fbpx

বাংলাদেশে কোটা সংস্কার আন্দোলনের যৌক্তিকতা

১৯৭১ সালে স্বাধীন হওয়া সাড়ে ৭ কোটি মানুষের দরিদ্র দেশ বাংলাদেশ, এটি আজ প্রায় সাড়ে ১৭ কোটি মানুষের উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হয়েছে। উন্নতির মাপকাঠির সাথে সামঞ্জস্যতায় কি আদতে দেশের জনগণ খুশি? কমেছে কি বৈষম্যের? এসেছে কি জনজীবনে শান্তি? হয়তো না। বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম আলোচ্য বিষয় হচ্ছে  কোটা সংস্কার আন্দোলন; যার মূল বিষয়বস্তু  হলো: সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতির সংস্কার করা।

২০১৮ সালে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ আন্দোলনের জেরে এক পরিপত্রের মাধ্যমে সরকার কোটাব্যবস্থাই বাতিল করে দেয়। ২০১৮ সাল পর্যন্ত সরকারি চাকরিতে মোট ৫৬ শতাংশ কোটা প্রচলিত ছিল। এর মধ্যে ৩০ শতাংশ বীর মুক্তিযোদ্ধা (পরে বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও নাতি-নাতনী) কোটা, ১০ শতাংশ নারী কোটা, ১০ শতাংশ জেলা কোটা এবং ৫ শতাংশ ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী কোটা। এ ছাড়া ১ শতাংশ পদ প্রতিবন্ধী প্রার্থীদের দিয়ে পূরণের নিয়ম চালু হয়। ওই বছর কোটা সংস্কার করে ১০ শতাংশ করার দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নেমেছিলেন। আন্দোলনের মুখে একপর্যায়ে সরকার প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিতে পুরো কোটাব্যবস্থাই বাতিল করে। ওই বছরের ৪ অক্টোবর কোটা বাতিল বিষয়ক পরিপত্র জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।

তাহলে কোটা নিয়ে আবার বিতর্ক কেন? 

২০২১ সালে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা ফিরে পাবার জন্য উচ্চ আদালতে রিট করেন এবং গত ৫ জুন প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে সরকারি চাকরিতে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিলের সরকারি সিদ্ধান্ত অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেয় হাইকোর্ট। তারপর হাইকোর্টের ওই রায় স্থগিত চেয়ে আপিল বিভাগে আবেদন করে রাষ্ট্রপক্ষ। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ হাইকোর্টের এই রায় স্থগিত না করায় পূর্বের নিয়মানুযায়ী সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা আপাতত বহাল রয়েছে। এর ফলে নতুন করে আবারও বিতর্কের জন্ম নিয়েছে কোটাব্যবস্থা। আবারও শুরু হয়েছে আন্দোলন।

সাম্প্রতিক সময়ে কোটা সংস্কার ও ২০১৮ সালের মেধাভিত্তিক নিয়োগের সরকারি পরিপত্র পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলন করছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনে উঠে আসে তাদের চারটি দাবি। শনিবার রাজধানীর শাহবাগ থেকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি ঘোষণা করেন। পরবর্তীতে গত রবিবার শিক্ষার্থীরা চার দফা বাদ দিয়ে এক দফা দাবি ঘোষণা করেন।

দাবিটি হলো-

“সরকারি চাকরির সকল গ্রেডে বৈষম্যমূলক কোটা বাতিল করে শুধুমাত্র অনগ্রসর গোষ্ঠী, প্রতিবন্ধী ও মুক্তিযুদ্ধাদের সন্তানদের জন্য সর্বোচ্চ ৫% কোটা রাখতে হবে।”

সেই মোতাবেক সোমবার সারাদেশে আন্দোলন করেন শিক্ষার্থীরা। মঙ্গলবার অনলাইনে এবং অফলাইনে গণসংযোগ চলে এবং বুধবার সারাদেশে সকাল-সন্ধ্যা অবরোধের ডাক দেন। সরকারি চাকরিতে (৯ম থেকে ১৩তম গ্রেড) মুক্তিযোদ্ধা কোটা বহাল করে হাইকোর্টের দেয়া রায়ে চার সপ্তাহের জন্য স্থিতাবস্থা দিয়েছেন আপিল বিভাগ। বুধবার বেলা সাড়ে ১১টায় প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের আপিল বিভাগে শুনানি শেষে এ আদেশ দেন আদালত। চার সপ্তাহ পর পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হবে বলেও এসময় জানান আদালত।

স্বাধীনতার পর কেটে গেছে দীর্ঘ ৫৩ বছর। ২০২৪ সালে এসে শিক্ষার্থীরা ‘মেধা না কোটা?, মেধা মেধা’, ‘সংবিধানের মূল কথা, সুযোগের সমতা’, ‘৭১ এর বাংলায়, বৈষম্যের ঠাঁই নাই’, ‘সারা বাংলায় খবর দে, কোটা প্রথার কবর দে’সহ বিভিন্ন স্লোগানে অন্যায্য কোটা বাতিলে আন্দোলনে নেমেছে তা যৌক্তিক। মুক্তিযোদ্ধারা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। এই ৫৩ বছরে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের সর্বোচ্চ সম্মান দেয়া হয়েছে এবং তাদের আজীবন সম্মান দেয়া উচিৎ। মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান, নাতি-নাতনীদের মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি বা অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা দেওয়া যৌক্তিক পর্যায়ে পড়ে না। যেকোনো ধরনের কোটা পদ্ধতি চাকরির ক্ষেত্রে চরম বৈষম্য সৃষ্টি করে। এমনিতেই দেশে লাখ লাখ উচ্চশিক্ষিত এবং মেধাবী বেকার রয়েছে। কোথাও তাদের চাকরির সুযোগ হচ্ছে না। তারপর এই কোটা ব্যবস্থার জন্য মেধাবী তরুণরা চাকরির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এ পদ্ধতিতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মেধাবীদের চেয়ে কম মেধাবীরা বেশি সুযোগ পেয়ে থাকে। এতে করে কোনো সুস্থ প্রতিযোগিতা থাকে না। একটি দেশকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার জন্য প্রশাসন থেকে শুরু করে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে যোগ্য লোকের প্রয়োজন। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের বেলায় এটি আরও বেশি প্রযোজ্য। দেশের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে যেখানে মেধাবীদের যুক্ত করা প্রয়োজন, সেখানে দেখা যাচ্ছে অপেক্ষাকৃত কম মেধাবীরা যুক্ত হওয়ার কারণে উন্নয়নের গতি শ্লথ হয়ে যাচ্ছে। এই পদ্ধতিতে মেধাবীদের বঞ্চিত করা হচ্ছে যেটা কোনোভাবেই কাম্য নয়। কোটাধারীরা কম মেধাবী হলেও কোটা পদ্ধতির কারণে সরাসরি চাকরি পাবে এটা যুক্তিযুক্ত হতে পারে না। তাদের উচিৎ সাধারণ মেধাবীদের সাথে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা দিয়ে চাকরিতে প্রবেশ করা। বাবা-দাদা মুক্তিযোদ্ধা হওয়ায় এমনিতেই চাকরি পাবে, এমন মনোভাব থেকে বের হয়ে আসা।

মেধাবী তরুণরা আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। যদি চাকরিতে শতকরা ১০০ ভাগের মধ্যে ৫৬ ভাগ কোটাধারী হয়, তাহলে সেটা সাধারন মেধাবীদের সাথে চরম বৈষম্যের সামিল। এই বিপুল পরিমাণ কোটা সাধারণ মেধাবীদের সাথে চরম অন্যায় ও বৈরিতা ছাড়া আর কিছুই না। স্মার্ট বাংলাদেশ গঠনের মাধ্যমে উন্নতির সর্বোচ্চ শিখরে দেশকে এগিয়ে নিতে প্রয়োজন মেধার বিকাশ নিশ্চিত করা এবং মেধার সুষ্ঠু প্রয়োগ। কোটায় নিয়োগ নিশ্চয় কোনোভাবে মেধাবীদের চিহ্নিতকরণের কোনো সঠিক পদ্ধতি হতে পারে না। তাই শিক্ষার্থীদের কোটা পদ্ধতি সংস্কার করার দাবি যৌক্তিক। দেশ ও দেশের জনগণের উন্নতি নিশ্চিতে বিষয়টি পুনঃবিবেচনা করে ন্যায়সংগত, যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিৎ।

প্রতিবেদক:

জান্নাতুল নাঈম লায়লা
মো: মুহেব্বুল ইসলাম
ইসরাত জাহান নাফিছা
নুঝাত নাজিয়া

প্রতিবেদনের তারিখ: ১০/০৭/২০২৪

0703 End