শিউলি

কিছু কিছু ফুল আছে, যার সাথে আমাদের শৈশব কৈশোর জড়িয়ে রয়েছে। খুব ভোরে শিশির ভেজা ঘাসের উপর পড়ে থাকা শিউলি ফুল কুড়ানোর সময়টা কি মনে পড়ে? শিউলি আমাদের একান্ত নিজস্ব গাছ। দক্ষিণ এশিয়ার দক্ষিণ-পূর্ব থাইল্যান্ড থেকে পশ্চিমে বাংলাদেশ, ভারত, উত্তরে নেপাল ও পূর্বে পাকিস্তান পর্যন্ত এলাকা জুড়ে শিউলি গাছের দেখা পাওয়া যায়। পশ্চিমবঙ্গের ও থাইল্যান্ডের কাঞ্চনাবুরি প্রদেশের রাষ্ট্রীয় ফুল শিউলি।

শিউলি বা শেফালি ফুলের বৈজ্ঞানিক নাম Nyctanthes arbor-tristis; লাতিন Nyctanthes এর অর্থ হচ্ছে “সন্ধ্যায় ফোটা” এবং arbor-tristis এর মানে হচ্ছে “বিষণ্ন গাছ”। শিউলি ফুল সন্ধ্যায় ফোটে আর সকালে সূর্য উঠবার আগেই ঝরে যায়। ধারণা করা হয় সন্ধ্যায় ফোটা আর সকালে ঝরা ফুলের মাঝে বিষণ্নভাবে দাঁড়িয়ে থাকার জন্য শিউলি ফুলের এরকম নামকরণ হয়েছে। শিউলিকে কখনও কখনও “tree of sorrow” বা “বিষণ্ন তরু”-ও বলা হয়।

বাংলার বুকে শিউলি নিয়ে আসে শরতের আগমনী বার্তা। শিউলি মূলত শরতের ফুল হলেও ফোটে হেমন্তের কাছাকাছি বা শেষ পর্যন্ত। শিউলি ফুলের একটি বারোমাসি জাতও আছে যাতে সারা বছরই কম বেশি ফুল ফোটে। আরো অনেক সুগন্ধি সাদা ফুলের মতো শিউলি ফুলও ফোটে রাতে। সকালে ভোরের আলো ফুটবার সাথে সাথে ঝরে যায় শিউলি; গাছের তলা সাদা নরম কোমল ফুলে ফুলে ভরে যায়। শরৎ ও হেমন্ত কালের শিশির ভেজা সকালে গাছের নীচে ঝরে থাকা সাদা শিউলি অসম্ভব সুন্দর দৃশ্য তৈরি করে। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা এই ফুল দিয়ে মালা বানিয়ে গলায় পরে। দিনের আলোতে এই ফুল তাদের উজ্জ্বলতা হারায়।

শিউলি ছোট আকারের বৃক্ষ জাতীয় ফুল গাছ যা বহু বর্ষজীবী। উঁচু থেকে মাঝারি উঁচু ভূমি, প্রায় সব ধরনের মাটি এবং রৌদ্রজ্জ্বল স্থানে এ ফুলের গাছ ভালো জন্মে। জলাবদ্ধতা একেবারেই সহ্য করতে পারে না। শিউলি গাছ প্রায় ১০ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। শিউলি গাছের শাখা-প্রশাখা ও কাণ্ড মাঝারি শক্ত মানের। গাছের পাতাগুলো ৬ সেন্টিমিটার থেকে ৭ সেন্টিমিটার লম্বা। পাতার রঙ সবুজ, কচি পাতার কিনারায় খাঁজ কাটা, অগ্রপ্রান্তে সূচালো। তবে পূর্ণবয়স্ক পাতায় খাঁজকাটা থাকে না। শাখা-প্রশাখার অগ্রভাগে ফুল ধরে। ফুল ছোট আকৃতির ও সুগন্ধিযুক্ত। শিউলি ফুলে রয়েছে পাঁচ থেকে সাতটি সাদা পাপড়ি ও মাঝে লালচে-কমলা টিউবের মত বৃন্ত। ফুল ১ ইঞ্চির মতো চওড়া। ফুল শেষে ফল হয়। এর ফল কাঁচা অবস্থায় সবুজ এবং পাকলে এর রং বাদামী হয়। চ্যাপ্টা ও হৃৎপিণ্ডাকৃতি ফলের ব্যাস ২ সেন্টিমিটার। দুই ভাগে বিভক্ত ফলের প্রতিটি ভাগে একটি করে বীজ থাকে। বীজ এবং ডাল কাটিং-এর মাধ্যমে সহজেই শিউলির বংশবিস্তার করা যায়।

এই ফুলের বোঁটাগুলো শুকিয়ে গুঁড়ো করে পাউডার করে হালকা গরম পানিতে বা জলে মেশালে চমৎকার হলুদ রঙ হয়। প্রাকৃতিক রঙ তৈরিতে শিউলি ফুলের বোটার ব্যবহার অনেক পুরনো।

শিউলির ভেষজ গুনাগুণ অনেক। শিউলির বীজ, পাতা ও ফুল সবই ভেষজ গুণ সম্পন্ন। সাইটিকার বা আর্থারাইটিস এর ব্যথায় শিউলির পাতা দিয়ে চা বানিয়ে খেলে উপকার পাওয়া যায়। মাথার খুশকি দূর করতে শিউলির বীজ উপকারী। কৃমিনাশক হিসেবে দারুণ কাজ করে শিউলি পাতার রস। পাতা বেটে খাওয়া যায়। আবার ঘি দিয়ে শিউলি পাতা ভেজে গরম ভাত দিয়ে মেখেও খাওয়া হয়।

ভারতীয় উপমহাদেশের কোথাও কোথাও এই ফুলকে দুর্গা পূজার আগমনী ফুলের মর্যাদা দেয়া হয়েছে। শিউলি-কে নিয়ে বাংলায় গান বা কবিতার শেষ নেই। রবি ঠাকুর বলেন, আর কাজী নজরুল বলেন, শিউলি নিয়ে লেখা অজস্র গান আর কবিতা মনে করিয়ে দেয় শিউলি আর শরতের অবিচ্ছেদ্যতা। শরৎ বা হেমন্তের শিশির ভেজা ভোরে শিউলি গাছের নীচটা ভরে যায় ঝরা ফুলে, আর কোমল গন্ধে ভরে ওঠে চারদিক। সারা রাতের বিশ্রাম শেষে সূর্য যখন উঁকি দেয় ভোরের আকাশে, তখনই শিউলিরা ঝরে পড়তে থাকে, নিঃশব্দে। যেন সূর্যের সঙ্গে তার চিরজনমের অভিমান। পৌরাণিক কাহিনীতে এই নিয়ে একটি গল্প আছে।

পারিজাতিকা নামে এক রাজকন্যা সূর্যের প্রেমে পড়েন। কিন্তু শত চেষ্টা করেও তিনি সূর্যকে পেতে ব্যর্থ হন। গভীর দুঃখে রাজকন্যা প্রাণ ত্যাগ করেন। তাঁর দেহাবশেষ থেকে জন্ম নেয় অপরূপ ফুলের পারিজাত বৃক্ষ, পারিজাতিকার নীরব ব্যর্থ প্রেমের প্রতীক। এই পারিজাত শিউলি ফুলের আরেক নাম। সূর্যের সাথে সুতীব্র অভিমানে সূর্যের আলো ফুটবার আগেই সে মাটিতে ঝরে পড়ে অশ্রুবিন্দুর মত। কোমল সুগন্ধি ছড়িয়ে দেয় চারদিকে। হিন্দু দেবতার পূজোয় শিউলিই এমন ফুল যেটি মাটিতে ঝরে পড়লেও তাকে দেবতার উদ্দেশ্যে নিবেদন করা যায়।

তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া

কমেন্ট করুন

প্রাক্তন শিক্ষার্থী

পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সেশন: ১৯৯২ - ১৯৯৩

জাহিদা গুলশান

প্রাক্তন শিক্ষার্থী পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সেশন: ১৯৯২ - ১৯৯৩

0