এক বিকেলে বেদে পাড়ায়

ছোটবেলা থেকে রাস্তা দিয়ে যাবার সময় যখন বেদেদের তাঁবুগুলো দেখতাম, খুব অবাক হতাম; ঘর নেই, বাড়ি নেই এই একটা ছোট তাঁবুতে মানুষের জীবন কাটে! স্কুলে আসা যাওয়ার সময় মাঝে মাঝে বিলে ওদেরকে সাপ সংগ্রহ করতে দেখতাম। একবার ওদেরকে খোঁচা মেরে মজা করতে গিয়ে এমন গালি শুনেছি, জীবনেও ভুলবোনা। তারপর থেকে ওদের থেকে দূরে দূরে হাঁটতাম। আমরা ভদ্র(!) ঘরের সন্তান। ওদের সাথে আলাপ করা আমাদেরকে মানায় না(!)। ওদের পাড়ায় যাবার তো প্রশ্নই আসে না।

তবু বড় হতে হতে ওদের জীবন সম্পর্কে জানার আগ্রহটা খুব বাড়তে থাকে।

২০১৫/১৬ সালে আমার প্রথম কাছ থেকে এক বেদে পরিবারকে দেখার সুযোগ হয়েছিলো, কথা বলা হয়নি। একটা ব্রিকফিল্ডের খোলা মাঠের এক প্রান্তে একটা বাঁশের তৈরি তাঁবু, একটা পরিবার, তাঁবুর ভেতর জিনিসপত্র তেমন কিছু চোখে পড়লো না। বাইরে ইট দিয়ে বানানো একটা চুলোয় হাড়িতে কিছু রান্না হচ্ছে, পাশে আরেকটা হাড়ি। লাকড়ি বলতে ছোট ছোট দুটো মাত্র শুকনা কাঠ। এই গ্রামবাংলায় লাকড়িরও যে কোন মানুষের এতটা সংকট থাকতে পারে আমার জানা ছিলো না।

বহুদিনের ইচ্ছাপূরণে আজ বিকেলে বেরুলাম বান্ধবী তামিমাকে সাথে করে বেদে পাড়ার উদ্দেশ্যে। শহীদ মিনারের পাশে গিয়ে দেখলাম, যেখানে একসময় বিশাল মাঠজুড়ে প্রায় বিশের মত বেদেদের তাঁবু ছিলো, সেখানে এখন তার চিহ্ণটিও নেই। অথচ এর মধ্যে একবারও সেটি আমার দৃষ্টিগোচর হয়নি!

রিকশাওয়ালাকে জিজ্ঞেস করে জানলাম,সামনে আরেকটি বেদে পাড়া আছে। সেখানে রিকশাওয়ালা আমাদের নামিয়ে দিলেন।

গলির সামনে একটি চায়ের দোকান আছে, আমাদের পথ আগলে দোকানী জানতে চাইলো, আমরা কোথায় যাবো,কেন যাবো। জবাব দেয়ার পর পথ ছাড়লো। প্রথমে একটা বাড়ির সামনে গেলাম।কয়েকজন মহিলা দাঁড়িয়ে ছিলো, ওরা আমাদেরকে এড়িয়ে যেতে চাইলো। বললো সামনে যান, ওখানে বেদেরা থাকে। তাদের একটা বাচ্চা আমাদেরকে নিয়ে গেলো। পরে জানতে পেরেছিলাম প্রথমে যাদের সাথে কথা হয়েছিলো, তারাও বেদে সম্প্রদায়ের লোক। কিন্তু এরা এখন লেখাপড়া করছে। বড় মেয়ে মাস্টার্সে পড়ে। তাই এখন আর নিজেদেরকে বেদে বলে পরিচয় দিতে চায় না। যাই হোক আমরা গিয়ে এক বেদে পরিবারের বাড়ির দাওয়ায় বসলাম,অনুরোধ করতে এক মহিলা আন্তরিকভাবেই আমাদের সাথে গল্প করতে বসলেন। এরা তাঁবুতে নয়, টিনের বাড়িতে থাকে। যদিও টিনের বাড়িটাও বেশ ছোট। তবে এর ভেতরে টিন দিয়ে আলাদা আলাদা ঘর করা আছে। টিনের বাড়ির সামনেই পুরনো একটা টিনের পাত্র মাটির উপর বসিয়ে রান্নার ব্যবস্থা। ভিটেটুকুই সম্বল। এখানে জমি কিনে ওরা এসেছে। অনেকগুলো বেদে পরিবার আছে এখানে। মাঝে মাঝে গেরস্তদের(যারা বেদে নয় তাদেরকে বোঝাচ্ছিলো) জমিজমাও আছে। জানালো তারা ইসলাম ধর্মাবলম্বী। ইসলাম মানে, কুরআন পড়ে। মুসলমানদের যে উৎসবগুলো; বিয়ে, ঈদ সেগুলো পালন করে। তাদের গোত্রীয় আলাদা কোন উৎসব নেই। কালেমা না পড়লে বিয়ে হয়না। বিয়েতে তারা নাচ-গান করে। জানালো তাদের মধ্যে একাধিক বিয়ের প্রচলন আছে। প্রথম বিয়ে, দ্বিতীয়, তৃতীয় বিয়ের মধ্যে তারা কোন ব্যবধান দেখে না। পুরুষরা ছয়-সাতটা বিয়ে ও করতে পারে। এটিকে তারা খারাপ মনে করে না। তবে এখন অনেকেই শুধু একটি বিয়ে করে। তাদের বিয়ে নিয়মানুযায়ী শুধু তাদের বেদে সম্প্রদায়ের লোকদের মধ্যেই হয়। তবে আজকাল যারা পড়াশুনা করে, তারা বাইরে বিয়ে করে। এমনকি নিজেদের মধ্যেও ভিন্নধর্মাবলম্বীদের সাথে বিয়ের নিয়ম নেই। মেয়েদের বিয়ে হয় ১২-১৬ এর মধ্যে, ছেলেদের আরেকটু দেরিতে। কেউ নিজেরা আগেই করে ফেললে কিছু করার নেই।

খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে জানতে চাইলে জানালো, তারা যেহেতু মুসলমান মুসলমানরা যা খায়, তারা তাই খায়।আবার যারা হিন্দু বাঃ খ্রিস্টান আছে তারা তাদের ধর্মমতে যা কিছু খাওয়া যায়,তা খায়। পিঠাপুলির আয়জন তাদের হয় না। তারা নাস্তা দোকান থেকে কিনে খায়।

পেশা হিসেবে নারীরা শিঙ্গায় ফুঁক দেয়, সাপের বিষ তোলে, ঝাড় ফুঁক করে। চার পাঁচ জন মহিলা একসাথে বের হয়, দৈনিক গড়ে দুই-আড়াইশো টাকা রোজগার হয়;সেটা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয়। জানতে চাইলাম,তাদের ঝাড়ফুঁকের দোয়া/মন্ত্র আমাদেরকে শেখানো যাবে কিনা। তারা জানালো-নিয়ম নেই। এটি তারা বংশপরম্পরায় শিখে আসছে। সম্প্রদায়ের বাইরে কাউকে শেখানো যায় না। প্রশ্ন করে জানতে পারলাম তারা খুব ছোটবেলা থেকেই এ কাজে লেগে যায়।

পুরুষেরা সাপের খেলা দেখায়, পানিতে হারিয়ে যাওয়া জিনিস খুঁজে দেয়। জিজ্ঞেস করলাম,”সাপ এবং অন্যান্য সরঞ্জামগুলো সংগ্রহ করেন কোথা থেকে?”

-ইন্ডিয়া থেকে।

-ইন্ডিয়ার সাথে আপনাদের যোগাযোগ কীভাবে?

-আমাদের সর্দার পাঠায়।

-আপনাদের সর্দার কে?

– আমাদের জাতির (বেদে সম্প্রদায়ের) সর্দার।

-আপনাদের সর্দার কোথায় থাকেন?

-ইন্ডিয়ায়। উনার বাড়ি ইন্ডিয়ায়।

-আপনাদের স্থানীয় কোন সর্দার আছে?

-আছে।

-উনি কোথায় থাকেন?

-এইখানেই। এই পাড়ার শ্যাষ মাথায় সর্দারের বাড়ি।

-আপনাদের মূল সর্দার কি আপনাদের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করেন, নাকি স্থানীয় সর্দারের মাধ্যমে?

-এই সর্দারের মাধ্যমে।

-সর্দার কি আপনাদের মত সাপের খেলা দেখানো, শিঙ্গায় ফুঁ দেয়া এসব করে জীবিকা নির্বাহ করেন?

-না।

আরও কথাবার্তা বলে যা বুঝলাম তা হলো  সম্প্রদায়ের লোকদের বিয়ে শাদী, শালিসি কাজ এবং বড় সর্দারের সাথে যোগাযোগের সূত্র হিসেবে সর্দার কাজ করেন। তার বিনিময়ে সবাই তাকে কিছু সম্মানী দেয়। বড় সর্দার ও কিছু দেয়। এভাবে সর্দারের চলে যায়।।

-আচ্ছা আপনাদের সাথে কি সর্দার পরিবারের বিয়েশাদী হয়?

-না।

-তাহলে সর্দারদের বিয়ে শাদী কি অন্য কোন বেদে সর্দারের পরিবারের সাথে হয়?

-হয়।

-সর্দার কি আপনারা আপনাদের মধ্য থেকে নির্বাচন করেন? নাকি বংশানুক্রমে?

-বংশ।

-যদি কোন সর্দারের ছেলে না থাকে,তাহলে তার পরে কে সর্দার হবে?

-তার যদি মেয়ে থাকে-মেয়ে।

-আপনারা কি কখনো তাঁবুতে ছিলেন?

-হুম। ছোডবেলায় ওইখানেই ছিলাম।

-ওগুলোকে আপনারা কি বলতেন?

-তাম্বু, সরকি।

-একেকটা তাঁবুতে কতজন করে থাকতেন?

-৫জন/৬ জন/৭জন। কেউ স্বামী-স্ত্রী থাকলে তাদেরকে আলাদা পর্দা খাটাই দিতাম।

-আপনাদের পূর্বপুরুষের বাড়ি কোথায়?

-আসাম।

-সেখান থেকে আপনারা বাংলাদেশে আসলেন কবে, দেশ ভাগের সময়?

-কত আগের কথা..কইতে পারমু না।

 সন্ধ্যা হয়ে আসছিলো। আমরা তাকে সাথে নিয়ে সর্দারের বাড়ি গেলাম। সর্দারের বাড়িটা অন্য বাড়িগুলো থেকে একটু আলাদা। চারপাশ টিনের বেড়া দিয়ে ঘেরা। ছোট্ট উঠোন। উঠোনের দু প্রান্তে দুটি দোচালা টিনের ঘর। চারপাশে কয়েকটা ছোট ছোট কাঠের মাচা-উপরে টিনের চালা দেয়া। প্রতিটি মাচায় একজন করে ঘুমায়। সর্দারের বাড়িটা খালের পাড়ে। কাঠের ঘাট আছে খাল পাড়ে। সর্দার বাড়ি ছিলেন না। কোথাও জানাযা পড়তে গেছেন। সর্দারপত্নী ও বাড়িতে ছিলেন না। কুরআন পড়তে গেছেন। আমরা সর্দারের মেয়ের সাথে কথা বলছিলাম। সামনে একটা একচালার নিচে মাটির চুলোয় রান্না হচ্ছিলো। মেয়েটি আফসোস করে বলছিলো,”আমাদের কপালেই খালি পড়ালেখা নাই।”  আমরা জিজ্ঞেস করলাম, “আপনারা পড়ালেখা করেন না কেন?” মেয়েটির জবাব ছিলো,”পড়ালেখা করতে ট্যাকা লাগে না?”

এরই মধ্যে মাগরিবের আজান হয়ে গেলো। এক বৃদ্ধা সবাইকে নামাযের জন্য ডাকতে লাগলেন।

আমরাও উঠে পড়লাম।

কিন্তু মনে হচ্ছিলো কী যেন বাকি রয়ে গেছে।

তবু ফিরতে তো হতোই।

কমেন্ট করুন
শিক্ষার্থী | পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সেশনঃ ২০১৭-১৮

নাজিয়া তাসনিম

সেশনঃ ২০১৭-১৮

0