মেঘস্নান

কাহিনীটা ফোর্থ ইয়ারের শুরুর দিকের। আড়াই মাস ধরে থার্ড ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষা দিয়ে রেজাল্টের জন্য অপেক্ষা করছি। এ সময় একটা রিফ্রেশমেন্ট ট্যুর দেয়ার জন্য মনটা ব্যাকুল হয়ে ছিল। বাড়ি চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে হওয়ায় ব্যক্তিগত ভাবে পাহাড় সমুদ্রের প্রতি টান আমার স্বভাবগত। ভার্সিটির অনেক বন্ধুই বলতো আমি নাকি সকালে পাহাড়ে ট্র্যাকিং করে আর বিকালে সমুদ্রের পাড়ে চিল করে বড় হয়েছি।          

পাহাড়, সমুদ্র ছেড়ে নতুন জায়গা বেড়ানোর চিন্তা করলাম এবার। শুরুতেই মাথায় আসল সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর। বন্ধু শায়েখ আর নঈমুলকে জানালাম। শায়েখ আর নঈমুলের সাথে অনেক জায়গায় ঘুরেছি। দুজনই প্রকৃতি প্রেমী। কোথাও ট্যুর দেয়ার প্ল্যান বেশিরভাগ সময় শায়েখই করে থাকে। সবার থেকে টাকা কালেক্ট করে, ট্যুরের খরচপাতি দেখাশোনা করা এসব করতেও ওর ভাল লাগে। ফলে ক্লাসের যারা নিয়মিত ঘোরাঘুরি করে তাদের কাছে শায়েখ “ম্যানেজার শায়েখ” হিসেবে বেশি পরিচিত। নঈমুল কিঞ্চিৎ ভীতু প্রকৃতির। সাঁতার না জানায় পানি ওর কিছুটা কম পছন্দ, তবে পাহাড় জঙ্গল ভালো লাগে ওর। ক্লাসের সবার সাথেই ওর খুব ভালো সম্পর্ক, ফলে কোথাও যাওয়ার আগে লোকবলের দরকার হলে নঈমুলকে পাঠানো হয় ছেলেপেলে রাজি করানোর জন্য।

যাহোক, সুনামগঞ্জের কথা শুনে ওরা বলল, আরো লোক লাগবে; অন্তত ৭-৮ জন না হলে নৌকা ভাড়া করে সুবিধা হবে না। কেননা জন প্রতি খরচের একটা ব্যাপার আছে। আর স্টুডেন্ট লাইফ মানেই বাজেট ট্যুর, কম খরচে যত বেশি বেড়ানো যায়।

শায়েখ আর নঈমুল কথা বলে অতি আগ্রহী ১১ জন ব্যক্তির দল করে ফেলল দ্রুতই; বলা বাহুল্য কয়েকজন অতি উৎসাহী বান্ধবীও ছিল দলে। যাইহোক যাওয়ার দিনক্ষন, খরচাপাতি সব যখন ফাইনাল তখন যাওয়ার দু’দিন আগে সবার যেন একচেটিয়া সমস্যা দেখা দিল। -‘বাসা থেকে পারমিশন দিচ্ছে না’, ‘নৌকায় কিভাবে থাকব’, ‘নৌকায় তো ওয়াশরুমের ব্যবস্থা নাই’, ‘দোস্ত, আমি তো সাঁতার জানি না’ – এরকম আরো কত বাহানা! শায়েখ, নঈমুল আর আমি ছাড়া শেষ পর্যন্ত আর কেউ যেতে রাজি হল না। এগার জনের দল নেমে এলো তিন-এ। এই ছোট দল নিয়ে খরচে পোষাবে না বলে শেষ পর্যন্ত টাঙ্গুয়ার হাওর যাত্রা বাতিলই হল। মন খারাপ করে কদিন পর ঈদের ছুটিতে চলে এলাম বাড়িতে– প্রিয় চট্টগ্রামে।

বেড়ানোর চিন্তা বাদ দিয়ে যখন ঈদের ছুটি কাটাচ্ছি এরকম সময়ে ঈদের দুদিন পর শায়েখের ফোন,

: বান্দরবন যাচ্ছি, বগালেক হয়ে কেওকাড়াডং, ২-৩ দিনের ট্যুর, যাবি না কি?

: আর কে যাবে?

: তুই গেলে আমি, নঈমুল আর চিকনা আকাশ।

: খরচ?

: আমাদের জন্য সাড়ে চার-পাঁচ হাজার, তোর আরও কম লাগবে।

হাতে সালামির টাকা ছিল, আমার তাই রাজি হতে বেশি সময় লাগল না।

ক্লাসে আকাশ নামের দুইজন আছে। একজন সাইজে ছোটখাটো কিন্তু গোলগাল, যে মোটা আকাশ নামে পরিচিত। আরেকজন কিছুটা লম্বা, তবে তাল পাতার সেপাই অবস্থা। মোটা আকাশের উপস্থিতি আর ওর স্বাস্থ্যগত কারণেই সবাই পুনর্বিবেচনা ছাড়াই ওকে চিকনা আকাশ ডাকতে শুরু করে। চিকনা আকাশও প্রচুর ঘোরাঘুরি করে তবে বেশির ভাগ সময়ই ঘরোয়া পরিবেশে পরিবারের সাথে। আকাশের আগে কখনো পাহাড়ে চড়া হয়নি। প্রথমবার পাহাড়ে উঠবে তাও আবার কেওকারাডং! ফলে আকাশের কথা শোনার পর আমি কিছুটা চিন্তিত ছিলাম। ভাবলাম ওকে নিয়ে কোনোমতে হাত-পা চারটা অক্ষত অবস্থায় ফিরতে পারলেই হবে।

পঁচিশে জুন রাতে ওরা ৩ জন তূর্ণা-নিশিতায় ঢাকা থেকে রওনা দিল। পরের দিন খুব ভোরে ওদের সাথে চট্টগ্রাম স্টেশনে দেখা করলাম। তিন জনই সারারাত ট্রেনে কার্ড খেলে কাটিয়েছে, ফলে যখন ওরা ট্রেন থেকে নামলো ট্যুরের উত্তেজনা ওদের ঘুম ঘুম চোখের আড়ালে চাপা পড়ে গেল। নঈমুলকেই কেবল কিছুটা চাঙ্গা মনে হল, বাকি দুজনের অবস্থা এমন যেন স্টেশনেই ঘুমিয়ে পড়বে।

স্টেশনে সকালের নাস্তা করে একটা ট্যাক্সি ভাড়া করে সোজা বহদ্দারহাট বাসস্ট্যান্ড চলে আসলাম। পূর্বানি বাস ছাড়ল যথা সময়েই। প্রায় ৩ ঘন্টা লাগল বান্দরবন পৌঁছাতে। বাসের বেশির ভাগ সময় ঘুমিয়েই কাটিয়েছি। সকাল ১১টায় পৌঁছলাম বান্দরবন শহরে। পরের গন্তব্য রুমাবাজার। আমরা যেখানে বাস থেকে নামলাম সেখান থেকে অটোরিক্সায় মিনিট পাঁচেক এগিয়ে গেলেই রুমা আর থাঞ্চির বাসস্ট্যান্ড। সেখান থেকে আমাদের রুমার বাস ছাড়ল ঠিক দুপুর ১২ টায়।

শুরুর দিকে বাস কিছুটা থেমে থেমে চলছিল। বাসের জানালা দিয়ে দেখছিলাম বান্দরবনের সৌন্দর্য। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তা, আর সবুজের সমারোহ, দূরে তাকালে মনে হয় পাহাড়ের সবুজ আর আকাশের নীল এক হয়ে গেছে। খাগড়াছড়ি আর বান্দরবনের পাহাড়ের উচ্চতার পার্থক্য তো আছেই, সবুজের পার্থক্যও ব্যাপক। খাগড়াছড়ির পাহাড় অনেক রুক্ষ, গাছপালা কম আর বান্দরবনের চিত্র ঠিক উল্টো।

মনে হচ্ছিল বাসের জানালা দিয়ে এই সৌন্দর্য ঠিক মনমত উপভোগ করতে পারছি না। বিশেষ করে যখন পাহাড়ের উপর থেকে সাঙ্গু নদী দেখলাম তখনই বাসের ছাদে উঠে যেতে ইচ্ছা করল। চলন্ত অবস্থায় বাসের ছাদে উঠার রিস্ক ৪ জনের কেউই নিলাম না। জানালা দিয়েই দেখলাম কষ্ট করে। সবুজ পাহাড়ের মাঝখানে সাপের মত আঁকা বাঁকা নিলাভ সাঙ্গু নদী, দেখে যে কারো চোখ জুড়িয়ে যাবে।

কিছুক্ষণ পর বাস যাত্রা বিরতি দিল। বিরতির জায়গাটাও সুন্দর। রাস্তার বামে একটু উঁচু ছোট খাট একটা হ্যালিপ্যাডের মত জায়গা। দৌড়ে উঠলাম ওখানে। সামনে পাহাড়ের ভাল ভিউ ছিল, দ্রুত ছবি তুললাম কয়েকটা। রাস্তার ডানে একটা বড় বটগাছের নিচে কয়েকটা খুঁটির উপর লম্বা তক্তা লাগিয়ে টুল বানানো। ওখানে বসে মানুষজন চা-নাস্তা খাচ্ছে, গল্প করছে । বেশির ভাগই পাহাড়ি চেহারা। ছোট খাটো একটা হাট বসেছিল গাছেটার নিচে। লোক জন পাহাড়ি আম, কাঁঠাল, আনারস এসব নিয়ে বসেছিল। আশেপাশে ছিল কয়েকটা মুদি দোকান আর খাবার হোটেল।

বাস ছাড়ার সময় হয়ে গেল। আমি আর শায়েখ মনস্থির করলাম বাসের ছাদে চড়ব। উঠে বসলাম ছাদে, একটু পর আকাশও উঠে আসল। নঈমুল বলল, ‘টিকেট কাটার সময় তো জোরাজুরি করে সামনের সিট নিলাম, এখন এই সিট ছেড়ে আসব?’ বললাম, ‘আচ্ছা, তুই তাহলে ভেতরে বসে ব্যাগ পাহারা দে’। এ কথা বলার কিছুক্ষণ পরেই দেখি সবার ব্যাগ নিয়ে নঈমুলও ছাদে উঠে গেলে। চার জন হাত পা ছড়িয়ে বসলাম।

বাস ছাড়ল। শুরু হল অসাধারণ সুন্দরের মাঝে অসম্ভব ভয়ঙ্কর এক যাত্রা। বাসের ছাদ তো ঝুঁকিপূর্ণ বটে, তার উপর এই ছোট বাসের ছাদে ভাল করে ধরে বসার মত তেমন কিছু নেই। বিশেষ করে বাস যখন বাঁক নিচ্ছিল তখন তো রীতিমত পরে যাওয়ার দশা। এড্রেনালিন রাশ হচ্ছিল, ফলে শুরুতে ভয় লাগলেও সেটাতে ধীরে ধীরে মজা পেতে শুরু করলাম আমরা সবাই। ঝুঁকি যত বেশি উত্তেজনা আর আনন্দ তত বেশি।

সরু আঁকা-বাঁকা উঁচু-নিচু রাস্তা দিয়ে ছুটে চলছে সুগন্ধা বাস। বিরতির পর বাসের গতি যেন দ্বিগুন হয়ে গেলে। উপর থেকে নিচে নামতে গতি কিছুটা কমিয়ে আবার যখন একটানে উপরে উঠছিল মনে হচ্ছিল যেন রোলারকোস্টার। প্রতিবার বাঁক নেয়ার সময় আমরা চার জন গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠছিলাম। আমাদের চিৎকারে বাসের ড্রাইভার হেল্পারও মজা পাচ্ছিল। আর বাসের ছাদে বসে চোখ ধাঁধানো পাহাড়ি প্রকৃতি দেখতে লাগলাম। শুরু থেকেই বাসের ছাদে চড়ে না আসার কিঞ্চিৎ আফসোস হল। যেদিকে তাকাই প্রকৃতি মনে হয় আগের থেকেও সুন্দর। মনে হচ্ছিল যেন সৌন্দর্য বারবার আপডেট হচ্ছে। আর সমানে ছবি তোলা তো চলছেই।

প্রায় পৌনে তিনটায় রুমা বাজার পৌঁছালাম। আমাদের গাইড জসিম ভাই সেই সকাল থেকেই অপেক্ষা করছিলেন আমাদের জন্য। অমায়িক এক লোক। এই পেশায় থাকলে অমায়িক হতেই হয়, কিন্তু উনার মধ্যে সেই চাপানো কৃত্রিমতা চোখে পড়ল না। দেখে আমাদের চেয়ে দু এক বছরের বড় মনে হয়।

রুমা বাজারে দুপুরের খাওয়া শেষ করে গেলাম আর্মি ক্যাম্পে রিপোর্ট করতে। তখন জসিম ভাই কোত্থেকে এক লোককে নিয়ে আসলেন। শাহিনুর ভাইয়ের সাথে ওখানেই পরিচয়। কিছুটা গম্ভীর, অল্পভাষী মানুষ। আমাদের বয়সী মনে হল। উনিও কেওকারাডং ঘুরতে এসেছেন কিন্তু একা।  জসিম ভাই জিজ্ঞেস করলেন উনাকে সাথে নিব কিনা। আমরা ভাবলাম একজন বাড়তি লোক হলে জনপ্রতি খরচ কিছুটা কমবে, সুতরাং আমাদের ম্যানেজার শায়েখ রাজি হয়ে গেল। রিপোর্ট শেষ করে চান্দের গাড়িতে উঠলাম।

চান্দের গাড়িটা ছিল আর্মিদের ব্যবহৃত একটা পুরাতন ল্যান্ডক্রুসার পিক-আপ। শুরু হল আরেক রোলারকোস্টার রাইড, সাথে হলুদ সূর্যের আলোয় বান্দরবনের পাহাড়ের বিকালের রূপ। প্রতি মুহূর্তেই মুগ্ধ হচ্ছিলাম। কখনো পাহাড়ের ঢাল ঘেসে আবার কখনো দুটো উঁচু পাহাড়ের মাঝ দিয়ে চলে গেছে রাস্তা। আর সেই রাস্তায় প্রচন্ড গতিতে ছুটে চলছে চান্দের গাড়ি।

সাধারণত চান্দের গাড়ি একেবারে বগালেক পর্যন্ত যায়। কিন্ত কয়েকদিন আগের বৃষ্টিতে পাহাড় ধস হয়ে রাস্তা বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে আমাদের আরো ২ কিলোমিটার পাহাড়ি রাস্তা পাড়ি দিয়ে বগালেক যেতে হবে। গাড়ী থেকে নেমে হাঁটা শুরু করলাম। রাস্তার দুই পাশের পাহাড়ে প্রচুর আম গাছ, সেগুলোতে বড় বড় আম ঝুলছে । অনেক কষ্টে ঢিল মারার ইচ্ছা সংবরণ করলাম। শায়েখ কোন ফাঁকে গিয়ে একটা আম ছিঁড়ে আনল খেয়ালই করিনি। পাহাড়ের গায়ে পিচ করা রোড, তবুও এই পাহাড় বাইতে সবারই কষ্ট হল, বিশেষ করে আকাশের। এই দুই কিলোমিটার পাড়ি দিতে প্রায় ১ ঘন্টা লেগে গেল।

বিদ্ধস্ত অবস্থায় পাহাড়ি মোড় ঘুরে যখন বগালেকে প্রথম চোখ পড়ল সব ক্লান্তি যেন নিমেষেই মিলিয়ে গেল। দুটো বিশাল পাহাড়ের মাঝখানে শান্ত নিলাভ সবুজ পানির লেক। যারা যায়নি তাদের কে বলে বোঝানো যাবে না। বগালেকের ছবি আগেই দেখেছি, সুন্দর এডিট করা ছবি। চোখের দেখা সৌন্দর্য আর ছবির সৌন্দর্য যে বিস্তর তফাৎ এখানেই এসেই বুঝলাম। আকাশের ছোপ ছোপ মেঘের ছায়া পড়ছে লেকের উপর, হালকা কোমল বাতাস ঢেউ তৈরি করছে লেকের পানিতে, সেই ঢেউয়ে ডুবন্ত লাল সূর্যের আলো চিকচিক করছে। লেকের পাশে খুঁটির উপর বসানো টিনের ছাউনি দেয়া কয়েকটা কটেজ।

বাংলাদেশের সর্বোচ্চ উচ্চতার স্বাদু পানির পানির হ্রদ বগালেক। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা প্রায় ১,২৪৬ ফুট। ফানেল আকৃতির আরেকটি পাহাড়ের চূড়ায় বগালেক দেখতে অনেকটা আগ্নেয়গিরির মুখের মত। বগালেক অনেকের কাছে ড্রাগন লেক নামেও পরিচিত। স্থানীয়দের উপকথা অনুযায়ী অনেককাল আগে পাহাড়ের গুহায় এক ড্রাগন বসবাস করত। কিন্তু একবার কয়েকজন মিলে এই ড্রাগন দেবতাকে হত্যা করলে পাহাড়ের চূড়াটি পানিতে ভেসে যায়, এবং আশেপাশের গ্রাম গুলো ধংস হয়ে যায়। এভাবেই উৎপত্তি ড্রাগন লেকের। প্রায় ১৫০ ফুট গভীর লেকটি পুরোই আবদ্ধ একটি জলাশয়। সব চেয়ে মজার ব্যাপার হল বগালেকের পানি প্রতি বছর এপ্রিল থেকে মে মাসে ঘোলাটে হয়ে যায়। লেকের তলদেশে একপ্রকার উষ্ণ প্রস্রবণের কারণে এমনটা হয়  বলে ধারণা করা হয়।

বগালেকে ঢোকার রাস্তায় এক পাশে আর্মিদের ক্যাম্প। আর্মি ক্যাম্পে রিপোর্ট করে কটেজে ঢুকলাম। পুরো কটেজটাই বেড়ার তৈরি, সামনে পেছনে বারান্দা, দুটো রুম একটা বেড়া দিয়ে আলাদা করা। রুমের মেঝেতে তোশক পেতে দেয়া, আর কোন আসবাবপত্র নেই। পেছনের বারান্দাটা লেকের পাশে। বারান্দায় গিয়ে মনে হলো সারাজীবন এখানে বসেই যদি কাটিয়ে দেয়া যেত!

প্রকৃতির সান্নিধ্যে থাকার জন্য জায়গাটা অসাধারন। খাবারের জন্য এখানকার স্থানীয়দের হোটেলে আগে থেকে বলে রাখতে হয়। জসিম ভাইকে বলে রেখেছিলাম, উনি খাবারের ব্যবস্থা করলেন। খাবার পানির উৎস পাশের পাহাড়ি ঝর্না, পাইপ দিয়ে পানি উঠানো হয় ঝর্ণা থেকে। টয়লেটের অবস্থা খুব একটা সুবিধার না, বেড়ার তৈরি দেয়াল ভেতরে প্লাস্টিকের কমোড বসানো। আকাশের একদমই পছন্দ হলো না। সে কিছুক্ষন ঘ্যানর ঘ্যানর করল টয়লেট নিয়ে। নঈমুল কিছুটা বিরক্ত হল ওর উপর এবং একটা ছোটখাট বাক বিতন্ডা ঘটে গেলে দুজনের মধ্যে। আমি আর শায়েখ মিলে ওদের বুঝিয়ে ঠাণ্ডা করলাম। ঘরকুনো মানুষ নিয়ে ঘুরতে বের হল এরকম ঝামেলাই হয়।

পাহাড় বেয়ে ওঠার পর লেকের পানি দেখে আর থাকতে পারলাম না, ব্যাগগুলো কটেজে রেখেই সবাই মিলে দৌড়ে নামলাম পানিতে। শাহিনুর ভাই উপরেই ছিলেন উনি পানিতে নামলেন না। লেকের একপাশে আমাদের কটেজ থেকে একটু দূরে বাঁধাই করা ঘাট। যখন পানিতে নামি তখন প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেছে, অন্ধকার হয়ে আসছে চারিদিক, পাহাড়ের চূড়ায় তখনো সূর্যের আলো পড়ছে। একটু ভয় ভয় লাগছিল পানিতে, তাই ইচ্ছা থাকলেও সাঁতরানোর সাহস হল না, ঘাটের সিঁড়িতে শরীর ডুবিয়ে বসে থাকলাম। একেই বলে শান্তি, এসবের জন্যই তো পাহাড়ে জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানো। আকাশ যে কতবার সাঁতার না জানার আফসোস করল। নঈমুল গামছা পরে নেমেছিল, আর কিছুক্ষন পর পর গামছায় গিট দিচ্ছিল উপরে একটা নিচে একটা। বলল ‘ভাই মাছ অনেক ডিস্টার্ব করছে, খালি গামছার ভেতর ঢুইকা যায়’। শায়েখ ডুব দিয়ে পানির নিচে ছবি তোলার চষ্টা করছিল। তবে অনেকটা অন্ধকার হয়ে আসায় ওর প্রচেষ্টা ব্যর্থ হল, ক্যামেরায় কিছুই দেখা গেল না পানির নিচে।

সব ক্লান্তি লেকের পানিতে ধুয়ে সবাই চাঙ্গা হয়ে উঠল। আমরা উঠেছিলাম বগালেকের সবচেয়ে পরিচিত এবং জনপ্রিয় ব্যক্তি সিয়াম দিদির কটেজে, খাওয়া-দাওয়াও উনার হোটেলে। শুনলাম এখানে কচিবাঁশ রান্না হয়। যেহেতু এখানকার স্পেশাল আইটেম, একটু তো চেখে দেখতেই হয়। জসিম ভাইকে জানলাম আমাদের আগ্রহের কথা।

সন্ধ্যার কিছুক্ষণ পরেই আকাশে চাঁদ উঠল, অর্ধেক চাঁদ, একবার মেঘের আড়ালে চলে যাচ্ছে আবার মেঘ সরতেই স্বমহিমায় আবির্ভূত হচ্ছে। ঘাট পাড়ের জায়গাটা বসার জন্য ভালোই। ব্যাঙের ছাতার মত দুটো ছাউনির নিচে মোড়ার সাইজের কংক্রিটের টুল বসানো। ওখানে বসে লেকের পানিতে রুপালি চাঁদের আলো দেখে আর বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়ে সময় ভালোই কাটল।

শাহিনুর ভাইয়ের সাথে কথা বলে জানতে পারলাম, উনি বিবাহিত। আর অনেক দিন ধরেই এরকম একা একা ঘুরে বেরান। প্রায় ৪৫ জেলা দেখা হয়ে গেছে তার ইতিমধ্যে। কম কথার মানুষ, ফলে কথোপকথন বেশি আগালো না। আমাদেরও যে খুব একটা ইচ্ছা ছিল তা না। উনাকে উনার মত থাকতে দিয়ে আমরা একটু আশেপাশে ঘুরে দেখলাম। বগালেক ঘেঁষে বমদের গ্রাম। এখানকার মানুষ গুলো অনেক সভ্য। পর্যটকরাই যে তাদের জীবিকার মূল উৎস এই ব্যাপারটা এরা ভাল করেই জানে। সন্ধ্যার পর চা-কফি খেতে বমদের একটা হোটেলে বসলাম। সামনে চেয়ার টেবিল দিয়ে ট্যুরিস্টদের বসার জায়গা, আর ভেতরের ঘরে নিজেদের থাকার জায়গা। ভেতর একটা ছোট ছেলেকে অক্ষর শেখানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছিল তার মা।

বাইরের মানুষ বলতে আমরা কজন, বাকি সবাই স্থানীয়। ঈদের ছুটি শেষ হওয়ার পর আসাতে ভিড় একদমই নেই। ফলে একান্তে উপোভগের জন্য নিরিবিলি পরিবেশ পেয়েছি। রাতের খাবার শেষে কটেজে ফিরলাম। কটেজের চারপাশে প্রচুর আম গাছ। কিছুক্ষণ পরপরই ধুপধাপ টিনের চালে আম পরার শব্দ হচ্ছিল।

বগালেকে বিদ্যুতের লাইন পৌঁছায়নি, জেনারেটর চলে আর সৌর বিদ্যুৎ, কিন্তু ট্যুরিস্ট কেবল আমরা কজন হওয়ায় আমরা জেনারেটরের সুবিধা পেলাম না। ফলে জসিম ভাইকে দিয়ে মোবাইল, পাওয়ার ব্যাংক সব চার্জ করানোর জন্য সিয়াম দিদির বাসায় পাঠানো হল। কটেজে দুটো রুমের একটাতে আমরা চার জন, আর বাকিটা শাহিনুর ভাইয়ের জন্য ছেড়ে দিলাম। ঘুমাতে যাওয়ার আগে দেখি উনি কাঁথা বালিশ নিয়ে আমদের রুমে চলে আসলেন। বললেন- ‘ভাই ভয় লাগে, একা থাকতে পারবো না’। বলে আমরা কিছু বলার আগেই এক পাশে গিয়ে শুয়ে পরলেন। শায়েখ নঈমুল এতে কিছুটা বিরক্ত হল, যদিও উনার সামনে প্রকাশ করল না। পরের দিন অনেক সময় ধরে পাহাড় বাইতে হবে ভেবে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পরলাম। এমনিতেও সাথে মোবাইল না থাকায় বেশি কিছু করার ও ছিল না, ঘুমানো ছাড়া। কার্ড খেলতে বসেছিলাম, হাই তুলতে তুলতে সেটাও আর বেশি দূর আগালো না। শেষমেশ ঘুমিয়ে পরলাম।

রাতে হালকা বৃষ্টি হয়েছিল। টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ সব মিলিয়ে ঘুমটাও হয়েছে দারুণ। সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠেই বারান্দায় গেলাম। ভোরে বগালেকের এ যেন অন্য এক রূপ। সূর্যের কোমল আলো তখনো লেকের পানি স্পর্শ করেনি, কেবল পাহাড়ের গায়ে পড়েছে। স্নিগ্ধ একটা অনুভূতি, রাতের বৃষ্টিতে প্রকৃতি একেবারে তরতাজা হয়ে উঠেছে।

একা একা এই প্রকৃতি উপভোগ করা অপরাধ হবে, তাই জলদি গিয়ে সবাইকে ডেকে তুললাম। বাকিদের অবস্থাও আমার মত, যেন সারাদিন বারান্দায় বসেই কাটিয়ে দেবে।

কটেজ থেকে বের হলাম ফ্রেশ হওয়ার জন্য। আর শুরু হল ভাঙ্গা টয়লেটের সামনে লম্বা লাইন। যেই আকাশ শুরুতে টয়লেট নিয়ে নাক সিটকাচ্ছিল, সেই সবার আগে গেল। মানুষের অভিযোজন ক্ষমতা কতটা তীব্র আকাশকে দেখে বুঝলাম।

আমরা ফ্রেশ হয়ে সকালের নাস্তা সেরেই কেওকাড়াডং এর উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। আকাশে মেঘের আনাগোনা ছিল, ভালোই হল রোদ কম লাগবে। শুরুর দিকে অতি উত্তেজনায় দ্রুত হাঁটা শুরু করলাম, হাঁটা কি রীতিমত দৌড়। ফলাফল অল্পতে হাঁপিয়ে গেলাম আর ঢকঢক করে পানি খেয়ে পেট ফুলিয়ে ফেললাম। ফলে হাঁটা আরো কষ্টকর হয়ে গেল। জসিম ভাই একটা টেকনিক শিখিয়ে দিলেন। বললেন, শুধু গলা ভেজে এই পরিমাণ পানি খেতে তাহলে তৃষ্ণাও মিটবে আর হাঁটতেও অসুবিধা হবে না।

যাই হোক পাহাড়ি মেঠোপথ বেয়ে উঠতে লাগলাম। বিশাল বিশাল গাছ দুই পাশে, বেশির ভাগ দেখলাম বড় বড় সেগুন গাছ, আরো হরেক রকমের বনজ গাছে যেগুলোর নাম আমার জানা নেই  আর সেসব গাছে পাখির নিরলস কিচির-মিচির ডাকাডাকি। বানরও চোখে পড়ল কয়েকটা, তবে পুরান ঢাকার মত অত বেশি না। দূরে কিছু কিছু পাহাড়ের পাশে জুম চাষ হচ্ছিল। কিছু পাহাড়ে সব গাছ কেটে একেবারে ন্যাড়া করে কেবল জুম চাষ করছে । সবুজ একটা পাহাড় কোন বড় গাছ নেই, আছে শুধু জমি আর দুয়েকটা খড়ের ছাউনি দেয়া মাঁচা। দূরে পাহাড়ের মাঝে কয়েকটা ঝর্ণা দেখলাম। জাদিপাই বান্দরবনের সব চেয়ে বড় ঝর্ণা। জাদিপাইয়ে যাওয়ার রাস্তাটা দেখলাম, কিন্তু যেতে পারলাম না। নিরাপত্তা জনিত কারণে আর্মি ওখানে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে।

আমরা একটা পাহাড় পার হয়ে পানি বিরতি নিলাম একটা ছড়ার পাশে। ঠান্ডা পানিতে পা ভেজাতেই সারা শরীর ঠাণ্ডা হয়ে গেল। গাইড বলল, এই পানি চিংড়ি ঝর্ণা থেকে আসছে, ঝর্ণাটা কাছেই। ভাবলাম দেখে আসি। ঝর্ণায় ভেজার কোনো ইচ্ছা ছিল না কারণ আরো দুটো পাহাড় বাইতে হবে, আর ভেজা কাপড়ে পাহাড়ে ওঠা কষ্টকর হবে। কিন্তু ঝর্ণাটা দেখার পর আর না ভিজে থাকতে পারলাম না।

আমি মিরসরাইয়ের আশেপাশে এর থেকে আরো বড় ঝর্ণা দেখেছি। তবে এই ঝর্ণার সৌন্দর্য ছিল অন্যরকম। ঝর্ণাটা কিছুটা ভেতরের দিকে, গাছপালা দিয়ে ঢাকা, উপরে বড় বড় গাছ থাকায় সূর্যের আলো ঠিক মত পৌঁছায় না, গাছের ফাঁক দিয়ে টর্চের আলোর মত সূর্য রশ্মি পড়ছিল। প্রায় ৬০ ফুট উপর থেকে পানি আছড়ে পড়ছে বিশাল এক পাথরের উপর ফলে ঝর্ণার সামনের কূপটা বেশি গভীর হওয়ার সুযোগ পায়নি। এই অগভীর পানিতেই সবাই মিলে দাপাদাপি করলাম অনেকক্ষণ। সাঁতার না জানা আকাশ তার সাঁতারের সকল কৌশল দেখিয়ে দিল এই হাঁটু পরিমাণ পানিতে। নঈমুল ধ্যানে বসল ঝর্ণার নিচে, আমিও গিয়ে দাঁড়ালাম। যেই বেগে পানি আছড়ে পড়ছে মিনিট দুয়েকের বেশি দাঁড়ানো সম্ভব হল না ঝর্ণার নিচে, প্রকৃতির কাছে আত্মসমর্পণ করতেই হল। ঝর্ণার পানিতে শরীর মন দুটোই ঠাণ্ডা হয়ে গেল।

চিংড়ি ঝর্ণা থেকে বের হয়ে আরেকটা পাহাড়ে উঠতে লাগলাম। পাহাড়টা বেশ খাড়া, তার উপর গত রাতের বৃষ্টিতে কিছুটা পিচ্ছিল হয়ে আছে। উঠতে বেশ বেগ পেতে হল। কিছু কিছু জায়গায় তো আছাড় খাওয়ার উপক্রম হয়েছিল।

প্রায় চল্লিশ মিনিট এই খাড়া পাহাড় বেয়ে উঠে একটা সমতল জায়গায় আসলাম। এখানে ছাউনি দেয়া সুন্দর বসার জায়গা আছে। ওই ছাউনির পাশেই পাহাড়ি চেহারার এক বৃদ্ধ কলা, পেঁপে বিক্রি করছিলেন। এনার্জির জন্য সম্মিলিত খরচ থেকে কলা, পেঁপে কেনা হল। প্রায় ২২০০ ফুট উপর থেকে ছাউনিতে বসে কলা খেতে খেতে পাহাড়ি প্রকৃতি দেখতে অসাধারণ লাগছিল। আমি আর আকাশ শায়েখকে বললাম লাফ দিয়ে শূন্যে ভাসমান অবস্থায় ছবি তুলব। নঈমুল কি শুনলো কে জানে, আমার আকাশের মাঝখানে এসে দাঁড়ালো। আমরা ছবি তোলার জন্য লাফ দিলাম আর নঈমুল বুকের কাছে দুই হাতে দিয়ে একটা হার্ট সেপ পোজ দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পরে বুঝলাম যখন শায়েখকে বলেছিলাম “লাফ” দিয়ে ছবি তুলব, নঈমুল শুনেছিল “লাভ” দিয়ে ছবি তুলব।

কিছুক্ষণ জিরিয়ে নিয়ে আবার হাঁটা শুরু করলাম। ওই পাহাড়টা পার হয়ে আরেকটা পাহাড়ের পাশ দিয়ে আরো প্রায় সোয়া এক ঘন্টা হাঁটার পর আমরা দারজেলিং পাড়ায় পৌঁছালাম।

পাড়ায় প্রবেশের রাস্তায় পাহাড়ের ঢালে কয়েকটা এপিটাফ দেখতে পেলাম। নাম পড়ে বুঝলাম খ্রিষ্টানদের সমাধি, পাড়ার ভেতরে দুটো চার্চও চোখে পড়ল। বুঝতে পারলাম এখানকার বেশির ভাগ বাসিন্দাই খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী। ছোট পাড়াটা খুবই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন আর সাজানো গোছানো। ট্যুরিস্টারাই এদের জীবিকার মূল উৎস। প্রায় প্রত্যেক ঘরের সামনেই অতিথি আপ্যায়নের ভাল ব্যবস্থা আছে। ওখানকার সবচেয়ে ভাল ঘরটায় ঢুকলাম চা বিরতি নিতে। এই পাড়া থেকে কেওকাড়াডং দেখা যায়।

পুদিনা চায়ে চুমুক দিতে দিতে ওটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম, ভাবছিলাম আর কিছু সময় পরই আমি থাকব বাংলাদেশের চূড়ায়। কেওকাড়াডং পৌঁছানোর আগে এটাই ছিল শেষ বিরতি। চা শেষ করেই  বেরিয়ে পরলাম, চা টা রিতিমত জেট ফুয়েলের মত কাজ করল। সবাই খুব দ্রুত পা চালাতে থাকলাম। ফলে বাকি সাড়ে আটশ ফুট উঠে গেলাম ২৫ মিনিটে। একটা বাঁশের তৈরি গেইটে লেখা “স্বাগতম কেওকারাডং আর্মি ক্যাম্প”। ওই গেইট থেকে কংক্রিটের সিঁড়ি উঠে গেছে উপরে। সিঁড়ির দুই পাশে আর্মি ক্যাম্প। সিঁড়ি ভেঙ্গে উপরে উঠে দেখি একটা কংক্রিটের টুকরায় লেখা-

“KEOKRADONG
THE
HIGHEST PEAK(3172) OF
BANGLADESH
LAID BY
MAJ AM. MOSAROF HOSSAIN
BCOY COMD OF 38
TH BATTALION
THE EAST BENGAL REGIMENT
DT 02.03.93”

অবশেষে আমরা কেওকারাডং এর চূড়ায় ভেবেই শান্তি পাচ্ছিলাম। নঈমুল একটা পতাকা নিয়ে এসেছিল। সবাই ওটা ধরে এই বিদ্ধস্ত অবস্থাতেই একটার পর একটা ছবি তুলতে লাগলাম। বাংলাদেশি হয়ে কেওকাড়াডং এর চূড়ায় বাংলাদেশের পতাকা উড়ানোর কোন মানে খুঁজে পেলাম না, যেখানে আগে থেকেই আর্মিদের লাগানো পতাকা উড়ছে। আবেগের সামনে যুক্তি টিকল না, পতাকা নিয়েই বিভিন্ন পোজে ছবি তুললাম, সাথে স্লো-মোশন ভিডিও।

কেওকাড়াডঙ্গের চূড়া থেকে নেমে গেলাম কটেজে । কটেজ গুলো পাহাড়ের ঠিক ঢালে খুঁটির উপর বসানো। আমাদের কটেজটা ছিল সবচেয়ে উঁচুতে, আর একপাশে। সবুজ টিনের কটেজটি বেশ মজবুত করেই বানানো হয়েছে। কটেজে ঢুকতেই সদর দরজার দুইপাশে বসার জায়গা, দরজা দিয়ে ঢুকে কটেজের অপর পাশের বারান্দা পর্যন্ত লম্বা করিডোর, করিডোরের দুইপাশে দুটো বড় বড় রুম। আর দুটো রুম বারান্দার পাশে। বারান্দা থেকে এতো অসাধারন ভিউ, চোখ জুড়িয়ে গেল। জসিম ভাইকে নগদে একটা ধন্যবাদ দিয়ে দিলাম।

হালকা ফ্রেশ হয়ে, দুপুরের খাওয়া সারতে গেলাম কেওকাড়াডঙ্গের রাজা লালা বং এর বাসায়। কটেজগুলোর মালিকও তিনি। দোতলা একটা কাঠের বাড়ী। উপরে ট্যুরিস্টদের থাকার ব্যবস্থাও আছে। আর নিচে বিশাল একটা ডাইনিং রুম। ভেতরে গিয়ে লালা বং কে পেলাম না, উনার পরিবারের সাথে দেখা হল। অনেক বেশি আন্তরিক মানুষগুলো।

দুপুরের খাওয়া শেষ করে হ্যালিপ্যাডে গেলাম, হ্যালিপ্যাড টা কেওকারাডং এর পাশেই। একটা ফুটবল মাঠ থেকে ক্ষানিকটা ছোট হবে। ওখানে আবার জোঁকের উপদ্রব বেশি।

হ্যালিপ্যাড থেকে আবার গেলাম কেওকারাডং এর চূড়ায়। প্রচুর বাতাস ছিল, সেই বাতাসে ভেসে যাচ্ছিল মেঘ। মেঘ গুলো এতোই নিচে মনে হচ্ছিল যেন লাফ দিলেই ধরা যাবে, আবার মনে হচ্ছিল এই যেন শরীর ছুঁয়ে গেল। এতো উপর থেকে বাকি পাহাড় গুলো একেবারে ছোট মনে হচ্ছিল। সারা বিকাল ওখানে বসেই কাটালাম, সূর্যাস্ত দেখলাম। বাকি সব বাদ দিলেও শুধু কেওকাড়াডঙ্গের চূড়ায় বসে সূর্যাস্ত দেখার জন্য হলেও একবার বান্দরবন আসা উচিত। প্রকৃতি কত সুন্দর আর বৈচিত্র্যময় বান্দরবন আসলে ব্যাপারটা আরো ভাল ভাবে অনুধাবন করা যায়।

হঠাৎ শায়েখ বলল আমার থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্টের হাঁটুর কাছে রক্ত লেগে আছে। তাকিয়ে দেখি জোঁকে ধরেছে। সবাই নিজেদের একবার চেক করে নিল। আকাশের গায়েও জোঁক লেগেছে। আমার স্যান্ডেলের ভেতরেও ছিল একটা। তাড়াতাড়ি আর্মি ক্যাম্পে গেলাম, লবন দিয়ে জোঁক ছাড়ালাম। পায়ের কাছটায় অনেক্ষন রক্ত ঝরছিল। জসিম ভাই লালা বং এর বাসা থেকে গুল এনে দিলেন ক্ষতস্থানে লাগানোর জন্য।

সন্ধ্যা হতেই কিছু শুকনো খাবার নিয়ে কটেজে ফিরলাম। কাঠের মেঝেতে তোশক পাতা, আর অনেকগুলো লেপ, কম্বল। সূর্য ডুবে যাওয়ার সাথেই সাথেই যেন ঠাণ্ডা পড়তে শুরু করল। বিকালেও মোটামুটি ঠাণ্ডা ছিল, কিন্তু সন্ধ্যার পর ঠাণ্ডাটা অনেক বেড়ে গেল। সবাই যার যার মত কম্বল নিয়ে আরাম করে বসলাম। মানুষ কম হওয়ায় প্রয়োজনের তুলনায় অধিক কম্বলের যোগান ছিল। তাও নঈমুল আর শায়েখ কম্বল নিয়ে টানাটানি শুরু করে দিল। আকাশ কার্ড নিয়ে এসেছিল। কার্ড খেলে সময় ভালোই কাটছিল, সবাই প্রচন্ড ফুর্তি মেজাজে ছিলাম।

হঠাৎ শায়েখের ফোন বেজে উঠল। রুমির ফোন। ওদের কথা শুনে বুঝলাম রেজাল্ট দিয়েছে। রুমি একে একে সবার রেজাল্ট বলল, এরপরই কলটা নেটওয়ার্ক স্বল্পতার কারণে ডিস্কানেক্ট হয়ে গেল। সব আনন্দে যেন পানি ঢেলে দিল ঐ একটা ফোন কল। আমার মাথায় এটা ঢুকলো না, সেই বিকাল থেকে সবাই বাসায় যোগাযোগের চেষ্টা করলাম। নেটওয়ার্কের খারাপ থাকায় কল যায়নি। অথচ রুমির কল ঠিকই আসল। জগত বড়ই বৈচিত্রময়!

সবারই মন-মেজাজ কিঞ্চিৎ খারাপ হয়ে গেল। মেজাজ ঠিক করার জন্য চা খেতে কটেজ থেকে বের হলাম, বাইরে প্রচণ্ড ঠাণ্ডা। এই জুন মাসেও মনে হল ডিসেম্বরের শীত। কাঁপতে কাঁপতে নিচে গেলাম। চা খাওয়া শেষ করে চূড়ায় উঠলাম। একেতো ঠাণ্ডা তার উপর বাতাস, হাঁড়গোড় হিম হয়ে যাওয়ার মত অবস্থা। বেশিক্ষণ দাঁড়াতে পারলাম না, নেমে আসলাম। রাতের খাওয়া শেষ করে, কটেজে ফিরে ঘুমাতে গেলাম। শুরুতে নঈমুল আর আকাশ আলাদা আলাদা রুমে থাকতে চাইলেও রাতে ঘুমাতে গিয়ে ভূতের ভয়ে আমদের সাথেই ঘুমাতে আসল। অথচ আকাশ বলল, ‘দোস্ত বেশি ঠাণ্ডা, একসাথেই ঘুমাই’। আসল ব্যাপার জানলেও ওদের দুজনকে শাহিনুর ভাইয়ের সামনে আর কিছু বললাম না। সারা দিন পাহাড় বেয়ে ক্লান্ত, তার উপর এই ঠাণ্ডা পরিবেশ, সব মিলিয়ে কম্বলের নিচে মারত্মক ঘুম হল।

সকালে উঠে মনে হল রুমের ভেতরটা ধোঁয়ায় ভরে গেছে। রুম থেকে বের হতে গিয়ে রাতে দরজার উপর নেড়ে দেয়া ঘামে ভেজা কাপড়গুলো ধরে মনে হল যেন ওগুলো আরো ভেজা ভেজা হয়ে আছে। বারান্দায় গেলাম। মাথা নষ্ট করা ভিউ। মনে হচ্ছিল সাদা মেঘের সমুদ্রের মাঝে পাহাড়ের চূড়াগুলো দ্বীপের মত মাথা উঁচু করে আছে।  মোবাইলে টাইমল্যাপ্স ভিডিও চালু করে দিলাম। চেয়ারে হেলান দিয়ে বারান্দার রেলিঙের উপর পা উঠিয়ে বসলাম। ঠাণ্ডা বাতাস লাগছিল গায়ে, আর সামনের পাগল করা দৃশ্য। এক কাপ চা খুবই দরকার ছিল এই সময়। পূর্ণতার মাঝেও একটা ছোট্ট অপূর্ণতা। মনে মনেই চায়ের ফিল নিয়ে নিলাম, আর চুপচাপ দেখতে থাকলাম। প্রকৃতি এত সুন্দর কেন! ইচ্ছা করছিল সারাজীবন এখানেই কাটিয়ে দেই।

কটেজ থেকে বের হয়ে দেখালাম পরো জায়গাটা ধোঁয়া আর কুয়াশায় ঘেরা। আশেপাশে সব আবছা আবছা দেখা যাচ্ছে। দশ-বার ফুট দূরের জিনিসও ঠিক মত দেখা যায় না। ফ্রেশ হয়ে এসে নামার প্রস্তুতি নিলাম। আকাশ বলল- ‘ভাই একটু পরে নাম, আরো কিছুক্ষন দেখি’। ওর কথায় আরো মিনিট দশেক বসলাম।

বিকালের মধ্যে আমার চট্টগ্রাম আর ওদের রাতের মধ্যে ঢাকা পৌঁছাতে হবে। তাই বেশি দেরি না করে সকাল সকাল বেরিয়ে পড়লাম। সকাল ৭টায় কেওকাড়াডং থেকে নামা শুরু করলাম। বগালেক গিয়েই সকালের নাস্তা করব। নামতে বেশি সময় লাগল না। দুই ঘন্টায় পৌঁছালাম বগালেক। সকালের ডিম খিচুড়ি সাথে ডাল আর আলুভর্তা এতো ভাল হয়েছিল, যেন অমৃত। ক্ষিদেও পেয়েছিল বেশ। নঈমুলতো একাই চার প্লেট খেয়ে ফেলল। ওর এই প্রতিভা সম্পর্কে আমি অজ্ঞাত ছিলাম। সিয়াম দিদির সাথেও দেখা হয়ে গেল, খুবই বন্ধুসলভ ব্যক্তি।

আসতে ইচ্ছা করছিল না একেবারেই। এত সুন্দর প্রকৃতি ফেলে আবার শহরমুখী হতে হবে, এই ব্যাপারটা খুবই পীড়া দিচ্ছিল। মনে কষ্ট নিয়েই চান্দের গাড়ীতে উঠলাম। রুমা বাজার পৌঁছাতে পৌঁছাতে দুপুর হয়ে গেল। দুপুর খাবার শেষ করে জসিম ভাইয়ের থেকে বিদায় নেয়ার আগে কথায় কথায় জানতে পারলাম, উনি নাকি পাঁচ সন্তানে বাবা। বড় ছেলে ক্লাস ফাইভে পড়ে। তাজ্জব ব্যাপার, অথচ উনাকে দেখে আমরা ভাবছিলাম আমদের প্রায় সমবয়সী। সপ্তাহে পাঁচ দিন কেওকাড়াডং উঠার ফল।

রুমা বাজার থেকে বান্দরবন পৌঁছাতে পৌঁছাতে বিকাল হয়ে গেল। আমি চট্টগ্রামের বাসে বাড়ি ফিরলাম, আর ওরা সন্ধ্যার বাসে ঢাকায়।

বাড়ি এসেই ফেইসবুক ইন্সটাগ্রামে ছবি আপলোড দিলাম। একটা ছবির caption দিলাম “ON TOP OF BANGLADESH”। সেখানে রাকিব ভাইয়া কমেন্ট করল “সাকা হাফং বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু চূড়া”। জ্ঞানের স্বল্পতার কারণে জানতামই না ব্যাপারটা।

ভাইয়ার কমেন্টে পরের গন্তব্য পেয়ে গেলাম। সাকা হাফং!!

কমেন্ট করুন

তাওহীদুল মুনিম

সেশন: ২০১৪-২০১৫