একদিন সুবহে সাদিকের পর সদ্য মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করে আবার জেগে উঠবে তুমি। সদ্য যমদূতের সাক্ষাৎ পাওয়া জেগে ওঠা অপ্রিয় আত্মাদের মতো করেই। দূরে ভেসে আসবে জুম্মার দিনের ফজরের প্রথম আজান। মুয়াজ্জিন ডেকে চলবেন “হাইয়্যা আলাল ফালাহ, হাইয়্যা আলাছ সালাহ”। ফিনাইলের গন্ধে মুহুর্মুহু কেবিনে তখনো একপাশে একটা অস্ফুট গোঙানির স্বরে জায়নামাজ বিছিয়ে তসবি গুনছে কেউ। অতিকায় পিনপতন নীরবতা আঁচড়ে পড়ছে তোমার কেবিনে। ক্যানোলা খুলে দৃঢ় পায়ে এগিয়ে যাচ্ছো তুমি আবার একটু জীবনকে আলিঙ্গনের খোঁজে। তুমি এগুতে পারছো না। পিছিয়ে যাচ্ছো অতলান্তিক কালের গহ্বরে। পিছিয়ে যাচ্ছো কয়েক যুগ পেছনে। পিছিয়ে যাচ্ছো যৌবন থেকে শৈশবে। স্মৃতির আলমারি খোঁজে ভেসে আসে শৈশবের বৃষ্টিস্নাত রজনীর স্মৃতি। আঁছড়ে পড়ে তোমার মগজে। আম্মা ডালের বড়া ভেজে গরম ভাতে লবণ ছিটিয়ে লোকমা তুলে খাওয়াচ্ছে। তুমি ক্ষিপ্র গতিতে গলধঃকরণ করছো পৃথিবীর সবচেয়ে সুস্বাদু খাবার। তুমি গোগ্রাসে গিলে ফেলছো আব্বার নিজে না খেয়ে অফিস থেকে আনা বিরিয়ানির প্যাকেট। কোনো এক রজনীর আঁধার ছিড়ে তুমি গিলে ফেলছো আব্বার হাতের চা এ ডোবানো পাউরুটি। টিলার উপরের টিনের ছাদের খুপরির মতো চায়ের দোকান। জহির মামার দোকান। কৃষ্ণবর্ণ মানুষ জহির মামা। গোধূলির আলো সন্ধ্যার রক্তিম বর্ণিলা আকাশে হাজিরা দিতেই লোকসমাগমের হিড়িক পড়তো টিলার খুপরি চায়ের ঘরগুলোতে। তুমি বসে আছো টিলার শীতল মাটির পরশে। জোনাকির আলোয় মেপে ফেলছো গোটা একটা আকাশ আর বুলি আওড়াচ্ছো কাজী নজরুলের কবিতা “থাকবো নাকো বদ্ধ ঘরে, দেখবো এবার জগতটাকে। কেমন করে ঘুরছে মানুষ, যুগান্তরের ঘূর্ণিপাকে।” সেই ঘূর্ণিপাকে ঘূর্ণায়মান তোমার চোখে ভেসে ওঠে সন্ধ্যার পর লোডশেডিং এর ভ্যাপসা গরমে আব্বা তালপাতার হাতপাখা দিয়ে ক্রমশ বাতাস করে চলেছেন। ছাতি ভেদ করে তুমি গ্রহণ করছো জগতের সবচেয়ে শীতলতম বাতাস। দখিন দোয়ার খুলে রোয়াকে বসে জুম্মাবারে পাঞ্জেগানা থেকে আব্বা সুললিত কণ্ঠে তিলাওয়াত করছেন সূরা আর-রহমান। আকাশে বাতাসে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে সুতীক্ষ্ণ কোরআনের আয়াত “ফাবি আয়্যি আলাইয়্যি রাব্বিকুমা তুকাজ্জিবান”।
সেবার তোমার অসুখ হলো। জৈষ্ঠ্য মাসের কটকটে গরমে মৃতপ্রায় হয়ে শুয়ে আছে এক শিশু যেনো এক টুকরো জীবনের আরাধ্যের খোঁজে। তুমি পেয়েছিলে সেই আরাধ্য। সেই এক টুকরো জীবনের স্বাদ। হুট করেই তোমার অশ্রুসিক্ত নয়নে ভেসে ওঠে প্রমত্তা মেঘনার নীল জলরাশি। বর্ষার মৌসুমে প্রমত্তা মেঘনার সেই নীল জলে ধবল বালুর কণা মেখে পা ভেজাচ্ছে এক মেরুন রঙের জামা পড়া শিশু। বালুচরের আলগা জোলো বাতাসের হাওয়ায় উড়ে চলেছে তার এবড়ো- থেবড়ো চুল। চুলের ঝাকুনি যত বাড়ে ততই রবির লাল আভা অস্তমিত হয় আর নদীর চরের দোকান-পাট, ছোট ট্রলারগুলোতে জন্ম হয় নতুন আভার। শেষের পর এ যেন এক নতুন শুরু। তোমার মনে পড়ে লোহার চার সিকের জানালা ভেদ করে আসা পূর্ণিমার আলোয় বিলি কেটে দেয়া রাতের ঘুম, যে ঘুমের অন্তরালে নিঃশব্দে নিঃশেষ হতো এক অতন্দ্র নিশীথ রাত।
ঈদের দিন আম্মার ভোরবেলার কাওয়াজ। আম্মা কি সুন্দর নারকেল গুঁড়া আর বাদাম মিশিয়ে চালের আটার সোয়াই রাধঁতেন। নতুন পাঞ্জাবি পড়ে আতর মেখে নানা সালামির অংক কষতেন। তোমার মনে পড়ে আলির কথা, সেই ছোটবেলার বন্ধু আলি। কলেরার কড়াল ঘাতে আলি নিশ্বাস নিতে পারে না। আলির অস্থিসার বুকের পাঁজর তোমার চোখের মণি ভেদ করে আসে। তোমার পানতোয়ার মতো ডাবর নয়নে ভেসে ওঠে আলির শেষ স্মৃতি, তার শেষ যাত্রা। আলির কবরের মাটি ধরে বেমালুম কেঁদে চলছো তুমি বিরাগে, দুঃখে। একদিন তোমার বড্ড অভিমান বাধঁলো গবলুর উপর। তোমার পোষা সাদা জালালি কবুতর। পাখাগুলো তার সমুদ্র সফেন। গবলুর বড্ড নীল আকাশের লোভ ছিলো। তোমার যত্নকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নীল আকাশের গভীরে ক্রমশ অদৃশ্য হয়ে গেলো সে নিমিষেই। চোখের আড়ালে হারিয়ে গেলো গবলু। এ পর্যায়ে এসে প্রচন্ড ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠবে তুমি। বড্ড যন্ত্রণা হবে তোমার। হৃদয়ে প্রকম্পিত হবে একটা তীব্র হাহাকার। কেউ যেন প্রতিশ্রুতি দিয়ে বেড়ায় মহাদেব সাহার বিখ্যাত লাইন “পরের জন্মে বয়স যখন ষোলই সঠিক, আমরা তখন প্রেমে পড়বো। মনে থাকবে?”
তোমার মনে পরে নলকূপের জলের মতো একটা শীতল জীবন, মনে পরে শহরের সমস্ত ফুটপাতের লাল আলো। তোমার মনে পরে দাদির কাঁসার পানের বাড়া। পাতলা সুতি শাড়ি পড়ে কি সুন্দর পানের খিলি সাজিয়ে বসতেন। চোখের অশ্রু মুছতে এবার নিজের কেবিনের পাশের বেসিনে দৌড়ে যাবে তুমি। হায়! আয়নায় তুমি দেখতে পাচ্ছো নিজের মৃত অবয়ব। তুমি স্পর্শ করতে পারছো না বেসিনের কল গড়িয়ে পড়া জল। হুট করেই সাদা এপ্রোন পড়া এক সুঠাম দেহী ভদ্রলোক ঢুকবে তোমার কেবিনে। একে একে খুলে ফেলবে তোমার কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্র, স্যালাইন৷ মনিটরে ভেসে ওঠে তোমার শূন্য পার্লসরেট; একটা সমান্তরাল লাইন। তসবিহরত ভদ্রমহিলাকে ডেকে শোনানো হচ্ছে তোমার মৃত্যু সংবাদ। তুমি অধ্যয়ন করে ফেলেছো মৃত্যু বিক্রি করে আনা একটা সাত মিনিটের ছোট্ট জীবন। সমাপ্ত হবে জীবনের প্রকাণ্ড পাণ্ডুলিপি। তুমি হারিয়ে যাচ্ছো চিরতরে; অতল নিদ্রায়। অসাড় হয়ে পড়ছে সমস্ত শরীর। জীবনের সমস্ত কর্কশ ব্যাথার অবসান ঘটছে। ক্রমশ অন্ধকার হয়ে পড়ছে কেবিন। তুমি হাত পেতে শেষ আলো টুকু ভিক্ষে চাইছো। অথচ ফিরিয়ে দেয়া হচ্ছে কি নিদারুণ শূন্য হাতে।
- ফারিয়া তাবাসসুম মেহরিনhttps://www.thepapyrus.org/author/%e0%a6%ab%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%bf%e0%a6%af%e0%a6%bc%e0%a6%be-%e0%a6%a4%e0%a6%be%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%b8%e0%a6%b8%e0%a7%81%e0%a6%ae-%e0%a6%ae%e0%a7%87%e0%a6%b9%e0%a6%b0%e0%a6%bf%e0%a6%a8/বৃহস্পতিবার, অক্টোবর 10, 2024
- ফারিয়া তাবাসসুম মেহরিনhttps://www.thepapyrus.org/author/%e0%a6%ab%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%bf%e0%a6%af%e0%a6%bc%e0%a6%be-%e0%a6%a4%e0%a6%be%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%b8%e0%a6%b8%e0%a7%81%e0%a6%ae-%e0%a6%ae%e0%a7%87%e0%a6%b9%e0%a6%b0%e0%a6%bf%e0%a6%a8/বৃহস্পতিবার, ডিসেম্বর 12, 2024
- ফারিয়া তাবাসসুম মেহরিনhttps://www.thepapyrus.org/author/%e0%a6%ab%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%bf%e0%a6%af%e0%a6%bc%e0%a6%be-%e0%a6%a4%e0%a6%be%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%b8%e0%a6%b8%e0%a7%81%e0%a6%ae-%e0%a6%ae%e0%a7%87%e0%a6%b9%e0%a6%b0%e0%a6%bf%e0%a6%a8/বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারি 13, 2025
- ফারিয়া তাবাসসুম মেহরিনhttps://www.thepapyrus.org/author/%e0%a6%ab%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%bf%e0%a6%af%e0%a6%bc%e0%a6%be-%e0%a6%a4%e0%a6%be%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%b8%e0%a6%b8%e0%a7%81%e0%a6%ae-%e0%a6%ae%e0%a7%87%e0%a6%b9%e0%a6%b0%e0%a6%bf%e0%a6%a8/শুক্রবার, এপ্রিল 18, 2025
- ফারিয়া তাবাসসুম মেহরিনhttps://www.thepapyrus.org/author/%e0%a6%ab%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%bf%e0%a6%af%e0%a6%bc%e0%a6%be-%e0%a6%a4%e0%a6%be%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%b8%e0%a6%b8%e0%a7%81%e0%a6%ae-%e0%a6%ae%e0%a7%87%e0%a6%b9%e0%a6%b0%e0%a6%bf%e0%a6%a8/বৃহস্পতিবার, মে 8, 2025












