আলো

জুন ২০০৪। আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি পড়ছে। বার ড্যান্সারদের আন্দোলন চলছে গোটা ভারতে। মুম্বাই, দিল্লী সহ গোটা ভারতে বৈধ-অবৈধ ড্যান্স বারের রমরমা ব্যবসা বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে ভারতের মহারাষ্ট্র সরকার। এ নির্দেশের পেছনে মূল কারণ ছিল মাফিয়া চক্রের অবৈধ অস্ত্র পাচার, মাদক ব্যবসা, মানব পাচারের মতো অপরাধ গুলো বন্ধ করা। কিন্তু তৎকালীন গোঁড়া মন্ত্রীগোষ্ঠী ধোঁয়া তুললেন যে ভারতের আবহমান সংস্কৃতি ও রক্ষণশীলতা বজায় রাখতেই এই সিদ্ধান্ত। কারণ যা-ই হোক না কেন এ সিদ্ধান্তে মানুষ দু’ ভাগ হয়ে গেল। এক দলের মতে এ সিদ্ধান্ত সঠিক। আর এক দলের মতে এ বারগুলোর হাজার হাজার কর্মী, বিশেষত নারী কর্মী, সিঙ্গার, ওয়েট্রেস – এরা কোথায় যাবে, তাদের কর্মসংস্থানের কী হবে, এদের পুনর্বাসন কী করে হবে! মুম্বাইয়ের সাতশ’ বারের নারী শ্রমিকরা নেমে এলো রাস্তায়; বৃষ্টিতে ভিজেই তারা আন্দোলন করবে। কাপড় দিয়ে মুখ ঢেকে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে বার কর্মীরা। তাদের মতে বলিউডের নায়িকারা যদি স্বল্প বস্ত্রে নাচ গান করে সম্মানের সাথে ভারতে অবস্থান করতে পারে তবে তারা পারবে না কেন? তারা ভারতের নৃত্য বা সংস্কৃতির কোন অবমাননা তো করছে না। তাদের সাথে যোগ দিল কিছু সমাজকর্মী, আইনজীবী আর সাংবাদিক। সুপ্রিম কোর্টে আপিল করে বার কর্মীদের পক্ষের আইনজীবীরা। এ আন্দোলনের জল কতদূর গড়াবে তা কেউই কল্পনা করতে পারে নি তখন। বহুবছর এই ড্যান্সবার  মামলা চলে। প্রতিবারই বারগুলোর পক্ষে রায় হয়। ২০১৪ সালে বহু বার আবার খুলে যায়। আবার একদল তাদের দমিয়ে দেয়। ভারতের এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী বারে কর্মরত ৭৫,০০০ নারী কর্মী তাদের জীবিকা হারায় যার অধিকাংশই দেহব্যবসার সাথে জড়িয়ে পড়ে এবং তাদের কন্যা সন্তানরাও এই পেশায় জড়িয়ে পড়তে বাধ্য হয়। ভারতের ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত এ  ঘটনা, সমাজকে পরিবর্তনের এ পদক্ষেপ আর তার এই ভয়াবহ ফলাফল প্রমাণ করে যে, সমাজ যতদিন নারীদের জন্য একটা নিরাপদ আশ্রয় তৈরি না করবে, ততদিন আমারা আলোকিত সমাজ পাবো না। আমাদের গল্পের ‘জয়’-এর মত এক মিথ্যে প্রলোভনের পিছে ছুটে চলতে হবে সমাজকে।

আমাদের গল্প মহারাষ্ট্রের বার ড্যান্সার মোহিনী আর তার ছেলে জয়-কে নিয়ে।

মোহিনী ছিল মহারাষ্ট্রের দীপা বারের নর্তকী। দীপা বারে কখনো কাউকে জোর করে আনা হয়নি, কেউ স্বেচ্ছায় এ পেশায় আসলে দীপা বারে তাদের স্বাগত জানানো হত। অভাব-অনটনক্লিষ্ট, সমাজের অভিভাবকহীন দুঃখী আর সমাজ থেকে বিতাড়িত অস্বীকৃত মেয়েদের ঠাই হয় এখানে।

মাত্র তেরো বছর বয়সে এক যুবকের হাত ধরে ঘর ছেড়ে পালায় মোহিনী। মহারাষ্ট্রে সেই যুবকের সাথে বিয়ে হয়, কোল জুড়ে আসে জয়। অভিনয় এর জগতে আগ্রহ আর তার খামখেয়ালি আচরণে সংসার ভাঙ্গে মাত্র আঠারো বছর বয়সে। একাকী তরুণী সুন্দরী মোহিনী কে সমাজ নিরাপদ আশ্রয় দেয় নি। অনিরাপদ, নিশ্চিত পতিতাবৃত্তি থেকে নাচ-গান ও পুরুষের লোলুপ দৃষ্টির মাঝে তুলনামূলক নিরাপদ জীবন হিসেবে মোহিনী আশ্রয় খুঁজে নেয় দীপা বারে।

সমাজের সাধারণ মানুষেরা ভাবে বার অভিশপ্ত। কিন্তু এ সমাজেরই কিছু মানুষ এখানে আসে মদ, নাচ আর গানের মাঝে জীবনকে উপভোগ করতে। অবশ্যই এখানে মানুষ সুস্থ ধারার সংস্কৃতি উপভোগ করতে আসে না। নারীদের সান্নিধ্যে আসাই এখানে মুখ্য; সে সাথে চলে মাদক পাচার, ড্রাগ ডিল সহ মাফিয়া সংঘের নানা অপকর্ম। দীপা বারে মোহিনী শুধু নাচ গানের সাথে জড়িত ছিল। কিন্তু তার মতো অনেক অভাগাই এখানে সরাসরি কল গার্ল হিসেবে কাজ করতো।

এমন নয় যে মোহিনী এ কাজে সন্তুষ্ট ছিল। দিন শেষে এ জীবনকে ঘৃণাই করতো সে। শেঠদের ছুঁড়ে মারা কচকচে টাকার নোটে নিজেকে পণ্যই মনে হতো কখনো কখনো (পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্টের  নির্দেশে ড্যান্সারদের উপর টাকা ছুঁড়ে মারার রীতি বন্ধ হয়)। জীবন চালাতে রাস্তার অনিশ্চিত ক্ষুধার্ত এবং বারের বাইরের কল গার্লদের চেয়ে নিজের জীবনকে অনেক নিরাপদ ভাবতো মোহিনী।

মোহিনী স্বপ্ন দেখতো সুন্দর জীবনের। ছয় বছরের ছেলে জয়কে ও এই জীবনের দুঃখ বুঝতে দিতো না। জয় বারের এ রংবেরঙ্গের জীবন, গান, সুর, জমকালো ডিস্ক লাইটকে খুব ভালোবাসতো। তার মা যখন চকমকে পোশাকে বারের ডিস্ক লাইটের নীচে বলিউডের হাই বিট গানগুলোতে নাচতো জয় আড়াল থেকে তাকিয়ে দেখতো। মায়ের মুখে এই সময় দেখতে পেতো মিষ্টি হাসি। আর জয় তাই এই অন্ধকার জীবনকেই আলো ভাবতো। মার দিকে টাকার নোট ছুঁড়ে মারা লোকগুলোকে অর মনে হতো দেবদূত ।

দিনের বেলা অল্প সময় জয় আর মোহিনী থাকতো তাদের বস্তির জীর্ণ ঘরটায়। জয় এ সময়টা মাকে খুব ভয় পেতো, মার মেজাজ থাকতো খুব খারাপ। অন্ধকার, নোংরা আর অসুখী এই জীবনটাতে দম বন্ধ হয়ে আসতো জয়ের।

মোহিনী সুন্দরী ছিল, চাইলে আরো টাকা কামানো তার জন্য কষ্টের ছিল না। বারের মাদক ব্যবসা, দেহ ব্যবসা অনেক কিছুর অফুরন্ত সুযোগ ছিল। তাদের মালিক ছিল বেশ ভাল মনের, কর্মীদের নিরাপত্তা দেয়ার চেষ্টা করতেন। সাহেবদের দেয়া বকশিসের সিংহভাগ যেতো মালিকের হাতে। তারপর তিনি নিজেই বকশিস ভাগ করে দিতেন সবাইকে।

বারের এই অন্ধকার দুনিয়ায় সভ্য লোকের আগমন তেমন ছিল না। দু’ একজন যারা এ বারে আসতো তাদেরই একজন ছিল বীর নামের এক ক্রাইম রিপোর্টার। মোহিনী বীরের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি করতো বারে। এতে মোহিনীর কিছু আয়ও হতো গোপনে। মোহিনী মনে মনে বীরের প্রতি দুর্বল ছিল। বার বার বীরকে বলতো এ জীবন থেকে  তাকে বের করতে। বীরও তাকে আশা দিতো। হয়তো মনের অজান্তেই বীর মোহিনীকে ভালবাসতো। কিন্তু সত্যি বলতে মোহিনীর মতো মেয়েরা এ জগত থেকে ভদ্র সমাজে যেতে চাইলেও কোনদিন তাদের সেখানে গ্রহণ করা হয় নি।

জুন ২০০৪। মহারাষ্ট্রের রাজপথ বৃষ্টিতে ভেসে যাচ্ছে। সাথে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে মোহিনীর জীবিকার আশ্রয় দীপা বারকে। মুম্বাই সহ বড় শহরগুলোতে বেশ কিছু বার বহাল তবিয়তে থাকলেও দীপা বার সহ মহারাষ্ট্রের অনেক বার পুলিশ প্রশাসনের তৎপরতায় বন্ধ হয়ে গিয়েছে। একুশ বছরের বয়স সীমা এবং সিসি ক্যামেরা সহ নানা শর্ত পূরণ করেও রক্ষা পায় নি অনেক বার। আর তাই বারের নারী কর্মীদের সাথে মোহিনীও পড়ে আছে রাজপথে। বৃষ্টিতে ভাসছে স্বপ্ন, আশা আর অবলম্বন!

দুর্দিনের প্রথম ছ’ মাসেই মোহিনীর সঞ্চয় শেষ হয়ে আসলো। বার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় থেকে গুপ্তচরবৃত্তি ও তেমন আয় হচ্ছিল না। এদিকে জয় তার মার সুন্দর মুখখানা আর দেখতে পেতো না। মা আগের মত আর কখনো হাসতো না, সুন্দর জামা পরতো না, আগের মত অবশ্য খিটমিটও করতো না। দিন শেষে রাত্রি বেলা মা ফিরতো, জয়কে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়তো। বস্তিতে মোহিনীর মতো দীপা বারের পুরাতন অনেক কর্মীই থাকতো। জীবনের তাগিদে বিভিন্ন পুরুষকে প্রতি সন্ধ্যায় ঘরে টেনে নেয়া ছাড়া তাদের আর উপায় ছিল না।

মোহিনীও ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়ল মাদক ব্যবসায়। মোহিনী নিজেও এক সময় মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ল। এ সময় বীর মাঝে মাঝে বস্তিতে আসতো মাদকের খবর নিতে। মোহিনী বুঝতে পারছিল যে নিজের জীবনের পরিবর্তন সে ঘটাতে পারবে না। তাই বীরকে বার বার অনুরোধ করতো জয়কে এ জগতের বাইরে নিয়ে যেতে। বীর কথা দেয় এক মাস পর ওদের দু’জনকেই ও নিয়ে যাবে মুম্বাই। ঠিক সে সময় সুপ্রিমকোর্টে বার কর্মীদের মামলার রায় হচ্ছিল দিল্লীতে। বীর দু’মাসের জন্য চলে যায় দিল্লীতে। দীপা বার নতুন করে রেস্টুরেন্ট আকারে ফেরত আসবে বলে শোনা যাচ্ছিল।  রেস্টুরেন্টে মিউজিক অরক্রেস্টার ব্যবস্থা থাকলেও মোহিনীর আর আশার আলো নেই তখন।

অগত্যা বীরের অপেক্ষায় দিন গুনে মোহিনী।

অনেক দিন থেকেই মাদক ব্যবসার এক চরের নজরবন্দী ছিল মোহিনী। সেই মোহিনীকে বীরের সাথে দেখতে পায় বেশ কিছু দিন। আর বীরের অবর্তমানে এক দিন বিকেলে একদল লোক মোহিনী কে তুলে নিয়ে যায়। এরপর থেকে বস্তিতে মোহিনীর আর খোঁজ পাওয়া যায় না।

ছোট জয়ের সামনেই তার মাকে তুলে নেয়ে হয়েছিল। মা বলেছিল, বীর আঙ্কেলের জন্য অপেক্ষা করতে। কিন্তু অনেকক্ষণ ঘরে লুকিয়ে থেকে যখন মা বা বীর আংকেল কেউ আসলো না তখন মার খোঁজে বেরিয়ে যায় জয়।

রাস্তায় থাকে টানা ৩ দিন। তখনও বৃষ্টি হচ্ছে। জয়ের গন্তব্য ছিল দীপা বার। বার তখনো তালাবন্ধ। বার চলাকালীন জয় প্রায়ই বারে ঘুমিয়ে থাকতো। ঘুম থেকে উঠে অনেক সময় মাকে পেতো না। ঘুম ভাঙলে বারের মিউজিক অনুসরণ করে মাকে পেয়ে যেতো। উচু স্টেজে মাকে দেখাতো পরীর মতো। আশপাশে রঙ্গিন আলো আর মা! আবারো একবার মাকে দেখতে চায় জয়। কোন এক অজানা কারণে তার মনে হয়েছিল দীপা বারেই মায়ের দেখা মিলবে।

বন্ধ বারের পাশেই রাখা ছিল বড় বড় লোহার নল। এর মাঝেই না খেয়ে না ঘুমিয়ে জয় অপেক্ষা করতে লাগল মা’র জন্য। সারাদিন বৃষ্টিতে ভিজে জয়ের গা কাঁপুনি দিয়ে জ্বর চলে আসলো রাতে। এই বিশাল পৃথিবীতে জ্বরে কাতর সাত বছরের একটি ছেলে লোহার নলের ভেতর অসহায়ভাবে পড়ে থাকলো একটু আদর, একটু ভালবাসা আর মায়ের প্রত্যাশায় ।

জ্বরের ঘোরে জয় হঠাৎ যেন মা’র গলা শুনতে পেলো। দূর থেকে একটা গান শুনতে পেলো জয়, দীপা বারে এই গানটাই সারাদিন বাজতো। টলমলে দুর্বল শরীরে ছুটে বেড়িয়ে যায় জয় ঘোর বৃষ্টির মধ্যে। রাস্তার পাশে মুখে রং মেখে দাঁড়ানো মেয়েগুলো ওকে চিৎকার করে থামতে বলল। রক্তলাল ঝাপসা চোখে রাস্তার ওপাশে জয় দেখতে পেলো কিছু রঙিন আলো। শরীরের সব শক্তি দিয়ে দৌড়াতে থাকে জয়, মার কাছে যেতে হবে। এই তো সেই সুর, সেই আলো, মা তো ওখানেই আছে!

জয়ের  চোখে পানি, চোখের পানি আর বৃষ্টিতে ঝাপসা ভাবে ও দেখে আলোটা ওর দিকে ছুটে আসছে আর সেই দীপা বারের সুর আরও স্পষ্ট ভাবে শুনা যাচ্ছে। জয় হাত বাড়িয়ে দেয় মার জন্য, মা তাকে জড়িয়ে ধরবে।

দ্রুত গতিতে ছুটে আসা ডিস্ক লাইটের মতো আলোর ধাক্কায় জয় রাস্তার পাশে ছিটকে পড়ে। গাড়িটা দ্রুত গতিতে পালিয়ে যায় । জয়ের মৃত দেহ কোন সভ্য মানুষ হাসপাতালে নিয়ে যায় না।পুলিশ এ মামলার তদন্তে তেমন আগ্রহী ছিল না, কিন্তু বাচ্চাটা নিজে গাড়ির দিকে ছুটে যাওয়ায় এ গল্পের বেশ ভাল প্রচার হল স্থানীয় পত্রিকায়। দিল্লী থেকে ফিরে এসে বীর আর কখনো মোহিনী বা জয়কে খুঁজে পেলো না। পেলো শুধু  “আলোর খোঁজে” শিরোনামের এক রহস্যময় দুর্ঘটনার খবর। বীর জানতেও পারলো না যে, রহস্যের নায়ক ছিল জয়।

কমেন্ট করুন

সিলভিয়া আহমেদ

সেশন: ২০১৪-১৫