আইসক্রিম

সেদিন ক্লাস শেষে হলে ফিরছি, মেডিকেল কলেজের সামনে দেখি একটা ছেলে আইসক্রিম খাচ্ছে। অবিকল ছোটবেলায় আমরা এক টাকা দিয়ে যেভাবে আইসক্রিম খেতাম। ছেলেটা আইসক্রিমের একপ্রান্তে একটা কামড়  দিয়েই মনের আনন্দে চোখ বন্ধ করে ফেলছে। এরকম পরিতৃপ্ত নির্মল আনন্দ এখন খুব কমই দেখা যায়। উপভোগ্য আনন্দ নামক অনুভূতিটা এখনকার শিশুদের জীবন থেকে অনেকটাই নির্বাসিত। আমি খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বাচ্চাটার আইসক্রিম খাওয়া দেখলাম। দেখতে দেখতে নিজের ছেলেবেলায় এক দুপুরে হারিয়ে গেলাম।

শীতকাল শেষে কেবল একটু গরম পড়েছে। এমন দিনে দুপুর বেলা স্পেশাল আইসক্রিম নিয়ে আসলেন আমাদের পরিচিত আইসক্রিমওয়ালা, দাম এক টাকা। আইসক্রিমওয়ালার চেহারাটা আজ এত বছর পরেও মনের মধ্যে অবিকল ছেলেবেলার মতোই রয়েছে। একটা বড় চৌকোনা বাক্সের দুই কোনায় গামছা দিয়ে বেধে কাঁধে ঝোলানো আইসক্রিমের বাক্সটা ছিল আমাদের কাছে যাদুর বাক্সের মতো। এই বাক্সে করে আইসক্রিমওয়ালা যেন শীতল পরিতৃপ্তি ফেরী করে ফিরতো। আইসক্রিমওয়ালার হাতের টিংটিং করে বেজে ওঠা ঘণ্টাটা যেন হ্যাঁমিলনের বাঁশিওয়ালার বাঁশির মতো। ঐ সুরেই আমরা বাচ্চারা সব জটলা করে ছুটতাম আইসক্রিমওয়ালার পিছু পিছু। আইসক্রিমওয়ালার ঘণ্টা মানেই এক আকার শীতল পরিতৃপ্তির জন্য মার কাছে আবদার!

সেই দুপুরে আইসক্রিমওয়ালার ঘণ্টার শব্দ শুনেই ছুটে গিয়ে মার কাছে টাকা চাইলাম। মার মোটামুটি নিস্পৃহ উত্তর-

“টাকা নেই।”

‘টাকা নেই’ এটা কোন বিশ্বাসযোগ্য কথা হলো!তাই আকারে প্রকারে টাকা চাইতেই থাকলাম। এবার মা বললেন-

“প্রতিদিন কিসের আইসক্রিম খাওয়া, গতকালই তো টাকা দিলাম।“

পাল্টা যুক্তি দেওয়ার মতো বয়স তখন আমার হয়েছে। তাই বললাম-

“শুধু কালকের দিনটা বাদ দেন তারপর দেখেন আমি কতোদিন থেকে আইসক্রিম খাই না।“

দেখি মার আমার দিকে তেমন কোন মনোযোগই নেই। মা তার কাজকর্ম এমনভাবে করছেন, যেন পাশে যে আমি আছি সেটা ঠিক বুঝতেই পারছেন না। এদিকে আমার মধ্যে চরম উত্তেজনা – মা যদি টাকা দিতে বেশি দেরি করেন তাহলে তো আইসক্রিমওয়ালা চলে যাবে। হায় আল্লাহ! তখন কি হবে?

তবে আমি আশা ছাড়লাম না। মা যেহেতু একেবারে ‘না’বলেন নাই সেহেতু অনেকটা সম্ভাবনা আছে। আমি ভাবলাম এত নরম থাকলে চলবে না, এবার খানিকটা জোরালো ভাবে বলতে হবে। জোরালোভাবে বলা মানে হচ্ছে চেহারার মধ্যে একটা কান্না কান্না ভাব নিয়ে আসা। কাজেই আমি চেহারায় একটা কান্না কান্না ভাব নিয়ে টাকা চাইতেই থাকলাম। এবার মা যা বললেন, সেটা আরও বিস্ময়কর ও চরম কষ্টদায়ক। তার কাছে শুধু একটা দশ টাকার নোট আছে আর সেটা ভাঙ্গিয়ে এক টাকার আইসক্রিম খাওয়ার কোন কারণ নেই। এই ধরণের নিষ্ঠুর কথা শুনে এবার আর কান্না কান্না ভাব ধরতে হলো না, আমার চোখে সত্যিপানি চলে আসলো। এক পর্যায়ে আমি কান্না শুরু করলাম। আমার কান্না দেখে মার মনে হয় একটু দয়া হলো। কিছুক্ষণ পর দেখা গেল মেশিনের ড্রয়ার খুলে তিনি দশ টাকার একটা নোট নিয়ে এসে আমাকে দিলেন।

টাকা হাতে পেয়ে আমি যেন যাদুর বাক্সের চাবি হাতে পেলাম! সেই যাদুর বাক্সের চাবি হাতে নিয়েই দৌঁড়। ততক্ষণে যথেষ্ট দেরি হয়ে গেছে। বাড়ির গেতে এসে দেখি আইসক্রিমওয়ালা নেই। দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে রাস্তার মোড় পর্যন্ত চলে আসলাম। আমার চলাচলের এটাই শেষ সীমানা; এর ওপারে একা একা যাওয়ার বিষয়ে মার কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। হাঁপাতে হাঁপাতে দৌঁড়ে এসেও আইসক্রিমওয়ালার দেখা পেলাম না। তখন আমার সে কি কান্না! সমস্ত রাগ গিয়ে পড়লো মার উপর। টাকা যদি তিনি দেবেনই তাহলে এত দেরি করলেন কেন? মাকে খুব খারাপ একজন মহিলা মনে হতে লাগলো। রাস্তা দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে হাফপ্যান্ট একটা ছেলে – এই আমি – যাচ্ছি, আর সবাই তার দিকে তাকিয়ে আছে।

কাঁদতে কাঁদতেই বাড়ি ফিরে আসলাম। টাকাটা মার ড্রয়ারে রেখে দিলাম। মা আমাকে দেখে একটু হাসলেন-

“কি আইসক্রিমওয়ালার দেখা পাস নি?“

অভিমানে তার সাথে আর কথাই বলতে ইচ্ছা করলো না। সিঁড়ির একদিকে বসে কাঁদতেই থাকলাম। মা তখন আমার দিকে আড়চোখে একবার তাকিয়ে হয়তো বললেন-

“ঠিক আছে, কাল আইসক্রিমওয়ালা আসলে টাকা নিয়ে যাস।“

তার এইটুকু কথা কান্না থামানোর জন্য যথেষ্ট ছিল না। এবার মা বললেন-

“শিগগির কান্না বন্ধ কর। আমাকে কাজ করতে দে। তাড়াতাড়ি গোসল করে আয় এখন ভাত দেওয়া হবে।“ মার এরকম নিষ্ঠুর(!) আচরণে আমি তখন পৃথিবীর সবচেয়ে দুঃখী মানুষ।

ফোঁপাতে ফোঁপাতে গোসল করতে চলে গেলাম। খেতে বসেছি তবু তার উপর অভিমান যায় না। তিনি যদি টাকা না দিতেন তাহলে হয়তো এতো সমস্যা হতো না। যদি দিলেনই যখন তাহলে এতো দেরি করলেন কেন। এক ধরণের দুঃখবোধ নিয়েই খাওয়া শেষ করলাম। কারও সাথে কোনো কথা নেই। সোজা বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লাম।

খাওয়া-দাওয়ার পর মা হয়তো আবার সেলাই করতে বসেছেন। একটু পর শুনলাম মা ডাকছেন-

“নবীন এইদিকে আয়।“

আমি কোন উত্তর না দিয়ে বিছানা থেকে উঠে মার কাছে গেলাম। মা তখন যে কাজটা করলেন সেটা অবিশ্বাস্য। তিনি দশ টাকার নোটটা ড্রয়ার থেকে বের করে আমার হাতে দিয়ে বললেন-

“নে ধর, এটা তোর। মন ভালো করে এখন ঘুমাতে যা।“আমার তো তখন মাথা খারাপের মতো অবস্থা। একটু আগে এক টাকার অভাবে একটা আইসক্রিম খেতে পারলাম না আর এখন আমিই দশ টাকার মালিক। এই না হলে আমার মা, পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে ভালো মানুষ!

দশ টাকা হাফপ্যান্টের পকেটে নিয়ে তখন যে ছেলেটা ঘুমাতে গেল তখন সে এই পৃথিবীর একজন সুখী মানুষ, অনেক সুখী। ইশ রে, কি দুঃখ মেশানো আনন্দে আনন্দেই না কাটে আমাদের শৈশব।

কমেন্ট করুন

মুশফিক নবীন

সেশনঃ ২০১০-১১