়ার গার্ল ফ্রেন্ড – এ বিষয়টা আবিষ্কারের পর একটা ব্যাপার ভেবে আমি বেশ অবাক হতাম। আম্মু আপুর প্রেমে বিশেষ বাগড়া দিলেও ভাইয়ার গার্ল ফ্রেন্ড-এর ব্যাপারে কিছুই বলতো না। তখন ভাবতাম, আম্মু হয়তো জানতোই না এই বিষয়টা। এ সব ভাবনা চিন্তার মধ্যেই একদিন ভাইয়ার বিছানায় পেলাম একটা সিগারেটের প্যাকেট। একে তো ভাইয়ার প্রেম, তার উপর সিগারেট – এ দুটো ব্যাপার জানার পর বেশ কান্নাকাটি করলাম – আহা রে! আমার ভাইয়াটা কত খারাপ ছেলে হয়ে গিয়েছে, এই ভেবে। কী বোকাই না ছিলাম!

        অনেক বুদ্ধি খাঁটিয়ে আপুকে ফোন দিয়ে সবিস্তারে বললাম সব কিছু। আপু বললো, ঘন ঘন প্রেম করাই না কি ভাইয়ার অভ্যাস। সেই সাথে আপুর সব সময়কার কমন উপদেশ – “ভাইয়ার সাথে মিশবি না।” আমি একটু অবাক হলাম, আর বরাবরের মতোই আপুর কথায় পাত্তা দিলাম না। আপু ভাইয়াকে দেখতে পারতো না আর ভাইয়াকে নিয়ে নানাবিধ আজগুবি কথা বলা ছিলো আপুর প্রিয় কাজ। ভাইয়া আর আপুর এই বাক্যালাপহীন সম্পর্ককে আমি খুব ভয় পেতাম। আমি তাই ভাইয়াকে বেশ তোয়াজ করে চলতাম।

        ভাইয়াকে তোয়াজ করে চলেছি ঠিকই, তাই বলে ভাইয়ার ফোনের পিছু ছাড়িনি কখনো। নিয়মিত ফোন নিয়ে গবেষণা চালাতাম। সে সময় ভাইয়া ফেসবুক ব্যবহার শুরু করেছিলো। তো নানা গবেষণায় বুঝলাম নিপা আর ভাইয়ার সাথে কথা বলে না, এখন রূপা নামে একটা মেয়ে নিয়মিত কথা বলে ভাইয়ার সাথে। কয়দিন পর টের পেলাম শুধু রূপা না, ভাইয়ার সাথে আসলে অনেক মেয়েরই কথা হয়।

        আমি এবার বেশ চিন্তিত হয়ে পড়লাম। কী করা যায় ভাবতে গিয়ে রিনির কথা মনে পড়লো। রিনি তখন ক্লাসে আমার সবচেয়ে ভলো বন্ধু। রিনি আমাদের থেকে কিছুটা বড়সড় আর বেশ সুন্দরীও ছিলো, সেই সাথে বুদ্ধিমতী। সে বয়সে আমি আমার জীবনের সব গুরুতর সমস্যার সমাধান চাইতাম রিনির কাছে। তো রিনির কাছেই জানতে পারলাম আজকাল ছেলে মেয়েরা না কি এমন অনেক কথা বার্তা অহরহ বলে। আর ভার্সিটিতে সব ছেলেরই অনেক বান্ধবী থাকে কিন্তু তাদের মাঝে যাকে ছেলো “আই লাভ ইউ” বলে সে হয় গার্ল ফ্রেন্ড। রিনির পরামর্শে আমি কিছুটা আশ্বস্ত হলাম। এবার আমি আমার অর্জিত নতুন জ্ঞান নিয়ে ভাইয়ার বান্ধবী আর প্রেয়সীর তফাৎ খুঁজতে নেমে পড়লাম। এখানেও আমি পড়লাম বিপাকে কারণ ভাইয়া প্রায় সবাইকেই “আই লাভ ইউ” বলে। আবার গেলাম রিনির কাছে। রিনি বললো, কিছু ছেলে তামাশা করে সব মেয়ের সাথেই আহ্লাদ করে, যার সাথে মাঝ রাতে কথা বলে সেই হলো আসল। মাঝরাতে দেখি ভাইয়া অনেকের সাথে কথা বলতো। অবশেষে আমি হাল ছেড়ে দিলাম।

        এভাবে ধীরে ধীরে সময় কেটে যাচ্ছিলো। ভাইয়ার ইন্টার্ন চলছে আর আমিও ক্লাস টেনে উঠে গেলাম, নিজের পড়াশোনায় তখন বেশ ব্যস্ত আমি। এদিকে আপুর একটা মেয়ে হয়েছে – নাম রেখেছে ঝুমুর। একদিন আপু আমাদের বাসায় এলো ছোট্ট ঝুমুরকে নিয়ে। আমি ঝুমুরকে নিয়ে শুয়ে আছি, ভাইয়া এসে ওকে নিয়ে খেলতে শুরু করলো। আপু তখন রান্নাঘরে। ঝুমুর হঠাৎ ভাইয়ার কোলে কান্না শুরু করলে আপু ছুটে এসে ঝুমুরকে কোলে নিয়ে ভাইয়াকে চিৎকার করে একটা গালি দিলো। আপুর মুখে আমরা কখনো গালি শুনি নি। আমার খুব কান্না পেয়ে গেলো আপুর এমন আচরণে। মনে হলো – আপুর মাথা ঠিক নেই। কারণ আপু ভাইয়াকে শুধু গালি দিয়েই থামেনি, আমাকে একটা চড়ও বসিয়ে দিলো আর বললো, “বলসিলাম না, ভাইয়ার কোলে ঝুমুরকে না দিতে।” আম্মু সব সময়ই ভাইয়া বলতে পাগল। আম্মু স্বাভাবিক ভাবেই আপুর সাথে খারাপ ব্যবহার করলো। আর সেদিনের পর থেকে আপু আমাদের বাসায় আসা পুরোপুরি বন্ধ করে দিলো।

        এ সময়টাতে আমি খুব একা হয়ে গেলাম। আমি তখন অনেক কিছুই বুঝি। ততদিনে আমি একটা ব্যাপার বুঝে গেছি যে, ভাইয়া ঘন ঘন প্রেম করে। আর কিছুদিন পর পর মেয়েরা কান্নাকাটি করে কল দেয় আর ভাইয়া সিম চেঞ্জ করে। এটাও টের পেতাম যে, বাসার জন্য ভাইয়া আলাদা সিম ব্যবহার করতো। আম্মু আসলে অনেক কিছু জানতো। অনেক সময় বাসায় মেয়েদের গার্জেন লেভেলের মানুষ এসে আম্মুকে শাসিয়ে যেতো। জীবনের গতিতে আর ভাইয়ার জীবনের এই খামখেয়ালীপনায় ভাইয়া আমার থেকে কেন জানি দূরে সরে যাচ্ছিলো। এতো কিছুর পরেও কিন্তু আমি ভাইয়াকে আগের মতোই বিশ্বাস করতাম, ভালোবাসতাম। তবুও নিজেকে আমার খুব দুঃখী মনে হতো। এমন অবস্থায় একমাত্র রিনি ছিলো আমার ছোট্ট আনন্দ। রিনিও এর মাঝে আরো সুন্দরী হয়ে গিয়েছিলো। মন খারাপ হলে আমি রিনির সাথে কথা বলে সময় কাটাতাম। রিনির সাথে কথা বলতাম ভাইয়ার ফোন দিয়ে। মেসেজও দিতাম ভাইয়ার ফোন দিয়ে। তবে ভাইয়ার ব্যাপারে রিনিকে আর কিছু বলতাম না।

        আমার এসএসসি পরীক্ষার পর আব্বু ঢাকায় চলে আসলো। আব্বু ঢাকায় আসলো ঠিকই কিন্তু আমার জীবনে আব্বুর তেমন কোন প্রভাব আমি অনুভব করতাম না যদিও আব্বু আপুর চেয়ে আমাকে বেশি পছন্দ করতো। আমি যখন আমার বান্ধবী রিনিকে দেখতাম ওর বাবার সাথে তখন আমার বেশ ঈর্ষা হতো। রিনির মা ছিলো না, তাই ও ওর বাবার কাছ থেকে অনেক আদর আর স্বাধীনতা পেয়েছিলো। রিনি আর ওর বাবার সম্পর্কটা ছিলো রৌদ্রোজ্জ্বল দিনের মতো ঝকঝকে আর নির্মল বন্ধুত্বের মতো প্রাণবন্ত। আব্বুর সাথে আমার এমন আবেগ কখনই তৈরি হয়নি। তবে আব্বু বাসায় থাকায় ভাইয়া বেশ হাসিখুশি হয়ে উঠলো। ভাইয়া তখন প্রাইভেট প্রাকটিস শুরু করেছে। ভাইয়া আমার সাথে অনেক গল্প করতো, শেয়ার করতো সব কিছু। আমি ভাইয়াকে পেয়ে খুশি ছিলাম। ভাইয়া সে সময় কোন এক মেয়ের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছিলো।

        কিন্তু বিপত্তি বাঁধলো তখনই যখন আব্বু ভাইয়ার পছন্দের মেয়ের সাথে ভাইয়ার বিয়ে দিতে চাইলো। এবার মেয়েই বেঁকে বসলো। সারা জীবন অগুনতি মেয়েকে বাতিল করে দিয়ে ভাইয়া নিজেই যখন রিজেকশনে পড়লো তখন ভাইয়া এটা আর নিতে পারলো না। এমন অবস্থা হলো যে, সারাদিন মন খারাপ করে থাকতো, কিছু খেতো না, দিন রাত শুয়ে থাকতো। আমি ভেবেই পেলাম না যে, ভাইয়া এতো মেয়ের সাথে প্রেম করেছে, আজ একজনকে হারিয়ে কেন এই অবস্থা! আম্মু তো একদিন বলেই বসলো, “মেয়ের তো অভাব নেই, আমি তোকে আরও সুন্দর দেখতে মেয়ের সাথে বিয়ে দিবো।” আম্মুর কাছে ছেলে বউ সুন্দরী হওয়াটাই যেন ছিলো জরুরি। একদিন আমি ভাইয়াকে সাহস করে জিজ্ঞেস করলাম, “ভাইয়া, কেন কষ্ট পাচ্ছো?” ভাইয়া ভাঙ্গা গলায় বললো, “মেয়েটা আমার দেখা সবচেয়ে সুন্দর মেয়ে ছিলো।” ভাইয়ার উত্তরে আমি মর্মাহত হলাম। আমি আশা করেছিলাম মেয়েটা ভাইয়ার ভালোবাসা ফিরিয়ে দিয়েছে এটাই ওর কষ্টের কারণ – ভাইয়া বলবে। আম্মু আর ভাইয়ার মাঝে আমি একটা অদ্ভুত মিল খুঁজে পেলাম। দু’জনেই মেয়ের বাহ্যিক রূপটাকেই গুরুত্ব দিচ্ছে, মনের খবরটা নিচ্ছে না।

        দিনে দিনে ভাইয়ার অবস্থার অবনতি হচ্ছিলো। কিছুদিন পর আম্মু একরকম বাধ্য হয়েই আমাকে নিয়ে ঐ মেয়ের সাথে দেখা করতে গেলো, কিন্তু কোন লাভ হলো না। মেয়েটা শুধু একটা কথাই বললো, “আপনার ছেলের চরিত্র ভালো না, ওকে সামলান।” আমার খুব গায়ে লেগেছিলো কথাটা, আম্মুর সম্ভবতঃ আরো বেশি। আম্মু অনেক কথা শুনালো মেয়েটাকে।

        আমার এসএসসি পরীক্ষার পর আমি কিছু দিন জন্ডিসে ভুগলাম। এ সময় প্রায়ই রিনি আমার সাথে সময় কাটাতে আমাদের বাসায় আসতো। বাসায় একদিন রিনিকে দেখে ভাইয়া রিনি চলে যাওয়ার পর হুট করে আমাকে বললো, “রিনি, মিলির থেকে অনেক বেশি সুন্দর।” মিলি হচ্ছে সেই মেয়ে যে ভাইয়ার সাথে বিয়ের প্রস্তাবে বেঁকে বসেছিলো। আমি ভাইয়ার কথায় একটু বিরক্ত হলাম – ভাইয়া তার চেয়ে আট বছরের ছোট একটা মেয়ের চেহারা নিয়ে গবেষণা চালাচ্ছে।

        এর মধ্যে আব্বু-আম্মু একদিন অসুস্থ নানুকে দেখতে গেলেন। পরদিন বিকেলে আমিও গাড়ি নিয়ে নানুর বাসায় রওনা দিলাম। এমন সময় আম্মু ফোন দিয়ে বললো ভাইয়াকেও নিয়ে যেতে। অগত্যা গাড়ি ঘুরিয়ে বাসার পথ ধরলাম। এ সময় ভাইয়ার ফেরার কথা না। কাজেই বাসায় গিয়ে ভাইয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। বাসায় ফিরে চাবি দিয়ে দরজা খুলে ভিতরে ঢুকতেই দেখি দরজার সামনে রিনির জুতা। আজ তো রিনির আসর কথা না! ভেতের ঢুকে রিনিকে কোথাও দেখতে না পেয়ে ভাইয়ার ঘরে গিয়ে দেখি দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। তার মানে ভাইয়া ফিরে এসেছে। দরজাটা নক করতেই শুনলাম ভেতর থেকে রিনি চিৎকার করছে। আমি হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। ঠিক ঐ সময় আমার কী করা উচিত আমি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। হঠাৎ-ই দরজা খুলে ভাইয়া বের হয়ে এলো ঘর থেকে, কোন দিকে না তাকিয়ে বেরিয়ে গেলো বাসা থেকে। দরজা থেকেই আমি দেখতে পাচ্ছিলাম রিনি যেন একটা যুদ্ধ শেষে পরাজিত মাংসপিণ্ডের মতো পড়ে ছিলো ঘরটার এক কোনে। আমার হয়তো উচিত ছিলো রিনির কাছে ছুটে যাওয়া, কিন্তু আমি তা না করে আপুকে ফোন দিলাম। রিনি যে কখন বেরিয়ে গেছে তা খেয়ালও করিনি।

        আপু আসলো। এক সময় আব্বু আম্মুও আসলো। আম্মুর সাথে আপুর তুমুল ঝগড়া হলো। আপুর চিৎকার থেকেই খুব অবাক হয়ে জানলাম, ভাইয়া না কি আমাদের এক খালাতো বোনের সাথেও আগে এমন করেছিলো। ঘটনা না কি খুব সহজেই চাঁপা দেয়া হয়েছিলো। আর এই ঘটনার পরেও ঐ পরিবারের বিভিন্ন প্রোগ্রামে ভাইয়া যেতো।

        রিনির ব্যাপারটায় ভাইয়া খুব দ্রুতই বেশ ঝামেলায় পড়ে গেলো। রিনির বাবা খুব শক্ত মানুষ ছিলেন। ভাইয়া শক্ত কেসে ফেঁসে গেলো। কিন্তু আব্বুও ভাইয়ার জন্য যা প্রয়োজন করলো। আমিও ভাইয়ার পক্ষে আদালতে সাক্ষ্য দিলাম। ভাইয়ার জন্য আমার ভালোবাসা তখনও বোধ হয় বেশ ভালোই ছিলো, নইলে আমার প্রিয় বান্ধবীর বিপক্ষে গিয়ে সাক্ষ্য দিলাম কী করে! কেস অনেক দূর গড়ালো, কিন্তু ভাইয়ার কিছু হলো না শেষ পর্যন্ত। ভাইয়াকে আমরা ফিরে পেলাম ঠিকই, কিন্তু আমি আমার রিনিকে হারালাম। রিনির সাথে আর কোন দিন কথা হয়নি আমার। আর কোন দিন আমার বেস্ট ফ্রেন্ডকে দেখি নি। কোন দিনও না! ভাইয়াকে যতখানি ভালোবাসতাম সব ধীরে ধীরে শেষ হয়ে যাচ্ছিলো, হয়তো চাঁপা পড়ে গিয়েছিলো ক্ষোভ আর অভিমানের আড়ালে। এই অভিমানে আমি বাসা ছেড়ে আপুর বাসায় গিয়ে উঠলাম।

        এখন আমি আপুর বাসায় থাকি। আপুর মেয়ে ঝুমুরকে নিয়ে সময় কাটে আমার। ওকে খুব ভালোবাসি আমি। ঝুমুর এর নরম গাল, ওর ছোট্ট চোখ, আদুরে কথাকে অসম্ভব ভালোবাসি। ঝুমুর এখন প্রায় ৪ বছর ৫ মাস। ঝুমুরকে নিয়ে সেদিন প্লে স্কুলে যাচ্ছি, হঠাৎ আম্মুর সাথে দেখা – প্রায় দুই বছর পর। আম্মুর সাথে অনেক দিন পর দেখা হওয়ায় আমি একটু গলে গিয়েছিলাম। আপুর সংসারে ভালো থাকলেও নিজের ঘরকে মিস করতাম, হয়তো আম্মুকেও মিস করতাম। ঐ দিন আম্মুর মুখে যখন শুনলাম আব্বু দেশের বাইরে তখন ঝুমুরকে নিয়ে বাড়ি যাবার জন্য রাজি হয়ে গেলাম।

        বাসায় এসে অনেক দিন পর নিজের বিছানায় শুয়ে কেমন জানি একটা ভালো লাগা ছড়িয়ে পড়ছিলো মনে। আমার পুরনো খেলনা খুঁজতে শুরু করলাম। ঝুমুরকে মা খাইয়ে দিচ্ছিলো, আর আমি আলমারিতে জামাকাপড় খুঁজতে শুরু করেছিলাম। ভাইয়ার বহু দিন আগে দেয়া সেই শাড়িটা পেয়ে গেলাম। কী মনে করে পরেও ফেললাম। আমাকে ভীষণ সুন্দর লাগছিলো। শাড়ি পড়েই ঘুমিয়ে গেলাম, স্বপ্নে দেখলাম ভাইয়া আমার সাথে কথা বলছে কত দিন পর।

        ঘুমের মাঝেই ঝুমুরের কান্না শুনতে পেলাম। ঘুম ভেঙ্গে গেলো।

না, স্বপ্ন না; সত্যি ঝুমুর কান্না করছে। ঝুমুরকে খুঁজতে খুঁজতে পেলাম ভাইয়াকে। ভাইয়ার কোলে ঝুমুর চিৎকার করে কান্না করছে। আজ অনেক দিন পর ভাইয়াকে দেখলাম। ভাইয়া ঝুমুরকে কোলে নিয়ে ছিলো, ঝুমুরকে কেমন জানি অসুস্থ দেখাচ্ছিলো। অজানা ভয়ে ভেতরটা কেঁপে উঠলেও জানতাম ভাইয়া ঝুমুরকে কিছু করবে না। আম্মু ঠিক কোথায় ছিলো জানি না। ভাইয়ার কোল থেকে ঝুমুরকে ছিনিয়ে নিয়ে আম্মুকে কিছু না বলেই বের হয়ে আসলাম বাসা থেকে। খুব দ্রুত গাড়ি ডেকে আপুর বাসায় চলে গেলাম। সারা রাস্তা ঝুমুর চিৎকার করে কাঁদছিলো। বাসায় পৌঁছে আপুকে দেখে বুক ধড়ফড় করতে লাগলো।

        ঝুমুরকে আপুর কোলে দিয়ে দৌড়ে নিজের ঘরে চলে গেলাম। আপু ডায়াপার বদলাতে বদলাতে চিৎকার করে উঠলো, “এই নিলু, ঝুমুরের গা থেকে রক্ত বের হচ্ছে কেন!?”

আপুর প্রশ্নের জবাব না দিয়ে আমি ঘর থেকে বের হয়ে রাস্তায় নেমে পড়লাম।

        রাস্তায় উদ্দেশ্যহীন ভাবে হাঁটতে হাঁটতে রিনির মুখটা ভেসে উঠলো মনে। হুম, খুব মনে পড়ছে সেদিনের কথা যেদিন রিনির মামলায় মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়েছিলাম। আমিই ছিলাম একমাত্র আই উইটনেস। আমার প্রিয় বান্ধবীর একমাত্র সাক্ষী হয়ে কী করেছিলাম জানেন? আম্মুর পরামর্শে আদালতে আমি বলেছিলাম ওদের রিলেশন ছিলো। অদ্ভুত বানোয়াট এক কাহিনী বলেছিলাম স্বাধীনচেতা রিনির চরিত্র নিয়ে। ভাইয়ার ফোন দিয়ে আমি রিনিকে যে মেসেজ করতাম সেগুলোকেও ব্যবহার করেছিলাম রিনির বিরুদ্ধে। হুম, রিনিকে ভালোবাসতাম, কিন্তু ভাইয়াকেও যে ভালোবাসতাম অনেক বেশি। কিন্তু ঝুমুরকে যে আমি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি।

        একটু আগে জানতে পেরেছি ঝুমুর এখন হাসপাতালে। আমি রাস্তায় হাঁটছি ভাইয়ার শাড়িটা পরে। হাতের ফোনটা বেজে উঠলো। ফোনের স্ক্রিনে ভাইয়ার নামটা ভেসে উঠলো। আজ এতো বছর পর আমি ভাইয়ার শাড়ি পরার আবদার রাখলাম, আমি কি পারবো ভাইয়ার আজকের আবদার রাখতে? ছোট্ট ঝুমুরের একমাত্র খালামনি হয়ে আমি কি পারবো ভাইয়ার আবদার রাখতে? সত্যি জানি না। আজ রিনির কথা কেন জানি খুব মনে পড়ছে। ঝুমুরও কি রিনির মতো দূরে সরে যাবে আমার থেকে?        এলোমেলো পায়ে আমি ভাইয়ার দেয়া শাড়ি পরে হাঁটতে শুরু করলাম এক অচেনা পথে।

কমেন্ট করুন

সিলভিয়া আহমেদ

সেশন: ২০১৪-১৫