কালাপানি

রাত ৮টা, দাবদাহ গরম। শরীরের পানিগুলো আন্দোলিত হয়ে লোমকূপ দিয়ে বের হচ্ছে। আমাকে দেখে কেউ কেউ মনে করবে এই মাত্র গোসল করে শরীর না শুকিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছে। মালিবাগের রাস্তা, সোডিয়াম আলোর ল্যাম্প, হাজারো মানুষ, তার উপর ফিটনেসবিহীন গাড়ি পাছা দিয়ে নির্লজ্জভাবে গরম হাওয়া বের করে বীরদর্পে চলে যাচ্ছে। আমাদেরই লজ্জা নেই, তাদের আবার লজ্জা! ভাবছি গাড়িতে উঠবো কিনা!? গাড়িতে ওঠাও তো একটা যুদ্ধ। না আছে সিট, না আছে ফ্যান। এমন কী মন খুলে যে শ্বাসপ্রশ্বাস নিবো, তার উপায়ও নেই। কী করা যায়? ভাবছি আর ভাবছি। হুট করে মাথায় আসলো উবারে ৬০% ছাড়ের অফার আছে, হল পর্যন্ত মাত্র ৭০ টাকা। কনফার্ম করলাম। ফোন আসলো।

-ভাই কোথায় যাবেন?
-অমর একুশে হল।
-চিনেন আপনি?
-৬ বছর যাবৎ আছি, চেনার কথা।
-ওকে, আমি আসছি।

কিছুক্ষণ পর উবার আসলো বটে কিন্তু বাইক নয়, প্রাইভেটকার।

-আপনি ওয়াছেক?
-জ্বি।
-প্লিজ, গাড়িতে উঠুন।

বুঝতে বাকি নেই, আমি মোটরসাইকেল ক্লিক করিনি, ভুলবশত কারে ক্লিক করেছি। কী আর করার! টিউশনি করিয়ে প্রাইভেট কারে হলে যাবো এটাই তো বিশাল কিছু! অন্যরকম অভিজ্ঞতা। নিজেকে সান্ত্বনা দিলাম। গাড়িটা আমার পছন্দ হয়েছে। কালো রঙের। মাত্র দুই মিনিটেই আমার শরীরের আন্দোলিত পানিগুলো রাজপথ ছেড়ে ভদ্র শিশুর মত ঘুমিয়ে পড়ছে। আমিও চিল চিল অনুভব করতে লাগলাম, মাথা ঠাণ্ডা হল। কিছুক্ষণ পর পায়ের উপর পা তুলে ঢাকা শহর দেখতে লাগলাম। পাশে একটা রমণী থাকলে ভালো হত। এর চেয়েও ভালো হত উষ্ণ ধূমায়মান এক কাপ রঙ চা, সাথে অবশ্যই আদা, দারুচিনি থাকতে হবে। অন্তত লেবু থাকলেও হত। যাহোক, যেটা নেই সেটা নিয়ে ভাবা শুধুই কষ্ট বাড়ানো। আমিও কখনও ঢাকা শহরকে এভাবে দেখিনি। মুহূর্তেই আমি ভুলে গেলাম অতীতের সব কিছু। মনে হল আমি এই গাড়িতে সদ্য জন্মগ্রহণ করেছি। এই শহরে জন্মগ্রহণ করে নিজেকে কেন জানি সৌভাগ্যবান মনে হলো। কোন যানজট নেই, কালো ধোঁয়া নেই, ধুলা-বালি নেই। কী যে আনন্দ, উচ্ছ্বাস, উদ্দীপনা কাজ করছে বলে বোঝানো মুশকিল। শহরের সুউচ্চ বিল্ডিংগুলোর ছাদে, বেলকনিতে গাছের টবগুলো শোভাবর্ধন করছে এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। খুব সম্ভবত শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঢাকা শহরের রাস্তার মাঝখানে বসে ঠাণ্ডা বাতাস খেয়ে খেয়ে “আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি…তোমার আকাশ তোমার বাতাস ” গানটা রচনা করেছিলেন। এছাড়া এত আবেগ পাবে কোথায়!? মানুষ রাস্তার পাশে পান বিক্রি করছে, চা বিক্রি করছে সিগারেট বিক্রি করছে, আরো হরকে রকমের জিনিস বিক্রি করছে, কিন্তু সবার মাঝে আনন্দ আছে। রিক্সাচালকের মুখেও হাসি আছে। বাসের ড্রাইভার, যাত্রী সবাই চোখমুখে হাসি নিয়ে কেউ বসে আছে, কেউ দাঁড়িয়ে আছে, কেউবা ঝুলে আছে। থাকবেই তো, আহ! কী ঠাণ্ডা! কী স্নিগ্ধ বাতাস! মূলত বঙ্গোপসাগর থেকে উৎপন্ন বাতাস সদরঘাটের বুড়িগঙ্গা নদীর নির্মল কালো পানির শরীর স্পর্শ করে পুরো ঢাকা শহরে ছড়িয়ে পড়ে। তাই, এই বাতাস এত নির্মল, স্নিগ্ধ, বিশুদ্ধ। ভাবছি, এসব বলার জন্য দেশের মন্ত্রী-এমপি কবে না জানি আমাকে তাদের পাবলিক রিলেশন এজেন্ট হিসেবে নিয়োগ দেয়! এমনিতেই বেকার জীবনের অবস্থা দিন দিন বেগতিক হয়ে উঠছে।

গাড়িটা হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ অতিক্রম করে কাকরাইল মোড়ে আসার পথে দেখা মিলল এক ঝাঁক তরুণের মিছিল; প্ল্যাকার্ডে লিখা– “বিশুদ্ধ কালো পানি খান, জীবন বাঁচান!”, “বিজ্ঞানীদের বিজ্ঞানী মাননীয় বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী মুসা পাগলা, আপনার দিকেই তাকিয়ে আছে বাংলাদেশ”, আরো অনেক বর্ণিল প্ল্যাকার্ড। কেউ কালো পানি খাচ্ছে, কেউবা মাথায় দিচ্ছে। আমি একটু উৎসুক হয়ে ড্রাইভার ভাইকে জিজ্ঞাসা করলাম,

-আচ্ছা, মাননীয় মন্ত্রী মুসা পাগলা বাংলাতে অনার্স, মাস্টার্স করে বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী হয়েছেন ভালো কথা। কিন্তু উনাকে বিজ্ঞানীদের বিজ্ঞানী, আপনার দিকেই তাকিয়ে আছে বাংলাদেশ, এসবের মানে কী!?
-ভাইজান কী দেশের বাহিরে ছিলেন? আপনি মনে হয় কিছুই জানেন না?
– জ্বি, আমি একটু দেশের বাহিরে নোয়াখালিতে ছিলাম। আজকে সকালে আসছি। ঘটনাটা কি সংক্ষেপে বলতে পারবেন?
– শিওর। পরশু বিজ্ঞান মেলায় সজ্ঞানে কিংবা অজ্ঞানে তিনি বললেন বিশুদ্ধ পানির রঙ কালো। পরমুহূর্তেই হাততালি পড়ল, ব্রেকিং নিউজ হল। পরের দিন এই তত্ত্বের জন্য বিশাল আনন্দ মিছিল হলো। তাতেই ক্ষান্ত হয়নি, আজকে অধিকতর তেলমর্দনের জন্য জাতীয় স্টেডিয়ামে লক্ষ জনস্রোতে মন্ত্রী মহোদয়কে বিজ্ঞানীদের বিজ্ঞানী খেতাব দেওয়া হবে। বুড়িগঙ্গার কালো পানির কদর বেড়ে গেলো এবং ক্রমে নাব্যতা কমতে শুরু করলো।


আমি ড্রাইভার ভাইকে বললাম, বিশুদ্ধ পানির রঙ কালো কীভাবে হয়?
-বড়দের সাথে পালটা কথা বলা বেয়াদবির পর্যায়ে পড়ে। আর রাজনীতিবিদদের মতের বিরুদ্ধে কথা বলা শুধু বেয়াদবির পর্যায়েই পড়ে না, এটা এক ধরনের কবিরা গুনাহ। তাই যা শুনেছেন হয় বিশ্বাস করেন নতুবা চুপ থাকেন, চুপ থাকা স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। জন্মগত ভাবেই একজন রাজনীতিবিদ সবসময় ভুলের ঊর্ধ্বে ; তাই তারা নিষ্পাপ, ফুলের মত পবিত্র। আর ক্রমেই তারা সমাজবিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ, দার্শনিক, লেখক, কবি ও আরও না জানি কতো কী হয়ে উঠেন। আল্লাহ তাদেরকে বিশেষ মুজেযা দান করে থাকেন। সুবহানাল্লাহ বলেন।
-সুবহানাল্লাহ! তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে তাদেরকে দিয়ে ক্লাস নেওয়া হয় না কেনো?
-তারা তো দেশ নিয়েই ব্যস্ত থাকেন, পাঠদানে তাদের সময় হয়ে উঠেনা। তবে তারা সান্ধ্যকালীন কোর্স চালু করেছেন, গুটি কয়েকজন শিক্ষক তাদের কদর বুজতে পেরেছেন এবং সান্ধ্যকালীন কোর্সে ভর্তি হয়ে তাদেরকে তেলমর্দন করে বিশ্ববিদ্যালয়ে দাপটের সাথে চলছেন এবং সবাইকে চালাচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে তারাই এখন সর্বেসর্বা।

আমি ড্রাইভার ভাইয়ের কথা শুনে মুগ্ধ হলাম।

গাড়ি চলছে টগবগে যুবকের মত। কাকরাইল চলে এসেছি। কিন্তু কোন নর্দমা দেখছি না, পানির জলাবদ্ধতা দেখছি না, রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি দেখছি না। অথচ কয়েকদিন আগেও ওয়াসার খোঁড়াখুঁড়ি আর সিটি কর্পোরেশনের রাস্তার মেরামত এই দুই মিলিয়ে জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিলো। বাহ, এতো পরিবর্তন! ভাবা যায়! আর যে বিষয়টি আমাকে ভাবিয়ে তুলেছে, আজকে আমি ছিন্নমুল মানুষ দেখছি না, উদ্দেশ্যহীন চাকরির জন্য ঘুরে বেড়ানো কোন বেকার যুবক-যুবতি দেখছি না, হাসপাতাল থানার পাশে কাতরানো কোন অসহায় মানুষ দেখছি না, চোখে পড়ছে না রমনার ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের দেহপসারিণী। শুধু চোখে পড়ছে নীরবতা, হাজারো বাতির গল্প; লাল, নীল, হলুদ।

শহরের নীরবতা ক্রমেই বাড়ছে, এতো মানুষ, এতো গাড়ি কিন্তু কোন শব্দ নেই, হাংগামা নেই, গরম নেই। সবাই শান্তশিষ্ট, যার যার কাজ করছে। সত্যিই আমরা উন্নয়নের জোয়ারে ভাসছি, শুধু ভাসছিনা, ডুবে যাওয়ার মত অবস্থা। কিন্তু ডুবে যাওয়ার পূর্বেই ড্রাইভার আমাকে বললেন,

-স্যার নামেন।
-নামব? কেনো?
-স্যার চলে আসছি।
-কোথায় চলে আসছি? গাড়ি চালাতে থাকো। কোন কথা হবে না। শুধু চিল হবে।
-স্যার, আপনি এই পর্যন্তই আসার কথা বলছিলেন।
-কী বলেন এসব!?
-জ্বি, স্যার। এটাই একুশে হল।

আমার মোবাইলও তাই বলছে। অতঃপর গাড়ি থেকে নামলাম। নামার সাথে সাথেই ড্রেইনের ময়লা থেকে আসা দুর্গন্ধ আমার নাসারন্ধ্র দিয়ে প্রবেশ করে পাকস্থলীতে গিয়ে আটকা পড়ল। চোখটা প্রসারিত করতেই একুশে হলের গেইটটা চোখে পড়ল, পিছন ঘুরে তাকাতেই হোসেন ভাইয়ের চায়ের দোকান চোখে পড়ল, পাশে নুরুল হোসেন রেস্তোরাঁ। আমি অনুভব করলাম বিন্দু মাত্র বাতাস নেই, এমনকি গাছের পাতাও নড়ছে না, তারমধ্যে একটা গাড়ি যাওয়া মানেই কিছু ধুলাবালি উপহার দিয়ে যাওয়া। একটু অদূরেই বিশাল যানযট। ইতিমধ্যে আমি আবার ঘামতে শুরু করলাম। আমার মোহ কাটতে শুরু করল। আমি বুঝতে পারলাম  ক্ষণিকের সুখেই আমি সব কিছু ভুলে গিয়েছি। পেছন থেকে উবার ড্রাইভারের কণ্ঠ।

-স্যার, ভাড়াটা!
-ভাড়া কত?
-স্যার, ৪০৫ টাকা।
-৪০৫ টাকা! কী বলেন? এত টাকা!
-ভাই, অনেকক্ষণ যাবৎ যানজটে ছিলাম।
-কী বলেন এসব। গাড়ি যানজটে ছিল? কখন কোন সময়? ঢাকা শহরে যানজট আছে নাকি! বললেই হল। আমি তো টের পাইনি।
-খুব সম্ভবত আপনি ঘুমিয়ে পড়েছিলেন।

মনে মনে ভাবতে লাগলাম যেখানে ১০ টাকা দিয়ে আসা যায় সেখানে ৪০৫ টাকা! আপদের শেষ নাই।

আমার রুম পাঁচ তলায়, ছয়তলা বিল্ডিং, লিফট নেই। রুমে আসতে আসতে ভাবলাম আমি কিংবা আমরা সারাক্ষণ সমালোচনা করি; ও ভালো না, এ ভালো না, এদেশের ডাক্তার খারাপ, ইঞ্জিনিয়ার খারাপ, পুলিশ খারাপ, আমলারা দুর্নীতিবাজ, রাজনীতিবিদরা দুর্নীতিবাজ আরো হরেক রকমের সমালোচনা। অথচ আমি নিজেই ছয়মাস যাবত অবৈধভাবে হলে আছি এবং সকল ধরনের সুযোগ সুবিধা নিচ্ছি।  এই হচ্ছে আমার কিংবা আমাদের চরিত্র। নীতিকথা শুনতে ভালো লাগে, বলতে ভালো লাগে, পালন করতে বড্ড কষ্ট লাগে।

হঠাৎ বিড়বিড় করে বলে উঠলাম, ধুর, সিঁড়ি শেষ হয়না কেন! লিফটটা যে কেন লাগায় না প্রভোস্ট স্যার, বুঝিনা। কোন মানে হয় এসবের!

কমেন্ট করুন
শিক্ষার্থী | পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সেশন: ২০১১-২০১২

ওয়াছেকুর রহমান

সেশন: ২০১১-২০১২