কূটনৈতিক আলাপে বঙ্গবন্ধু

বঙ্গবন্ধুর প্রথম বিদেশ সফর   

১৯৫২ সালে যখন ভাষা আন্দোলন চলছিল বঙ্গবন্ধু তখন জেলে ছিলেন। অবশ্য তাঁর জীবনের অধিকাংশ সময়ই জেলে কাটে। তিনি আয়ু পেয়েছিলেন মাত্র ৫৪ বছর ৫ মাস, এই অল্প আয়ুর চারভাগের একভাগ সময়ই তাঁর জেলে কাটে। তবে বঙ্গবন্ধুর জেল জীবন বাঙালি জাতির জন্য আশীর্বাদই বলতে হবে। এই জেলে থাকাকালীন সময়েই হয়তো তিনি তাঁর জীবনের বড় বড় সিদ্ধান্তগুলি নিয়েছিলেন। তাছাড়া, বঙ্গবন্ধুর লেখা যে বইগুলি বর্তমান সময়ে বের হচ্ছে তা ঐ সময়েই লেখা।  

ভাষা আন্দোলনের পরপর জেল থেকে ছাড়া পেয়ে দল গোছানোর কাজে লেগে পড়লেন। ঠিক ঐ বছরের সেপ্টেম্বর মাসের ১৫ বা ১৬ তারিখে খবর এলো দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলির প্রতিনিধিরা শান্তি সম্মেলনে যোগদান করবে। পাকিস্তান থেকে মোট ৩০ জন আমন্ত্রিত। এর মধ্যে পূর্ব বাংলার ভাগে পড়েছে মাত্র ৫ জন। তাঁরা হলেন আতাউর রহমান খান, ইত্তেফাক সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াঁ, খন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস, ইবনে হাসান এবং বঙ্গবন্ধু।

একদিকে যেমন ছিল পয়সার অভাব, তার উপর দিয়ে পাকিস্তান সরকার এই মানুষগুলোর উপর মহাবিরক্ত। পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর ধারণা ছিল, কমিউনিস্ট নাহলে কি এরা এমনি এমনি চীনদেশে যেতে চায়! যদিও বঙ্গবন্ধু তখন পর্যন্ত কোন প্রকার সমাজতন্ত্রের বাতাস গায়ে লাগান নাই। টিকিটের টাকাটা শান্তি সম্মেলনের কাছ থেকেই পাওয়া গেল, এরপর ছিল পাসপোর্ট করার পালা। বেশ দৌড়াদৌড়ি করেও খুব বেশি কাজ হয়নি। ১৯৫২ সালের সেপ্টেম্বরের ২৪ তারিখ ফ্লাইটের দিন ধার্য ছিল। ২২-২৩ তারিখের দিকেই বঙ্গবন্ধুসহ বাকিরা এক রকম হালই ছেড়ে দেয়। পাসপোর্ট শেষ পর্যন্ত পাওয়া গেল ২৪ তারিখ। ততক্ষণে অবশ্য ফ্লাইটের সময় শেষ! 

তবে বেশ কিছুক্ষণ পর খবর এলো প্লেন ২৪ ঘণ্টা লেট। এর মাঝে মানিক মিয়াঁ যাবেননা বলে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু তাঁর স্বভাবসুলভ কথার মারপ্যাঁচে মানিক মিয়াঁকে পরাস্ত করে সফরসঙ্গী করে ফেললেন।  

প্লেন প্রথমে রেঙ্গুনে পৌঁছাল, এরপর সেখানে বিকাল ও রাত থাকতে হয়েছিল। রেঙ্গুনে যখন বঙ্গবন্ধু পৌঁছালেন তখন তৎকালীন বার্মা সম্পর্কে তিনি যে বিবরণ দিয়েছেন তাতে বোঝা যায় দেশটির অবস্থা খুব একটা ভালো ছিলোনা। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে অন্তঃকলহ, রাজনৈতিক অস্থিরতা, চুরি–ডাকাতি ছিল নিত্যদিনকার ব্যাপার। মজার ব্যাপার হলো সেসময় সেখানকার বাঙ্গালিদের বেশ সরব উপস্থিতিই ছিল। রেঙ্গুন থেকে বঙ্গবন্ধু যাত্রা করলেন থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে। ওখানে ছিলেন মাত্র একঘণ্টা । এরপর সেখান থেকে আকাশপথে পৌঁছালেন হংকং। এই শহরটিকে বঙ্গবন্ধু খুব ভালোচোখে দেখেননি। তাঁর মতে শহরটির নামকরণ হওয়া উচিৎ ছিলো ঠগীবাজের শহর। বঙ্গবন্ধু হংকং সম্পর্কে বলেছেন, 

“হংকং এত পাপ সহ্য করে কেমন করে, শুধু তাই ভাবি।”

চীনের বেইজিং- এ অনুষ্ঠিত এশিয়া-প্যাসিফিক রিম শান্তি সম্মেলনে পাকিস্তানের উদীয়মান জননেতা শেখ মুজিবুর রহমান (অক্টোবর ২-১২, ১৯৫২)।

বঙ্গবন্ধু হংকং থেকে রেলগাড়িতে ২৭ তারিখ পৌঁছালেন চীনের ক্যান্টন শহরে। তিনি একপ্রকার বিস্ময় নিয়েই চীনকে দেখতে লাগলেন। একটু পরপরই নানা বিষয়ে মুগ্ধ হতে থাকলেন। বেশ বড় রকমের মানসিক পরিবর্তন ঘটেছিল বঙ্গবন্ধুর চীন সফরে গিয়ে। চীন সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন,

“আফিং খাওয়া জাত যেন হঠাত ঘুম থেকে জেগে  উঠেছে। আফিং আর কেউ খায়না, আর ঝিমিয়েও পড়েনা। মনে হলো এ এক নতুন দেশ, নতুন মানুষ।”

চীনের বেশ কয়েকটি স্থান ঘুরে ঘুরে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর। এর মধ্যে ক্যান্টন শহরকে তিনি বাংলাদেশের মতোই সুজলা সুফলা বলেছেন। নয়া  চীনের মানুষের কর্মোদ্যম মানসিকতা, চীন সরকারের সাধারণ জনগণের প্রতি কমিটমেন্ট বঙ্গবন্ধুকে নতুন ভাবে ভাবতে শিখিয়েছিল। চীন সফরের অনেক অভিজ্ঞতা যে তিনি কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন তা তাঁর পরবর্তী কর্মকাণ্ড থেকেই বোঝা যায়। প্রথমত, চীনারা নিজেদের ভাষার প্রতি অগাধ শ্রদ্ধাশীল। সেই শান্তি সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু পুরো ভাষণ বাংলায় দিয়েছিলেন। আতাউর রহমান খান সেটির ইংরেজি অনুবাদ করেছিলেন যাতে অন্যরা বুঝতে পারে। পরবর্তীতে জাতিসংঘের সম্মেলনেও তিনি বাংলায় ভাষণ দেন। 

দ্বিতীয়ত, চীনের বিপ্লবের পরবর্তী সময়ে অনেককিছুই জাতীয়করণ করা হয়। তিনি সেখানে দেখতে পেয়েছিলেন চীনের বিভিন্ন শিল্প কারখানা মালিক-শ্রমিক-রাষ্ট্র এক হয়ে পরিচালনা করে। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুকে বাংলাদেশে একই পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়। 

দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই ১৯৭২ সালের ২৬ জুলাই বাংলাদেশে গঠন করা হয় ‘জাতীয় শিক্ষা কমিশন’। ১৯৭৪ সালের মে মাসে কমিশনের নামটি তৎকালীন কমিশনের সভাপতি কুদরত-এ-খুদা’র নামে নামকরণ করা হয়। দুঃখজনক হলেও সত্যি কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশন আজও বাস্তবায়িত হয়নি। বঙ্গবন্ধু চীন সফরে চীনের নতুন শিক্ষা পদ্ধতি দেখে অভিভূত হন। তিনি আবিষ্কার করেন চীনারা নিজস্ব পদ্ধতিতে জাতিকে শিক্ষিত করছে। পরবর্তীতে কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশন গঠন করার  সময় বঙ্গবন্ধু চীনের শিক্ষা ব্যবস্থা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন এরকমটা ধারণা করা যেতেই পারে। 

চীনের আরেকটি ব্যাপার তাঁর চোখে ধরা পড়েছিল। জাতি ও ধর্মের ব্যাপারটি সম্পূর্ণ আলাদা। তিনি দেখতে পেয়েছিলেন চীনে যার যার ধর্ম সে সে পালন করছে। তৎকালীন সময়ের কিছু ধার্মিকদের কাছে তিনি এ ব্যাপারে তথ্য যাচাইও করেছিলেন। অবশ্য বর্তমান চীনের সাথে সেই সময়ের চীনের যে মিল নেই তা বঙ্গবন্ধুর বর্ণনা থেকেই বোঝা যায়।

উপরি পাওনা হিসেবে চীন সফরে অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিদের সাথে বঙ্গবন্ধুর দেখা হয়েছিল। এদের মধ্যে ছিলেন জনপ্রিয় সাহিত্যিক আইজ্যাক আজিমভ এবং তুরস্কের বিখ্যাত কবি নাজিম হিকমত। 

ব্রিটিশ ভারতে জন্মগ্রহণ করায় তিনি একসময় ছিলেন ভারতের নাগরিক। দেশভাগের পর পাকিস্তানের, দেশ স্বাধীন করার পর বাংলাদেশর। তাই বিদেশ সফর বলতে যা বোঝায় তা বঙ্গবন্ধুর জীবনে প্রথম ঘটেছিল চীনের মাধ্যমে। এই সম্মেলনে শেখ মুজিবুর রহমান শিখেছিলেন কীভাবে নতুন জাতি গঠিত হয়, কীভাবে মানুষদের উজ্জীবিত করতে হয়, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কিভাবে কথা বলতে হয়। এই উপলব্ধির প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। তাঁর মনোজগতের যে বিশাল পরিবর্তন হয়েছিল তা বোঝা যায় নিচের উক্তির মাধ্যমে- 

“চীন সরকার নিজেকে কমিউনিস্ট সরকার বলে ঘোষণা করে নাই, তাঁরা তাদের সরকারকে ‘নতুন গণতন্ত্রের কোয়ালিশন সরকার’ বলে থাকে। কমিউনিস্ট ছাড়াও অন্য মতাবলম্বী লোকও সরকারের মধ্যে আছে। যদিও আমার মনে হলো কমিউনিস্টরা নিয়ন্ত্রণ করছে সকল কিছুই। আমি নিজে কমিউনিস্ট নই। তবে সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করি এবং পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে বিশ্বাস করিনা। একে আমি শোষণের যন্ত্র হিসাবে মনে করি।”

স্বদেশ প্রত্যাবর্তন এবং ভারতীয় সেনা প্রত্যাহার

পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী বঙ্গবন্ধুকে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। দেশ স্বাধীন হয়ে গেলেও দেশের কী অবস্থা বঙ্গবন্ধু তখনো জানতেন  না। মুক্ত হওয়ার প্রথম প্রহরে তিনি ঠিক কী ভাবছিলেন অনুমান করা কঠিন। দেশ তাঁর নামে স্বাধীন হলেও মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময় কারারুদ্ধ থাকায় দেশের সার্বিক পরিস্থিতি কেমন, তা তাঁর বোঝার কথা না। 

১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি ভোরে তিনি লন্ডনে উপস্থিত হন। দেশের সকল মানুষ তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিল। লন্ডন থেকে ভারত হয়ে বাংলাদেশে আসার কথা। এজন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাঁর জন্য এয়ার ইন্ডিয়া বা ভারতীয় বিমান বাহিনীর একটি বিমানের ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেন। নির্দেশ মোতাবেক বঙ্গবন্ধুকে ভারতীয় হাই কমিশন বঙ্গবন্ধুকে এ প্রস্তাব দেয়। কিন্তু বঙ্গবন্ধু এই প্রস্তাব গ্রহণ করেননি। এখানেই বঙ্গবন্ধুর দূরদৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। তিনি যে ভারতের উপর নির্ভরশীল কোন পুতুল নন এই বার্তা তিনি প্রথমেই জনগণকে দিতে চেয়েছিলেন।

বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন

লন্ডনের হিথ্রো বিমান বন্দরে পৌঁছান ভোর ছয়টার সময়। এরপর সেখান থেকে লন্ডনের প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথের সাথে দেখা হয় তাঁর সরকারি বাসভবন ১০ নং ডাউনিং স্ট্রিটে। ইন্দিরা গান্ধীর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার পর অবশ্য নতুন এক চ্যালেঞ্জ আসে ইন্দিরার সামনে। নতুন চ্যালেঞ্জটি ছিল বঙ্গবন্ধুকে জেট বিমানে করে ভারতে পৌঁছে দেওয়ার ব্যাপারে যুক্তরাজ্যকে রাজি করানো। কারণ তখনও যুক্তরাজ্য বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি। এই কূটনীতিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী সফল হয়। বাংলাদেশকে তখন যুক্তরাজ্যের স্বীকৃতি দেওয়া ছিল সময়ের ব্যাপার।

লন্ডন থেকে ফেরত আসার সময় বঙ্গবন্ধুর সফরসঙ্গী ছিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠ ড. কামাল ও তাঁর স্ত্রী এবং ভারতীয় হাই কমিশনের কর্মকর্তা শশাঙ্ক শেখর ব্যানার্জী ও ফার্স্ট সেক্রেটারি ভেদ মারওয়া। তিনি তাঁর ভারতীয় সফরসঙ্গীদের দুই ধরনের বার্তা দিয়েছিলেন। এক, তাঁর এবং বাংলাদেশের পরিচয় ঠিক কী হবে তার সঠিক ধারণা। তিনি জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশের মানুষের প্রথম পরিচয় অধিকাংশ জনগণ বাঙালি এবং দ্বিতীয় পরিচয়টি হলো তারা অধিকাংশ মুসলিম। এ দুটি পরিচয় নিয়েই বঙ্গবন্ধু গর্বিত ছিলেন। এ থেকে ভারতীয়দের একটা বার্তা দেওয়া হয়েছিল পশ্চিম বাংলার সাথে পূর্ব বাংলার একটা পার্থক্য আছে। যার ফলে তৎকালীন সময়ে দুই অঞ্চলের এক হওয়া, না হওয়ার প্রশ্নটির একটি উত্তর পাওয়া যায়। পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধু অবশ্য বলেছিলেন, এই ভূখণ্ড ছাড়া তার এক ইঞ্চি জমিও বেশি দরকার নাই। দুই নম্বর বার্তাটি ছিল বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহার করা। বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন যত দ্রুত সম্ভব ভারতীয় সেনারা যাতে বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যায়। এ বিষয়টি ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ ব্যাপারটি বুঝতে হলে আমাদের কাশ্মীর সমস্যায় যেতে হবে। 

পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে লন্ডনের ক্লেরিজেস হোটেলের প্রেস কনফারেন্সে বিশ্ব মিডিয়ার মুখোমুখি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (৮ জানুয়ারি, ১৯৭২)
লন্ডনের ১০ নং ডাউনিং স্ট্রিটে বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে অভ্যর্থনা জানাচ্ছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ। (জানুয়ারি, ১৯৭২)
লন্ডনের ক্লেরিজেস হোটেলের উদ্দেশ্যে ড. কামালের সাথে যাত্রা করেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, (৮ জানুয়ারি, ১৯৭২)

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা যখন বিদায় নেয় তখন তাদের অধীনে থাকা ৫৬২টি প্রিন্সলি স্টেটকে তারা ভারত অথবা পাকিস্তানে থাকতে বলে। এর মধ্যে কয়েকটি স্টেট স্বাধীন থাকতে চেয়েছিল। এরকমই একটি প্রিন্সলি স্টেট ছিল কাশ্মীর। সেখানকার রাজা হরি সিং ছিল হিন্দু, কিন্তু সেখানকার অধিকাংশ জনগণ ছিল মুসলিম। হরি সিং চেয়েছিলেন কাশ্মীর স্বাধীন থাকবে  অথবা ভারতের সাথে সংযুক্ত হবে। অন্যদিকে জম্মু এবং পশ্চিম বালতিস্তানের মুসলিমরা চেয়েছিল পাকিস্তানের সাথে যোগ দিতে। রাজার বিরুদ্ধে যাওয়া বিদ্রোহী জনগণ পাকিস্তানের সাহায্য নিয়ে নিজেদের স্বাধীন ঘোষণা করে। যে অংশটি এখন আজাদ কাশ্মীর নামে পরিচিত। বিদ্রোহ দমন করার জন্য হরি সিং ওখানকার বিখ্যাত নেতা আব্দুল্লাহর সাথে সমঝোতায় রাজি হন। আব্দুল্লাহ ছিলেন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নেহ্‌রুর বন্ধু। হরি সিং ভারতের সহযোগিতায় বিদ্রোহীদের দমন করার জন্য ভারতের সাথে চুক্তিবদ্ধ হতে বাধ্য হন। বর্তমানে ভারতে যে ৩৭০ ধারা এবং ৩৫এ অনুচ্ছেদ নিয়ে যে তোলপাড় চলছে তা ঐ সময়েরই ফসল। 

ভারত পাকিস্তান যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে আন্তর্জাতিক মহল নড়ে চড়ে বসে। যুদ্ধ থেমে যাওয়ার পর ভারত ও পাকিস্তান তাদের সেনা প্রত্যাহারে অস্বীকৃতি জানায়। একটা অংশ থাকে পাকিস্তানের, আরেকটি অংশ ভারতের। ১৯৬২ সালে ভারত-চীনের যুদ্ধের পর কাশ্মীরের কিছু অংশ আকসাই-চীন নামে চীনের হয়ে যায়। এর কিছুদিন পর পাকিস্তান বন্ধুত্ব স্বরূপ চীনকে কারাকোরাম অংশটি চীনকে হস্তান্তর করে। যুদ্ধ, অবিশ্বাসের খেলায় স্বাধীনতাকামী কাশ্মীরের জনগণ আজ তিন দেশে বিভক্ত।

এবার মুল ঘটনায় ফেরা যাক। বঙ্গবন্ধু কিন্তু কাশ্মীরের ব্যাপারটা নিয়ে খুব ভালো ভাবেই ওয়াকিবহাল ছিলেন। তিনি খুব ভালো করেই জানতেন কাশ্মীরের পরিণতি, তাঁর চোখের সামনেই সকল ঘটনা ঘটে গেছে। তাই তিনি সবার আগে ভারতীয় সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখেন। ১৯৭২ সালের ৩০ জুন ভারতীয় সেনা প্রত্যাহারের কথা থাকলেও ইন্দিরা গান্ধীর কাছে কৌশলে ৩১ মার্চের মধ্যে সেনা প্রত্যাহারে প্রতিশ্রুতি নিতে সক্ষম হন। এটি ছিলো বঙ্গবন্ধুর প্রথম কূটনৈতিক বিজয়। 

বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন

স্বাধীনতার প্রথম প্রহরে কূটনীতি 

সদ্য স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশের সামনে চ্যালেঞ্জ ছিল অনেকগুলি। তবে প্রায় সবগুলো চ্যালেঞ্জ কূটনৈতিক কারণে মোকাবেলা করা সহজ হয়েছে, আবার কূটনৈতিক কারণে পরিস্থিতি জটিলও হয়েছে। এর মধ্যে ভারতের সাথে বাংলাদেশের সাথে চুক্তিগুলো বেশ স্পর্শকাতর। কারণ, মুক্তিযুদ্ধ শেষ হওয়ার সাথে সাথেই কিছু রাজনৈতিক দল ভারত বিরোধী অবস্থান নেয়। যার ফলে ভারতের সাথে যেসব চুক্তি হয় সেগুলোকে অনেকে যৌক্তিক ভিত্তি ছাড়াই ভারতের দাসত্ব বলে অভিহিত করা শুরু করে। বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন ১৭ মার্চ, ১৯৭২ তারিখে ঢাকা আসেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। বঙ্গবন্ধুর ইচ্ছানুসারেই ভারতের সাথে যৌথ বিবৃতি এবং চুক্তি করা হয়। এ চুক্তিটি ছিল ১৯৭১ সালের ৯ আগস্ট ভারত-সোভিয়েত ইউনিয়ন চুক্তির আদলে করা। দুটো চুক্তিতেই একই সংখ্যক ধারা এবং ভাষা ব্যবহার করা হয়। পার্থক্য ছিল মেয়াদে, ভারত-সোভিয়েত চুক্তিটির মেয়াদ ২০ বছর, আর ভারত-বাংলাদেশ চুক্তিটির ২৫ বছর মেয়াদ ছিল। চুক্তিটির মধ্যে কিছু অংশ ছিল সামরিক চুক্তি, যেমন- “কোন এক পক্ষের বিরুদ্ধে তৃতীয় কোন পক্ষ যুদ্ধে লিপ্ত হলে চুক্তিকারী পক্ষ তৃতীয় পক্ষকে সাহায্য দিবেনা।”

ঐতিহাসিক মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি স্বাক্ষরকালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (১৬ মে, ১৯৭৪)

আবার এই চুক্তিতেই যৌথ নদী কমিশন গঠন করা বা ট্রানজিট ও সীমান্ত বাণিজ্যের ব্যাপারে কথা বলা হয়। এই চুক্তিটি ১৯ মার্চে ভারত-বাংলাদেশের যৌথ ঘোষণায় স্বাক্ষরিত হয়। এরপর অবশ্য মার্চের শেষের দিকে ভারত বাংলাদেশ বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। 

পাকিস্তানের স্বীকৃতি

অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে পাকিস্তানের স্বীকৃতি কেন দরকার ছিল? ৯৩ হাজার যুদ্ধবন্দিদের বঙ্গবন্ধু কেন ফিরিয়ে দিয়েছিল? বঙ্গবন্ধু কেন সাধারণ ক্ষমা করেছিলেন?

এসব প্রশ্নগুলো তীক্ষ্ণগোছের, কিন্তু এর উত্তরগুলো অত্যন্ত জটিল। আন্তর্জাতিকভাবে পাকিস্তান বেশ দুর্বল অবস্থানে চলে যায়। আবার যুদ্ধে এভাবে পরাজয় তাদের পক্ষে হজম করাও বেশ কঠিন ছিল।   

প্রথম প্রশ্নে আসি, পাকিস্তানের স্বীকৃতি তখন কি খুব দরকার ছিল? উত্তর হলো – হ্যাঁ! কারণ, পাকিস্তানের মিত্রদের ফলে জাতিসংঘ বা মুসলিম বিশ্বের সংস্থা ওআইসির সাথে যুক্ত হওয়া সম্ভব হচ্ছিলনা। আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশ অপেক্ষাকৃত দুর্বল অবস্থানে ছিল। পাকিস্তান আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশকে  বিপাকে ফেলার অনেকগুলি ফন্দি আঁটে। এর মধ্যে চাকমা রাজা ত্রিদিব রায়ের ঘটনা বেশ চমকপ্রদ! মুক্তিযুদ্ধের সময় চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় পাকিস্তানের পক্ষ নেয়। বাংলাদেশ প্রথম জাতিসংঘের সদস্য আবেদন করে ১৯৭২ সালে। ভুট্টো বাংলাদেশকে বিশ্বের মাঝে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য রাজা ত্রিদিব রায়কে পাকিস্তানের প্রতিনিধি হিসেবে পাঠান। বঙ্গবন্ধু এই কূটচাল টের পেয়ে রাজা ত্রিদিব রায়ের মা বিনীতা রায়কে বোঝানোর চেষ্টা করেন এবং তাঁকে নিউইয়র্কে পাঠান।  যাতে ত্রিদিব রায় দেশে ফিরে এসে পাকিস্তানের পরিবর্তে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করে। অবশ্য ত্রিদিব রায় একথা শুনে নাই। 

এখানে, একটা কথা না বলে পারছিনা, শুধুমাত্র ত্রিদিব রায়ের কারণে অনেকেই আদিবাসীদের রাজাকার বা পাকিস্তানপন্থী বলে চিহ্নিত করার চেষ্টা করে। অথচ আদিবাসীদের মধ্যে বিশাল একটা অংশ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। অনেকেই শহীদ হয়েছেন, তবে খেতাব প্রাপ্ত হলেন একজন ইউ কে চিং মারমা। 

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সিমলা চুক্তিটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। যদিও চুক্তিটি হয় ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে। বঙ্গবন্ধু বুঝতে পেরেছিলেন মুসলিম বিশ্বের স্বীকৃতি পাওয়া বেশ কঠিন হয়ে যাচ্ছে কারণ পাকিস্তান স্বীকৃতি দিচ্ছিলনা।

জুলফিকার আলি ভুট্টো এবং ইন্দিরা গান্ধীর সিমলা চুক্তি (২ জুলাই ১৯৭২)

১৯৭২ সালের ৯ জুলাই ভারতের সিমলায় ইন্দিরা-ভুট্টো বৈঠকের সিমলা চুক্তি হয়। সিমলা চুক্তিতে বাংলাদেশ বিষয়ে যেসব সিদ্ধান্ত ছিল তা হলো – 

“সব যুদ্ধবন্দিকে পাকিস্তান ফেরত পাঠানো হবে। বাংলাদেশের পক্ষ হয়ে ভারত জানিয়ে দিচ্ছে যে যুদ্ধাপরাধের কোনো বিচার হবেনা।”

পরবর্তীতে জুলফিকার আলি ভুট্টো বাংলাদেশে প্রতিনিধি দল পাঠায়। সেখানে সে উল্লেখ করে পাকিস্তান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিবে। এরই ফলশ্রুতিতে পাকিস্তান বাংলাদেশকে ১৯৭৪ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি স্বীকৃতি প্রদান করে এবং ২৭ ফেব্রুয়ারি লাহোরে অনুষ্ঠিত ওআইসির সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু যোগদান করেন। এপ্রিল মাসে বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে একটি ত্রি-পক্ষীয় চুক্তি সই হয়। সেই চুক্তি অনুসারে বাংলাদেশ যুদ্ধাপরাধীদের ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। বিনিময়ে পাকিস্তানে আটকে পড়া বাঙ্গালিরা মুক্তির স্বাদ পায়। এ পদক্ষেপ নিতে বঙ্গবন্ধুকে বেশ মনোবেদনার মধ্যে যেতে হয়। তিনি চুক্তি সই করার পর দিল্লি থেকে ফিরে এসে ড. কামাল হোসেনকে বলেছিলেন,

“বাঙালিরা উদারতা দেখিয়েছে। এই অঞ্চলে একটা নতুন ধারার সৃষ্টির জন্য আমরা সর্বোচ্চ ছাড় দিয়েছি। কিন্তু, আমি ভাবছি, জীবনে এই প্রথমবারের মতো আমি জনগণকে দেওয়া ওয়াদা রাখতে পারলাম না। আমি বলেছিলাম বাংলাদেশের মাটিতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবে। আমি আমার কথা রাখতে পারিনি। আশা করি এই সিদ্ধান্ত জনগণের জন্য ভালো কিছু নিয়ে আসবে।” 

লাহোরে মুসলিম রাষ্ট্রসমূহের ওআইসি সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (২৩ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৪)

অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে শেষমেশ পাকিস্তানের স্বীকৃতি পাওয়া গেলো। কিন্তু এই স্বীকৃতি পাওয়ার পথটিই বন্ধুর ছিল। খোদ আওয়ামীলীগের মধ্যেই অনেক মতভেদ ছিল। লাহোরে সম্মেলনে যোগ দেওয়ার আগে দলের প্রধান প্রধান নেতাদের নিয়ে বঙ্গবন্ধুর  বৈঠক হয়। অনেকেই পাকিস্তানে যাওয়াটা সমর্থন করছিলেন না। ভাবছিলেন এ ব্যাপারে ভারত বেজার হবে। ভারতকে না জানিয়ে কাজটা করা ঠিক হবেনা জানিয়ে জ্যেষ্ঠ নেতারা বঙ্গবন্ধুকে দিল্লি হয়ে পাকিস্তান যাওয়ার পরামর্শ দেন। এব্যাপারে বঙ্গবন্ধু রেগে যান। তৎকালীন সংসদের চিফ হুইপ শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন (বর্তমানে বিএনপির ভাইস প্রেসিডেন্ট) বলেন,

“বঙ্গবন্ধু টেবিল চাপড়িয়ে রীতিমতো ক্রুদ্ধ কণ্ঠে চিৎকার করে উঠলেন, আমি কারও মাখা তামাক খাই যে আমাকে মাঝ পথে নেমে কারও মত নিতে হবে? তোমরা ভেবেছ কী? আমাদের স্বাধীন সার্বভৌম দেশ। কী করব, না করবো আমরাই সাব্যস্ত করব। কাউকে ট্যাক্স দিয়ে চলার জন্য দেশ স্বাধীন হয়নি। পিন্ডির গুহা থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়ে আমরা দিল্লির গর্তে ঢুকব- আমার জীবদ্দশায় তা হবেনা। তোমরা যে যা মনে কর, আমি ইসলামাবাদ যাব এবং সরাসরি যাব – দিল্লি থামব না।”

 জাতিসংঘে বাংলাদেশ

১৯৭২ সালে বাংলাদেশ জাতিসংঘে সদস্য হওয়ার জন্য আবেদন করলে চীন ভেটো দেয়। সেই যাত্রায় বাংলাদেশ আর জাতিসংঘের সদস্য হতে পারেনা। বাংলাদেশ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সদস্য হয় ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর। ঐ অধিবেশনেই বঙ্গবন্ধু প্রথমবারের মতো জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ দিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেন।  

জাতিসংঘের মহাসচিব কুর্ট ওয়াইল্ডহেমের সাথে আলোচনারত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (২৭ নভেম্বর, ১৯৭২)
নিউইয়র্কে জাতিসংঘের ২৯তম সাধারণ অধিবেশনে বাংলায় ভাষণ দিচ্ছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বিশ্ব দরবারে বাংলা ভাষায় এটিই প্রথম ভাষণ (২৪ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৪)

আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো, যুদ্ধে পাকিস্তানের ইজ্জত যাওয়ার পাশাপাশি তারা অর্থনৈতিকভাবে চরম পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়। বিশ্বব্যাংকের দেনায় পড়ে গিয়ে একসময় দেনা শোধে অস্বীকৃতি জানায়। বিশ্বব্যাংক যেহেতু পাকিস্তানের মিত্ররাই চালাতো তাই খুব স্বাভাবিক ভাবেই পাকিস্তানের প্রতি বিশ্বব্যাংক বেশ সহানুভূতিশীল ছিল। একসময় তারা বঙ্গবন্ধুকে দেনার টাকা শোধ দিতে চাপাচাপি করে। বঙ্গবন্ধু এ টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানায়। অবশ্য বাধ্য হয়ে বাংলাদেশকে প্রায় ৩৫ কোটি ডলারের উপরে দিতে হয়। অবশ্য বিশ্বব্যাংক দাবি করেছিল ১২০ কোটি ডলারের মতো।   

 যুক্তরাষ্ট্রের কূটচাল

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময় পুরো পৃথিবীরই মেরুকরণ চলছিল। দুইভাগে বিভক্ত শিবিরের পুঁজিবাদী পতাকা উত্তোলন করে রেখেছিল যুক্তরাষ্ট্র এবং পুঁজিবাদের বিরোধী শক্তি ছিল সোভিয়েত রাশিয়া। এই মেরুকরণ অবশ্য শুরু হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রপক্ষের বিজয়ের মধ্য দিয়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী প্রধান দুই দেশ নিজেদের মতের মাধ্যমে পুরো পৃথিবীতে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে তখন মরিয়া। আদর্শগত মিলের চেয়ে ‘শত্রুর শত্রু- বন্ধু’ এই নীতিতেই বিশ্বাসী ছিল এই দুই পরাশক্তি। 

১৯৭১ সাল সময়টা ছিল স্নায়ুযুদ্ধের মধ্যভাগ। যুদ্ধ, বিজ্ঞান এমনকি দাবা খেলায় জয়-পরাজয়ও স্নায়ু যুদ্ধের অংশ হয়ে গিয়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই সোভিয়েত রাশিয়া  যুক্তরাষ্ট্রের পরম মিত্র পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। এই যুদ্ধ পরিণত হয় সোভিয়েত রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি প্রদর্শনের অন্যতম মাধ্যম। পক্ষ নেওয়ার খেলা চলছিল সর্বত্র। দক্ষিণ কোরিয়া – উত্তর কোরিয়া, দক্ষিণ ভিয়েতনাম – উত্তর ভিয়েতনাম, পূর্ব জার্মানি – পশ্চিম জার্মানি সবখানেই চলছিল মেরুকরণ! সাউথ ভিয়েতনামের পক্ষ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের তখন ছেড়ে দে মা, কেঁদে বাঁচি অবস্থা। উত্তর ভিয়েতনামের জয় নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল অনেক আগেই। ঠিক তখনই ভারত – পাকিস্তানের চলছে বিশাল সংকট। ভিয়েতনাম যুদ্ধে এমনিতেই যুক্তরাষ্ট্রের শাসকগোষ্ঠী সেই দেশের জনগণের তোপের মুখে, তার উপর দিয়ে অনেক খরচ হয়ে গেছে, মান-সম্মানের বেশ খারাপ অবস্থা। এরকম পরিস্থিতিতেও সপ্তম নৌবহর পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু, শত্রুপক্ষ সোভিয়েত রাশিয়ার ষষ্ঠ নৌবহর ততদিনে বঙ্গোপসাগরে পৌঁছে গেছে। যুদ্ধে আর পরাজয় মেনে নেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে সম্ভব ছিলনা। তাই বাধ্য হয়েই পাকিস্তানকে সর্বোচ্চ সাহায্য করতে পারলো না। দেশটি স্নায়ুযুদ্ধের এই অংশে হেরে যাওয়া কখনোই হজম করতে পারেনি। পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পেছনে তাদের অবস্থান বেশ সন্দেহজনক ছিল। 

সোভিয়েত ইউনিয়ন সফরে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, স্বাগত জানাচ্ছেন সোভিয়েত নেতা আলেক্সাই কোসিগিন (১ মার্চ, ১৯৭২)
হোয়াইট হাউসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ডের সাথে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (১ অক্টোবর, ১৯৭৪)

বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিনেই বিমানবন্দরে ঢাকায় অবস্থানরত মার্কিন কনসাল জেনারেল হার্বাট ডি স্পিভাকও উপস্থিত ছিলেন। তিনি বঙ্গবন্ধুকে একটা বার্তা দিতে চেয়েছিলেন যে যুক্তরাষ্ট্র মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ের তিক্ততা কাটিয়ে উঠতে চায়। অবশ্য তারও বেশ কিছুদিন পর ১৯৭২ সালের ৪ এপ্রিল বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। 

স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৭২-৭৫ একটা অস্থির সময়। যে সময়ে দেশ যেমন নবজাতকের ন্যায় ভূমিষ্ঠ হয়েছে, পৃথিবীব্যাপী চলছিল শত্রু শত্রু খেলা। যুক্তরাষ্ট্র স্বীকৃতি প্রদানের পর থেকেই বাংলাদেশকে খাদ্য সাহায্য করে আসছিল। খাদ্য ঘাটতি দেখা দেওয়ায় তৎকালীন অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে আরো বেশি সাহায্যের জন্য আবেদন করেছিল। পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র খাদ্যশস্য বিক্রি করতেও সম্মত হয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের পিএল-৪৮০ ধারা মোতাবেক খাদ্য সাহায্য পেতো। চুক্তি অনুসারে সাহায্যগ্রহণকারী কোন দেশ যুক্তরাষ্ট্রের শত্রু দেশের সাথে বাণিজ্য করতে পারবেনা। 

যুক্তরাষ্ট্র কারণ দেখালো যে বাংলাদেশ তখন শর্ত ভেঙ্গে কিউবাতে চটের ব্যাগ রপ্তানি করছে। কিন্তু কিউবার সাথে বাংলাদেশের কোন বাণিজ্য চুক্তি ছিলনা। বৈদেশিক মুদ্রার সংকট দেখায় বাংলাদেশ কিউবার সাথে বাণিজ্য করছিল। যুক্তরাষ্ট্র কোন ধরণের সতর্কবাণী ছাড়া খাদ্য সাহায্য দিতে অস্বীকৃতি জানালো। দেশ পড়ে গেলো খাদ্য সংকটে, দেখা দিলো দুর্ভিক্ষ। বাংলাদেশকে প্রথম স্বীকৃতি দেওয়া দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম অকৃত্রিম বন্ধু কিউবার সাথে বাণিজ্য থেকে সরে আসলো। বঙ্গবন্ধু অসহায়ের মতো বন্ধু দেশকে দেওয়া কথার বরখেলাপ করলেন। অবশ্য পরে যুক্তরাষ্ট্র খাদ্য সহায়তা দিতে চুক্তিবদ্ধ হয়, কিন্তু ততদিনে দুর্ভিক্ষে যা ক্ষতি হওয়ার হয়ে গেছে।   

চীনের বেইজিং- এ অনুষ্ঠিত এশিয়া-প্যাসিফিক রিম শান্তি সম্মেলনে পাকিস্তানের উদীয়মান জননেতা শেখ মুজিবুর রহমান (অক্টোবর ২-১২, ১৯৫২)
আলজেরিয়ায় জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনে কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল ক্যাস্ত্রোর সঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (সেপ্টেম্বর, ১৯৭৩)

 পাকিস্তানের বন্ধু চীন ও সৌদি আরবের অবস্থান 

পৃথিবীকে যদিও মোটা দাগে ভাগ করা হচ্ছিল সমাজতন্ত্র এবং পুঁজিবাদী শাসনের মাধ্যমে। কিন্তু পাকিস্তানের পক্ষে যেমন ছিল পুঁজিবাদের চারণভূমি যুক্তরাষ্ট্র তেমনি ছিলো গণচীন। আগেই বলেছি আদর্শ এখানে সেরকম বড় রকমের নিয়ামক কখনোই ছিলনা। ১৯৬২ সালের আগে ছিল হিন্দি-চীনা ভাই ভাই, এরপর হলো পাকিস্তানের চরমতম মিত্র। বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকতে চীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় নাই, এমনকি জাতিসংঘে সদস্যপদ পাওয়ার বিপক্ষে ছিল। তবে চীনের স্বীকৃতির ব্যাপারে চেষ্টা চলছিল ৭৫ পর্যন্ত। শেষদিকে চৌএনলাই বঙ্গবন্ধুকে স্বীকৃতি দেওয়ার ব্যাপারে মত প্রদান করে চিঠিও পাঠিয়েছিল। অবশ্য চীন শেষ পর্যন্ত স্বীকৃতি দিয়েছিল ১৯৭৫ সালের ৩১ আগস্ট, বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর ১৬ দিনের মাথায়! 

পাকিস্তানের আরেকটি মিত্র রাষ্ট্র সৌদি আরবের স্বীকৃতি ছিল খুব গুরুত্বপূর্ণ । ইসলামিক বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরো শক্ত করার জন্য এর কোনো বিকল্পও ছিলনা। পাকিস্তানের কূটনৈতিক কৌশলের কারণে স্বীকৃতি প্রাপ্তিতে বড় রকমের বাঁধা আসে। ১৯৭৩ সালের মে মাসে বঙ্গবন্ধু সৌদি বাদশাহ ফয়সালের কাছে একজন বিশেষ দূত পাঠিয়েছিলেন। পরবর্তীতে জোট নিরপেক্ষ দেশগুলোর সম্মেলনে বাদশাহ ফয়সালের সাথে তাঁর দেখা হয়। বাদশাহ ফয়সাল বলেছিলেন,

           “বাংলাদেশ ও পাকিস্তান দুটো চোখের মতোই মূল্যবান”

আলজেরিয়ায় জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনে সৌদি বাদশাহ ফয়সালের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এই সাক্ষাৎ থেকেই বাংলাদেশিদের পবিত্র হজ্জ্ব পালনের সুযোগ প্রদান প্রসঙ্গে আলোচনা শুরু হয় (১৯৭৩)

অবশ্য বাদশাহ ফয়সাল বাংলাদেশ ধর্মনিরপেক্ষ হওয়ার কারণে শঙ্কাও প্রকাশ করেছিলেন। তবে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ হওয়ার প্রেক্ষাপট এবং দেশ কেন কোনোভাবেই ইসলামিক রাষ্ট্র হওয়া সম্ভব না এটি বুঝিয়েছিলেন। ১৯৭৪ সালের দিকে বঙ্গবন্ধু তৎকালীন পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. কামাল হোসেনকে বাদশাহ ফয়সালের কাছে পাঠান। ড. কামালের সেই সফরটি ছিল বেশ আশাব্যঞ্জক। সৌদি আরবের স্বীকৃতি প্রায় নিশ্চিত হয়ে যায়। কিন্তু এ ব্যাপারে কোনো চূড়ান্ত ফলাফল আসার আগেই আততায়ীর হাতে বাদশাহ ফয়সাল নিহত হন। সে যাত্রায় আর স্বীকৃতি পাওয়া হয় নাই। এরপরের বছরেই অর্থাৎ ১৯৭৫ সালের জুলাই মাসে ইসলামিক দেশগুলোর পররাষ্ট্র মন্ত্রীদের সম্মেলনে সৌদি আরবের বাদশাহ খালেদের সাথে ড. কামালের দেখা হয়। সৌদি আরবের বাদশাহ বিশেষ রাজকীয় ভোজের আয়োজন করেন। সেই আয়োজনে প্রধান টেবিলে সৌদি রাজপরিবারের সদস্যবৃন্দ, ওআইসির মহাসচিব, আরব লীগের মহাসচিব ও প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিনিধির ড. কামালের আসন দেওয়া হয়। এটা ছিল অভাবনীয় কূটনৈতিক সাফল্য। ধারণা করা হয় এরপরের মাসে আগস্টেই বাংলাদেশ স্বীকৃতি পেতে যাচ্ছে। 

আগস্টেই সৌদি আরব বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করে, কিন্তু সেটি ছিল বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর একদিন পর ১৬ আগস্ট, ১৯৭৫! 

 শেষ কথা

বঙ্গবন্ধুর কর্মকাণ্ডকে বিশ্লেষণ করলে মূলত দুটি পর্ব পাওয়া যায়। প্রথম পর্বটি হলো ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ । এই পর্বে আসলে বঙ্গবন্ধু অনেক কিছু শিখেছেন, অনেক ভেবেছেন। অনেক ত্যাগ, সাহস, প্রজ্ঞাবোধ দিয়ে অত্যন্ত চৌকসভাবে নিয়েছেন বিভিন্ন সিদ্ধান্ত। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি তাঁকে শুধুমাত্র বিবিসি জরিপের কারণে বলা হয়না। একটি জাতির হাজার বছরের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনার নায়ক হলেন বঙ্গবন্ধু। পৃথিবীতে বহু জাতি অনেক বছর চেষ্টা করেও স্বাধীনতা অর্জন করতে পারেনি। হারিয়ে গিয়েছে অনেক জাতি, অনেক ভাষা! একজন ব্যক্তির একাগ্র চেষ্টায়  মুক্তি পেয়েছে একটি জাতি, এজন্য বাংলা ভাষাও পেয়েছে অনেকদিনের আয়ু। একটি জাতির মহান নেতাকে শুধু জনসমর্থনের উপর নির্ভর করলেই চলেনা, তাঁকে মেলাতে বিশ্বের সাথে তাল। অন্য জাতিগোষ্ঠীর শাসকদের পালস বুঝতে হয়। দ্বিতীয় পর্বে বঙ্গবন্ধু সময় পেয়েছিলেন মাত্র ৪ বছর, ১৯৭২-৭৫ । এই চার বছরে ৭০টিরও অধিক চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক করেছেন।  তাঁকে বিশ্বকে নিয়ে ভাবতে হয়েছে, দেশের আভ্যন্তরীণ ব্যাপার নিয়ে ঝামেলায় পড়তে হয়েছে। অসীম কারিশমা নিয়ে জন্মগ্রহণ করা জাতির পিতা দিনশেষে তিনিও একজন মানুষ। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঘাত প্রতিঘাতে, বিদেশি কূটচালের কাছে অসহায়ত্বের মাঝে এতো অল্প সময়ে দেশ পরিচালনার প্রতিটি পদক্ষেপে সফল হওয়া সম্ভব ছিলনা। তবুও মহান নেতা এই জাতির জন্য যা করে গিয়েছেন সেটির ঋণ বাঙালি সামনে টিকে থাকলে আগামী হাজার বছরেও শোধ করতে পারবেনা।    

তথ্যসূত্র – 

১। অসমাপ্ত আত্মজীবনী, শেখ মুজিবুর রহমান (তৃতীয় মুদ্রণ – মার্চ ২০১৩) 
২। আমার দেখা নয়া চীন, শেখ মুজিবুর রহমান (প্রথম মুদ্রণ – ফেব্রুয়ারি,২০২০)
৩। বেলা-অবেলা, মহিউদ্দিন আহমদ (প্রথম মুদ্রণ – ফেব্রুয়ারি,২০২০)
৪। বাংলাপিডিয়া
৫। উইকিপিডিয়া
৬। https://mujib100.gov.bd/
কমেন্ট করুন
প্রাক্তন শিক্ষার্থী | গণিত বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সেশন: ২০১২-১৩

মাহমুদ ধ্রুব

সেশন: ২০১২-১৩