কালো ঘুড়ি

(১)

ড্রাইভওয়েতে এসে আবিদ আর গাড়িটি তুলতে পারে না।

ঠায় স্থির হয়ে থাকে। এমন না যে ওর গাড়িতে কোন সমস্যা আছে। এখনো দিব্যি আট-দশ বছর চোখ বুজে চালানো যাবে। মাত্র তো চল্লিশ হাজার মাইল চালিয়েছে। ইঞ্জিনে কোন বাজে আওয়াজও নেই। নিয়মিত যত্ন করে বলে গাড়ির ভিতর-বাহির বেশ ঝকঝকে। সাধারণত আমাদের ওদিককার লোকজন জাপানি গাড়ির বাইরে অন্য কোন দেশের ব্র্যান্ডেই যায় না। তার সে সমস্যা নেই। প্রথম থেকেই সে অ্যামেরিকান গাড়ি চালিয়ে এসেছে। কোন ঝামেলায় পড়েনি। ওর এবারেরটা ফোরড-এস্কেপ। পরিবার বড় হচ্ছে, তাই একটু বড় গাড়ি দরকার হয়ই। আর তাছাড়া ওকে প্রায়ই নর্থ শোর কিম্বা দুলুথে যেতে হয়। গাড়ির ভিতরেও খানিক বেশি জায়গা প্রয়োজন। বড় গাড়িতে তাই মেলা সুবিধা।

পারকিং গিয়ারে বসে সে জোরে জোরে গ্যাসে চাপ দেয়। জায়গায় দাঁড়িয়ে থেকে এস্কেপ ‘বুম-বুম’ করে ওঠে। অমন শব্দে তো ওটির উড়ে যাবার কথা। কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। ওটার নড়ার কোন লক্ষণই নেই! বরং গ্যারাজের দিকে ফিরে কেমন হেলে দুলে চলছে! যেন কোন শব্দই পাচ্ছে না । পাখিরা বধির হয় নাকি? কী নাম পাখিটার? দেখতে অনেকটা কানি-বকের মতো, কেমন ধূসর পালক। লম্বা ঠোঁট। ওদের গ্রামের বাড়িতে এ ধরণের পাখিকে বলে ‘বগলা’ । পাখিটি এইবার ওর গাড়ির দিকে ফিরে তাকায়, স্থির দৃষ্টি। মাথাটা একদিক থেকে হঠাৎ করে অন্যদিকে ঝাঁকায়। সেদিকে তাকিয়ে আবিদের নিঃশ্বাস দ্রুত থেকে দ্রুততর হয়ে ওঠে। ওটির চোখে চোখ পড়তেই কেমন হিম শীতল একটা অনুভূতি হয় তার। সে হাত দিয়ে কোমরের ডান পাশে জিনিসটা অনুভব করার চেষ্টা করে। নাহ, ঠিক জায়গা মতোই আছে সেটি। ওর মাথায় চিন্তার ঝড় চলছে, সে এখন কী করবে? দিবে নাকি ফেলে। এতো কাছ থেকে লক্ষ্য মিস হবার কথা নয়। তার হাতের টিপ প্রায় অব্যর্থ। বহুকালের অধ্যবসায়ের ফল, বিফলে যায় কী করে। কিন্তু সমস্যা হল, এটা তো ওর প্রতিবেশ। গুলির শব্দ শুনে নানা ফ্যাসাদ তৈরি হবে। বলা যায় না প্রতিবেশীরা টেররিস্ট-অ্যাটাক বলে নাইন-ওয়ান-ওয়ানে ফোনও করে দিতে পারে। ঝামেলা আরও একটা আছে। তার ড্রাইভিং সিট থেকে পাখিটার মাথা লক্ষ্য করে গুলি চালালে তা সরাসরি গিয়ে ওর গ্যারাজের রোলিং-ডোর ছ্যাদা করে দিতে পারে। ওটা একটা বেশ ভালো ক্ষতির কারণ হয়ে যাবে তখন। কিন্তু কী করবে এখন সে? তার যুক্তি বোধ যথার্থ মাত্রায় কাজ করছে না। শরীর অবশ হয়ে আসছে। অথচ গাড়ি চালিয়ে সামনের দিকে গেলেই তো ওটা উড়ে যাবার কথা। এই কাজটাও করতে পারছে না আবিদ। ঠিক তখন ঝিলিকের মতো মাথায় একটা খেয়াল আসে। সে বাসায় ফোন করে। ওপাশে তিথি ফোন ধরে। আবিদ বলে, অরাকে একটু বাইরে পাঠাও তো।

– কেন? কী দরকার?

– বাজার গুলো নামাতে হেল্প করবে। জলদি পাঠাও।

– কী আর এমন বাজার যে ওকে লাগবে? আচ্ছা পাঠাচ্ছি।

অরা এসে গ্যারাজের ভিতর থেকে দরজার বোতামে চাপ দেয়। দরজাটি ঘড়ঘড় শব্দ করে আস্তে আস্তে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে উপরে উঠে যায়। গাড়িটি গ্যারাজে ঢুকানোর সময় পাখিটিকে আর নজরে পড়েনি তার। উড়ে গেলো নাকি? কিন্তু সে দেখেনি কেন? আসলে কি কোন পাখি ছিল ওখানে? নাকি সেটা  তার দেখার ভুল? আরেকটি ব্যাপার এই মাত্র তার মনে হল। সে-ও তো গাড়িতে বসেই রিমোট টিপে দরজা খুলতে পারতো! আর তাতে অনায়েশেই পাখিটি উড়ে যেতো। কোন হ্যাপাই হতো না। এই যেমন এখন তা হাওয়া হয়ে গেছে। কিন্তু এই চিন্তাটা একটু আগেও তার মাথায় কাজ করে নি, কেন? আজব তো!

মেয়েকে গোপন উপহার দেবার ভান করে একটা প্যাকেট ধরিয়ে দেয় সে। অরা ভ্রু কুচকে জানতে চায়, হোয়াট’স দ্যাট?

– খুলে দ্যাখ।

প্যাকেটটি খুলতে খুলতে ওর মুখের রেখা বদলাতে থাকে। সরলতার অভিব্যক্তির তুলনা হয় না বুঝি। সে জোরে চিৎকার করে ওঠার আগেই আবিদ বলে, ডোন্ট স্ক্রিম, ইয়োর মাম উইল বিট ইউ এন্ড মি আপ। আমি পেঁয়াজ আনতে ভুলে গেছি। তুই ব্যাগগুলা একটু ধর। আমি কস্টকো থেকে চট করে এক ব্যাগ পেঁয়াজ কিনে নিয়ে আসি, কেমন।

অরাকে দেখে মনে হল না বাবার কথা খুব একটা মনোযোগ দিয়ে শুনেছে সে। বাজারের ব্যাগগুলো নিঃস্পৃহ ভাবে নেয়। তার পুরো নজর জুড়ে আছে হাতের চৌকোণা প্যাকেটটি। একটা দূরবিন, তার অনেক দিনের শখ।

আবিদ ওর এস্কেপ নিয়ে আবার বেরিয়ে যায়। দেখে রাস্তা একদম পরিষ্কার। ঝলমলে একটা দিনের শেষ বেলা। অক্টোবরের  আকাশ কাঁচের মতো,  মেঘহীন- বর্তুল। রোদ ক্রমশ হলদেটে-কমলা রঙের হতে শুরু করেছে। সে রোদ ঘাড়ে এসে পড়ে, ভালো লাগে তার। আশেপাশের গাছে একটিও পাতা নেই। আর ক’দিন বাদেই নেমে আসবে হিম শীতল ঠাণ্ডা। প্রথম প্রথম অনেক অসুবিধা হতো তার। চারদিক এতো তুষার পড়ে মিনেসোটায়, কেমন অস্থির অস্থির লাগতো তার। অথচ আস্তে আস্তে এই সাদা বরফের রাজ্যই ভালো লাগতে শুরু করে। এখন তো চারপাশে বরফের পাহাড় না জমলেই বরং মনটা দমে যায়। কেমন মনমরা লাগে। বাংলাদেশের মতো অমন একটা চিটচিটে গরমের দেশ থেকে এসেও দিব্যি মানিয়ে গেছে সে। মানুষ কি তবে পাল্টায়? সবকিছুর সাথে মানিয়ে নিতে পারে? কে জানে।

চিন্তার মোড় অন্যদিকে ফেরাতে চেষ্টা করে আবিদ। অফিসের কথা ভাবে। আজ একটা ঘটনা ঘটেছে। ওদের আগের ম্যানেজার পাল্টে নতুন একজন এসেছে। লোকটি ভারতীয়, ব্যাঙ্গালোরের। ভেংকটেশ না কী যেন একটা নাম। আজ প্রথমদিন থেকেই ওর অন্যান্য কলিগরা অনায়েশে মিঃ ভি বলে ডাকতে শুরু করেছে। অথচ সে তা বলতে পারেনি। তার আগের বস ছিল চিঙ্কু, চাইনিজ। কঠিন পরিশ্রমী আর হার বজ্জাৎ। সারাক্ষণ পেছনে টিকটিক করতো। প্রতি সপ্তাহের সোমবার সকালে বসতো ওদের ৩০ মিনিটের মিটিং। সেখানে তার চাইনিজ বস চ্যাং(সব চিঙ্কুর নামই কি চ্যাং নাকি?) রাজ্যের অনুপাত, কর্মক্ষমতার ক্রমহ্রাস কিম্বা বৃদ্ধি ইত্যাদি নিয়ে আঙ্কিক বিশ্লেষণে বসতো। ওসব ম্যাথম্যাটিক্যাল এনালিসিসের সে ছাই কিছুই বুঝত না। শুধু মিটিং শেষে ওদের দলের সবার চোখ-মুখ দেখে বোঝা যেতো, হাওয়া গরম। প্রতি সোমবার সকাল ছিল তাই তার বিভীষিকার দিন। মনে মনে দিন গুনত কবে না তাকে একটা চিঠি ধরিয়ে দিয়ে বলে, ‘কাল থেকে তোমার কাজে আসার আর দরকার নেই’। আগে হলে তেমন ভাবত না। কাজ গেলে যাবে, আরেকটা জুটিয়ে নেবে। কিন্তু আজকাল একটু একটু করে চিন্তা কাজ করে তার। কাজের বাজারটা এখনো তেমন ভালো হয়ে ওঠেনি। এইতো শরিফের চাকরিটা হুট করে চলে গেলো। আজ ছমাস, এখনো ওর কোন ভালো কাজ জোটে নি। সামনের বছর অনল কলেজে যাবে। ওর জন্য কিছু সঞ্চয় থাকাটা জরুরি। এখন অনল যদি একটা ভালো স্কলারশিপ পায় তবে সে উৎরে যায়।

সেদিক থেকে ভারতীয় ম্যানেজার বুঝি খারাপ হবে না, আবিদ ভাবে। এসেই প্রথমে সবাইকে নিয়ে একটা শিথিল আয়েশি সভা করলো। সবার কথা শুনল। কফি খেতে খেতে একটা ছোট্ট ভাষণ দেয় মিঃ ভেংকটেশ,

…‘কেন অ্যামেরিকা একটি মহান দেশ তা এখানকার এই ছোট্ট টিমটির দিকে তাকালেই বোঝা যায়। এগারো জনের এই দলে তুমি দেখবে পৃথিবীর নানা ভূখণ্ডের চিত্র। যেন একটা ফুলের বাগান। এদেশে আমরা যেমন পারস্পরিক সহাবস্থান করি তেমনি নিজেদের ফেলে আসা দেশের সংস্কৃতিও বিনিময় করি। গতিশীলতা এবং সহনশীলতার এমন নিদর্শন আর কোথায় পাবে, বল? প্রোডাক্টিভিটির দিক দিয়ে তাই ইউএস শীর্ষে। মজার ব্যাপার হল আগে তোমাদের দলে একজন ভারতীয় ছিল, আজ থেকে দুজন হলাম। আমাদের এই দলটি প্রকৃত অর্থেই এ মহান দেশের একটি প্রতীকী সংস্করণ। এবং আমি দৃঢ় ভাবে বিশ্বাস করি আমাদের এই অভিযাত্রা একটি সুন্দর অভিজ্ঞতা হয়েই থাকবে। তোমাদের সবাইকে ধন্যবাদ’।…

মিটিং শেষে প্রত্যেককেই বেশ হৃষ্টচিত্ত মনে হল। লোকটি কথা বলে চমৎকার, মুগ্ধ হয়ে শুনতে হয়। তবুও একটি বিষয়ে আবিদের খটকা রয়েই যায়। ভেংকটেশ বলল তাদের দলে দুজন ভারতীয়। তার জানা মতে আর কোন ইন্ডিয়ান নেই ওদের দলে। ভেংকটেশ আসাতে সে-ই প্রথম সংযোজন। কিন্তু দ্বিতীয় ব্যাক্তিটি কে? তবে কি আরও কেউ আসছে নাকি? হবে হয়তো, কে জানে। আসলেই কী আর না আসলেই বা কী? তাতে তার কিছুই যায় আসে না। কিন্তু ওর চিন্তাটা উসকে দিলো ড্যান। লাঞ্চ ব্রেকে দুজনে একসাথে বসে কফি খাচ্ছিল। ড্যান বেশ রসিকতার ছলে বলে, তোমাদের দেশের মানুষকে আমার কাছে একই রকম লাগে, বিড। আলাদা করতে পারি না।

– কী রকম? অবশ্য প্রথম প্রথম এদেশে এসে আমারও একই দশা ছিল। এখন বেশ চিনে যাই। কিন্তু তোমার এটা মনে হল কেন?

– এই যে মিঃ ভি আর তুমি তো একই দেশ থেকে এসেছ। দেখতেও প্রায় একই রকম। প্রথমে দেখলে মনে হয় তোমরা যেন যমজ ভাই, হা হা হা।

– আরে দূর, কী যে বল না তুমি ড্যান! আমাদের মাঝে কোন মিলই নেই। আমি তার থেকে কমপক্ষে আধ হাত লম্বা। তার চুলে পাক ধরেছে, সে চশমা পরে, আমি পরি না। তার গোঁফ আছে, আর আমার ময়দান সাফ। কতো পার্থক্য!

– তবুও, তোমাদের দেশের মানুষকে আমার কাছে একই রকম মনে হয়। বিদেশের মাটিতে একই দেশের বস পাওয়া কিন্তু বেশ সৌভাগ্যের বিষয়, কি বল?

– হা হা হা, ভালো বলেছ। ওয়েট অ্যা সেকেন্ড, আমরা কিন্তু একই দেশ থেকে আসি নি। দু’জন দু দেশের। হি ইজ ফ্রম ইন্ডিয়া এন্ড আই অ্যাম ফ্রম বাংলাদেশ, এ নেইবারিং কান্ট্রি অফ ইন্ডিয়া।

– ও, তাই নাকি। কিন্তু মিঃ ভি যে বলল তোমরা দুজনেই একই দেশ থেকে এসেছ! তুমি কি খেয়াল করনি? সে কি জানে না যে তুমি অন্য দেশের?

কথাটি ঝাঁ করে মাথায় ঢুকে যায় ওর। বুঝতে পারে ভেংকটেশ আসলে তাকেও একই দেশের ঠাওরেছে। তবে কি ব্যাঙ্গালোর আর বাংলাদেশেই এই গুবলেট? তার অস্বস্তি লাগতে থাকে। পরে কখনো ব্যাপারটা খোলাসা করে নিলেই হল, সমস্যা কোথায়? অথচ, সে চিন্তা থেকে আবিদ সহজেই মুক্তি পায় না। ব্যাঙ্গালোরে নয়টি ইংরেজি অক্ষর আর বাংলাদেশে দশটি। তার মাঝে সাতটিতেই মিল, কমন অক্ষর। হলেও তো উচ্চারণে কতো ফারাক। আর মিটিং-এর শুরুতেই তো সে বলেছে যে সে বাংলাদেশ থেকে এসেছে। একবারও বলে নি ‘ব্যাংলাডেশ’। তবে এই সংশয় কেন? তাহলে কি ভেংকটেশ বোঝে নি ওর কথা? নাকি সে ইচ্ছে করেই অমনটা করেছে? এতো দিনেও ওর ইংরেজি উচ্চারণ কি তবে ঠিক হয় নি? কাজের সবাই কিন্তু ঠিকই বোঝে ওর কথা। নিকোলস প্রায়ই বলে, ‘হেই বিড, ইউ স্পিক ভেরি ওয়েল। ইয়োর ইংলিশ ইজ জাস্ট পারফেক্ট, ডুড। আই ওয়ান্ডার ইফ ইউ হ্যাড টু স্পিক ইংলিশ ইন ইউর কান্ট্রি!’ এই ধরণের প্রশংসা বাক্য প্রায়ই শোনে সে। তবু আজ আবিদের অস্বস্তি কিছুতেই কমছে না।

সপ্তাহের অন্যান্য রাতে আবিদ জলদি জলদি ঘুমিয়ে পড়ে, কেবল শুক্রবার ছাড়া। শুক্রবার রাতে সে নিজের কিছু কাজ করে। গরমের সময় গ্যারাজ সাজায়। সাইকেলগুলো পরোখ করে দেখে- সব ঠিক আছে কিনা। গত প্রায় এক যুগ ধরে এমএস ১৫০ সাইকেল র‍্যালিতে অংশ নিয়ে আসছে সে। এই আয়োজনে তার নেশা ধরে গেছে। না গিয়ে পারে না। কিন্তু সে তো সামারের শুরুতে। এখন সে পর্বের মুলতবি। পরের বছরের জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া আর কিছুই করার নেই। এখানকার গরমের সময়টা এতো ছোটো! 

তবুও আবিদ বসে থাকে না। এই সময়গুলোতে, সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে, সে তার বন্দুক গুলো পরিষ্কার করে। ওর একটা টিম্বার ক্ল্যাসিক মারলিন থ্রিথ্রিসিক্স-সি, আরেকটা নাইন এমএম টরাস হ্যান্ড গান আছে। মারলিনটি সে হরিণ শিকারে ব্যবহার করে। এটি আসলে কিছুটা মৌসুম নির্ভর, সবসময় দরকার পড়ে না। তাই মাঝে মাঝেই পরিষ্কার করে সে। এই যেমন আজ করছে। পাশাপাশি পিস্তলটিও মনোযোগ দিয়ে পরিষ্কার করে। যদিও তার তেমন দরকার হয় না। এই যন্ত্রটি তার অতি প্রিয়, সবসময় সাথে সাথে রাখে। প্রায় প্রতি উইকএন্ডেই অনুশীলনে যায়। বেশ পুরনো হয়ে গেছে। স্প্রিঙটা বুঝি কিছুটা ঢিলে হয়ে গেছে। মেলা দিন ব্যবহার করেছে সে। বদলানো দরকার। বাজারে কতো যে সুন্দর সুন্দর জিনিস এসেছে, দেখলেই কিনতে ইচ্ছে করে। অথচ পুরনো টরাসের জন্য ওর মনটা কেমন যেন করে। আশ্চর্য, একটা পুরনো অস্ত্রও বুঝি পেছন থেকে খামচে ধরে!

আরেকটি বিশেষ কাজ করে সে। কিছুটা ছেলেমানুষি খেয়াল যদিও, তবু করে। নিয়ম করেই করে বলা যায়। আর তা হল, পত্রিকার পাতায় উপর-নিচে, পাশাপাশি চৌকোণা ঘরের শব্দ মেলানো। এ কাজটি সে করে আজ বহুকাল। দেশে থাকতে বাংলা পত্রিকা পেত, মনের সুখে সেটা করতে পারতো। কিন্তু এখানে এসে তো তা সম্ভব হয়নি। সে নেশার জন্য সে তাই  ইংরেজি পত্রিকাতেই ঘাই মারত। পারুক বা না পারুক। এখন তো অন-লাইনে দেশের পত্রিকা চলে আসে হাতের মুঠোয়। তাই তার হয়েছে বেজায় মজা। কিন্তু আজ কিছুতেই মেলাতে পারছে না সে। কেন পারছে না?

***

ধড়ফড় করে ঘুম থেকে জেগে ওঠে সে।

কিছুক্ষণ স্থির থেকে বোঝার চেষ্টা করে, সে কি কোন স্বপ্ন দেখছিল? নাকি এমনি এমনি ঘুম ভেঙে গেছে তার? কিন্তু কার্যকারণ ছাড়া তো কিছুই ঘটে না। একটা অস্বস্তি টের পায় সে। সেটা কি ঘুমোনোর আগে শব্দ না মেলানোর জন্য? সে তো নিছক খেলা! নাকি অন্য কোন কারণ আছে? কোন পুরনো ভাবনা হয়তো ওর মনের গভীরে প্রোথিত হয়ে আছে। কিছুতেই সে রহস্যের কিনারা করতে পারে না। তবে বোঝে, ঘামে বিছানাটা ভিজে একাকার।

গায়ের গেঞ্জিটা খুলে বিছানা থেকে উঠে গিয়ে বেশি বরফ দিয়ে এক গ্লাস পানি খায়। অন্ধকার লিভিং রুমে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকে আবিদ। ঠাণ্ডা গ্লাসে চুমুক দেবার সময় ডান হাতের তর্জনীতে কেমন একটা তীক্ষ্ণ টনটনে ব্যথা অনুভব করে। এটা কেন? আবছা আলো আঁধারের জন্যই কিনা কে জানে- সে যেন শোনে, অজুত- নিজুত কাকের কর্কশ গলা। ইলেক্ট্রিকের তারে বসে তারস্বরে ডেকে যাচ্ছে। বিরাম নেই। আকাশ জুড়ে কালো কালো মেঘ। সে মেঘ বুঝি তার মাথার ভিতর। মেঘে মেঘে শব্দরা ভেসে যাচ্ছে। সে যেন কিছুতেই ধরতে পারছে না।

তবে কি সে সত্যি সত্যি স্বপ্ন দেখছিল? তা সে দেখলেই বা কী? লোকে বুঝি আর খোওয়াব দেখে না? বিষয়টা নিয়ে ভাবা দরকার। আগে হলে ফস করে হয়তো একটা সিগারেট ধরিয়ে বসতো। কিন্তু প্রকৃত ধূমপান সে ছেড়ে দিয়েছে বহুকাল। এখন সে ই- সিগারেটে অভ্যস্ত। নাহ, এখন আর ওসবে যাবে না সে। এক কাপ কফি বানিয়ে খাবে নাকি? সে চিন্তাটাও বাতিল করে দেয় আবিদ। তার যুক্তিবোধ কাজ করতে শুরু করেছে।এই শেষ রাতে খুটুস খাটুস শব্দে তিথি উঠে যেতে পারে। তখন হাজার প্রশ্নের জবাব দিতে হবে তাকে। তারচেয়ে চুপচাপ মটকা মেরে পড়ে থাকলে ঠিকই একসময় ঘুম এসে যাবে। আর ঘুম না এলেও সমস্যা তো নেই। শুয়ে শুয়ে ঘুম ভেঙে যাবার কারণ নিয়ে ভাবা যাবে। কাল তো শনিবার। জলদি ওঠার তাড়াও তো নেই।

অথচ বিছানায় এসে দেখে তিথি জেগে গেছে। চোখ খুলে ওর দিকে পাশ ফিরে শুয়ে আছে। আস্তে আস্তে ওর বুকে হাত বুলাতে বুলাতে বলে, ঘুম ভেঙে গেল?

আবিদ অস্ফুট গলায় বলে, হুম।

– কোন বাজে স্বপ্ন দেখছ?

– জানি না। কেমন অস্বস্তি বোধ হচ্ছে। হঠাৎ করে বেশ পানি পিপাসা পেলো। গরমও লাগছিল বেশ। বাট দিস ইজ অলরেডি অক্টোবর, গরমের বালাইই নেই।

– তোমার আসলে ডিয়ার হান্টিং-এ যাওয়া উচিৎ। কবে থেকে সিজন শুরু?

– নেক্সট উইক।

এরপর আর কথা হয়না ওদের মাঝে। দুটো মানুষ প্রায় পুরোপুরি দুটো আলাদা অনুভূতি নিয়ে পাশাপাশি চুপচাপ নিথর হয়ে পড়ে থাকে। তিথি দেখে জানালার বাইরের ফটফটে পরিষ্কার আকাশ। সেখানে কৃষ্ণপক্ষের ক্ষয়ে যাওয়া চাঁদ। তারই হলদেটে আলো জানালা গলে ঘরে ঢুকে পড়েছে। আর আবিদ যেন টের পায় অজুত নিযুত পাখি চারপাশে ডানা ঝাপটাচ্ছে। অথবা সেটা বুঝি তার মাথার ভিতরেই। যেন সে পক্ষীুকুল অনবরত ডেকে চলছে। অদ্ভুত শব্দ আর আলোর খেলা । বাকি রাতটা ওরা দুজনের কেউই ঘুমোতে পারে না।

(২)

সন্তু একটা কেবিন বানিয়েছে নর্থ শোরে।

জায়গাটা সে কিনে রেখেছিল বেশ ক’বছর আগেই, মন্দার কিছুদিন পরপরই। তখন জমির দাম বেশ কমে গিয়েছিলো। সন্তু হিসেবী ছেলে। প্রায় জলের দামে নর্থ শোরে হাজার শতাংশের জমি কিনে ফেলে। আসলে জঙ্গলের ভিতরেই জায়গাটা। প্রথম প্রথম যখন এসেছে, গা ছমছম করতো। সন্তুকে আবিদ বলেছিল, এ জায়গার দাম বাড়বে ভবিষ্যতে, দেখে নিয়ো। লেক সুপেরিওর থেকে তো তেমন দূরে নয়।

কলিন্স, ডেভিড, রশিদ, রেহান-অনেকেই সাহায্য করলেও মূল কাজটা ওরা দুজনেই করেছে।। সে সময়টাতে বেশ মজা হতো। এমএস১৫০-এর উৎসব শেষ হবার পর থেকে প্রায় প্রতি শুক্রবার রাতে ক্যাম্পিং-এর জিনিসপত্র নিয়ে চলে আসতো। তখন অবশ্য কেউই বউ-বাচ্চাদের আনত না। প্রকৃতির অতটা প্রতিকূলতা ওরা হয়তো সইতে পারতো না। দুদিন কাজ করতো আর নিজেরাই রান্নাবান্না করে খেত। ডেভিড মাছ ধরাতে ওস্তাদ। নির্মেঘ তারা জ্বলা রাতে সেসব মাছ ঝলসে খেয়েছে ওরা, দারুণ মজা।

আজ এসেছে হরিণ শিকারে। সন্তুর কেবিন থেকে প্রায় তিরিশ মাইল দক্ষিন-পশ্চিমে। ওর কেবিনের আশেপাশে তেমন হরিণ দেখা যায় না। এ জায়গাটাতে বরং ভালুক আর নেকড়ে বেশ চোখে পড়ে। গতবার এসে ওর কেবিনের পেছনে ভালুকের এত্ত বড় একটা শুকনো বিষ্ঠা দেখেছে। সন্তু চেনে নি। কী না কী ভেবেছে। আবিদই একটা লম্বা লাঠির আগায় ওটাকে উঁচুতে ধরে বলেছে, ‘উহা মহান ভল্লুক মহাশয়ের প্রকাণ্ড শুকনা হাগু। সাইজ দেখেছো, হা হা হা’।

আজ শিকারে যদি কিছু মেলে তবে সাথে সাথেই তা বানিয়ে ফেলবে। তারপর সোজা ফিরে যাবে ম্যাপল গ্রোভ-এ, সন্তুর বাসায়। আবিদের বাসা গোল্ডেন ভ্যালি, কাছেই। ১৫-২০ মিনিটের ড্রাইভ। সে ভেবে দেখেছে ভালো সাইজের‘হোয়াইট টেল বাক্স’ পেলে দু পরিবারের আগামি মাস খানেক চলে যাবে। আর দুটো হলে তো কথাই নাই। তবে চিন্তার বিষয় হল গত দু’বছর তেমন ভালো হরিণ শিকার হয়নি। ‘তবে কি রিসিশনের প্রভাব এদের মাঝেও পড়েছে? কে জানে’। রসিকতা করে সন্তু এটা বলে। কথাটা ভেবে ওর হাসি পায়।

ব্রেকফাস্ট করে ধীরে সুস্থে বেলা করে বেরিয়েছে ওরা। সন্তু জানতে চায়, আবিদ ভাই বেরোতে বেরোতে একটু দেরি হয়ে গেলো না? আমার তো মনে হয় আরও একটু সকাল সকাল বেরোলেই হতো।

– উহু, একদম পারফেক্ট টাইমেই বেরিয়েছি। শোন, হরিণ হল প্রচণ্ড পরিমাণ স্ট্যাটিস্টিক্যালি এনালাইটিক্যাল একটা জন্তু।

– স্ট্যাটিস্টিক্যালি এনালাইটিক্যাল! হা হা হা, ভালোই বলেছেন।

– উহু, হাসির কথা নয়। খুব ভালো করে দেখো এই যে চারপাশের বিশাল নির্বাক প্রকৃতি, তা কী শেখায় আমাদের? কোন ভাষা ছাড়াই কিন্তু অনেক শিক্ষা দেয়। সবচেয়ে ভালো শেখায় অ্যাডজাস্টমেন্ট করার তরিকা। বেঁচে থাকার কায়দা। ‘সারভাইভ’ কথাটা তুমি প্রায়ই বল। প্রকৃতি আসলে আমাদের সারভাইভ করার পথই বাতলে দেয়।

– কী রকম?

– এই যেমন ধরো, হরিণ তো আর বাঘ কিম্বা ভালুকের মতো হিংস্র না। সে তার নিজের পদ্ধতি নিজেই বের করে নেয়। সকাল ১০টা থেকে দুপুর ২ টা পর্যন্ত মানুষ লাঞ্চ করে। ওরা ঠিকই জানে এ সময়টাতে ওদের মারা পড়ার সম্ভাবনা বেশ কম। জাস্ট ইমাজিন, হরিণও ট্রেন্ড আর প্রব্যাবিলিটি থিওরি ফলো করে। সে জন্যে ওরা ঠিক এই সময়টাই বেছে নেয় বাইরে বেরোতে। তাই আমার হিসেবে এটাই একদম মোক্ষম সময়।

– কী করে যে এতো সব জানেন আবিদ ভাই!

– হা হা হা। জানি, কারণ, এতে আমার ব্যাপক ইন্টারেস্ট। তোমার যেমন জাভা প্রোগ্রামিং-এ। আমার এটাতে। আমি শালা চাকরি করি কেবল পেটের ভাত জোগানোর জন্যে। তা নাহলে কবেই ওই চাকরির খ্যাতা পুড়ে দিতাম। ভাগ্যিস এই শিকারে রেগুলার আসি, তা না হলে কখন কী করে বসতাম কে জানে। কিছুদিন পর পর তিথিই আমাকে ঠেলে পাঠায় হান্টিং-এ। আমি নিশ্চয়ই এজিটেটেড হয়ে পড়ি। নিজে তো ঠিক বুঝি না চেঞ্জ গুলো, ও বোঝে।

– এবার কী এজিটেশন দেখা দিলো?

– আছে। কাজ নিয়ে একটু অস্বস্তিতে আছি । একটা খটকা বুকের মাঝে বিঁধে আছে, পরে বলবো।

সন্তু অবাক হয়ে দেখে আবিদের কথা সত্যি সত্যি ফলে গেলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই ওরা একটা বাক্স ফেলে দেয়। সে-ই মেরেছে ওটা, আবিদের বন্দুক দিয়ে। যদিও ওর একটি টার্গেট আগে ফসকে গেছে। আবিদ হলে এক গুলিতেই শুইয়ে দিতো। ওর টার্গেট মারাত্মক! গুলি লাগার পর হোয়াইট-টেলটা অদ্ভুত ভঙ্গিতে একটা লাফ দিয়ে একটু এগিয়ে গিয়ে ধুপ করে শুয়ে পড়ে। অনেকটা নতুন জলের মাছের মতো। দেখে দারুণ রোমাঞ্চ হয়। গুলি লাগার পরের কাজ গুলো দ্রুত করতে হয়। গাড়ি খুব একটা কাছে পার্ক করেনি ওরা। প্রায় মাইল খানেক গভীরে চলে এসেছে। ওদের দুজনের পকেটেই লোডেড টরাস রয়েছে। বিপদে পড়লে সটান চালিয়ে দেবে। সেইফটি লক পর্যন্ত খোলা। গভীর জঙ্গলে ঢুকে গেলে একটা ঝামেলা হয়। ঠিক মতো পথ খুঁজে গাড়ির কাছে ফেরা মুশকিল হয়ে পড়ে। ফোনের নেট ওয়ার্ক ঠিক মতো কাজ করে না। প্রায়ই সিগন্যাল হারিয়ে ফেলে। তখন বিপদ হয়, রাস্তা হারানোর সম্ভাবনা থাকে। তাই একধরণের স্পেশাল জিপিএস এনেছে সাথে করে। প্রায় ষোল ঘণ্টা ব্যাটারিতে চার্জ থাকে। দেখতে অনেকটা এন্টেনা ওয়ালা সেল ফোনের মতো। গাড়ির জায়গাটাকে ফেরার জায়গা ধরে ওরা গভীরে চলে এসেছে। এখন আর হারানোর ভয় থাকলো না। কিন্তু, আরও একটা ভেজাল আছে। এই হরিণ নেওয়াটা একটা মহা ফ্যাসাদের বিষয়। যতদূরে যাবে, তত বেশি বয়ে নেবার মাশুল। আর গুলিতে হরিণ না পড়ার আগে ঠিক ঠাওর করা কঠিন কতো বড় ওটি। যত বড়, বয়ে নেবার ঝক্কি তত বেশি। তবে সন্তুকে তেমন কিছুই করতে হয় নি। আবিদ অনায়েশে ওটিকে ওর কাঁধে তুলে নেয়। বর্ষাতির মতো একটা ট্রাক সুট পরে আছে সে। হরিণের গা থেকে টপটপ করে রক্ত ঝরে। সে রক্ত আবিদের বর্ষাতিতে আটকে থাকে। সন্তু অস্ত্র আর জিপিএস হাতে পথ দেখায়।

কেবিনে ফিরে আসার পর চলে আবিদের তেলেসমাতি। চ্যারচ্যার করে চামড়া ছাড়িয়ে ফেলে। দেখলে মনে হবে যেন তার পূর্ব পুরুষ কসাইয়ের কাজই করতো। ফিটেড গেঞ্জির বাইরে ওর হাতের পেশি গুলো কিলবিল করে ওঠে। হরিণের গা থকে চামড়া ছাড়ানো এবং মাংস বানানো একটা প্রসারিত কর্মযজ্ঞ। অথচ দুজনে মিলে খুব অল্প সময়েই পুরো জন্তুটি সাইজ করে দেয়। কাজ শেষ করে দুজনে মিলে বারান্দায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সিগারেট ফুঁকছে। আবিদেরটা ই- সিগারেট। সন্ধ্যা হতে তেমন বেশি দেরি নেই। তাড়াতাড়ি ফেরা দরকার। আবিদ বলে, সন্তু তুমি জিনিসপত্র গুলো একটু গুছিয়ে ফেলো। আমি ফোন করে রিপোর্ট করি যে আমরা একটা বাক্স মেরেছি।

সন্তু মোটামুটি গুছিয়ে ফেলেছে। কিন্তু আবিদ এখনো আসছে না কেন? ঠিক এ সময় সে গুলির আওয়াজ শোনে, পর পর দু’বার। গম্ভীর এবং তীব্র। সুনসান নর্থ-শোরের গাছে গাছে প্রতিধ্বনিত হয় সে শব্দ। সন্তু দৌড়ে বেরিয়ে আসে। খুব কাছে হয় নি শব্দটি। আবিদ ভাই কোন মানুষকে ফেলে দিয়েছে কি না কে জানে। ট্রেস প্যাসিং এখানে নিষিদ্ধ। আবিদ ভাইয়ের মাথা একটু গরম আছে। স্কুল জীবন থেকেই দেখে এসেছে। সে ছিল আবিদের এক ব্যাচ জুনিয়র। সন্তুর মনে আছে, ক্লাস নাইনে থাকতে আবিদ ভাইয়েরা টেনের বড় ভাইদের পেটাল। টেস্টের পর প্রবেশ পত্র নেবার দিন ছিল সেটা। বিকেলে আবার ওদের ক্লাসে এসে আবিদ ভাই ছোটো খাটো ভাষণ দিয়েছিল। সে ভাষণে ছিল একধরণের হুমকি। ওরা যা করেছে সেরকম যদি ক্লাস এইট করে তবে গল্প অন্যরকম হবে। বক্তৃতার ফাঁকে ফাঁকে প্রায়ই তার হাত চলে যাচ্ছিলো বাঁ কোমরের কাছে। কেউ বলে না দিলেও কারো বুঝতে অসুবিধা ছিল না, ওটি আসলে একটি পিস্তল। সেদিন আবিদ ভাইয়ের সাথে অন্যান্যদের মধ্যে ছিল বিজয় দা, আবিদের জানে জিগার।

আজ কী হল কে জানে! দৌড়ে বেশ দূরে নিচে নেমে এসে যে দৃশ্যটা দেখে এবং তার জন্য সে মোটেই প্রস্তুত ছিল না। দেখে, আবিদ ওর কালো টরাস পিস্তল্টা হাতে ধরে আছে। ওর চোখে এক ধরণের রাগ এবং শঙ্কা। খানিক দূরে একটা পাখি ঝাপটাচ্ছে। আবিদের চোখে তখনো আগুন, আরেকবার ট্রিগার টিপবে এমন। দৌড়ে গিয়ে সন্তু বলে, ওটা একটু পরেই মরে যাবে। আর গুলি করার দকার নেই আবিদ ভাই।

ধীরে ধীরে আবিদ হাতটা নামিয়ে আনে। বড় ডানার হক পাখিটি নিথর হয়ে পড়ে থাকে। অনেকটা ঈগল পাখির মতো। কিন্তু এই পাখি এখানে কেন? সেদিকে তাকিয়ে সন্তুর মনটা খারাপ হয়ে যায়। সে শোনে আবিদ বলছে, তোমার কেবিনের পাশে সিগন্যাল পাচ্ছিলাম না, তাই এদিকটায় নেমে এলাম। এসেই শালা এটার সামনে পড়ে গেলাম। আমার দিকে ট্যাঁ ট্যাঁ করে তাকিয়ে ছিল। ডালে বসে ডানা ঝাঁপটাচ্ছিলো, আমার তো আত্মা খাঁচা ছাড়া। দিলাম পণ্ডিতি বের করে।

সন্তুর ভালো লাগে নি বিষয়টি। কিন্তু কিছু বলে না। ফেরার সময় সে-ই গাড়ি চালায়। আবিদ পাশের সিটে বসে অভ্যস্ত হাতে ওর ছোট্ট কালো হ্যান্ডগানটা মুহূর্তের মাঝে খুলে ফেলে। তারপর নিজের মনেই বিড়বিড় করে বলে, ‘স্প্রিং-টা গেছে একেবারে। ট্রিগার টিপলাম তিনবার, অথচ গুলি বেরোল দু’বার! ব্যপারটা ডেঞ্জারাস। এনিথিং কুড হ্যাপেন ইন বিটউইন দিস টাইম। আই কুড গেট কিল্ড!’ তারপর চুপচাপ বসে থাকে। আর কোন কথা বলছে না। সন্তু বলে, পাখি দেখলেই আপনার কী হয় আবিদ ভাই?

– জানি না। মাথাটা আওলা হয়ে যায়। লজিক কাজ করে না। ভয় আর রাগ মিশে একটা থার্ড কাইন্ড অফ ফিলিং ডেভেলপ করে। হাতের কাছে বন্দুক থাকলে দূর থেকে দ্রিম দ্রিম চালিয়ে দিই। সমস্যা হয় কাছে যখন বন্ধুক না থাকে। হাত পা ঘামতে থাকে তখন, অসহায় লাগে খুব।

– আশ্চর্য, যে লোকের কথা শুনলে একসময় ধানমন্ডি-লালবাগের লোকজন থরথর করে কাঁপত সে কিনা সামান্য পাখি দেখলে ভয় পায়! স্ট্রেঞ্জ! জগতে কতো আজব বিষয় যে আছে।

– হুম। কী আর করা।

– কবে থেকে আপনার এই ভয়ের শুরু মনে আছে?

– সেটা ঠিক জানি না। তবে পাখিতে যে আমার ভয় সেটা বুঝছিলাম ২৪ মার্চ, ১৯৮২ সাল। তারিখটা এখনো মনে আছে।

– বাপরে, একেবারে দিন তারিখ সুদ্ধ মনে আছে! কোন স্পেশাল দিন ছিল নাকি, আবিদ ভাই। হা হা হা।

– হুম, কারণ সেদিন স্কুল জলদি ছুটি হয়ে গিয়েছিল। আমরা তখন লক্ষ্মীবাজারে থাকতাম। সেদিন আকাশে অনেক মেঘ জমেছিল। রাস্তার উপরের তারে বসেছিল হাজার হাজার কাক। যেন সেদিন পুরো ঢাকা শহরের সব কাক এসে জড়ো হয়েছিল পাতলাখান লেনের উপর। সেদিনই তো এরশাদ সাহেব ক্ষমতা দখল করলেন। ছোটো মামাকে সে রাতেই একটা বন্দুক আনতে বলেছিলাম আমি। জানো, ওটা হাতে নিয়ে কোথায় কোথায় দাবড়িয়ে বেড়িয়েছি তার কি ঠিক আছে কোন। দূর থেকে কোন পাখি দেখলেই হল, টকাস করে এয়ারগানের দস্তা সোজা ওদের বুকে বসিয়ে দিতাম। পাখিগুলো ধড়ফড় করে খানিক পরেই মরে যেতো। আমি ওগুলোর কাছেও ঘেঁষতাম  না কখনো। বুকের মধ্যে কেমন যেন একটা অনুভূতি হতো- ঠিক মালুম হতো না। কেবল কখনো কোন চিল মারতে পারি নি। একটা আফসোস তাই রয়েই গেছে। দূর আকাশে কালো ঘুড়ির মতো চক্রাকারে ঘুরতে থাকে ওরা। কিছুতেই নাগালে পাওয়া যায় না । কিন্তু কী আশ্চর্য, নিজের প্রয়োজনে আকস্মিক ছোঁয়ে চিল তার আধার ঠিকই ছিনিয়ে নেয়। আর সে জন্যে দরকার হলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, দিনের পর দিন আকাশে ঘুরতে থাকে। আরও একটা কারণে দিনটি আমার বিশেষ ভাবে মনে আছে।

–  কী সেটা?

–  ঐ হাজার হাজার কাকের মাঝে একটা আবার কিছুটা বিটলা কিসিমের। ঠোঁটে রিক্সার স্পোক নিয়ে একদম তারের শেষ প্রান্তে বসেছিল। ধাতব সরু কাঠি নিয়ে কাকটি কী করবে ঠিক বুঝে পায় না। অস্থির ভঙ্গিতে নড়াচড়া করছে। শুনেছি কাকের বাসা নাকি কী সব হাবিজাবি রাজ্যের জিনিস দিয়ে বানানো। দেখি, চঞ্চল পাখিটি অনর্থক মাথা নাড়াচ্ছে। আর তার সাথে সাথে সেই ধাতব স্পোকটিও এদিক ওদিক নড়ছে। হঠাৎ আচমকা ঝুলন্ত দুটো তারের কোণায় ধাতব কাঠিটা লেগে যায়। আর তাতেই হয় বিপত্তি। মুহূর্তে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে যায় কাকটি। ‘বুম’ বিকট শব্দ করে ট্রান্সফরমারটি জ্বলে যায়। একটু সরে এসে সে দেখি ঝলসে যাওয়া কাকটি মরার আগে উড়তে চাইছে। পারছে না, ঝপাৎ করে আমার গায়ে এসে পড়ে। উহ, কী বাজে গন্ধ! পুরো ব্যাপারটাই এতো দ্রুত ঘটে যে ঠিক মতো সামলে উঠতে পারি না।

সন্তু কৌতুহলী হয়ে ওঠে। বলে, আপনার অপোন্যান্টরা যদি জানতে পারতো যে পাখিতেই আপনার প্রান ভোমরা, তবে কবেই ফিনিশ করে দিতো। সবারই কোথাও না কোথাও একটা উইক পয়েন্ট থাকে, কী বলেন? 

– দেশে থাকতে সে কথা মাত্র একজনই টের পেয়েছিলো। আর কেউ না?

– কে সেটা?

– দুর মিয়া, সাংবাদিকের মত অতো কথা জিগাও ক্যান? গাড়ি চালাও, আমি সেই ফোনটা করি। তখন তো রিপোর্টটা করা হয়নি।

আবিদ আর কিছু বলে না দেখে সে বলে, আপনার এটা একটা ফোবিয়া কিন্তু আবিদ ভাই। ইউ নিড টু সি অ্যা ডক্টর।

– কী বল মিয়া? ফাজলামো কর।

– নো, আই অ্যাম কোয়াইট সিরিয়াস। আই ডিড সাম রিসার্চ অন দিস ম্যাটার আরলিয়ার। ইটস কল্ড, অরনিথো-ফোবিয়া- ফিয়ার অফ বার্ডস।

সন্তুর মনে হল না আবিদ খুব মনোযোগ দিয়ে শুনছে তার কথা। সে হাতের ফোনের বোতাম টিপে রিপোর্ট করছে। একাজটি তখন করা হয়নি। হরিণ মারাটা রিপোর্ট করলেও পাখি মারার কথাটা বেমালুম চেপে যায় সে।

সন্তু দেখে লেক সুপেরিয়রের ওপাশে সূর্য হলদেটে কমলা হতে শুরু করেছে। লেকের পানি অপূর্ব নীল।  দূর থেকে আকাশ ও লেকের সীমানা ঠিক বোঝা যায় না। তাই আরও প্রকাণ্ড মনে হয়। সে বর্ধিত আকাশের দিকে তাকিয়ে মন উদাস হয়ে যায়। প্রকৃতি এতো সুন্দর হতে পারে! সে একটা নিঃশ্বাস ফেলে। পাশে তাকিয়ে দেখে আবিদ বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। অদ্ভুত তো লোকটা! কিছু আগের অস্থিরতার বিন্দু মাত্র চোখে পড়ে না। কেমন শিশুর মতো কাত হয়ে ঘুমায়। সে মুখে কোন বৈপরীত্য নজরে পড়ে না। সে গ্যাসে চাপ বাড়ায়। ওর গাড়িটি লাফিয়ে লাফিয়ে ছুটতে থাকে।

(৩)

আজকের দিনটাকে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করে আবিদ।

বলা নেই কওয়া নেই মিস্টার ভি. হুট করে তাকে ফোন করে লাঞ্চে ডাকে। মিষ্টি মিষ্টি আলাপ করে। তেমন কোন কাজের কথা না। কেবল শেষের দশ মিনিট সে ঠিক বোঝে নি। লাজানিয়াতে কামড় দিতে দিতে ভেংকটেশ ওকে বলে, আবিদ তুমি কি কখনো তোমার পারফরমেন্স কম্পেয়ার করো?

– কম্পেয়ার? কার সাথে?

– এই যেমন ধরো, তোমার আজকের ড্যাটার সাথে গত সপ্তাহের, গত মাসের? তোমার পারফরমেন্সের সাথে অন্য সহকর্মীর?

– না, আর তাছাড়া অন্যের পারফরমেন্সের খবর আমি কী করে জানবো? সেটা আমার জানার কথাও নয়।

– কিন্তু আমি দেখি, আর তা অবশ্য আমার নিজের অবস্থানের কারণেই। সেখান থেকেই বলছি, আনফরচুনেটলি ইউ আর অ্যাট দ্যা বোটম। এমন না যে আমি বর্তমান তথ্যের ভিত্তিতে কথা গুলো বলছি। বরং প্রায় ছ’ মাসের হিসেব দেখেই বলছি। এন্ড দ্যাট মেক্স মি টু আস্ক ইউ দিস, হোয়াই?

আজকের মধ্যাহ্ন ভোজের রহস্য ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়ে ওঠে তার কাছে। সে কিছু বলে না। শোনে মিস্টার ভি বলছে, দেখো আমি ব্যক্তিগত ভাবে চাই তুমি ভালো করো, খানিক উপরের দিকে যাও। হাজার হলেও আমরা একই দেশের মানুষ। আমরাই যদি একজন আরেকজনকে না দেখি তো কে দেখবে, বল? কিন্তু তার জন্য নিদেন পক্ষে একটা স্কোপ তো থাকতে হবে, নাকি?

কথা গুলো সে হিন্দিতে বলে। তার আধা আবিদ বুঝতে পারে, আধা বোঝে না। তবে এটা ঠিকই টের পায় মিঃ ভি কী করে কথার জাল বিছাচ্ছে। শব্দ দিয়ে, কোলাহল ছাড়া, নিপুণ ভাবে। কী বলবে সে ঠিক বুঝে ওঠে না। সে কী বলবে, ‘আই উইল ট্রাই মাই বেস্ট টু গেট মি টু দ্যাট লেভেল’? নাকি বলবে, ‘গাইড মি স্যার’। সেসব কিছুই না বলে সে বলে, মিস্টার ভেংকটেশ তোমাকে ধন্যবাদ বিষয়টা সামনে আনার জন্য। দেখা যাক কী হয়। বাই দ্যা ওয়ে, আমি কিন্তু তোমার দেশের কেউ না। আমি এসেছি বাংলাদেশ থেকে। তোমার হয়তো বুঝতে ভুল হচ্ছে।

– আরে ইয়ার, বাঙ্গালাদেস ভি তো ইন্ডিয়া ম্যায় হ্যায়, না? ওহ দুস্রি মুলুক কাব সে। বিফোর সেভেনটি ওয়ান ইট ওয়াজ পার্ট অফ পাকিস্তান। লেকেন সেভেনটি ওয়ান সে হামলোক উসকো ভি হামারা দেস সামাঝতাহু। কই বাত নেহি।

আবিদ কিছুটা শক্ত ভাবেই বলে, না বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ। যদিও প্রতিবেশী হিসেবে ভারতকে পেয়ে আমরা আনন্দিত। অ্যা ওয়ে বেটার নেইবার দ্যান পাকিস্তান।

– ওয়েল, ইউ গাট্টা বি সিউর অফ দ্যা ফ্যাক্ট এন্ড হিস্ট্রি, ইয়ার। সেভেনটি ওয়ান ওয়ার ওয়াজ একচুয়ালি আওয়ার ফাইট এগেইন্সট পাকিস্তান। হা হা হা। ওকে উই উইল টক লেটার অ্যাবাউট দিস, বাডি।

আবিদ বোঝে ভেংকটেশ সেই প্রথম দিন থেকেই জানতো ব্যাপারটা। তা মোটেই মনের বা বোঝার ভুল নয়। দিনের বাকিটা সময় তার মাথা ঠিক মতো কাজ করে নি। একটা অস্বস্তি এবং বিরক্তির কাঁটা সেই থেকে বুকে বিঁধে আছে। কিছুটা রাগ, কিছুটা বিরক্তি। কিছুতেই দূর হচ্ছে না। এমন না যে, তার মাঝে প্রগাঢ় দেশপ্রেম রয়েছে। বরং সুযোগ পেলেই নিজেদের মাঝে আড্ডায় দেশের গুষ্টি উদ্ধার করে। কিন্তু আজ যে ভাবে মিঃ ভি কথাগুলো বলল, সে ঠিক মেনে নিতে পারে নি? কিন্তু কেন? কোন মতে পাঁচটা বাজতেই অফিস থেকে বেরিয়ে আসে সে। গোল্লায় যাক অফিস। বেরিয়ে এদিক সেদিক এলোমেলো ভাবে ঘুরলো। দেরি দেখে তিথি ফোন করে, কি ব্যাপার দেরি করছ যে? পথে কি খুব বেশি ট্র্যাফিক নাকি?

– নাহ, ট্র্যাফিক নেই। এমনি একটু ঘুরছি। তোমরা খেয়ে নিয়ো।

– আচ্ছা, ফেরার সময় এক গ্যালন স্কিমড মিল্ক নিয়ে এসে তো?

ফোনটা আবার বাজছে। গাড়ি চালাতে চালাতে আড় চোখে দেখে সন্তুর কল। সে গাড়ি চালাতে চালাতে ব্লু-টুথে কথা বলে, হেই হোয়াজ্জাপ?

– আবিদ ভাই আপনি কই?

– এই যে রাস্তায়, গাড়ি চালাই। কী খবর তোমার?

– কাম না থাকলে ডাউন টাউনের দিকে আসবেন নাকি একবার?

– এখন?

– হুম, আসেন একটা নতুন খাবার ট্রাই করি। কোয়াং নামে একটা ভিয়েতনামি রেস্টুরেন্ট আছে এখানে। আসেন ফো-গ্যায় খাই?

– কী গ্যায়?

– ফো- গ্যায়। হা হা হা।

– কই থেকে যে এইসব খাবারের খোঁজ পাও মিয়া!

– আসেন আসেন, আরেকটা মজার খবর আছে। আসলেই শুধু বলবো।

একটা না, আসলে দুটো খবর দেয় সন্তু তাকে। প্রথমটা বেশ চমকপ্রদ, মজার। সন্তু আজ ড্রাইভারি করেছে সারাদিন। মানে ভাড়ায় গাড়িচালক হয়েছে। বেশ ছুটি জমে গিয়েছিলো তার। সেগুলো না কাটালে নষ্ট হবে। এই মধ্য-সপ্তাহে বন্ধুহীন নর্থ শোরে যেতেও ইচ্ছে করে নি ওর। আবার বাসায় বসে থাকতেও মন চাইছিল না। কাল তাই ঘরে বসে বসে ‘উবার’ নামে এক বিশেষ অনলাইন ট্রান্সপোর্ট নেটওয়ার্ক-এ রেজিস্ট্রেশন করে ফেলে সে। আর কি আশ্চর্য, বিকেল থেকেই একের পর এক বুকিং আসতে থাকে। বিশেষ করে বিকেল বেলাটা অফিস ফেরতা লোকজনের ঢল নামে। তারা আর ট্যাক্সি সুবিধা পছন্দ করছে না। হাতের কাছেই স্মার্ট ফোনে অ্যাপ নামিয়ে নাও। রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে দাও, সময়মত গাড়ি এসে হাজির। পুরো ব্যবস্থাটাই চলছে একটা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে। গরম ফো- গ্যায়তে চপস্টিক ঢুকিয়ে সন্তু বলে, হেব্বি মজা আবিদ ভাই। আজ গাড়ি চালিয়ে সত্তুর ডলার কামালাম। বাসায় থাকলে কী করতাম, শুয়ে শুয়ে শুধু ঘুমাতাম। কোন এক্টিভিটি নেই। অথচ দেখেন, মুফতে কিছু পয়সা এসে গেলো পকেটে। টেকনোলজির কী দিন আসছে দেখেন তো! কদিন পর তো ট্যাক্সি ব্যবসাই পুরোপুরি উঠে যাবে। হা হা হা।

– তুমি এই সব খবর কোত্থেকে যে পাও বুঝি না।

– হা হা হা। আরে এখন খান তো। এইটা আমার আজকের রোজগার থেকে খাওয়াচ্ছি আপনাকে। অ্যা লট অফ অপরচুনিটিজ আর আউট দেয়ার। শোনেন আপনার সাথে আরেকটা কথা আছে।

– কী কথা?

– আমি ওয়েবসাইট ঘেঁটে দেখেছি, ফিয়ার অফ বার্ডের বেশ ভালো ডাক্তার রয়েছে এই মিনিয়াপলিসে। এরা আবার ভিন্ন পদের ডাক্তার। আপনার সাথে কথা বলবে, শুনবে আপনার কথা। তারপর উপায় বাতলে দেবে। ভেজাল নেই কোন। চাইলে আমি আপনার জন্য এপয়েন্টমেন্ট করতে পারি। কিম্বা আজই চলেন না যাই। দেখি না গিয়ে। কী বলেন? কিন্তু আপনার চেহারা এমন দেখাচ্ছে কেন? এনি প্রবলেম?

– না, তেমন কিছু না। আচ্ছা ভেবে দেখি কী করা যায়।

– এতে অত ভাবাভাবির কী আছে। সটান চলে যাবেন। ওরা আপনাকে দেখবে। ব্যস হয়ে গেলো। আপনাকে তো আর পে-ও করতে হচ্ছে না। অফিসের ইনস্যুরেন্স তা দেখবে। আপনি বলেন তো  ঘটনা? আমাকে বলতে পারেন। আর তাছাড়া বলার মতো এই বিদেশের মাটিতে আছেই বা কে?

আবিদ মোটামুটি সবিস্তারে তার অস্বস্তির কথাটা সন্তুকে জানায়। শেষে বলে, আজ যখন মিঃ ভি ওভাবে কথা গুলো বলছিল, আমার কেমন লাগছিলো জানো? ঠিক পাখি দেখার পর যেমন হয়, তেমন। এক মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিলো যাই শালা গাড়ির ড্যাশ-বোর্ডের নিচ থেকে মালটা এনে দু’ রাউন্ড চালিয়ে দেই মালাউনের বুকে। এটাকে কি বলবো, দেশপ্রেম? অথচ লক্ষ্য করে দেখো, আমাদের মাঝে কেউই ঠিক সে অর্থে বাংলাদেশকে মনে রাখিনি।সুযোগ পেলেই উল্টা দেশের বদনাম করি। উই আর বিইং অ্যা স্ট্রেঞ্জ স্পিসিস অন আর্থ, ট্রুলি উই আর। 

সন্তু দেখে আবিদের চোখে রাগ এবং ঘৃণার একটা আঁচ। ভয়ের জায়গাটা নিয়েছে ঘৃণা। রেস্তোরাঁ থেকে বেরিয়ে দুজনে সিগারেট ফুকে। আবিদেরটা যথারীতি ধোঁয়াহীন ই-সিগারেট। বাইরে তখন নভেম্বরের হিম রাত গুটি গুটি পায়ে নেমে আসে। ‘এবার বুঝি দেরিতে শীত আসছে!’- সন্তু বলে।

‘হুম’ বলে চুপ করে থাকে। তারপর, ‘আজ যাই, সন্তু। ভালো লাগছে না। আর এই শনিবার সকালে তোমাদেরকে বিফ দেবার কথা ছিল। ভাবীকে বল একটু দেরি হবে। সকালে দুটো গাড়ির অয়েল চেঞ্জ করার কাজ আছে। ওটা শেষ করেই দিয়ে যাবো।’ বলে ওর গাড়ির দিকে হনহন করে হাঁটতে থাকে। একবারও পেছন ফিরে তাকায় না।

অন্য যে কেউ দেখলে ব্যাপারটাকে রূঢ় ভাবতে পারে। কিন্ত সে আবিদকে চেনে দীর্ঘকাল।দেখে আবিদের গাড়ি অন্ধকারে আস্তে আস্তে মিলিয়ে যাচ্ছে। রাজপুত্রের মতো জীবন হবার কথা যার সে এই পরবাসে কেমন সংগ্রাম করে টিকে আছে! সপ্তাহান্তের দিনগুলোতে আবিদ বসে থাকে না। কিছু না কিছু টুকটাক করেই। বাঙালি কমিউনিটিতে গরুর মাংশ সরবরাহ করে। মাঝে মাঝে গাড়ির মেকানিকের কাজও করে। অথচ চাইলে অপার আনন্দের একটা জীবন কাটাতে পারতো সে। সেই জীবন সে বেছে নেয় নি। অনান্য ভাইবোন কিন্তু দিব্যি আছে। প্রত্যেকেরই বিপুল সম্পদ। নাহ, তা ওরা নিজেরা যতটুকু না অর্জন করেছে, প্রায় পুরোটাই মাজেদ সাহেবের কল্যানে। মাজেদ সাহেব, মানে আবিদের বাবা, মারা যাবার আগে নিপুণভাবে সব ভাগ করে গেছেন। আবিদের ভাগ্যেও পড়েছে। কিন্তু সে তা কিছুতেই ছুঁয়ে দেখবে না। এ বিষয়ে তার একটা সুদৃঢ় মতামত রয়েছে। পাপের অনলে হাত দিলে তা একদিন সবকিছু খাক করে দেয়। সে মনে করে, এই যে তার জীবনটা এমন বেপথু হয়ে গিয়েছিলো তা নিশ্চিতভাবেই মাজেদ সাহেবের স্খলিত জীবনের জন্যই। সন্তু মাঝে মাঝে জানতে চায়, সেটা কেবল আপনার বেলায়ই কেন হবে? আর সবাই তো বেশ আছে। আপনার ভাইবোন এবং তাদের ছেলেমেয়েরা দেখেন কেমন সাকসেসফুল!

আবিদ বলে, একটা পরিবারে একজনের সর্বনাশ হলেই তো হয়। একটা নৌকা ডুবার জন্য কি হাজারটা ফুটো লাগে? নজর এড়ানো একটা হলেই হয়। আমি হলাম সেই নজর এড়ানো প্রকাণ্ড ছ্যাদা। তবু তেমন দুঃখ নাই। বাচ্চাগুলো ভালো হচ্ছে। এর বেশি কিছু চাই না। শুধু একটা আফসোসই রয়ে গেছে। সেটা আর পূরণ হবে না।

– কি সেটা?

– আমি দেশ ছেড়ে আসার আগে বেলালকে একটা বুলেট দিয়ে এসেছিলাম। সেও মেলা আগে। তাও প্রায় কুড়ি বছর হবে। কথা ছিল কাউকে না জানিয়ে একবার গিয়ে সোজা উনার বুকে বসিয়ে দেব। বেলাল যত্ন করে রেখেও ছিল সেটা। অথচ তা আর হল কই। লোকটা মরে গেলো। তবে আমি কি করেছি জানো? দেশে গিয়ে উনার কবরে বন্দুক ঢুকিয়ে ট্রিগার টিপে দিলাম। তেমন শব্দ হয়নি কিন্তু। বুলেটটা ওখানেই আছে। ভেবে দেখো উনার মতো লোকের কবর হয়েছে বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে! হা হা হা।

সন্তুকে এসব কথা প্রায়ই বলে আবিদ। বাবার প্রতি তার ঘৃণা লেক সুপিরিওরের মতোই নিঃসীম । কোনই শেষ নেই যেন। বাইরের নিকশ রাতের দিকে তাকিয়ে সন্তু ভাবে, আমাদের প্রত্যেকের জীবন কতই না বিচিত্র।

(৪)

খবরটা শুনে খুশি হবে কি না ঠিক বুঝতে পারে না তিথি।

অনলের মেলা দিনের শখ ডিউক ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হবার। নাহ, কথাটা হয়তো পুরোপুরি ঠিক নয়। আসলে সে চেয়েছিল আইভি লীগের যে আটটা বিশ্ববিদ্যালয় আছে তার একটিতে পড়তে। সেই অনুযায়ী মিডিল স্কুল থেকেই সে ভিতর ভিতর তৈরি হচ্ছে। এসএটি-তে নম্বর বাড়ানোর জন্য প্রতিদিন সেই ভোরবেলা উঠে পড়তে বসে যায়। একদিনও তাকে ডেকে ওঠাতে হয়নি। ক্লাসের পড়া স্কুলেই শেষ করে আসে, যাতে ওকে বেশি রাত জাগতে না হয়। সকার খেলাতে সে স্টার খেলোয়াড়। টেনিসে স্কুল চ্যাম্পিয়ন। বেইজ বলেও দুর্দান্ত। এ ছাড়া কমিউনিটির কাজ তো রয়েছেই। চার থেকে পাঁচটা লিডারশীপ ক্লাবেও বেশ ভাল ভাবে যুক্ত। ওর স্কুলের শিক্ষকরা অনেক আশাবাদী । তাঁরা ভেবেছিলেন অনল সেই আটটি কলেজের একটিতে অন্তত ভর্তি হবার সুযোগ পাবে। কিন্তু সেটা যখন একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে ভেস্তে গেল, সে কিন্তু মোটেই মুষড়ে পড়েনি। পাশাপাশি অন্যান্য আরো বেশ কিছু ভাল ভাল কলেজে অ্যাপ্লাই করেছিল। ডিউক বিশ্ববিদ্যালয় ছিল টপ অফ দ্য লিস্ট। আজ সেটারই ‘ফর্মাল অ্যাকসেপ্টেন্স লেটার’টা পেলো সে।

অনল তো মহা খুশি। গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে যেতে চেয়েছিল। তিথিই দেয় নি। ওর তো এখনো আঠেরোই হয়নি। যদিও আবিদ ওকে অনেক আগেই গাড়ি চালানো শিখিয়েছে। মাঝে মাঝে মাকে পাশে বসিয়ে অনল ড্রাইভও করে। এদিক সেদিক যায়। তবে একা একা তিথি ছাড়ে না কিছুতেই। সে তাই এখন উপরে, ওর ঘরে বসে আছে। বাবাকে ফোন করে এখনো জানায়নি খবরটা। সেটা সে সামনাসামনিই দিতে চায়। এখন কি যেন একটা গেম খেলায় মগ্ন। মাঝে মাঝে খেলায় কিছু ভুলভাল হলে হা- হু করছে। অরাও পাশে বসে উত্তেজিত। নিচের রান্নাঘরে তিথি ধোয়া বাসন গুলো ডিস ওয়াসার থেকে মুছে মুছে তুলছে। ওদের উচ্ছ্বাসের টুকরো শব্দ এখান থেকেও দিব্যি শোনা যায়। কেমন সরল ওদের অভিব্যাক্তি! অথচ আর কদিন পরই তো অনল কলেজে যাচ্ছে। ওকে দেখলে কেউ কি বলবে সে কথা? নাকি এই ভাবনাটা মা হিসেবে কেবল তারই? কে জানে, হবে হয়তো। সন্তানেরা মায়ের কাছে কখনো বড় হয় বুঝি!

সে অবশ্য আরো একটি কলেজের অফার লেটারও পেয়েছে। পুরোপুরি স্কলারশিপ সহ। এই মিনেসোটারই মায়ো মেডিক্যাল স্কুলে। রচেস্টারের এই কলেজটিও টপ র‍্যাঙ্কড গুলোর মধ্যে একটি। ওদের বাসা থেকে ঘণ্টা খানেকের দূরত্ব। চাইলে প্রতি সপ্তাহে সে বাসায় আসতে পারবে। ওরাও হুটহাট গিয়ে দেখে আসতে পারবে ওকে। ইন-স্টেট সুবিধা তো থাকছেই। বলতে গেলে প্রায় বিনে পয়সায় পড়তে পারবে ওখানে। তবে সেদিকে অনলের মোটেও নজর নেই। সে উড়ছে ডিউকের হাওয়ায়।

কিন্তু আবিদ ফিরতে এতো  দেরি করছে কেন? আজকাল কোন কারণ ছাড়াই ওর বেশ রাত হয় ফিরতে। জিজ্ঞেস করলে বলে, কিছু না এমনিই। রাতের বেলা এদিক সেদিক গাড়ি চালাতে ইচ্ছে করে। মিনিয়াপলিস দেখতে দেখতে কেমন পাল্টে গেছে। সে তুমি দিনের বেলায় টের পাবে না। রাতে বের হলেই শুধু বোঝা যায়। স্ট্রিট লাইট গুলো এবারই পাল্টে দিয়েছে। উজ্জ্বল সাদা এলইডি  আলোর চারপাশে গোলাকার কুয়াশার অদৃশ্য আবরণ। দেখতে দারুণ লাগে। অথচ যখন প্রথম প্রথম এ শহরে এলাম পুরো ডাউন টাউনেই ছিল মিটমিটে বাতি।

– তা তুমি কি ওই বাত্তি দেখতে রোজ যাও ওখানে?

– হুম, আমার ভাল লাগে। এই টুইন সিটির অলিগলি আমার একদম মুখস্থ, ভীষণ পরিচিত। কিন্তু আশ্চর্য কি জানো, রাতের বেলা যখন আমি যাই সেসব রাস্তায়, আমার কাছে কেমন অপরিচিত মনে হয়। ব্যাপারটা বেশ মজার। তোমাকে নিয়ে যাবো একদিন।

ব্যস ও পর্যন্তই। এর বেশি কিছু বলে না। তিথি লক্ষ্য করেছে আবিদ বাসায় ফিরে ইদানীং বেশ চুপচাপ থাকে। এমন না যে সে মেজাজ দেখায়। বরং দিনে দিনে আরো কেমন শান্ত হয়ে যাচ্ছে। স্ত্রী হিসেবে যে কোন নারীই চাইবে তার স্বামী কিছুটা ‘নাইভ’ স্বভাবের হোক। কিন্তু তিথির সেটা ভাল লাগে না। বরং তার মাঝে এক ধরণের উৎকণ্ঠা কাজ করে সবসময়। কে জানে কি ঘটছে ওর ভিতর ভিতর। সে এটা নিয়ে তেমন ভাবতেও চায়না। ঠিক তখন রান্না ঘরের জানালা দিয়ে দেখে ড্রাইভ ওয়েতে গাড়ির হেড লাইটের আলো পড়েছে। তার মানে আবিদ ফিরেছে।

‘সন্তু একটা পাগল’ ঘরে ঢুকেই কথাটি বলে আবিদ।

– কেন, কী হয়েছে?

– আর বল না, আজ জোর করে ধরে আমাকে একজন সাইকোলোজিস্টের কাছে নিয়ে গেছে। বলে আমার নাকি থেরাপি প্রয়োজন।

– তা তুমি গেলে?

– হুম। আরে ফালতু একটা সেশন। আমি জানি এ সবের কোন ট্রিটমেন্ট নেই। ফালতু খরচের কিছু কায়দা আরকি। দু’ সপ্তাহ পর আবার যেতে বলেছে। কিছু প্র্যাকটিস দিয়েছে। ওগুলো করেই তবে যেতে হবে। মহা ফ্যাসাদ।

– কী জন্যে গিয়েছিলে, কিসের থেরাপি দরকার?

– টু গেট রিড অফ ‘ফিয়ার অফ বার্ডস’। হা হা হা।

কথা বলতে বলতে জুতো খুলছে সে। ওর কথা পুরোপুরি শেষ হয় না। দেখে সিঁড়ির গোঁড়ায় দুই ভাইবোন দাঁড়িয়ে। ওদের চোখমুখ ঝলমল করছে। অরার হাসি হাসি মুখটা দেখলে মাঝে মাঝেই চমকে ওঠে আবিদ। অবিকল মায়ের মত দেখতে! মজার ব্যাপার হল সেটা শুধু ওর হাসি হাসি চেহারাতেই ছাপ ফেলে। অন্য সময় নয়। তাই সে সবসময় চায় অরা কেবল হাসুক। মায়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। শেষের দিকে মা তেমন একটা হাসতেন না। কিন্তু আজ দু’ ভাইবোনের এমন আনন্দের কারণ কী?

ঘরের সব কাজ শেষ করতে করতে তিথির প্রায় রাত এগারটা বেজে যায়। খাওয়ার পর এঁটো থালা যে যার মত ডিশ ওয়াসারে ঢুকিয়ে দেয়। তারপরও কিছু রয়ে যায় সিঙ্কে। সেগুলো ধুয়ে ডিশ ওয়াসারটা চালু করে দেয়। কিচেনের কাউন্টার টপটা ভাল করে পরিস্কার করে নেয়। ওটা একদম চকচকে হওয়া চাই-ই চাই। ওয়াশিং মেশিন থেকে ভেজা কাপড় বের করে ড্রায়ারে দিয়ে দেয়। ওটা যতক্ষণ চলে সে জেগে থাকতে চায়। ইনস্ট্যান্ট কফি মেকারে সে কফি চড়িয়ে দেয়। এই সময়টা আবিদের সাথে পাশাপাশি বসে কফি পান করে। সারা দিনে এই তার একমাত্র বিলাসিতা, নিজস্ব সময়। মাইক্রো ওয়েভের সামনে থেকে আড় চেখে দেখে আবিদ ল্যাপটপ খুলে কি যেন করছে? সাধারণত বাসায় এসে সে এসব কিছুই করে না। আজ কী মনে করে করছে কে জানে?

ওর হাত থেকে কফির কাপ নেবার সময় আবিদ বলে, একটা ব্যাপার ভেবে আমার অবাক লাগে তিথি।

– কোন ব্যাপার?

– এই যে আমার ছেলে হয়েও অনল এমন ব্রিলিয়ান্ট কী করে হল? মনে হয় তোমার জীন থেকে ওটা এসেছে, অ্যান্ড আই অ্যাম হেপি ফর দ্যাট। হা হা হা।

– মোটেও তা না। তোমার এসএসসি আর এইচএসসির রেজাল্ট কী আমার মনে নেই। তা না হলেে, মাত্র দু’তিন মাস পড়ে কেউ কি এমন রেজাল্ট করতে পারে? ওটা সে তোমার কাছ থেকেই পেয়েছে। অনলের আজকের খবরে কি তুমি খুশি?

– খুশি মানে! বেজায় খুশি।

– কিন্তু ওখানে পড়তে তো মেলা খরচ, আমাদের তো অত সেভিংস নেই।

– আরে অত ভেব না। একটা কিছু ব্যবস্থা ঠিকই হয়ে যাবে। হোয়ার দেয়ার ইজ অ্যা উইল, দেয়ার ইজ অ্যা ওয়ে- মনে নেই? সন্তু বলেছে, সেন্ট ক্লাউডে নাকি চারটে বাঙালি পরিবার আছে। ওদের অয়েল চেঞ্জ করানো দরকার হয়। সে চেষ্টা করছে একই উইক এন্ডে সবারটা ফেলতে। তাতে আমার একদিনেই কাজটা হয়ে যাবে। আমাদের এদিকেও তো বাঙালি বাড়ছে, অনুষ্ঠান বাড়ছে। গরুর মাংসের ডিমান্ড বাড়ছেই বাড়ছে। তুমি অত ভেবো না। যাও শুয়ে পড়। লিভ ইট অন মি।

এবার তিথির সত্যি সত্যিই হাসি পায়। এসব করে আর কয় টাকা হবে? ওরা বাচ্চাদের জন্য তেমন টাকা পয়সা জমাতে পারে নি। আবিদ কিছুদিন পরপর চাকরি ছেড়ে দেয়। বাচ্চাদের পড়ালেখার খরচের জন্য একটা স্কিম আছে‘ফাইভ টুয়েন্টি নাইন’ নামে। তাতে তাই তেমন জমে নি। নিজেদের চলতেই জান বেরিয়ে যায় তখন, তো আবার টাকা জমানো! সেটা সম্ভব হয় না। সেও অনেকদিন কোন কাজ করছে না। অরা হবার পর আবিদ বলেছিল,আমাদের একজনের অন্তত বাচ্চাদের কাছে থাকা দরকার। কিডস নিড প্যারেন্টস ক্লোজলি। আমি দরকার হলে আরো এক্সট্রা কাজ করবো। চিন্তা কর না।

এতদিন সে আসলেই তেমন ভাবে নি। কিন্তু আজ তার চিন্তা কাজ করছে। সে বলে, আসলে আমারও কাজে ঢোকা দরকার। অরা তো মোটামুটি বড়ই হয়ে গেছে। আর স্কুলের পর সে লাইজু ভাবীর ওখানে গিয়ে থাকতে পারবে। মাত্র তো কয়েক ঘণ্টার ব্যাপার। আর রোজ হয়তো দরকারও পড়বে না। । লাইজু ভাবী কিছুদিন হল এসেছেন এখানে। কোন কাজ করছেন না, একেবারে ঝাড়া হাত পা। আমি উনার সাথে কথা বলে দেখতে পারি। আমার মেসিস’র টিম লিডার স্টেলার কথা মনে আছে না তোমার? ওর সাথে দু’সপ্তাহ আগে দেখা হল হঠাৎ। সে এখন ওয়াইজেটা ব্রাঞ্চের হোম সেকশনের ম্যানেজার। যখন ওর সাথে কাজ করতাম সে আমাকে বেশ পছন্দ করতো। এখনো দিব্যি আমার কথা মনে রেখেছে সে। আমাকে ডাকে টিটি বলে, হি হি হি। কথা হল, ওর কন্টাক্ট ইনফরমেশন দিলো আমাকে। গিয়ে কথা বলে দেখতে পারি।

অন্য সময় হলে আবিদ হয়তো মানা করতো। আজ কিছু বলে না। তিথি টের পায় ড্রায়ার বন্ধ হয়ে গেছে। ভোতা ধাতব শব্দ আসছে না ওখান থেকে। সে উঠে যায়। সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় দেখে আবিদ তখনো ল্যাপটপে নিমগ্ন। তিথি বোঝার চেষ্টা করে কী ভাবছে সে? কী করছে ? পারে না। ক্লান্ত বোধ করে। তবে কি সময় আমাদের আস্তে আস্তে ক্লান্ত করে দেয়? দূরে সরিয়ে দেয়? অথচ প্রথম দেখার দিনেই কত কী-ই না বুঝে নিয়েছিলো সে! সেদিকে তাকিয়ে থেকে ওর সাথে প্রথম দিনের দেখা হবার কথাটা মনে পড়ে যায়। সময় কত দ্রুত উড়ে যায়! সেসব দিনের ভাবনা নিয়ে তিথি শুতে চলে যায়।

আবিদের সাথে তিথির দেখা হওয়াটা গল্পকেও হার মানায়।

‘আপনার সাথে একটা পুরো দিন কাটাতে চাই’- ওকে সেদিন এই কথাটিই বলেছিল তিথি-স্পষ্ট মনে আছে।।

ঘুম ভেঙ্গে চোখের সামনে জলজ্যান্ত একটি মেয়েকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিল আবিদ। তার আরো খানিকক্ষন বেশি ঘুমানোর কথা। কাঁচা ঘুম ভেঙ্গে যাওয়ায় যুক্তিবোধ ঠিকমতো কাজ করে না। কী বলবে ভেবে পায় না। এ জায়গার কথা তো বেলাল ছাড়া আর কেউ জানে না! প্রতি সোমবার সকালে বাসা থেকে নাস্তা করে কামাল বেকারিতে আসে সে। এদের দোকানের পেছনে একটা ডেরা মতন জায়গা আছে। সামান্য হেঁটে গিয়ে ঢুকতে হয়। বাইরে থেকে কারোরই কিছু বোঝার উপায় নেই যে এখানে একটা ঘর আছে। আর সেও সামনে দিয়ে কখনোই আসে না। পুলিশের বাবার ক্ষমতা নেই আন্দাজ করার। কিন্তু মেয়েটি এখানে এল কী করে?

সোমবার দৈনিক সংবাদ পত্রিকা একটা নতুন বিভাগ চালু করেছে। উপর নিচে পাশাপাশি কতোগুলো চারকোণা ঘর থাকে। কিছু সূত্র দেয়া থাকে, তাই দিয়ে শব্দ তৈরি করতে হবে। এটা করতে ওর কেমন নেশা ধরে গেছে। প্রতি সোমবার নিয়ম করে এখানে এসে কাজটি করে সে। কামাল বেকারি ওদের দোকানে সংবাদ পত্রিকা রাখে। আর ওদের বাসায় ইত্তেফাক। ইদানীং ইনকিলাব পত্রিকাটি যুক্ত হয়েছে। সংবাদ পত্রিকাটিও বাসাতে রাখা যায়। তবে এখানে এসে এই কাজটি করতে ওর দারুণ লাগে। সেই অক্ষর সমস্যা সমাধান করতে করতে অনেকটা সময় লেগে যায় ওর। মেলানো শেষ করার পর বেশ ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। বিকেল পর্যন্ত ওখানে ঘুমায় সে । ওর জন্য বিছানা পাতা আছে। পাশে ছোট একটা ফ্রিজও আছে। বিকেলে বেলাল এলে ওদের জন্য খাবার আসে। তখন দুজনে মিলে সে খাবার খায়। নিজেদের মাঝে আলাপ করে।

স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষার আগে একবার পুলিশ ধরে ফেলে তাকে। একরাত ছিলও হাজতে। সেটা একটা বেশ মজার অভিজ্ঞতা। তার জন্য রহস্যজনক ভাবে মজার মজার সব খাবার আসতে থাকে। সেই হাজতখানায় আর যারা মজুত ছিল, সবাই তৃপ্তি করে খেল ওর সাথে। পরদিন সকালেই সে ছাড়া পেয়ে গেল। কোথাও কোন মুচলেখা বা স্বাক্ষর করতে হয় নি তাকে। ভেবেছিল মন্টু ভাই বুঝি এসবের ব্যবস্থা করেছেন। কৃতজ্ঞতায় তার মন ভরে যায়। কিন্তু সে ধারণা ভুল ছিল তার। সে গল্পের নেপথ্যের বীজ আরো গভীরে নিহিত।

এরপর পরই স্কুল বদলাতে হয় তাকে। পরীক্ষার মাত্র আর চার পাঁচ মাস বাকি। একরকম গৃহবন্দির মত থাকতে হয়েছে তাকে। নাম বদলে ওকে একেবারে অপরিচিত একটি স্কুলে ভর্তি করে দেওয়া হয়। প্রায় জোর করেই। ওর বাবা ততদিনে এরশাদ সরকারের পূর্ণ মন্ত্রী, অনেক ক্ষমতা। সে রাতেও ওর বাবার মুখ থেকে সেই বিচিত্র গন্ধটা টের পেয়েছিল। জড়িত কণ্ঠে তিনি বলেছিলেন, এসএসসি পরীক্ষা তুই দিতে পারবি নিজের খেয়াল খুশি মত। দরজা আটকে, বই খুলে।

সে অবশ্য তেমনটি করেনি। কোথাও যাবার উপায় না থাকাতে সে খানিক পড়ার চেষ্টা করতো। গৃহ শিক্ষক তো ছিলই। পরীক্ষায় নকল সে করেনি। ফলাফল চমকে দেবার মতই ছিল তার। তবে রেজিস্ট্রেশনের সময় ওর নাম বদলে রাখা হয় ‘আরিফ’।

ওর বন্ধু বিজয় গিয়েছিল ইন্ডিয়া বেড়াতে, আর ফেরে নি। ওরা ওখানে পাকাপাকি হয়ে যায়। আর কোন সংবাদ পায় নি সে। মন্টু ভাইয়ের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা তাকে দলের হাই কমান্ডের বেশ কাছাকাছি নিয়ে যায়। প্রত্যেকটি জনসভায় তাদের দলটাকে ডাকা হত নিরাপত্তার জন্য। তেরজনের দলটিতেই হাইকমান্ডের অমন ভরসা, পুলিশে নয়।  ঢাকা শহরে ওদের ‘আনলাকি থার্টিন’ দলের নাম কে না জানতো তখন।

‘কী, কিছু বলছেন না যে! আমি আপনার সাথেই তো কথা বলছি, নাকি? যাবেন ঘুরতে একদিন, আমার সাথে?’ – কথা কটি শুনে সম্বিত ফেরে তার। স্কুল ড্রেস পরে আছে মেয়েটা। কোন ক্লাসে পড়ে সে? এইট, কিম্বা নাইন। বেশ লম্বা আর চোখ গুলো স্বাভাবিকের চেয়ে বড় ও টলটলে। এই দুটো বিষয় চোখে পড়ে তার। কিন্তু এই মেয়েটি কী করে এল এখানে? এখানে তো কারো আসার কথা না? এটা ওদের সর্বোচ্চ গোপন আখড়া। তার ঘুম পুরোপুরি শেষ হয়নি, আরো একটু দরকার। সে কারণেই কিনা কে জানে সে বলে দেয়, আচ্ছা যাও যাবো ঘুরতে।

সে অবশ্য গিয়েছিল ঠিকই। নাহ ওটা কোন রোমাঞ্চ কিম্বা আকস্মিক এক সুন্দর মুখচ্ছবির কারণে না। এমনিই রাজি হয়েছিল। আমাদের চারপাশের সব কিছু কি আর যুক্তি মেনে চলে। প্রায় সারাদিন এদিক সেদিক ঘুরে একটা ব্যাপার সে টের পেয়েছিল সেদিন। আগে কখনও যেটির সাথে পরিচয় ঘটে নি। আর সেটা হল নির্মলতার গভীর একটা বোধ। শঙ্কাহীন একটা স্থির অপরাহ্ণ। আজব একটা মেয়ে তিথি।

তারপর আর ওর কথা তেমন মনেও নেই। আরেক সোমবারে আবার তার ঘুম ভাঙে। দেখে হাতে টিফিন ক্যারিয়ার নিয়ে তিথি দাঁড়িয়ে। এতো ভাল মসিবতে পড়া গেল?

তিথি বলেছিল, আজকে তিনটা কথা বলতে এসেছি এখানে। প্রথমটা একটা সত্য কথা, দ্বিতীয়টা অনুরোধ এবং তৃতীয়টা উপলব্ধির।

সে বেশ মজা পায়। জানতে চায়, কী অনুরোধ? টিফিন ক্যারিয়ারের খাওয়াটা খেতে হবে আমাকে, তাই তো? আর তাতে বিষ মেশানো আছে। দু দলা খাবার মুখে দিলেই কাত! হা হা হা, কে পাঠিয়েছে তোমাকে এখানে?

সে দেখে বিস্ফারিত চোখে মেয়েটি তাকিয়ে আছে । কিছুক্ষণ পর সেখান থেকে টপটপ করে পানি পড়তে থাকে। সে কিছুটা অপ্রস্তুত বোধ করে। শোনে মেয়েটি ধরা গলায় বলছে, আপনি কি ভেবেছেন আমি আপনার জন্য দেওয়ানা হয়ে গেছি? জি না, মোটেই তা না। প্রথম দিন তেমন কোন আবেগ থেকে আপনার সাথে দেখা করতে আসিনি। এসেছিলাম নিজের কথা ভেবেই। রাস্তায় অনেক নোংরা কমেন্ট, টিটকারি-শিস শুনতে হয় রোজ। আপনি তো আর মেয়ে না, তাই বুঝবেন না কিসের ভিতর দিয়ে আমাদের রোজ যেতে হয়। নিজের মনেই আমি আর সব মেয়েদের মত রোজই মরছি। কাউকে কিছু বলে লাভও নেই। উল্টা শাসানো হয়। অনেক ভেবে আমি একটা উপায় বের করেছি। আর তা হল আপনার সাথে ঘুরতে যাওয়া। আমার প্ল্যানটা বেশ কাজে লেগেছে। রাস্তা ঘাটের রোমিও গুলা একদম ঠাণ্ডা মেরে গেছে। এর জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আপনি না জেনেও আমার একটা উপকার করেছেন। এ খাবার সেজন্যই।

– তুমি বস, বসে কথা বল।

– না, আমি এভাবেই ঠিক আছি।

– আচ্ছা, এবার অনুরোধের কথাটা শুনি।

– অনুরোধটা হল আপনি এখানে আর এসেন না।

– মানে কি! কি বল এখানে আসব না?

– দেখেন আমার মত সাধারণ একটা মেয়েও বলে দিতে পারে আপনার এখানে নিয়ম করে থাকাটা নিরাপদ নয়।

– কী রকম? এটা তো আমার সবচেয়ে সেইফ জায়গা গুলোর একটা।

– আমার তা মনে হয় না। যেমন ধরেন, এই যে আমি একটা মেয়ে হয়েও এখানে আসতে পারলাম। সেটা তো যে কেউই করতে পারে, তাই না? হয়তো পুলিশ ইচ্ছে করেই আসে না ধরতে আপনাকে। কিন্তু পুলিশ ছাড়াও তো আরও অনেকে আছে, তাই না? তারা সে সুযোগ ছাড়বে কেন? আরেকটা ব্যাপার হল আপনার প্রতি সোমবার এখানে আসাটার মাঝে একটা প্যাটার্ন আছে, সেটা এক্সট্রিম্লি ডেঞ্জারাস মনে হয়েছে আমার কাছে। এটা আমার একটা অনুরোধ। মানা না মানা আপনার ব্যাপার।

সে বেশ শব্দ করে হেসে উঠেছিলো সেদিন। তিথির কথাটার তেমন একটা গুরুত্ব না দিয়ে রসিকতার ঢঙে জানতে চেয়েছিল, এবার বল তোমার তৃতীয় বাণী। উপলব্ধির কথা।

– সেটা হল, আমি আপনার বিষয়ে একটা ব্যাপার জেনেছি। আর সেটা আমার উপলব্ধি থেকেই বোঝা।

– কী সেটা?

– আপনি পাখিকে ভয় পান।

কথা কটি বলে আর থামে নি তিথি। বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকে সে। বেলাল এলে চুপচাপ ওর কথা শোনে, খাবার খায়। হু-হা করে কথার উত্তর দেয়। তার পরদিন আবার সব বেমালুম ভুলে যায়। কিন্তু পরের সোমবার কি মনে করে কামাল বেকারির ডেরায় যায়নি। হকারের কাছ থেকে সংবাদ পত্রিকা নিয়ে বাসাতেই শব্দ-সমস্যা সমাধান করে ঘুমিয়ে পড়ে। ওর ঘুম ভাঙে বেলালের ঝাঁকানিতে। দেখে বেলাল ওর মুখের সামনে পিস্তলের নল চেপে বলছে, মাঙ্গের পো, আমার লগে বিটলামী কর। দিমু ভইরা।

সে কিছুই বোঝে না। ঘুম জড়ানো কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে, কেন কী হয়েছে?

– মনে অয় কিছুই জানচ না, হালায়?

– কী জানবো, খুলে বল?

হাতের বন্দুক ওর দিকে তাক করেই বেলাল যা শোনালো তা রীতিমতো আশ্চর্যজনক। ওকে কামাল বেকারির আস্তানায় না পেয়ে সে পেছন পথে এদিকেই আসছিলো। কিছুদূর আসার পরই পিছনে বিকট শব্দ শোনে। দৌড়ে গিয়ে দেখে, ওদের গোপন ঠিকানাটা কেউ যেন বোমা দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছে। একটু আগে হলেই সে মারা পড়ে।

এটুকু শোনার পর আবিদ ধপাস করে বিছানায় বসে পড়ে অস্ফুট গলায় বলে, মাই গড। কিন্তু দোস্ত, এটা আমার কাণ্ড না।

তারপর সে তিথির সাথের পুরো ঘটনাটা খুলে বলে ওকে। পরদিন সকালের মাঝেই খবর চলে আসে, বাবর রোডের একটা উঠতি দল কল্যাণপুরের গ্রুপের সাথে মিলে এটা করেছে। এদিককার দখল নেওয়ার ওদের মেলা দিনের পরিকল্পনা। তার জন্যই আবিদ-বেলাল ওদের প্রধান টার্গেট। দশ-পনের দিনের মধ্যেই ওরা সব কিছু হাতের মুঠোয় নিয়ে আসে। এতো ব্যস্ততার মাঝেও আবিদের মনে একটা বিষয় কাঁটা হয়ে থাকে। আর তার থেকে মুক্তির একমাত্র উপায়, তিথির সাথে দেখা করা। কিন্তু সেটা আর হয়ে ওঠে নি কিছুতেই। এর পর সবকিছু অনেক দ্রুত ঘটতে থাকে। ৮৯-৯০ সালের ঐ সময়টা খুবই উৎকণ্ঠার ছিল। এরশাদ সরকারের পতনের জন্য পুরো দেশ তখন জ্বলছে।

তিথির সাথে তার আবার দেখা হয়েছিল ঠিকই। তবে তা পাক্কা পাঁচ বছর পর। ওদের বাড়ি ভর্তি মানুষ সেদিন।

ল্যাপটপটা যখন বন্ধ করে ওঠে, আবিদ লক্ষ্য করে, রাত প্রায় বারোটা বাজে। আজ ইন্টারনেট ঘেঁটে দুটো কাজ করেছে সে। একটি হল উবার নেট-ওয়ার্কে নিজেকে রেজিস্ট্রার করা । আর অন্যটি হল স্প্রিংফিল্ড এক্সডি ফোর পয়েন্ট ফাইভ কেনা। এটি একটি অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য সেমি-অটো হ্যান্ড গান।

আজ রাতেও তার অক্ষর দিয়ে শব্দ মেলানো হল না।

(৫)

জলোচ্ছ্বাসের মতো কাজ বাড়তে থাকে আবিদের।

এমন না যে ওদের অফিস হঠাৎ করে অনেক বেশি কাজ পেয়েছে। কিম্বা কেউ হুট করে কাজ ছেড়ে দিয়েছে। সব আগের মতোই আছে। অর্থনৈতিক মন্দার ভাবটাও আর নেই। পত্রপত্রিকায় তো সে সূচকের ছড়াছড়ি। কাজের আর সবাই পাঁচটা বাজতেই দিব্যি ড্যাং ড্যাং করে বেরিয়ে যায়। কারও চেহারাতেই অতিরিক্ত কাজের উৎকণ্ঠা চোখে পড়ে না। বরং বেশ একটা চাঙ্গা চাঙ্গা ভাব। শুধু তার কাজই যেন ফুরাতে চায় না কিছুতেই। প্রতিদিনই তাই বের হতে হতে ওর বেশ রাত হয়ে যায়। কিন্তু এটা কেন হচ্ছে? তবে কি তার কর্মক্ষমতা কমে যাচ্ছে? দুপুরে খেতে খেতে ড্যান গলায় বেশ ফুর্তি নিয়ে বলে, কী অত কাজ তোমার, বিড? নাকি প্রোমোশন পাচ্ছ কাজে?

তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ করতে করতে ও বলে, প্রোমোশন না আরও কিছু। নিজের কাজ শেষ করতে করতেই হিমশিম খাচ্ছি। রিকি ওর ইম্পুট দিয়ে বসে থাকে আমারটার সাথে কম্পেয়ার করার জন্য। আমারটাই কেবল শেষ হয় না। রোজই কাজ জমে যাচ্ছে।

প্রতিদিন যখন কাজ থেকে বের হয়, বাইরে বেশ অন্ধকার হয়ে যায়। থ্যাংকস গিভিং-এ তেমন একটা ছুটি কাটায় নি আবিদ। জমে থাকা কিছু কাজ কমিয়ে নিতে অনির্ধারিত ভাবে অফিসেও গিয়েছে সে। এমনিতেই এই সময়টায় দিন বেশ ছোটো হয়ে আসে। আবার কাজের জন্য যখন বাসা থেকে বের হয় তখনো চারপাশে আবছা আবছা অন্ধকার থাকে। বলা যায় দিনের আলো সে প্রায় দেখেই না আজকাল। এদিকে ভারি ঠাণ্ডা পড়েছে এবার। সাথে বয়ে চলে কনকনে হাওয়া। একেবারে কলিজার ভিতর গিয়ে বাড়ি খায়। আজ কাজ শেষে পারকিং লটে হেঁটে আসার সময় একটা ছোট্ট দৃশ্য দেখে আবিদ। ঠিক দৃশ্য কিনা কে জানে। চোখের ভুলও হতে পারে ওটা। দেখে, ওর গাড়ির বনেটের উপর কে যেন একজন বসা। প্রথমে সে একটু অবাক হয়। এমন সময় তো কারো ওভাবে বসে থাকার কথা নয়? বনেট তো ঠাণ্ডায় বরফ হয়ে থাকার কথা!  কে ওখানে? অ্যামেরিকাতে আজব ঘটনা প্রায়ই ঘটে। কোন আততায়ী নয় তো আবার? বন্দুক নিয়ে সে কখনোই কাজে ঢোকে না। গাড়িতে রেখে আসে। যতই সে এগুচ্ছে মনে হচ্ছে একটা লোক যেন বসে আছে। চেহারা দেখা যায়। কিন্তু স্পষ্ট নয়। যতই এগুচ্ছে ততই যেন সে চেহারা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। যেন লোকটি হাসছে।  আরে এ তো মন্টু ভাই! ওর দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছেন। কিন্তু উনি কী করে আসবেন এখানে! তার এখানে আসার কোনই সম্ভাবনা নেই। আশ্চর্য। সে জিজ্ঞেস করে, মন্টু ভাই নাকি?

কোন আওয়াজ নেই। মন্টু ভাই যেন নিঃশব্দে হেসেই চলছেন। হঠাৎ একটা দমকা হাওয়া চলে যায়, উইন্ড চিল। ফিরে দেখে কেউ নেই। এবার ওর যুক্তি বোধ কাজ করে। ও পাশের স্ট্রীট লাইটের বিপরিতে একটা ম্যাপল ট্রি। লাইট পোস্ট গুলো সম্প্রতি আরও উঁচু করা হয়েছে। কিছুদিন আগে বাতিও বদলে দেওয়া হয়েছে। সেই হলদেটে আলো পত্রহীন ম্যাপল ট্রির সাথে মিশে অদ্ভুত আলো আঁধারির এক বিভ্রান্তি তৈরি করেছে। সেটাকে পাশ কাটালেও ভাবনা থেকে আবিদের ঠিক মুক্তি মেলে না। গাড়ি চালাতে চালাতে তার অনেক কথাই মনে পরে যায়।

সেদিন গভীর রাতে ওদের মোহম্মদপুরের বাসার ফোনটা হঠাৎ করে বেজে ওঠেছিল।

রাতে বাসায় ফেরার পরই ফোনের লাইন সে নিজের ঘরে নিয়ে আসতো। প্যারালাল লাইনটা ডিস-কানেক্ট করে রাখতো সে। শুধু শুধু মধ্য রাতের ফোনের শব্দে বাসার সবাইকে জাগিয়ে কী লাভ? ওপাশে ভারি কণ্ঠ, আবিদ?

– হুম। মন্টু ভাই? এতো রাতে!

– কারণ আছে। তুই এখনই বেলালকে নিয়ে আমার এখানে চলে আয়।

– এতো রাতে? কাল সকালে আসি?

– না। এখনই আয়। দরকার আছে।

গিয়ে যা শুনল তাতে খানিক অবাক হতেই হয়। সে রাতে নাকি ভাইয়ের বাসায় পুলিশ রেইড দেবে। পুলিশেরই ভিতর থেকে সে খবর তাঁর কাছে পৌঁছে গেছে। এতে অবাক হবার কিছু নেই। আবিদ দেখেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের হল গুলোতে রেইড দেবার আগে ছাত্রনেতারা আগে থেকেই সব জেনে যায়। তাই কিছুই ধরা পড়ে না। সবাই বেশ ধোয়া তুলশি পাতার চেহারা নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। অথচ ওরা ঠিকই জানে কিভাবে অস্ত্র রাজনীতির অংশ হয়ে উঠছে।

দুটো বেশ বড় ব্যাগ নিয়ে যখন ওরা বের হয়ে আসে তখন রাত প্রায় আড়াইটা। অথচ সুলতান গঞ্জের মোড়ে তখনো লোকজন রয়েছে। চায়ের দোকানে খদ্দের বসে দিব্যি চুকচুক করে চা খাচ্ছে। বেলাল বলল, খাড়া, একটু চা খায়া লই।

পাশের অন্ধকারে মোটর সাইকেল দুটো দাঁড় করিয়ে ওরা বসে চা খাচ্ছে। ঠিক এই সময় দেখে একটা পুলিশের ভ্যান মন্টু ভাইয়ের বাসার দিকে যাচ্ছে। ওখানে অবশ্য ওরা কিছুই পায় নি। ভাইয়ের সম্মান বেড়ে শত গুন। দল ক্ষমতায় গেলে উনি নির্ঘাত সে এলাকার এমপি হচ্ছেন। আর এতে ওদের সেই দলটির অবস্থা গিয়ে কোথায় দাঁড়াবে ভাবতেই আবিদের রোমাঞ্চ হতো খুব।

মন্টু ভাইকে পুলিশ ধরতে না পারলেও বেলাল ঠিকই ধরা পড়ে যায়। কদিন পর পত্রিকায় অস্ত্রসহ বেলালের হাসিহাসি মুখ দেখতে পায় সে। সেই অস্ত্র গুলো বেলালের বাসাতেই ছিল। ওকে চালান করে দেবার পর একদিন দেখা করতে গিয়েছিলো সে। বেলাল আছে রাজার হালে। ওকে দেখে মুচকি হেসে বলে, ভাই ট্রিক্স কইরা আমারে হান্দায়া দিছে। তেলেসমাতি দেখছচ?

– কী বলিস এইটা?

– ঠিকই কই দোস্ত। আমার বাসায় মাল আছে, তুই আর হে ছাড়া ক্যাঠায় জানতো? তুই এইটা করবি না ঐ বাত আমি জানি। তরেও তো মাল গুলা রাখতে কইতে পারতো, নাকি? কয় নাইক্কা? কেন জানচ?

– কেন?

– কারণ, তরে হান্দাইলে দুই দিনে বায়রায়া যাইবি? তোর হোগায় তর বাপের গু লাইগা আছে না। বিগ ব্রাদার ওইটা বালাই বুঝে। হেয় তো পলিটিক্স করে।

– কিন্তু এটা উনি কেন করবেন?

– কারণ আচে রে, সালা।

বেলালকে ভিতরে ঢুকিয়ে মন্টু ভাই আসলে ওর উপকারই করেছিলেন। সেসব অবশ্য অনেক পরের কথা। ততদিনে সে দেশছাড়া। দল ক্ষমতায় গেছে। মন্টু ভাই ক্ষমতার খুব কাছের মানুষ হয়ে গেলেন। অথচ ওকেই কিনা একদিন রাস্তায় গুলি খেয়ে পড়ে থাকতে হল। ধানমণ্ডি তেরো বাই দুই-এর রাস্তা ভেসে গেলো ওর রক্তে। অনেকটা সময় ওখানে পড়ে থাকলেন উনি। কেউ যায় নি ফেরাতে কিম্বা কিছু করতে। কে মারল, কেন মারল কিছুই জানা হল না। অন্যসব কোল্ড কেইসের মতো ওটাও দফতরে দফতরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কেবল ওদের সেই দলের লিমনকে পুলিশ ধরে নিয়ে যায়। সে আর বেলাল আছে একই জেলখানায়। মোবাইলের এই যুগে খুব সহজেই যোগাযোগ হয় ওদের সাথে। আবিদের সাথে ঘণ্টার পর ঘণ্টার ফোনে কথা বলে ওরা। শোনা যায় দলের প্রধানের মামাতো নাকি চাচাতো ভাইকে টিকিট দেবার জন্যই এই ব্যবস্থা। মন্টু ভাই ক্রমেই অনেক জনপ্রিয় হয়ে উঠছিলেন যে। তিনি থাকলে ঝামেলা, তাই তাকে সরিয়ে দেয়া হল। মন্টু ভাই মারা যাওয়ায় ওদের দলটাও ভেঙে খান খান। বেলাল আর লিমন দুইজন জেলে বসে দাবা খেলে। আর ওখানে বসেই ঢাকা শহরের দুইটা দিক সামলায়। কল্যাণপুর-শ্যামলী-মোহম্মদপুর বেলালের এলাকা। আর হাজারিবাগ-লালবাগ লিমনের। বেজায় সুখে আছে ওরা। দেশ ছেড়ে আসার আগে শেষ বারের মতো দেখা করতে গিয়েছিলো আবিদ। নব্বই সালের জুলাই মাস থেকে বলতে গেলে একদম গৃহবন্দী সে। কোথাও যাবার উপায় নেই। কী করে কী করলেন মাজেদ সাহেব, আবিদ চলে এলো নিউ ইয়র্ক। কাগজে কলমে যদিও ওর নাম ছিল আরিফ, আরিফুর রহমান। স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষার আগে মাজেদুর রহমান সাহেব ওর নাম কায়দা করে পাল্টে দিয়েছিলেন। তাতেও শান্তি নেই। নিউ ইয়র্কে ওর উপর সবসময় নজর। সে অবাক হতো এই ভেবে রাজনিতিকদের হাত বুঝি সত্যি সত্যিই লম্বা হয়। তবে বেলালের সাথে দেশ ছাড়ার আগের শেষ সাক্ষাৎ ওকে একটা পথ দেখিয়ে দেয়। একটা ফোন নাম্বার দিয়ে বেলাল বলেছিল, এই নাম্বারে একটা ফোন দিস।

– কার নাম্বার এটা?

– আচে, তোর জাইনা কাম কী হালায়। দরকার হইলে ফোন করিচ।

কোন কাজে আসবে না জেনেও নিয়েছিলো। অথচ নিউ ইয়র্কে এসে একটা ফোনই সে করেছিলো। ও পাশে যে মিরাকল অপেক্ষা করছিলো কে জানে? ও পাশের মানুষটা যে ফোন ধরবেই তারই বা নিশ্চয়তা কী? আর একবার সুযোগ মিস করলে আবার করা মুশকিল। যে লোকটির তত্ত্বাবধানে সে ছিল তাঁর নাম আলাউদ্দিন। সারাক্ষণ চোখে চোখে রাখতো তাকে। একদিন সে পালাল। বেরিয়েই ঐ নাম্বারে ফোন করলো।

এক হ্যালোতেই একটা অজানা পথ মুহূর্তে খুলে গেলো। যেন বিজয় ওর ফোনের জন্যই অপেক্ষা করছিলো। এ পাশ থেকে সে শুনল বিজয় বলছে, আমি যা বলি খুব ভালো করে শোন আবিদ। একটা ঠিকানা দিচ্ছি। তুই একটা ট্যাক্সি নিয়ে সোজা চলে যা ওখানে। ওখানে লোক থাকবে তোর জন্য। রফিক নাম। তোর পাসপোর্ট খোয়া গেছে এই মর্মে রিপোর্ট করবি। যতদিন তোর পাসপোর্ট না আসবে ওখানেই থাকবি। বাসা থেকে একদম বেরোবি না।পাসপোর্ট পেলে গ্রে হাউন্ডে চড়ে সোজা দুলুথে চলে আসবি। আমি এখন এখানেই থাকি। তোর ভর্তির ব্যাপারে আমি ডিনের সাথে কথা বলেছি। ভগবান চান তো একটা ব্যবস্থা হবেই। তোর স্ট্যাটাসও চেঞ্জ করতে হবে। মেলা ফ্যাঁকড়া। তুই আয়, আস্তে আস্তে সব ঠিক করে ফেলবো। চিন্তা করিস না।

– তুই এতো কিছু জানলি কী করে?

– বেলাল আমাকে আগেই সব বলে রেখেছিল। আমি গত কয়দিন তোর ফোনের জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। ক্লাসে গেলেও কাউকে না কাউকে রেখে গেছি ফোনের পাশে।

আজ গাড়ি চালাতে চালাতে আবিদ ভাবছিল, এই যে বেলাল- সে তার কে হয়? কেউই না। বলতে গেলে রাস্তার ছেলে, সূত্রহীন। কোন লেখাপড়া নেই। ওর সাথে কিছুতেই মেলার কথা নয়। তবুও এই সুদূর অ্যামেরিকাতেও সে তাকে যে পথ বাতলে দিলো তা আর কে-ই বা দিতে পারতো। বেলালের বুদ্ধির আরেকটা নমুনা আবিদের মনে পড়ে। যেবার মা মারা গেলেন, মায়ের কবর দিয়ে আবিদ গিয়েছিলো বেলালের সাথে দেখা করতে। বেলাল হাসতে হাসতে বলেছিল, খালাম্মা আর কয়দিন বাঁচত, তোর বাপেই চাইছে হে যেন জলদি হুইয়া পড়ে । তোর বাপের আরেকটা বিয়া করার খায়েশ জাগছে রে আবিদ।

বেলালের এ কথাটিও সত্যি হয়ে গেলো। মাকে যে নার্স দেখাশুনা করতো সেই অল্প বয়সী মেয়েটিকেই মাজেদ সাহেব বিয়ে করে ফেললেন। আড়ালে নয়, মোটামুটি ঢাকঢোল পিটিয়েই। সে আরও জেনেছে, সে দেশ ছাড়ার পর ওদের এলাকাটা আর মাদক মুক্ত থাকে নি। আর সেটা জেলে বসে নিয়ন্ত্রণ করছে বেলাল। প্রথমে আবিদ বিশ্বাস করে নি। একদিন ফোনে কথা বলার সময় বেলালকে সে জিজ্ঞেস করেছিলো সে কথা। বেলাল বলেছিল, হ ঠিকই হুনছচ। মাগার আমার উপরেও ওস্তাদ আছে আবিদ। বেসি জানবার চাইচ না। মন খারাপ হইব তোর। খালি এইটা জাইনা রাখিচ তোর দেশ ছাড়নটা আসলে তোর উপকারের লাইগা না। আরও মানুষের উপকার অইছে। বাকি টা বুইঝা ল’।

বাকিটা সে ঠিকই বুঝে নিয়েছিলো। আর সে কারণেই মাজেদ সাহেবের কিছুই সে ছুঁয়েও দেখেনি। মাঝে মাঝে ভাবে বেলালের মতো সমঝদার একজন বন্ধু এখানে থাকলে বেশ হতো। বিজয় ছিল। কিন্তু সেও বছর পাঁচেক আগে ফ্লোরিডা চলে গেছে। নুসরাতের সাথে ছাড়াছাড়ি হবার পর বিজয় আর মিনেসোটায় থাকতে চায়নি। এতদিনের মিনিয়াপলিস ওর কাছে অনেক হীমশীতল জায়গা বলে মনে হতে লাগলো। চাকরি নিয়ে তাই সোজা ট্যাম্পা। বিজয়ের সাথে ওর গাঁট ছাড়া বন্ধনটা টেকসই হয়নি কিছুতেই। প্রায়ই বিচ্ছেদ ঘটে।

ক্রিসমাসের আগে আগে আবিদ আবারো অনুভব করলো, বেলালের মতো একজন তীক্ষ্ণ বুদ্ধির বন্ধু পাশে থাকাটা সত্যি জরুরি। তাহলে সে হয়তো আগেই আবিদকে সাবধান করে দিয়ে বলতো, তোর মামা, এই ক্রিসমাস বেকার কাটান লাগবো। ভেঙ্কু বাবু তোর চাকরিটা খাইব।

হলও ঠিক তাই। ক্রিসমাস ব্রেকের ঠিক আগেরদিন সন্ধ্যায় ওর চাকরিটা চলে গেলো।

(৬)

পরপর দুটো অনুষ্ঠানে আবিদ-পরিবার যোগ দিল না।

দুটোই ক্রিসমাস অনুষ্ঠান। প্রথমটি কলিন্সের বাসায় চব্বিশ তারিখ সন্ধ্যায়, অন্যটি পরদিন ডেভিডের বাসায়। মানে পঁচিশ তারিখ বড়দিনের সন্ধ্যায়। ওরা দুই ভাই প্রতি বছরই আগপিছ করে এই আয়োজন করে। এর কোনটিতেই এবার ওরা যায় নি। ক্রিসমাস ট্রি-ও ওরা সাজায় নি। এ ব্যাপারে প্রতিবারই তিথির ব্যাপক আগ্রহ। বাচ্চাদের নিয়ে রাত জেগে জেগে ক্রিসমাস ট্রি সাজায়। কিন্তু এবার সে তা করলো না। তার কারণ কোনভাবেই আবিদের বর্তমান কর্মহীনতা নয়- এটা সবাই বোঝে। এমনিই যেতে মন চায় নি। তবে কি ওদের পরিবারটি কিছুটা হতোদ্যম? দূর দূর। ওরা না গেলেও ডেভিড আর কলিন্সের বাসা থেকে খাবার কিন্তু ঠিকই এসেছে। সে দু’ রাতেও আবিদ- তিথির বাসায় জমেছে মধ্য রাতের বর্ধিত আড্ডা। এবার আবার হোয়াইট ক্রিসমাস হল মিনেসোটায়। সারা স্টেট ছেয়ে গেছে সাদা সাদা তুষারে।

আজ বছরের শেষ দিন। আবিদ তাঁর লিভিং রুমে গায়ে কম্বল জড়িয়ে বসে আছে। এমন না যে চাকরি চলে গেছে দেখে ওর মন খারাপ। বরং ওর খানিক মজাই লাগছে। মেলা দিন পর আরাম করার এমন একটা সুযোগ পাচ্ছে সে। আসলে আমাদের সবারই কিছুদিন পরপর কর্মহীন থাকা দরকার। বাসায় বসে কম্বলের নিচে শুয়ে পা নাচাও- কে মানা করেছে? চাকরিহীন তাকে আগেও থাকতে হয়েছে। তবে অন্যান্য বারের থেকে এবার কিছুটা ভিন্ন। অন্যসময় সে কাজ ছেড়ে দিয়েছে। কিন্তু এবারই প্রথম ওরটা চলে গেছে। তবে মুশকিল হলো এখন চরম শীতকাল। বাইরে গিয়ে কিছুই করার নেই। কোন আউটডোর এক্টিভিটিও নেই। সারাক্ষণ বাসাতেই স্থির। উফ, এবার ঠাণ্ডাও পড়েছে ভীষণ! সেন্ট্রাল হিটারের সাথে সাথে আর্টিফিশিয়াল ফায়ার প্লেস চালু করা আছে। ফায়ার প্লেসটি বৈদ্যুতিক। দেখলে মনে হবে যেন অবিরাম কাঠ পুড়ছে। আসলে তা নয়। কিন্তু তাতেও ঠাণ্ডা মানছে না।

আবিদের বেশির ভাগ সময় তাই কাটছে শুয়ে শুয়ে-শব্দ মেলানোর খেলাটা খেলে। খেলে বললে একটু ভুল বলা হবে। একটি শব্দ সেই কবে থেকেই মেলাতে পারছে না। সাধারণত ওর তেমন বেগ পেতে হয় না। সহজেই মেলাতে পারে। অথচ এবার পারছে না কেন? সেই কবে থেকেই তো খোঁচাখুঁচি করছে। দুই অক্ষরের শব্দটি সম্পর্কে দুটি অস্পষ্ট তথ্য দেওয়া আছে। আর তাহলো, পাখি বিশেষ। বাংলা সাহিত্যে এর ব্যাপক পরিচিতি রয়েছে। এখানে এসেই আবিদ আটকে গেছে। গিট্টুটা কিছুতেই খুলছে না। দুটো কারণে তার এই অপারগতা। প্রথমটি হল, এটি একটি পাখি বিশেষ। পাখিতেই ওর যত অসাড়তা। অপরটি হল, সাহিত্য নিয়ে আবিদের একদমই আগ্রহ নেই। বিন্দু মাত্র জ্ঞান নেই।

অরনিথো-ফোবিয়া নিয়ে তার থেরাপিটা শেষ হয়নি। মাঝপথে এসেই থেমে গেছে। এখন তো ওর এই চিকিৎসা করার ইনস্যুরেন্সও নেই। নিজের পকেট থেকে অত খরচ করার কোন মানে হয় না। আর তাছাড়া ব্যাপারটা তাকে তেমন ভুগায় না। তাই তাতে মুলতবি।

প্রতিবারই ওদের বাঙালি কমিউনিটি বছরের শেষ রাতটা উদযাপন করে। মিনিয়াপোলিসের কোন একটা বড় হল ওরা ভাড়া করে। আগে নিজেরাই রান্না-বান্না করে কারো বাসায় নিয়ে যেতো। সবাই মিলে জড় হয়ে বছরের শেষ দিনটিকে বিদায় জানাতো। আবার নতুন বছরের প্রথম দিনটিও বরন করে নিতো। সাথে থাকতো তুষার ভাইয়ের গান। তুষার ভাই একসময় বাংলাদেশের ‘ইন ঢাকা’ ব্যান্ডে লিড ভোকাল ছিলেন। এখানে এসেও গানের চর্চাটি ছেড়ে দেন নি। সেইসব নিউ-ইয়ার্স ইভ-এ তিনি গাইতেন। গত বিশ বছরে মিনেসোটায় বাঙালির সংখ্যা বেড়েছে মেলা। কারো বাসায় ঠিক কুলায় না আর। শিল্পীও বেড়েছে অনেক। তাই ঐ হলের ব্যবস্থা। আজ রাতেও তেমনই একটা আয়োজন রয়েছে। তবে তিথি সাফ জানিয়ে দিয়েছে-ওরা যাচ্ছে না। আবিদের সাথে পরামর্শ না করেই এমনটা জানিয়ে দিয়েছে সে। কথাটা জেনে আবিদের একটু মন খারাপ হয়েছে। যদিও সে তেমন কিছু বলে নি। এখানকার গানের অনুষ্ঠানগুলো দারুণ ভালো হয়।

বসে বসেই আবিদ তার ল্যাপটপটা খোলে। ওর সম্প্রতি কর্মচ্যুত অফিসের মেইল বক্সটা খোলে। সে জানে ওর একাউন্ট হয়তো ফ্রিজ করে দেওয়া হয়েছে। সাধারণত চাকরি ছেড়ে দিলে কিম্বা চলে গেলে প্রতিষ্ঠানের কোন চিঠি বা বার্তা পাবার কথা নয়। সে তাঁর ল্যাপটপটা খুলল। ড্যানের ই-মেইল কিম্বা ফোন নম্বরটা দরকার। আজ ভেবেছে ওকে একটা মেইল পাঠাবে কিম্বা ফোন করবে। নতুন বছরের অগ্রিম শুভেচ্ছা জানাবে। পাশাপাশি ওকে বলে রাখতে চায় ওর জানাশোনা কোথাও লোক নিলে যেন তাকে জানায়।

অফিসের আউটলুকের ইনবক্সটা খুলে সে বেশ অবাক হয়। অজস্র মেইল এসে জমে আছে। হয়তো ওরা ছুটির তাড়াহুড়ায় ওর একাউন্ট ফ্রিজ করতে ভুলে গেছে। আনমনে সে গতকালের একটা নিউজ লেটারের মেইলে ক্লিক করে। আর সাথে সাথে ঝলমলে একটা ছবি চোখে পড়ে। ওর কাজের দলের সবাইকেই দেখা যাচ্ছে। মিস্টার ভি-র হাসিটা বিস্তৃত। তবে ওর পাশে দুজন নতুন মুখ উঁকি দিচ্ছে। নিউজ লেটারের বিষয়ে লেখা, ‘আমাদের দলে দুজন নতুন ব্ল্যাক-কাইট (চিল) – মিস্টার ভিএস আচারিয়া এবং এস বাঙ্গারাপ্পা; যাদের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ, সুদূরে প্রসারিত এবং সচল। এদের কর্মক্ষমতা আমাদের দলে বাড়তি গতি আনবে। আমাদের দলে তাদের উষ্ণ স্বাগতম জানাই। সবাইকে বড়দিনের এবং নতুন বছরের অগ্রিম শুভেচ্ছা’।

সাথে সাথেই সাঁ করে একটা শব্দ আবিদের মাথায় ঢুকে যায়। ব্ল্যাক কাইট, মানে ‘চিল’! এইতো সেই দুই অক্ষরের শব্দ, ‘চিল’- একটি পাখি। চটপট চিল শব্দটি বাংলায় লিখে সে গুগুলে সার্চ দেয়। আর তাতেই বেরিয়ে আসে শত শত লিঙ্ক। একটা লিঙ্ক পায়, ‘হায় চিল’ নামে। জীবনানন্দ দাশের কবিতা, হায় চিল, সোনালি ডানার চিল…। ভদ্রলোক কোন এক নরম ভিজে দুপুরে চিলকে বিষণ্ণ গলায় মিনতি করছেন- যেন সে অমন দিনে উড়ে না বেড়ায়! ফু। কোন মানে হয়?

সে কম্বলের নিচ থেকে বেরিয়ে আসে। বেশ আস্থার সাথে পূরণ করে ফেলে শূন্য সেই শব্দের ঘর। পাশাপাশি ওর মাথায় ভাবনাও কাজ করতে থাকে। সে ভাবনা বেশ সুবিন্যস্ত, পরিপাটি। লিখতে লিখতে সে বুঝে যায় কেন ঠিক হলিডের আগে ওর কাজটি চলে যায়। কেন মাত্র সাত দিনেই মিস্টার ভি অপর দুজন লোক নিয়োগ দেয়। নাম দেখে সে কিছুটা আঁচ করে, লোক দুজন ভারতীয়। বলা যায় না হয়তো ব্যাঙ্গালোরেরই কেউ হয়তো। সে আবার ছবির দিকে তাকায়। মিস্টার ভি-এর তীক্ষ্ণ নাক ঠিক যেন চিলের চোখা ঠোঁট! চেহারাটা দেখতে অনেকটা সেই শিকার প্রত্যাশী ধৈর্যশীল পাখির মতোই। এই চেহারার আদল তার অজানা নয়। মাঝে মাঝেই সে চেহারা ঘুমের মধ্যে তাকে ঠুকরে খায়। আঙুলে সজোরে ঠোকর দেয়।

উঠে গিয়ে সে কিছু জিনিস প্রিন্ট করে। গায়ে বেশ কিছু গরম কাপড় চড়িয়ে নেয়। নতুন স্প্রিংফিল্ড এক্সডি ফোর পয়েন্ট ফাইভ  হ্যান্ড গানটা এখনো ব্যবহার করা হয় নি। সেটি কোমরের হোল্ডারে গুঁজে নেয়। কিছুদিন আগেই বেশ কয়েক বক্স গুলি কিনেছিল সে। ঘরে বসে অনলাইনে কিনে নাও। সহজেই চলে আসবে তোমার ঘরের দরজায়। কোন বাধা ছাড়াই। গুলি কেনা এত্তো সহজ! অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আইনের কথা প্রায়ই বলাবলি হয় এখানে। অথচ এমিউনিশন তো হাতের নাগালেই। এটি নিয়ন্ত্রণ না করে খালি খালি তলোয়ারের খাপে ধার দিয়ে কি লাভ? আবিদের হাসি পায়।

বাসা থেকে বেরোনোর ঠিক আগে অনল এসে ওর সামনে দাঁড়ায়। মনে হয় কিছু বলতে চাচ্ছে অনল। কিম্বা ভাবছে, বাবাকে একটু সময় দেবে। ওর মতো এমন সচল মানুষ হঠাৎ করে বসে থাকলে তো অস্বস্তি হবেই। কিন্তু আবিদ এখন কোন কথা শুনতে চাচ্ছে না। ওর দেরি হয়ে যাচ্ছে। সে ছোট্ট করে জিজ্ঞেস করে, কিছু বলবে অনল?

– হুম। বাবা আমি ঠিক করেছি আমি এখানকার মায়ো কলেজেই পড়বো?

– কেন? আমার চাকরি নেই বলে। ওটা নিয়ে তুমি ভেবো না। আই উইল হ্যান্ডেল দ্যাট।ইউ ডু নট নিড টু ওয়ারি ফর দ্যাট।

– না বাবা, ওটার জন্য না। আমি আসলে আন্ডারগ্র্যাডে টপ করতে চাই। এমক্যাট-এ অনেক ভালো স্কোর করতে হবে। এটা আমাকে হার্ভার্ডে বা জন হপকিন্সে পড়তে হেল্প করবে। এই জন্য আমাকে আগামী কয়েক বছর অনেক খাটতে হবে। নর্থ-ক্যারলাইনায় গেলে আমার অনেকটা সময় চলে যাবে খাওয়া, ক্লিনিং এইসব নিয়ে চিন্তা করতে করতে। আমি ফ্যাটেনিং খাবার ঠিক খেতে পারি না। এইসব নিয়ে ভাবলে পড়বো কখন? তাই এইই আমার সিদ্ধান্ত। তোমাকে জানালাম।

আবিদকে কিছু বলার সুযোগ সে দেয় নি। উঠে চলে যায়। ওর কথায় যুক্তি রয়েছে। আবিদ বোঝে ছেলে বড় হয়ে গেছে। নিজের কাছে এ কথা স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে, অনলের এই সিদ্ধান্তে সে খুশিই হয়েছে। অন্তত আজকের পর সে যা করতে যাচ্ছে। অনেকটা অনিশ্চিত একটা সময় ওকে পার করতে হবে। সেদিক থেকে অনলের সিদ্ধান্ত তাকে কিছুটা স্বস্তিই দেয়।

যখন রাস্তায় নামে তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল। ঝকঝকে দিন। দেখলে মনে হবে বুঝি বাইরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক। অথচ মাইনাস তিরিশ ডিগ্রি ফারেনহাইটের প্রকোপে ঠাণ্ডা একেবারে হাড়ের ভিতর গিয়ে লাগে। গাড়ির ভিতরটা বেশ গরম হয়ে আছে। গাড়ি চালাতে বেশ লাগে আবিদের। শব্দ-খেলাটা মিলিয়ে ফেলার পর ওর বেশ ঝরঝরে লাগছে। মাথাটা বেশ হালকা। ভাবনা বেশ পরিষ্কার কাজ করছে। এই সময়গুলোতে আশেপাশের অনেক কিছুই স্পষ্ট হয়ে ওর কাছে ধরা পড়ে।। যেমন বহু বছর আগেই সে বুঝে নিয়েছিলো কেন আম্মার দেখভালের জন্য আলাদা ভাবে নার্সের দরকার হয়ে পড়ে। বাড়িতে তো গ্রাম থেকে আসা লোকের অভাব ছিল না। তারাই ওর মায়ের দেখাশোনা করতে পারতো। সেই নার্স আসার পর ভালো হওয়ার বদলে আম্মা ধীরে ধীরে আরও নুয়ে পড়লেন। মা মারা যাবার পর অল্প বয়সী সেই মহিলাকেই মাজেদ সাহেব বিয়ে করে ফেললেন। তাঁর চেহারাটা ধীরে ধীরে চোখা ঠোঁটের পাখির মতো হয়ে যেতে থাকে। এরশাদ সাহেব যতদিন জেলে ছিলেন ভালোই ছিলেন ওরা। জেল থেকে ছাড়া পাবার পর থেকে মাজেদ সাহেবের হাইপার টেনশন দেখা দেয়। পরপর দুবার হার্ট অ্যাটাক হয়ে যায় তাঁর। সেই মহিলাকে মাজেদ সাহেব যে বাসা কিনে দিয়েছিলেন তাতেই একসময় তিনি অবাঞ্ছিত হয়ে পড়েন। প্রায়ই এরশাদকে দেখা যেতো সেখানে। শোনা যায়,মাজেদ সাহেবের মতো এরশাদ সাহেবের কাছের অনেক লোকেরই নাকি একাধিক বিয়ে। কারোটা স্পষ্ট, আবার কারোটা প্রচ্ছন্ন।  এদের সবার বাসাতেই তাঁর অনায়েশ যাতায়াত। সেখানে দিন কিম্বা রাত্রির সীমানা পরিষ্কার ভাবে দাগ কাটা থাকে না। অংক কষে কষে ওর মন অনেক কিছুই বুঝে নিয়েছিলো, যেমনটা আজও বোঝে সে।।

এখানে এসে নিজের স্ট্যাটাস বদলে ছাত্র হয়ে যায়। তখন বিষয়টা অতো কঠিন ছিল না। এক বছর মন দিয়ে লেখাপড়া করে। জিপিএ ভালো রাখার দরকার ছিল তার। এরপর হুট করে দেশে গিয়ে সরাসরি তিথির সাথে দেখা করে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। অথচ ওর বিয়ের সব কিছু ঠিক। আত্মীয় স্বজন আসতে শুরু করেছে। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই তিথি চলে আসে মিনেসোটায়। মা মারা যাবার পর তার আর তেমন পিছু টান থাকলো না। কেবল সিটিজেন হওয়ার সময় ‘আরিফ’ নামটা পাল্টে ফেলে সে। আবার আগের আবিদ নামে চলে যায়। এটা অ্যামেরিকাতেই সম্ভব। শুধু তাই নয় সে তার বাবার ‘রহমান’ উপাধি খসিয়ে নামের শেষে মায়ের ‘বিশ্বাস’ জুড়ে নেয়।

ঘ্যাশ করে এস্কেপটা পারকিং-এ থামিয়ে আবিদ বেরিয়ে আসে। কিছুক্ষণের মাঝেই একটি একতলা বিল্ডিংয়ে ওকে ঢুকতে দেখা যায়। সাথে নেয় গুলির পুরো বাক্স। তার মাঝে কোন অস্থিরতা দেখা যায় না। 

আবিদ দাঁড়িয়ে আছে লম্বা একটা ঘরের মধ্যে। কানে-মাথায় শব্দ নিরোধক হেডসেট। চোখে স্বচ্ছ চশমা। হাতে তার নব্য ক্রিত লোডেড স্প্রিংফিল্ড এক্সডি ফোর পয়েন্ট ফাইভ। এটি একটি শুটিং অনুশীলনের জায়গা। আস্তে আস্তে ব্যাগ থেকে ওর বিশেষ টার্গেটটি বের করে। ক্লিপে তা আটকিয়ে দেয়। ওর আজকের টার্গেটটা কিছুটা অদ্ভুত। নিচের অংশটি একটি পাখির শরীর, কালো একটা অবয়ব। অনেকটা নিচ থেকে দেখা উড়ে চলা চিলের মতোই। আর মাথায় সে বসিয়েছে মিস্টার ভি-এর চেহারাটা। ধীরে ধীরে টার্গেটটা দূরে সরে যায়। সেটা স্থির হয়ে গেলে আবিদ তাতে নিশানা ঠিক করে। একটু সময় নেয়। তারপর দুম দুম করে পুরো ম্যাগজিন খালি করে দেয়। লক্ষ্যটি মুহূর্তেই ঝাঁঝরা হয়ে যায়। সবগুলো গুলি লেগেছে মিস্টার ভি-র মুখে গিয়ে। ওর হাতের টিপ এখনো অব্যর্থ।

বাইরে বেরিয়ে কফির নেশা বোধ করে আবিদ। আরবান বীন কফি শপে গিয়ে একটা ব্ল্যাক ক্যাপাচিনো অর্ডার দেয় সে। তারপর ফোনটা খোলে। দেখে দুটা মিসড কল। একটা টেক্সট। ওটাও তিথির। সে লিখেছে, কল মি।

ফোন করার পর তিথি যা জানালো তা এই রকম, কদিন আগেই মেসিস এ যে ইন্টার্ভিউটা দিয়েছিলো আজ ওখান থেকে ওরা ফোন করেছিলো। জানুয়ারির পাঁচ তারিখ থেকে যোগ দিতে বলেছে। প্রথম তিন মাস প্রবেশন, তারপর কনফার্ম। তারমানে ফুল বেনিফিট।

কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে আবিদ উবারে লগ ইন করে। নেট ওয়ার্কে সে তার প্রাপ্যতার তথ্য দেয়। মানে, হি ইজ এভেইলেবল নাও। আর কী আশ্চর্য! কফি শেষ করার আগেই ক্রমাগত ওর কাছে অনুরোধ আসতে থাকে। সে উঠে পড়ে। ওর হাতের ডাফেল ব্যাগটা পেছনের ট্রাঙ্কে রাখে। তিথিকে ‘ফিরতে অনেক রাত হবে। হ্যাপি নিউ ইয়ার’- টেক্সট লিখে সোজা ড্রাইভিং সিটে বসে পড়ে সে। এখন কাজের সময়।

এরপরের বেশ কয়েক ঘণ্টা আবিদ টুইন সিটির এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত ঘুরে বেড়ায়। উবারের গাড়ি চালক হয়ে গেছে সে।  নিউ ইয়ার্সে প্রায় সারা রাত মানুষ জেগে থাকে। পার্টি শেষে গাড়ি চালাতে ভরসা পায় না ওরা। পা টলতে থাকে।  উবারেই নির্ভর করে অনেকেই। সন্তু ঠিকই বলে, ‘সম্ভাবনা কখনো শেষ হয়ে যায় না’।

গাড়ি চালাতে চালাতে আবিদ মধ্যরাতের মিনিয়াপোলিসের পথ দেখে। অরাকে কিনে দেওয়া দূরবীনটা ড্যাশ বোর্ডের ড্রয়ারেই ছিল। বাসায় নিতে ভুলে গেছে। তা দিয়ে দূরের পরিস্কার আকাশ দেখে সে। ওখানে একটিও কালো ঘুড়ি নজরে আসে না তার। পথের দুপাশে জমে থাকা আদিগন্ত বিস্তৃত খোলা ময়দান। সেখানে জমেছে সাদা সাদা বরফ। তুলোর মতো সে জমাট জলকণা রাতের বেলায় অপার্থিব এক দ্যুতি তৈরি করে। প্রহেলিকার মতো সে আলো মনের মাঝে ভ্রম তৈরি করে। যেন অন্য এক আলো; কোথাও অন্ধকার নেই। তুষারাবৃত কোন রাতকেই ঠিক কালো বলে মনে হয় না।

আবিদ গ্যাসে চাপ বাড়ায়।  

(শেষ)

কমেন্ট করুন

আসাদুজ্জামান পাভেল

সেশনঃ ১৯৮৯ - ১৯৯০

0