শহরের সব আলো নিভে যাওয়ার পর

সালাম মিয়ার টঙ দোকানটার সামনে দেড় ঘন্টা ধরে বসে আছে নাজমুল।

পরনে ঘিয়ে রঙের চেক শার্ট। হাতা গুটানো, কিন্তু দীর্ঘদিন এক শার্ট পরার কারণেই সম্ভবত হাতার দিকটা কুঁচকে গেছে। বুকের কাছে একটু ঝোলের হলদেটে দাগ লেগে আছে। শার্টের উপরের বোতামটা বোধহয় ছিঁড়ে গিয়েছিলো। একই রঙের সুতো না পাওয়ায় সাদা রঙের সুতো দিয়ে বোতামটি সেলাই করা। এক নজর দেখলেই বোতামটি চোখে লাগে।

বিকেল গড়িয়ে চারটার কাটা ছুঁইছুঁই করছে। হাজারীবাগের এই মোড়টাতে প্রতি মঙ্গলবার ঠিক এই সময়েই আসে নাজমুল কিংবা তাকে আসতে হয়। প্রায় বছর খানেকের নিয়মিত রুটিন। এসেই টঙ দোকানের মাচার কোণার দিকটায় কাচুমাচু হয়ে বসে নাজমুল। প্রথম প্রথম বিরক্ত হলেও দোকানদার সালাম মিয়া নাজমুলকে দেখলেই পান খাওয়া লাল দাঁত বের করে জিজ্ঞেস করে-

“মিয়াভাই, আইসা পড়ছেন? শরীল কেমুন? আদা দিয়া কড়া কইরা একখান চা দেই মিয়াভাই?”

নাজমুল মুচকি হেসে সালাম মিয়াকে অনুযোগের সুরে বলে-

“সালাম ভাই, আপনারে না কতবার কইছি, আমি চা খাই না। আপনের কি সত্যই মনে থাকে না, নাকি, আমার লগে মশকরা করেন?”

সালাম মিয়া দোকানের সামনে রাখা বয়ামের উপর দিয়ে মুখ বাড়িয়ে পানের পিক ফেলে। তারপর আবার হেসে বলে-

“কী যে কন মিয়াভাই! আপনেরে দেখলেই কেমুন জানি লাগে। রেগুলার আসেন বইলা আপনা লোক মনে অয়। আপনে যে চা খান না, এইটা সবসময়ই মনে থাকে। হেরপরেও, এক কাপ চা খাওয়ানোর খুব খায়েশ হয়।”

শেষবার, নাজমুল একদিন সালাম মিয়াকে কথা দেয়। আর কিছুদিন পরেই ভরা বর্ষার এক দুপুরে সালাম মিয়ার দোকানে চা খাবে সে। দুধ-চিনি কড়া করে এককাপ চা। নাজমুলের কল্পনা করতে ভালো লাগে- ঝুম বৃষ্টি। হাতে ধোঁয়া ওঠা গরম চা। সালামের দোকানের সামনে বৃষ্টিতে ভিঁজতে ভিঁজতে সে চা খাচ্ছে। দোকানের ঝাঁপের নীচে দাঁড়িয়ে নাজমুলের পাগলামি দেখে মনে মনে হাসবে বকুল।

গাউছিয়ার এক কাপড়ের দোকানে হিসেবের দিকটা সামলায় নাজমুল। প্রায় পাঁচ বছর ধরে এই দোকানটায় আছে সে। এই দোকানেই বছর দেড়েক আগে প্রথম বকুলের সাথে দেখা। চোখে লম্বা কাঁজল, লাল রঙের কামিজ পরা, চুলগুলো খোঁপা করে বাঁধা মেয়েটা যখন দোকানে এসে জিজ্ঞেস করেছিলো-

“আপনার দোকানে কি ফল্‌স পাড় পাওয়া যাবে?”

নাজমুলের তখন মনে হয়েছিলো একগোছা কাঁচের চুঁড়ি রিনরিন করে পড়ে গেল কংক্রিটের মেঝেতে। কিংবা, পিতলের থালায় এক টাকার একটা আধুলি ছুড়ে দিয়েছে কেউ- আধুলিটি না থেমে থালাটায় ক্রমাগত ঘুরছে।

নাজমুল হা করে চেয়ে আছে দেখে বকুল আবারো বলে- “ফল্‌স পাড় কি পাওয়া যাবে এইখানে?”

আবার বাতাসে সড়সড় করে পাতা উড়ার শব্দ হয়, চুঁড়ি বাজতে থাকে, পিতলের থালায় আধুলি ঘুরতে থাকে। নাজমুল বিড়বিড় করে বলে- “একটা জীবন গেল আমারও এক টুকরা ফল্‌স পাড় খুঁজতে খুঁজতে…”

চলে যেতে পা বাড়ানো বকুল হঠাৎ থেমে পড়ে। পেছনে ফিরে জিজ্ঞেস করে- “কি কইলেন?”

থতমত খেয়ে যায় নাজমুল। অপ্রস্তুত নাজমুল নিজেকে সামলে নিয়ে বলে- “না মানে… আপনার জন্যে, না, অন্য কারো জন্যে?”

“সেইটা দিয়া আপনের দরকার কী? আছে কি না সেইটা বলেন।”

“না, আপনের জন্যে ফল্‌স পাড় লাগবো না- ট্রু পাড় লাগবো। পরীরা ফল্‌স পাড় লাগায় না!”

বলে হেসে উঠে নাজমুল। আচমকা এমন কথা শুনে হেসে উঠে বকুলও। সেই থেকে শুরু। তারপর, নানা প্রয়োজনের অজুহাতে দোকানটায় প্রায়ই আসতো বকুল। হাজারীবাগ বস্তির প্রথম সারিতেই বকুলদের বাসা। পাঁচ ভাই-বোনের বড় সংসার। বকুলই বড়। বাবা প্যারীদাস রোডের এক কারখানায় কাজ করে। কিছু একটা করার মত কাজ খুঁজছিলো বকুল নিজেও। এর মাঝেই নাজমুলের সাথে পরিচয়। নাজমুলের কথার ভাঁজে, সারি সারি করে সাজানো নানান রঙের কাপড়ের তাক- এ বকুল খুঁজে পেতো আগামীর কিছু সুতো। রঙচটা দিনের শেষে, পায়ে পা ঘষে আনমনেই বকুল এসে দাঁড়াতো দোকানের সামনে। তারপর, চৈত্রের শেষ বিকেলে চারুকলার সামনে থেকে একগোছা কাঁচের চুঁড়ি বকুলের হাতে তুলে দিয়ে নাজমুল বিনিময় করছিলো তার মনটাও। প্রতি মঙ্গলবার, গাউছিয়ার সাপ্তাহিক ছুটির দিন। নাজমুল চলে আসতো হাজারীবাগের এই মোড়টাতে। যেখানটায় বেণী দুলিয়ে, কখনোবা একটা আকাশকে গায়ে জড়িয়ে ছোট ছোট পা ফেলে লজ্জা লজ্জা চোখে এসে দাঁড়াতো বকুল। তারপর দুজনে হয়তো চলে যেত ধানমন্ডি লেক, লালবাগ কেল্লা কিংবা টিএসসিতে। না বলা অনেক কথাই হতো তখন অথবা বলা কথাগুলোই আবার বলতো তারা। প্রায় বছরখানেকের নিয়মিত রুটিন।

মাস দুয়েক আগে হঠাৎ করেই বকুলের কোনো যোগাযোগ নেই। অনেক চেষ্টা করেছে নাজমুল ওর সাথে দেখা করতে পারে নি। আজ বকুল নিজেই তাকে সাড়ে চারটায় আসতে বলেছে। নাজমুল অনেক ভেবেও কুল-কিনারা করতে পারে না- এতোদিন কী হয়েছিল বকুলের।

“মিয়াভাই, আকাশের অবস্থা ভালো না। বিষ্টি আইবো। বাসায় যাবেন না?”

সালাম মিয়ার কথায় সম্বিত ফিরে নাজমুলের। দ্রুত হাতঘড়ির দিকে তাকায় সে। সর্বনাশ! চারটা পঁয়ত্রিশ। বকুল নিশ্চয়ই এসে গেছে। মাচা থেকে সাথে সাথে উঠে পড়ে নাজমুল। পা বাড়ায় সামনের দিকে। বিস্‌মিল্লাহ্ রেস্টুরেন্টের মহিলা কেবিনে থাকার কথা বকুলের।

বকুল বসে আছে। সামনে বসে আছে নাজমুল। বকুল আগের চেয়ে কিছুটা শুকিয়েছে। চোখের নিচে কালি জমেছে। কিন্তু বোঝা যায়, মেক-আপের ব্রাশে সে কালিটুকু মুছে দেয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করা হয়েছে। দীর্ঘসময় চুপচাপ থাকার পর বকুলই প্রথম নিরবতা ভাঙে।

“কিছুদিন আগে আমার বাবা মারা গেছে। সংসারের অবস্থা ভালো না। তুমি আর কোনদিন এসো না নাজমুল। আমার পক্ষে আর একসাথে চলা সম্ভব নয়।”

নাজমুল শূন্য চোখে বকুলের দিকে তাকায়। তার বুকে শীতল একটা স্রোত বয়ে যায়। সে কী বলবে ভেবে পায় না। বকুল আবার বলে-

“আমি ভুল জেনেছি। দুনিয়াটা আমার মতো নয়। তোমারে দেখে আমার খুব করুণা হয়। তুমি আর এসো না।”

বলেই হ্যান্ডব্যাগ থেকে নাজমুল তাকে যা যা দিয়েছিলো সব টেবিলের উপর বের করে রাখে। একটা হাতঘড়ি, কয়েক পাতা টিঁপ, একটা পারফিউম, দুটো শোপিস আর কয়েকটা চিঠি।

“যা যা দিয়েছিলে, সব আছে। আমি আর এই ভার নিতে পারছি না।”

নাজমুল সবগুলোর দিকে একনজর চোখ বুলিয়ে আচমকা বলে বসে, “কাঁচের চুঁড়িগুলো তো দাও নাই…”

কিছুক্ষণ থেমে থাকে বকুল। তারপর দ্ব্যর্থহীন কন্ঠে বলে- “ওটা ফেলে দিয়েছি। কিছু জিনিস কারো কাছেই থাকতে নেই। আমাকে ক্ষমা করে দিয়ো।”

বলে ব্যাগটা হাতে নিয়ে দ্রুত পায়ে বের হয়ে যায় বকুল। রেস্টুরেন্টের বাতাসে ভাসতে থাকে বকুলের গায়ের পারফিউমের গন্ধ। বুকের ভেতর বকুলের চলে যাওয়ার শব্দ শুনতে পায় নাজমুল।  কিছুক্ষণ নির্বাক বসে থাকে সে। কিছু বলার সুযোগ সে পায় না কিংবা তার বলার কিছুই থাকে না। অলিখিত চুক্তির সাক্ষী হয়ে থাকা গিফটের প্যাকেটগুলো নিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে নাজমুল।

বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। ঝুম বৃষ্টি। ভিজতে ভিজতে নাজমুল সালাম মিয়ার দোকানটা পার হয়ে চলে যায়। নাজমুলের আর চা খাওয়া হয় না।

গল্পটা এখানে শেষ হলেও হতে পারতো। কিন্তু কিছু গল্প শেষ থেকে শুরু হয়। একটা অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে এগিয়ে চলে গল্পের জীবন কিংবা জীবনের গল্প।

নগর ভবনের ঘড়িতে রাত বারোটা পার হয়েছে। হাজারীবাগ বস্তির একটা বাসায় আলো জ্বলছে। বকুল লাল রঙের একটা শাড়ি পরেছে। আয়নার সামনে বসে চোখে কাঁজল দিচ্ছে। কোন এক অদ্ভুত কারণে ঠিকমতো দিতে পারছে না। চোখে বারবার জল এসে যাচ্ছে। জল মুছে আবার কাজল দিতে হচ্ছে। ড্রয়ার থেকে কড়া পারফিউম বের করতেই সাথে বেরিয়ে পড়ে নাজমুলের দেয়া কাঁচের চুঁড়ি। একমুহূর্ত সেদিকে তাকিয়ে ড্রয়ার বন্ধ করে দেয় বকুল।

ধানমন্ডির মেইন রাস্তাটা মহাকালের মত নির্জন, বিষণ্ন। কোথা থেকে যেন একটা কুকুরের কান্নার ডাক শোনা যাচ্ছে। মাঝে মাঝে ভুস করে দু-একটা গাড়ি চলে যাচ্ছে। ফুটপাত ধরে হাঁটছে বকুল। হাঁটার সাথে সাথে তার পায়ের নূপুরটি বেজে চলেছে। পিৎজা হাটের সামনে গাড়ি নিয়ে একজন অপেক্ষা করছে তার জন্য। বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে তার জন্য অনেক আয়োজন থাকবে। কিংবা প্রতিদিন একেক ফ্ল্যাটে সে নিজেই এক বিলাসী আয়োজন।

শহরের সব আলো নিভে গেছে। শুধু রাস্তার পাশের স্ট্রিট লাইটগুলো জ্বলছে। সোডিয়াম আলোর নিচ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে বকুল। তার লাল শাড়িটির রঙ আর চেনা যাচ্ছে না।

কমেন্ট করুন
প্রাক্তন শিক্ষার্থী | পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সেশন: ২০০৭ - ২০০৮

মানিক মাহ্‌মুদ

সেশন: ২০০৭ - ২০০৮