স্বপ্নবন্দী

মে মাসের মাঝামাঝি তারপরেও গায়ে একটা পাতলা জ্যাকেট চড়িয়ে ঘুরতে হচ্ছে। তাও ভালো যে আজকে থেকে থেকে রোদ উঁকি দিচ্ছে। গত তিনদিন ছিলো টানা ছিঁচকাঁদুনে বৃষ্টি আর সাথে ঠান্ডা-ভেজা বাতাস। চিরাচরিত নিউইয়র্ক ওয়েদার!

ম্যানহাটন আপার-ওয়েস্ট সাইড-এর একটা গলিতে ট্যাক্সি পার্ক করে সেটার গায়ে হেলান দিয়ে গায়ে রোদ লাগাচ্ছে আসিফ। মুখে সিগারেট ধরা। একটু আগে সে একজন যাত্রী নামিয়ে দিয়েছে পাঁচ ব্লক উত্তরে। সেলফোনের উবার ড্রাইভার এপ-এ এরমধ্যে আরও দুইজন যাত্রীর রিকোয়েস্ট এসেছে। এই মুহূর্তে আর গাড়ি চালাতে ইচ্ছে করছেনা ওর। ঘড়িতে সময় দুপুর বারোটা। সকাল সাতটা থেকে একটানা চালাচ্ছে সে।

ফেসবুক ম্যাসেঞ্জার এপ-এ নোটিফিকেশন উঠে আছে। মুমুর ম্যাসেজ। এপ চালু করে আসিফের মুখে হাসি ছড়িয়ে পড়ল। ম্যাসেজটা এক অক্ষরের। আরও নির্দিষ্ট করে বললে এক চিহ্নের — প্রশ্নবোধক। এই চলটা ওরা কবে থেকে শুরু করেছে সেটা ওর মনে নেই। ওদের যাবতীয় কথোপকথন এখন এই প্রশ্নবোধক চিহ্ন দিয়েই শুরু হয়। একজন প্রশ্নবোধক চিহ্ন পাঠায়, অপরজন তার ইচ্ছামত উত্তর দেয়। তারপর আলাপ চলতে থাকে হাডসন বা বুড়িগঙ্গার প্রবাহের মত।

আসিফ লেখে, “কাজে একটু ব্রেক নিলাম।”

“আর? সিগারেট খাচ্ছেন?”

“হুম।”

“এটা কবে ছাড়বেন?”

“ছাড়বো। বিয়ে করে ছাড়লে কেমন হয়?”

“প্ল্যান দুর্বল। বিড়িখোরদের এখন আর কেউ বিয়ে করতে চায় না। ঠোঁটে সিগারেট ধরে নিজেকে ম্যানলি ভাবার দিন শেষ।”

শব্দ করে হেসে ফেললো আসিফ। এই মেয়ের সাথে আলাপ শুরু করার আগেই সে পর্যদুস্ত হওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে রাখে। নাকি এই পর্যদুস্ত হওয়াতেই তার সুখ?

মিনিট দশেক চ্যাটিং চলার পর হাতের ফোনটা বেজে উঠলো। বেলাল ভাইয়ের কল। ধরতেই ওই প্রান্তে স্বভাবসুলভ ফূর্তি-ফূর্তি কন্ঠ — “কি করো, মিয়া? হাফ-গার্লফ্রেন্ডের লগে কাঁচাপাকা প্রেমালাপ করো?”

“ভাই, আপনে তো অন্তর্যামী!”

“দেখলাম জুকারবার্গের ম্যাসেঞ্জারে তোমারে একটিভ দেখায়। মোল্লায় যায় মসজিদে, আর তুমি চ্যাটিং করবা হাফ-গার্লফ্রেন্ডের লগে। এইটা বুঝতে অন্তর্বাসী হওয়া লাগে?”

“অন্তর্বাসী না ভাই, অন্তর্যামী। অন্তর্বাস অন্য জিনিস।”

“আইচ্ছা, বুঝছি। সন্ধ্যাবেলা জ্যাকসন হাইটস আসো। একলগে ডিনার কইরা চা-চু খামুনে।”

“ওকে, ভাই। সী ইউ!”

মুখ থেকে সিগারেট ফেলে দিয়ে ও মুমুকে ম্যাসেজ দেয় — “আচ্ছা যাই। আবার কাজ শুরু করি।”

“ওকে 😊”

আসিফ ট্যাক্সিতে উঠে বসে। এই ‘কাজ’ মানে যে ট্যাক্সি চালানো সেটা মুমু জানে। কিন্তু ওদের আলাপে দুজনের কেউই এটা সরাসরি উল্লেখ করেনা।

এইটথ এভিনিউ পার হয়ে দুই ব্লক দক্ষিণ থেকে যাত্রী তুলতে হবে। নামাতে হবে ফার্স্ট এভিনিউ আর ফোরটি ফিফথ স্ট্রীট-এ। যাত্রীর স্ট্রীটে মোড় নিতেই আসিফ চারজনের একটা দলকে সাইডওয়াক-এ দাঁড়ানো দেখতে পেলো। মধ্যবয়সী পুরষটা ওর হোন্ডা একর্ড গাড়িটার নাম্বার প্লেইট পড়ে তার উবার এপ-এর সাথে মেলানোর চেষ্টা করছে।

যা ভেবেছিলো তাই – চাইনিজ টুরিস্ট। নির্ঘাত ইউএন প্লাজা দেখতে যাচ্ছে। যাত্রীদের সামনে ট্যাক্সি থামিয়ে ও জানালা নামালো। পুরুষ মানুষটা এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো– “আমেত?”

“ইয়েস। আই’ম আহমেদ। ইওর ড্রাইভার। প্লিজ গেট ইন।”

ট্যাক্সি চলতে শুরু করলো। ৪৫-৫০ বছর বয়সী দম্পতি আর তাদের মেয়ে। মেয়েটার বয়স ১৬/১৭ বছর হবে। বাবা-মা আর মেয়ের পোশাকআশাক আর চালচলনে আকাশপাতাল পার্থক্য। জেনারেশন গ্যাপ বলতে যে পার্থক্য বোঝায় তারচেয়ে ঢের বেশি।

দম্পতি নিজেদের মধ্যে কথা বলছেন প্রায় চিৎকার করে। হঠাৎ দেখলে মনে হতে পারে যে এরা ঝগড়া করছে। কিন্তু আসিফ জানে আসলে ব্যাপার তা না। বয়স্ক চাইনিজ টুরিস্টদের অনেকের মধ্যে এই ব্যাপারটা সে লক্ষ্য করেছে।

এর একটা সুন্দর ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন শফি ভাই– “বুঝলা আসিফ, এই চাইনিজ জাতিটা অর্থনৈতিক দিক দিয়ে রকেটের মত উপরে উঠছে। ত্রিশ বছর আগে যে শিশুটার বাপ-মা তাকে তিনবেলা পুষ্টিকর খাবার খাওয়াইতে পারত না, আজকে সে যুবক এবং কোটিপতি। কিন্তু তার হয়ত খুব বেশি পড়াশোনা নাই। পশ্চিমাদের ঠিক করে দেয়া আদবকেতা-ম্যানারিজম শেখার তার সুযোগ হয়নাই। কিন্তু দুনিয়া দেখার সামর্থ্য আর ইচ্ছা দুইটাই তার আছে। এদের কাজকারবার দেখে কখনো বিরক্ত হবা না। এরা হচ্ছে বিজয়ী জাতি।”

ইন্টারেস্টিং মানুষ এই শফি ভাই। একটা বিখ্যাত ফার্মাসিউটিক্যালস-এ গবেষকের চাকরি করেন। জগতের সব বিষয়ে তার আগ্রহ এবং জানাশোনা। আসিফের ট্যাক্সিতে একদিন যাত্রী হওয়ার সূত্রে পরিচয়। তারপর থেকে প্রায়ই তাকে কল করে ডেকে এনে যাত্রী হন তিনি।

না, আসিফ বিরক্ত হয় না। তাছাড়া অর্থনৈতিক পরিবর্তন তো শুধু চাইনিজদেরই হয়নি। ছয় বছর আগে সে দেশ ছেড়ে আসার পর বাংলাদেশও অনেক বদলে গেছে।

মাস্টার্স শেষ করার পর আসিফ বছরখানের একটা প্রাইভেট ব্যাংকে ম্যানেজমেন্ট ট্রেইনি হিসেবে চাকরি করেছিল। তারপর ইমিগ্র্যান্ট হয়ে আমেরিকায় চলে আসে। ওর সমসাময়িক কলিগরা এখন প্রায় সবাই মিড্-লেভেল ম্যানেজার। এদের লাইফস্টাইল দেখলে বুঝা যায় যে দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণি আগের চেয়ে অনেক সম্পদশালী হয়েছে।

আসিফের স্কুল-কলেজ-ইউনিভার্সিটির বন্ধুদের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা তাই। কিন্তু এদের অনেকে আবার ওর জীবনটাকে স্বপ্নের মতো মনে করে। এই তো সেদিন ওর স্কুলের বন্ধু অভিজিৎ হোয়াইট হাউজের সামনে তোলা একটা ছবিতে কমেন্ট করলো “মামা, নিউইয়র্কে থাকস, ওয়াশিংটন ডিসিতে ঘুরতে যাস। তোরই তো লাইফ! নেক্সট টাইম দেশে আইলে আমার কপালে তোর কপাল লাগায়া একটা ঘষা দিয়া যাইস!”

অভিজিৎ বলে এই কথা! হারামজাদাটা একটা মাল্টিন্যাশনাল চাকরি করে। বছরে কয়েকবার মিটিং করতে যায় সিঙ্গাপুর, কুয়ালালামপুর আর ব্যাংকক। আবার ঘুরতে যাবার বেলায় বালি আর ইস্তানবুল। আসিফের কাজের দৌড় সে জায়গায় কমবেশি ২০ মাইল রেডিয়াসের ম্যানহাটান, কুইন্স, ব্রুকলিন আর ব্রঙ্কস। চার ঘন্টা ড্রাইভ করে ডিসিতে গেলেই সেটা নাকি লাইফ!

সে মনে মনে হাসে আর বন্ধুকে কষে কয়েকটা গালি দেয়। অভিজিতেরই বা দোষ কী? ছাব্বিশ বছর বয়েসে দেশ ছাড়ার সময় তারও স্বপ্ন ছিলো আমেরিকা। বয়স বত্রিশে এসে স্বপ্নটার কিছুটা রং চটে গেছে। অথচ কী আশ্চৰ্য, আমেরিকান ড্রীম বলতে যে গাড়িবাড়ি আর ভালো আয়রোজগারের জীবনের ইমেজটা ওর মনে ছিলো, সেটা তো মিথ্যা নয়।

এর ব্যাখ্যাও আছে শফি ভাইয়ের কাছে—“আমাদের দেশে মানুষ এবসোলিউট ইনকামটারেই সব মনে করে। আসলে একটা পর্যায়ের পর এবসোলিউট ইনকামে কিছু যায় আসে না। রেলেটিভ ইনকামটাই মুখ্য। ধরো, দেশে একজন ৪০ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করে মধ্যবিত্ত জীবনযাপন করে। সে ভাবলো, উন্নত দেশে যায়া আমি রেস্টুরেন্টে বাসনপত্র মাজলেও তো এর চারগুণ আয় করব। কথা সত্য। কিন্তু উন্নত দেশে দেড় লাখ টাকা আয়ে সে হবে হতদরিদ্র। এই আপেক্ষিকতার ব্যাপারটা দেশের মানুষ এখনও ভালো বুঝে না।“

আসিফ আমেরিকা আসার পর বছরখানেক বাঙালি পাড়া জ্যাকসন হাইটস-এর একটা গ্রোসারি শপে চেকআউট কাউন্টারে কাজ করেছে। আপেক্ষিক দারিদ্রতা কি সেটা হাড়ে হাড়ে বোঝার দুর্ভাগ্য তার হয়েছে।

ইউএন প্লাজায় যাত্রী নামিয়ে দিয়ে ও আরেকজন যাত্রী পেয়ে গেলো। পরবর্তী গন্তব্য ব্রুকলিনের উইলিয়ামসবার্গ।

“স্লামালাইকুম। রাতের খাবার খাইছো?”

“খাইছি। তোর শরীরটা কেমন, বাবা?”

“আমার শরীরের আবার কী হবে? তুমি আমার কলের জন্য জাইগা থাকো কেন? আমি কাজে কখন ফাঁক পাই তার তো ঠিক নাই। তোমার এখন দেরি করে ঘুমানো ঠিক না।“

“না তোর সাথে কথা না বলে আমি ঘুমাইতে পারি না। তুই একা একা থাকিস। তোর জন্য কত মেয়ে দেখলাম কিন্তু তুই বিয়ে করতে চাস না। পরশুদিন তুই ছবি দিলি, একদম শুকায় গেছিস।“

আসিফ শুকিয়ে যাচ্ছে আর সে বিয়ে করতে চায় না – মায়ের সাথে ফোনালাপে এই দুই টপিক ম্যান্ডেটরি। দ্বিতীয় অভিযোগটা সত্য। মুমুর কথা মাকে বলা হয়নি। সেটা সম্ভবও না। কারণ আট বছরের পরিচয়ে সে মুমুকেই কখনও প্রপোজ করেনি। এই অবস্থায় মাকে জানালে তিনি অতিউদ্যমী হয়ে লেজেগোবরে করে ফেলবেন।

প্রথম অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ট্যাক্সি চালানো শুরু করার পর থেকে বসে বসে লম্বা সময় কাজ করে আর ফাস্টফুড খেয়ে আসিফের ওজন বেড়েছে আট কেজি। সোজা নিজের দিকে তাকালে এখন আর সে পায়ের পাতা দেখতে পায়না, ভুড়ি দেখা যায়। ফাস্টফুড অবশ্য সে ইচ্ছা করে খায়না। রেস্টুরেন্টের খাবারের তুলনায় ফাস্টফুড সস্তা। রেস্টুরেন্ট থেকে কিনে মোটামুটি ভালো খাবার খেতে প্রতিবেলায় কমপক্ষে দশ ডলার লাগে। ম্যাকডোনাল্ডসে সে জায়গায় লাগে বড়জোর পাঁচ ডলার। এইজন্য আমেরিকায় স্বল্প আয়ের মানুষদের বেশিরভাগের অতিরিক্ত ওজন।

আসিফ প্রসঙ্গ পালটায়—“আচ্ছা, আব্বা টাকা পাইছে?”

“পাইছে। তুই খামাখা টাকা পাঠাস। আমাদের টাকা লাগবে না। তারচেয়ে তুই বছরে অন্তত একবার দেশে আয়।“

আসিফ জানে টাকার প্রয়োজন তার বাবা-মার নেই। ওর পরিবার উচ্চবিত্ত না হলেও স্বচ্ছল। তারপরেও সে প্রতি মাসে কিছু টাকা পাঠায়। ও জানে যে মানা করলেও বাবা-মার এটা নিয়ে একটা অব্যক্ত গর্ববোধ আছে।

“আচ্ছা আম্মা, রাখি। দেশে আসব এই বছর। বিয়েও করব যাও বলে দিলাম।“

আসিফ মাকে বিদায় জানিয়ে ফোন কেটে দেয়। মুমু এরমধ্যে ঘুমিয়ে পড়েছে। ইনবক্সে ম্যাসেজ পড়ে আছে—“ঘুমাতে গেলাম। কালকে সকাল আটটায় একটা টেলিকনফারেন্স আছে।“

মুমুর সাথে ওর পরিচয় ইউনিভার্সিটি পড়াকালীন। আসিফ তখন ফাইনাল ইয়ারে। ওর চাচাতো বোনের বান্ধবীর ছোটবোন মুমু পড়ে ইকোনমিক্স ডিপার্টমেন্টে, সেকেন্ড ইয়ারে। নওরিন আপুই প্রথম দেখা করতে বলে দিয়েছিলো। আসিফ যখন দেশ ছেড়ে আসে তখন ওদের সম্পর্কটা সবেমাত্র ভালোলাগায় মোড় নিতে শুরু করেছে। বিদেশে আসার পর যোগাযোগের মাত্রা বেড়েছে আরও বেশি। কিন্তু তার সাথে দুইজনের জীবনরেখাটাও যেন ব্যস্তানুপাতিকভাবে বিপরীত দিকে চলতে শুরু করেছে।

আসিফ ভেবেছিলো আমেরিকায় এসে একটু গুছিয়ে নিয়েই সে মুমুকে প্রোপোজ করে ফেলবে। গুছিয়ে নেয়াটা গত ছয় বছরে এরকম হয়েছে – এক বছর গ্রোসারি শপে কাজ, তারপর দেড় বছর ইয়েলো ট্যাক্সি চালানো, এবং শেষমেশ উবার। এই সময়ে মুমু দুই দুইটা মাস্টার্স করে একটা এনজিওতে কাজ শুরু করে এবং ক্যারিয়ারে খুব দ্রুত এগোতে থাকে। ওর মনে হয় যে দিনে দিনে মুমু আকাশের চাঁদ হয়ে যাচ্ছে আর সে হয়ে যাচ্ছে বামন। মুমুর দিকে হাত বাড়াতে সে আর মন থেকে জোর পায়না। অথচ যত দেরি হচ্ছে কাজটা ততই কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

ওর প্রতি মুমুর অনুভূতি নিয়ে অবশ্য আসিফের কোন সন্দেহ নেই। ওর কমপ্লেক্সিটির ছিটেফোঁটাও মুমুর ভেতর নেই। আর নয়ত ওর মত সুশ্রী, বুদ্ধিমতী, যোগ্য মেয়ের কী দরকার একটা প্রতিশ্রুতিহীন, লং-ডিস্টেন্স সম্পর্ক আট বছর ধরে চালিয়ে যাওয়ার?

মুমুর বাসা থেকেও বিয়ে করার জন্য চাপ আছে। এটা আসিফকে সে কখনোই বলেনি। এটা ও জানতে পেরেছে মুমুর এক বান্ধবির কাছ থেকে। ব্যাপারটা স্বাভাবিক। বাংলাদেশের সামাজিক মানদন্ডে ত্রিশ বছরের মেয়ে আইবুড়ো। ওর বাবা-মা এটা নিয়ে দুশ্চিন্তা করতেই পারেন। এভাবে কালক্ষেপন আসিফের আর কোনমতেই ঠিক হচ্ছেনা।

ঘড়িতে সময় বেলা আড়াইটা। ফ্লাশিং-এর একটা যাত্রী ট্যাক্সিতে তুললো আসিফ।

জ্যাকসন হাইটস-এ পৌঁছে পার্কিং খুঁজে ট্যাক্সি থেকে বের হতে হতে রাত পৌনে নয়টা বেজে গেলো। বাঙালি জাতি কিরকম কলেবরে বৃদ্ধি পাচ্ছে সেটা এই পাড়ার ভিড় দেখলে টের পাওয়া যায়।  ৭৩ নম্বর স্ট্রীট-এ ঢুকে একটু এগোতেই বাঙালি মিষ্টির দোকানটার সামনে আসিফ ওদের দেখতে পেলো। বেলাল ভাই, জামি আর আশেক। মাহবুব ভাইয়ের এখনও পৌঁছানো বাকি। বাকি দুইজন বেলাল ভাইয়ের সামনে দাঁড়িয়ে খুব হাত-পা নাচিয়ে কিছু বলছে আর উনি একটু লজ্জামিশ্রিত আকর্ণ হাসি দিচ্ছেন।

আসিফকে দেখতে পেয়ে জামি হইহই করে উঠলো– “আসিফ ভাই, আসেন। আজকে বিচার হবে। বেলাল ভাই লাখ টাকার দাও মাইরা আমাদের বারো টাকার খিচুড়ি খাওয়াইতে ডাইকা নিয়া আসছে। এই চুদুরবুদুর চইলত ন।”

জামি ছেলেটা বেজায় পোংটা। এহেন সংসদীয় ভাষায় আক্রমণের শিকার হয়ে বেলাল ভাই হাসিটা টেনে আরেকটু বড় করলেন। আসিফ বললো– “এই, তোমরা ঝাইড়া কাশো। গ্যাজানোর টাইম নাই। অনেক খিদা লাগছে।”

উত্তর দিলো আশেক– “বেলাল ভাই বাড়ির ডীল ক্লোজিং কইরা আসছে। আর সেই উপলক্ষে আমাদের ভুনা খিচুড়ি খাওয়াইতে ডাক দিছে। এইটা কি ইনসাফ হইলো?”

“মানুষ তো মইরা গেলেও কুলখানিতে এরচেয়ে বেশি খাওয়ায়!”– জামির আক্রমণে বিরাম নেই।

আসিফ ওকে থামায়– “এই থামো! ব্যাপারটা বুইঝা নেই। ভাই, বিষয়টা খোলাসা করেন তো।”

অবশেষে কথা বলার সুযোগ পায় বেলাল ভাই– “অকশনে একটা বাড়ি পাইয়া গেলাম। সাড়ে চারশো হাজার দাম কিন্তু ডাউন পেমেন্ট মাত্র পাঁচ পারসেন্ট। নিয়া নিলাম। আজকে সকালেই ক্লোজিং কইরা আসছি। অগো কইলাম যে তোমাগো ভাবী দাওয়াত দিয়া ভালমতো খাওয়াইবো। আজকেরটা তো শুধু এপেটাইজার।”

“আরে এ তো সুখবর! কংগ্রাচুলেশনস, ভাই! কিন্তু কেম্নে কী? কিছু তো টের পাইলাম না! একদম কোভার্ট অপারেশন চালাইলেন?”

“ক্লোজিং না কইরা জানাইতে চাই নাই। জানোই তো, এর আগে দুই দুইটা বাড়ি কিনতে কিনতে হাত ফস্কায় গেছিলো।”

কথা সত্যি। নিউইয়র্ক শহরে প্রোপার্টি কেনা গ্রামের মাঠে ছাগলের বাচ্চা দাবড়ে ধরার মত। হাতের নাগালে আসতেই মোচড় দিয়ে বেরিয়ে যায়।

“আচ্ছা ব্যাপার নাহ! হ্যাপি ফর ইউ, ভাই। চলেন গিয়ে বসি। বাকি কথা খাবার অর্ডার দিয়া হবে। মাহবুব ভাইরে সরাসরি রেস্টুরেন্টে আসতে বইলা দেই।”– আসিফের আসলেই বেশ খিদে পেয়েছে।

সবাই মিলে ঢাকা গার্ডেন নামের একটা রেস্টুরেন্টে খাবে বলে ঠিক করলো। জায়গাটা নতুন তাই ভিড় একটু কম। কিন্তু খাবার ভালো। সেদিকে যেতে যেতে আরও তথ্য দেয় বেলাল ভাই– “বাড়িটা ভালই, বুঝলা। টু ফ্যামিলি হাউজ। নিচতলাটা ভাড়া দিয়ে দিব। সমস্যা একটাই – ওই এলাকার পাবলিক স্কুল খুব একটা ভালো না।”

নিউইয়র্ক স্টেইট-এ নিয়ম হচ্ছে যে এলাকায় বাস সেই এলাকার পাবলিক স্কুলেই বাচ্চাদের পড়াতে হয়। এর ফলাফল অনেকটা সফটকোর বর্ণপ্রথার মতো। গরীব এলাকায় স্কুলের মান খারাপ, বড়লোক এলাকায় ভালো। গরীবের সন্তান খারাপ স্কুলে পড়ে দুইএকটা ব্যতিক্রম ছাড়া খারাপ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে যায়, এবং শেষমেশ কম বেতনের চাকরি দিয়ে ক্যারিয়ার শুরু করে। পুরো সিস্টেমটা একটা ইনফাইনাইট লুপ।

আসিফ জিজ্ঞেস করে– “তাইলে বাচ্চাদের পড়াশোনার কী করবেন?”

“ওইখানেই পড়বো। আরে, আমি হইলাম মফস্বলের ডিগ্রী কলেজ ড্রপআউট। আমার পোলাপান কি আর আইনস্টাইন হইবো? তোমার মতো ঢাকা ইউনিভার্সিটি পাশ হইলে ওইসব নিয়া টেনশন করতাম।”

আসিফ হাসে। এই বেলাল ভাই লোকটাকে ওর হিংসে হয়। প্রবাসী জীবনটাকে তিনি শতভাগ উপভোগ করছেন। গাজীপুরে জন্ম আর বেড়ে ওঠা। উনার বাবা বাসস্ট্যান্ড বাজারে একটা মুদি দোকান চালান। বেলাল ভাইয়ের ছোটবেলার সব বন্ধুরা হয় যার যার দোকান চালায় অথবা মধ্যপ্রাচ্য প্রবাসী। উনিই উনার বন্ধুদের মধ্যে সবচেয়ে সফল ব্যক্তি। অর্থাৎ আসিফ নিজেকে যা মনে করে ঠিক তার উলটোটা। উনার আমেরিকান ড্রীম-এর যে শেষ টুকরোটা সংযোজন করা বাকি ছিলো, সেই বাড়ি কেনার কাজটাও আজ হয়ে গেলো। বেলাল ভাইয়ের মতো হতে পারলে বেশ ভালো হতো।

খাবার আর মাহবুব ভাই মোটামুটি একই সময়ে এসে পৌঁছালেন। পেটে দানা পড়তেই আড্ডা আরও বেগবান হলো।

ম্যানহাটনের নানা উচ্চতার গায়ে গা লাগিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বিল্ডিংগুলোর ব্যাকগ্রাউন্ডে পূর্ণিমার চাঁদটাকে বিচিত্র দেখায়। একবার মনে হয় চাঁদটা আদৌ আসল না। হয়ত ওই বিল্ডিংগুলো যাদের হাতে বানানো তাদেরই কেউ নিপুণ দক্ষতায় একটা নকল চাঁদ বানিয়ে আকাশে লটকে দিয়েছে। আবার মনে হচ্ছে বিল্ডিংগুলোই অবাস্তব, ওই চাঁদটার তৈরি করা একটা মায়া মাত্র।

খাবার শেষ করে পূর্ণিমার চাঁদ দেখতে ওরা সবাই রুজভেল্ট আইল্যান্ড-এ এসেছে। কাল শনিবার তাই সকাল সকাল ট্যাক্সি নিয়ে বের হয়ে অফিসগামী যাত্রী ধরার তাড়া নেই। এ জায়গাটা কুইন্স আর ম্যানহাটনের মাঝামাঝি ঈস্ট রিভারের উপর একটা চর। চরের পশ্চিম দিকটা থেকে ম্যানহাটনের স্কাইলাইন দেখা যায় খুব চমৎকার। জামি অবশ্য আসেনি। ওর কোর্সওয়ার্ক আছে। ছেলেটা সারাক্ষণ ফাজলামো করলেও পরিশ্রমী, ট্যাক্সি চালানোর পাশাপাশি একটা কমিউনিটি কলেজে এমবিএ করছে।

সবাই পার ঘেঁষে লাগানো বেঞ্চে বসলেও আসিফ নেমে এসেছে নদীর গা ঘেঁষা ওয়াকওয়ের উপর। রেলিং-এ ভর দিয়ে একমনে নদীতে চাঁদের আলোর নেচে বেড়ানো দেখছে সে। এই মুহূর্তে সবাই নীরব, চন্দ্রাহত। নীরবতার চাদরে যেন ছেঁদ না পড়ে এমনভাবে নিচু গলায় মোলায়েম কন্ঠে মাহবুব ভাই বললেন– “আসিফ, তোমার বকেয়া কাজটা আজকে সাইরা ফেলো। আজকে খুব শুভদিন। দুই দুইটা বড় সুসংবাদ শুনলা। এখন তুমি আমাদের একটা সুসংবাদ দাও।”

দ্বিতীয় সুসংবাদটা হলো মাহবুব ভাই বাবা হতে চলেছেন। খেতে বসে উনি এই সুসংবাদটা জানান। সত্যিই, দিনটাকে শুভ মনে না করার কোন কারণ নেই।

এইরকম চন্দ্রস্নাত রাতগুলোতে আসিফের উপর একটা অদ্ভুত মাদকতা ভর করে। ইচ্ছে করে মনের ভিতর জমে থাকা আক্ষেপ, সংশয় আর নিবেদনের সবটা বের করে দিয়ে ভারমুক্ত হয়ে যেতে। নিজেকে অসুখী করার যে অপরাধ সে ক্রমাগত করে চলেছে, ইচ্ছে করে সেই মুহূর্ত থেকেই সেই অপরাধের অবসান করে দিতে।

ফোনটা হাতে নিয়ে ম্যাসেঞ্জার এপ চালু করে আসিফ। থাম্বনেইল ছবিতে বুদ্ধিদীপ্ত চোখে ওর দিকে তাকিয়ে হাসছে মুমু। এই অতি গুরুত্বপূর্ণ কলটা করার জন্য কোনও প্রস্তুতির প্রয়োজন ওর নেই। এইরকম পূর্ণিমার রাতে অসংখ্যবার এই কথাগুলো সে মনে মনে আওড়েছে ঘোরগ্রস্ত মানুষের মত–

“মুমু, আমার একটা স্বপ্ন ছিলো উন্নত কোনও দেশে খুব সাজানো-গোছানো একটা জীবনের। স্বপ্ন আর বাস্তবতার মিল কতটুকু পেলাম সেটা ভেবে আর লাভ নেই। শুধু জানি যে এটাই এখন আমার জীবন। আমি আমার নিজের স্বপ্নে বন্দী।

স্বপ্নপূরণের কথা আর ভাবি না। কিন্তু তোমাকে না পাওয়ার অপূর্ণতা নিয়ে এক জীবন কাটানো আমার দুঃস্বপ্নেরও অতীত। তুমি কি আমার স্বপ্নে সহবন্দী হবে?”

মুমুর ছবিটায় আঙুল ছোঁয়ায় আসিফ৷ পাশেই নীল রঙের কল আইকন। সেটার দিকে সে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে তারপর ভাবে– “থাক, আজ না। অন্যকোনও দিন।”

কমেন্ট করুন
প্রাক্তন শিক্ষার্থী | পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সেশন: ২০০২ - ২০০৩

হাবিবুর রহমান খান

সেশন: ২০০২ - ২০০৩

0