ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল

লন্ঠন হাতে সেবারত ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল -মোটামুটি এরকম একটি চিত্র আমাদের সবার সামনে বেশ পরিচিত । ১৮২০ সালের ১২ মে ইতালির ফ্লোরেন্স শহরের বেশ সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম নেয়া নাইটিঙ্গেল প্রথম জীবনেই সিদ্ধান্ত নেন মানবতার জন্য নিজের জীবনকে উৎসর্গ করবেন। ঠিক এই কারণেই আমাদের কাছে ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল সেবার অপর নাম। অথচ আমরা জানি না তাঁর আরো একটি পরিচয়। পরিসংখ্যানে ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলের অবদান। এটাই নিচের গল্প।

ক্রিমিয়ার যুদ্ধের সময় ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল যখন তুরস্কের ব্রিটিশ সামরিক হাসপাতালে পৌঁছালেন, চারদিকে তখন বর্ণাতীত দুর্দশা ও বিশৃঙ্খলা। লম্বা টানা বারান্দায় অগণিত মানুষ একে অন্যের পাশে শুয়ে আছে, নিচ তলায় পায়খানার দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। হাসপাতালে খাবার ও অন্যান্য মৌলিক সরবরাহের পরিমাণও যতসামান্য। ১৮৫৬ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত এই যুদ্ধ স্থায়ী হয়। যুদ্ধ শেষে  নাইটিঙ্গেল যখন তুরস্ক ছাড়েন, হাসপাতালটির চিত্র তখন উল্টো; পরিপাটি এবং দক্ষতার দিক থেকেও অনেকখানি এগিয়ে। মৃত্যুর হার কমিয়ে এই হাসপাতালকে ইংল্যান্ডের অন্যান্য বেসামরিক হাসপাতালের কাছাকাছি নিয়ে যেতে সক্ষম হন তিনি। আর ভিক্টোরিয়ান নারী নাইটিঙ্গেল অর্জন করেন অসামান্য খ্যাতি। ভবিষ্যতে এ ধরনের বির্পযয় মোকাবেলা করার জন্য তিনি ব্রিটিশ সামরিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় কিছু মৌলিক পরিবর্তন আনেন যা ছিল ফলিত পরিসংখ্যান নামে একটি নতুন ধারার সূচনা। তার এই স্বল্প পরিচিত কাজ পরবর্তীতে অনেক মানুষের জীবন রক্ষায় ভূমিকা রেখেছে। ঠিক কীভাবে বদলে গেলো সবকিছু ?

নাইটিঙ্গেল যুদ্ধ থেকে ফেরেন কিন্তু ব্যর্থতার ঘোর তার মধ্যে থেকে কাটেনি, যদিও সাধারণ মানুষ তাকে খুবই পছন্দ করত। তাই তিনি সামরিক হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যবস্থা সংস্কারের জন্য নতুন একটি ক্যাম্পেইন শুরু করেন। এই ধরনের বিপর্যয়ের কারণ ও বিপর্যয় মোকাবেলায় করণীয় সম্পর্কে জানতে তিনি মেডিকেল পরিসংখ্যানের উদ্ভাবক উইলিয়াম ফারের শরণাপন্ন হলেন। ফার তাঁকে ঘটনার ছায়া নয় বরং প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের উপদেশ দেন । ফারের তত্ত্বাবধানে নাইটিঙ্গেল কোথায় এবং কীভাবে কত মানুষ মারা গিয়েছে, তা সম্পর্কে  বিস্তারিত পরিসংখ্যান একত্রিত করতে সমর্থ হন। পরিসংখ্যানিক তথ্য উপস্থাপনের জন্য পূর্বেও অল্প কয়েকবার গ্রাফ ব্যবহার করা হয়ে থাকলেও সম্ভবতঃ সামাজিক পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে বোঝানোর জন্য কখনই এটি ব্যবহার করা হয়নি। পরিসংখ্যানকে গ্রাফের মাধ্যমে উপস্থাপনের একজন অন্যতম প্রবর্তক হিসেবে বিবেচনা করা হয় ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলকে।

নাইটিঙ্গেলের উদ্ভাবিত সবচেয়ে পরিচিতি গ্রাফক্স এর নাম ‘কক্সম্ব’। এটি জনপ্রিয় আধুনিক পাই গ্রাফ থেকে রূপান্তরিত ছিল যা প্রত্যেক মাসে মৃত্যুর সংখ্যা এবং তার কারণ দেখাতে সক্ষম। প্রাথাগত ভাবে এই তথ্য উপস্থাপনের উপায় ছিলো বার গ্রাফ যা উইলিয়াম প্রেফেয়ার কয়েক যুগ আগে উদ্ভাবন করেছিলেন। নাইটিঙ্গেল বার গ্রাফের পরির্বতে কক্সম্ব পছন্দ করার হতে পারে যে এটিতে বিভিন্ন বছরের একই মাস একই সাথে বৃত্তের একস্থানে থাকে বলে মৌসুমভিত্তিক তুলনা সহজতর হয়। তিনি বলেন তার কক্সম্ব গ্রাফ পরিকল্পনা করা হয়েছে মানুষের চোখে সেই চিত্র তুলে ধরার জন্য যা মানুষের কানের মাধ্যমে পৌঁছে দিতে ব্যর্থ। এর মাধ্যমে হাসপাতালের পদ্ধতিগত অনুশীলনেও পরিবর্তন করা হয় । ফলাফল শতাব্দী শেষে সামরিক বাহিনীর মৃত্যুর হার সাধারণ মানুষের মৃত্যুর চেয়ে কম।

ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল এক ধরনের ‘পাই চার্ট’ উদ্ভাবনে ভূমিকা রাখেন যা বর্তমানে ‘পোলার এরিয়া ডায়াগ্রাম’ নামে এবং কখনো কখনো  Nightangle Rose Diagram নামে পরিচিত যা আধুনিক ‘বৃত্তাকার হিস্টোগ্রাম এর সমপর্যায়ের ।

নাইটিঙ্গেল গ্রাফের মাধ্যমে পরিংসখ্যানিক তথ্য উপস্থাপন করে যে সকল সরকারি কর্মকর্তার পরিসংখ্যান সম্পর্কিত ভালো ধারণা নেই তাদের নিকট বিভিন্ন প্রতিবেদন সহজভাবে উপস্থাপনের প্রয়াস পান। যা পরবর্তীতে তাঁকে রয়্যাল স্ট্যাটিসটিক্যাল সোসাইটির প্রথম মহিলা সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হতে সহায়তা করে। নাইটিঙ্গেল পরবর্তীতে আমেরিকান স্ট্যাটিস্‌টিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন-এর একজন সম্মানিত সদস্যের পদও লাভ করেন। ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল ভারতীয় গ্রামীণ জীবনে ‘অনাময় ব্যবস্থা’ (sanitation) সম্পর্কে বিস্তারিত পরিসংখ্যানিক গবেষণা পত্র প্রস্তুত করেন যা তাঁকে ভারতবর্ষে উন্নত চি্কিৎসা সেবা ও জনস্বাস্থ্য সেবা প্রণয়নের অগ্রদূত হিসেবে পরিগিণিত করে।

ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল পরিসংখ্যানের সংখ্যাকে দ্রুত বোধগম্য করতে গ্রাফের উপস্থাপনকে পরিসংখ্যানবিদ্যার একটি সরঞ্জামে পরিণত করেন ।

কমেন্ট করুন

প্রাক্তন শিক্ষার্থীঃ ১৯৯৯ - ২০০০

আরিফ আল মামুন

প্রাক্তন শিক্ষার্থীঃ ১৯৯৯ - ২০০০

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.