পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ আহমদ ছফা’র ‘সূর্য তুমি সাথী’

‘একটি অধঃপতিত সমাজে শোষকের বিরুদ্ধে পুনর্জাগরিত হওয়ার গল্প’

বইঃ সূর্য তুমি সাথী
প্রকৃতিঃ উপন্যাস
পৃষ্ঠা সংখ্যাঃ ১০০
প্রকাশকালঃ ১৯৬৭
লেখকঃ আহমদ ছফা

আহমদ ছফা। বাংলা সাহিত্যে এক অনন্য নাম। এই মানুষটিকে আমরা সাধারণত একজন সাহসী বস্তুনিষ্ঠ প্রবন্ধকার হিসেবেই জানি। কিন্তু উপন্যাসিক আহমদ ছফার পরিচয় আমাদের কাছে খুব বেশি নেই। যতটুকুই আছে সে কেবল “ওঙ্কার”, “গাভী বিত্তান্ত” অথবা “অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী” এ কয়েকটি উপন্যাসের জন্যই উনাকে আমরা জানি। আমি নিজেও এই কয়টি উপন্যাস পড়েছি। অনেক আগেই। এ উপন্যাসগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ব্যক্তি অথবা ঘটনাকেন্দ্রিক কিন্তু আজ আমি আহমদ ছফার যে উপন্যাস এর কথা বলব তা শুধু ব্যক্তিকেন্দ্রিকই নয় তা সমাজকেন্দ্রিক এবং জীবনকেন্দ্রিক। আমার এযাবতকাল পর্যন্ত আহমদ ছফার যতগুলো উপন্যাস পড়া হয়েছে তার মধ্যে যদি সবচেয়ে সার্থক উপন্যাস আমাকে নির্ধারণ করতে বলা হয় তাহলে কোন  মুহূর্তের অপচয় না করে আমি “সূর্য তুমি সাথী” উপন্যাসটিকে বেছে নিব। এ উপন্যাসটি আহমদ ছফার প্রথম উপন্যাস এবং লিখেছিলেন তার ২১-২২ বছর বয়সে এবং আহমদ ছফা নিজে মনে করতেন এটিই তার সেরা উপন্যাস। এ উপন্যাস সম্পর্কে আবুল ফজল বলেন, “এতো অল্প বয়সে এতোটা শৈল্পিক পরিপক্কতা আমার কল্পনারও অতীত।”  তাছাড়া নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, “সূর্য তুমি সাথী এই উপন্যাসটিতে সমাজের বাস্তব ছবি আশ্চর্য গতিশীলতায় বাঁধা পড়েছে।” তাছাড়া রণেশ দাশগুপ্ত এই উপন্যাস সম্পর্কে বলেছেন, “সাম্প্রদায়িকতার গোবর গাদা থেকে চেতনার মুক্তি সাধনে এ উপন্যাস একটা বড়ো ভূমিকা পালন করবে। ছফা একটা দুঃসাহসী কাজ করেছেন, এ কথা মানতেই হবে।”

উপন্যাসটি চট্টগ্রামের পাহাড়ঘেষা একটি গ্রামকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। কেন্দ্রীয় চরিত্রে রয়েছে হাসিম। যে সমাজে আর্থিক ক্ষেত্রে গরিবের থেকেও গরিব এবং সামাজিক ক্ষেত্রে নিচু থেকেও অনেক বেশি নিচে। হাসিমের বাবা ছিল নিচু শ্রেণির হিন্দু কিন্তু ভালবাসার টানে মুসলমান হয়ে কাজের মেয়েকে বিয়ে করে পায়নি মুসলমান সমাজেও কোন উঁচু স্থান এবং হারিয়েছিল হিন্দু সমাজে তার অবস্থান। তার ছেলে হয়ে হাসিমও সমাজের সবচেয়ে নিচু স্তরে থেকে যায় বটে কিন্তু হাসিমের ভিতর অনেকগুলো প্রশ্ন থেকে যায়; মেনে নিতে পারে না হাসিম; কেন তার এই অবস্থান! কেন মানুষ হয়ে মানুষ মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখে না, বিচার করে না! কেন সমাজের মানুষ তাকে সহজে গ্রহণ করতে পারে না! জন্ম পরিচয় কেন মানুষের আসল পরিচয় হিসেবে গণ্য হয়! কেন সমাজের অন্য সকলের সাথে সে ওঠাবসা করতে পারে না! কেন সমাজের মানুষ তাকে অপমান ও অসম্মান করে বেড়ায়! মানুষের আসলে পৃথিবীতে আসার উদ্দেশ্য কী? এরকম আরও নানা প্রশ্নের এবং চিন্তার মধ্যে হাসিম প্রায়ই ডুবে যায়। হাসিমের চিন্তার মধ্যে দিয়ে যেন লেখক তার নিজস্ব চিন্তার সুনিপুন শিল্পের ধারা বুনন করেছেন।

হাসিম খেটে খাওয়া মানুষ, কিন্তু চরম ব্যক্তিত্বের প্রকাশ ঘঠিয়েছেন লেখক এই চরিত্রের মাঝে। হাসিম অধিক পরিশ্রমে পাহাড়ের বাঁশ কেটে কম টাকা উপার্জনকে মেনে নিতে পারলেও কম পরিশ্রমে অন্য কাজে আগ্রহী নয় যেখানে তার সম্মান নেই। নিজের আত্মসম্মানকে বজায় রাখার জন্য সে নিজের শরীরকে বিসর্জন দিতে পারে, কিন্তু নিজের সম্মানকে খাটো করার অধিকার সে কাউকে দেয় না। সে ভালোবাসে তার স্ত্রীকে, কিন্তু সেই ভালবাসা লুকিয়ে থাকে দারিদ্র্যর মাঝে লুকিয়ে থাকা জমাটবাধা রক্তপিণ্ডের মধ্যে; যে রক্তপিণ্ডের অস্তিত্ব হাসিমের বুকের খুব গভীরে- যেখানে তার স্ত্রী সুফিয়া হয়তো কোনোকোনোদিন কোমল আদরে হাসিমকে সান্ত্বনা দেয়; সেই সান্ত্বনায় চোখের পানি থাকে, বুকের জমানো কথা থাকে কিন্তু মুখে কোন শব্দ থাকে না। এছাড়াও হাসিমের আছে আরেক পরিচয়, সে কবি এবং গায়ক। গ্রামের গানের আসরে কম টাকায় তাকে দিয়ে গান গাইয়ে নিতে পারে গ্রামের পুঁজিপতিরা, এতে তার কষ্ট হয় কিন্তু তার কোন অভিযোগ নেই। কারন সে গাইতে ভালোবাসে। সেই গানের এক গোপন শ্রোতা জোহরা। জোহরা গ্রামের এবং সমাজের চোখে পতিত নারী কিন্তু হাসিম এবং জোহরা উভয়েই বোঝে দুজনের মনের মধ্যে আলাদা একটি ঘর আছে যে ঘরে দুজনেই থাকে, স্বপ্নে। এ স্বপ্নের বাস্তব রূপ তারা কেউই দেখতে চায় না কিন্তু দুজনই এ স্বপ্নের রাজ্যে হারাতে কৃপণতা করে না।

খলু মাতব্বর এবং চেয়ারম্যান গ্রামের অন্যতম ধনী এবং শোষক শ্রেণির প্রতীক হিসেবে লেখক প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে হাসিম হলো শোষিত শ্রেণির প্রতীক যে একসময় পুনর্জাগরিত হয়ে ওঠে ঐ গ্রামের সমিতির সদস্যদের দ্বারা। সেই সমিতির সভাপতি কেরামত ভাই। কেরামত ভাই উপন্যাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং ঝাপসা একটি চরিত্র। কেরামত ভাই উপন্যাসের একটি গৌণ চরিত্র হিসেবে থেকে উপন্যাসের সার্বিক গুরুত্ত্বের বাহক হয়ে আছেন। এ চরিত্রটি “পদ্মা নদীর মাঝি” উপন্যাসের হোসেন মিয়ার চরিত্রের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। তবে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ময়না দ্বীপে একটি আলাদা সমাজতান্ত্রিক সমাজ গঠনের চিন্তার প্রকাশ ঘটিয়েছিলেন ঠিকই কিন্তু হোসেন মিয়ার মধ্যে পদ্মা নদীর পাড়ের সেই জেলে পাড়ার সমাজকে নতুনভাবে গড়ে তোলার, একটি পুনর্জাগরণের মাধ্যমে সমাজের শোষিত মানুষকে নিয়ে লড়াই করার চিন্তাকে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় হোসেন মিয়ার মাঝে দিতে পারেন নি। যেখানে আহমদ ছফা কেরামত ভাই এর মাঝে একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলে সেই সমাজকে নতুনভাবে গড়ে তুলার একটি প্রয়াস দেখিয়েছেন। বাস্তবিক দিক বিবেচনা করতে গেলে আমি ব্যক্তিগতভাবে কেরামত ভাইকে হোসেন মিয়া থেকে এগিয়ে রাখব এজন্য যে কেরামত ভাই এবং হোসেন মিয়া উভয়েই নতুন সূচনা চাইলেও কেরামত ভাই পুরো সমাজকে পরিবর্তিত করে সবাইকে নিয়ে এ পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেছিল, হোসেন মিয়ার মত দূরে ময়না দ্বীপ তৈরি করে নয়। 

খলু মাতব্বর এবং এরকম চরিত্ররা আমাদের সমাজের সবকিছুকে কীভাবে নিয়ন্ত্রন করে এবং তাঁদের সুবিধের জন্য সমাজের সকল শ্রেণির মানুষের আবেগ এবং দরিদ্রতাকে কীভাবে ব্যবহার করে তাঁদের নিজেদের চাওয়া পাওয়াগুলোকে পূর্ণ করে নেয় তা লেখক তার এ গল্পে এক অভাবনীয় শৈল্পিক ভাষায় ব্যাখ্যা করেছেন। আর্থিক স্বচ্ছলতায় থাকা একটি মানুষ তার চারপাশে আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল পরিবার অথবা মানুষগুলোকে কীভাবে শুধু অর্থের প্রয়াসে তাঁদের চাওয়া পাওয়া, ইচ্ছে অনিচ্ছে, জীবন মরণের ঈশ্বর হয়ে উঠতে পারে এ গল্পে তারই প্রতিচ্ছবি লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন তার শব্দের রঙ্গিন বর্ণে। একটি সমাজের মানুষের মান-সম্মান যে কেবলমাত্র আর্থিক স্বচ্ছলতার উপর নির্ভর করে তা লেখক দেখিয়েছেন হাসিমের আর্থিক অস্বচ্ছলতায় সমাজে তার অসম্মান এবং লাঞ্ছনার মধ্য দিয়ে এবং তার দাদীর তার কাছে প্রত্যাবর্তনের পর ভবিষ্যতে তার আর্থিক স্বচ্ছলতার আগাম পূর্বাভাষে সমাজে তার অবস্থানের উন্নয়নের মধ্য দিয়ে। একটি সমাজে মানুষ যে মানুষ হিসেবে সম্মানিত নয়, অর্থের পরিমাণের সাথে মানুষের সম্মান যে সমানুপাতিকভাবে পরিবর্তিত হয় এই উপন্যাসে লেখক তা পরিপূর্ণভাবে প্রকাশ করেছেন।

এ উপন্যাসে আমার প্রিয় কিছু লাইনঃ

“গান দুঃখের রাজ্য থেকে, অভাবের রাজ্য থেকে এক বিচিত্র রাজ্যে নিয়ে যায়।  সে এক বিচিত্র অনুভূতির রূপ-রাঙা জগৎ।”

“দেশ মরি গেল দুর্ভিক্ষের আগুনে
তবু দেশের মানুষ জাগিল না কেনে”

“জীবন অমূল্য সম্পদ, অসম্ভবকে সম্ভব, অসুন্দরকে সুন্দর করার নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম    করার নামই জীবন। ক্ষয়ে ক্ষয়ে ধুঁকে ধুঁকে মরার জন্য মানুষ পৃথিবীতে আসেনি। সমস্ত পরিশ্রম, সমস্ত আকাঙ্ক্ষা, সমস্ত স্নেহ ঢেলে দিয়ে জীবনকে মাটির পৃথিবীতে   দাঁড় করাতে হবে সুন্দর করে।”

“একা থাকার মধ্যে তৃপ্তি নেই। কেননা একা থাকলে অতি সহজে নেতিয়ে পড়ে। সংগ্রাম করার অনুপ্রেরণা থাকে না। জীবনের সুখ মানেই তো জীবনের সংগ্রামসামনের উজ্জ্বল আশা আর পেছনের উদ্দীপনা না। থাকলে মানুষ পারে না সংগ্রাম চালিয়ে যেত।”

“স্নেহ, প্রেম আর ভালোবাসার ভাষা দুনিয়ার সবদেশে এক। আরেকটা তেমন ভাষা আছে, তাও এক- সে সংগ্রামের ভাষা।”

“পূর্ণিমায় চোরেরা যত ঝগড়া, যত মারামারি করুক না কেন, অমাবস্যার রাতে সকলে একজাত। মহিষের শিং হানতে সোজা। তেমনি দুনিয়ার অত্যাচারীরা একজাত।”

“আদর্শের আগুন রক্তের ভেতর, বুকের ভেতর না থাকলে মানুষ মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে   বলতে পারে না, মৃত্যু, আমি তোমার চেয়ে অনেক অনেক বড়!” 

একটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক বা একটি পরিবারকেন্দ্রিক গল্প সাজানো খুব বেশি কঠিন কাজ নয় কিন্তু একটি সমাজের সার্বিক দিককে একটি গল্পে বা উপন্যাসে ফুটিয়ে তোলা অনেক কঠিন কাজ এবং এ উপন্যাসে লেখক হাসিমের চরিত্রের মধ্য দিয়ে, হাসিমের দৃষ্টির মধ্যে দিয়ে, হাসিমের চিন্তার মধ্যে দিয়ে পুরো সমাজকে পাঠকদের কাছে প্রকাশ করছেন পরিচ্ছন্নতম আবেগ নিয়ে, নিষ্ঠুরতম দরিদ্রতার প্রাপ্তি নিয়ে, ভালবাসার গভীরতার আবেগের জয় নিয়ে। গ্রাম সম্পর্কে যেসকল মানুষের একেবারেই ধারণা নেই, তাঁরা এ গল্প হয়তো বুঝতে পারবে কিন্তু অনুধাবন করতে পারবে না। এ গল্প গ্রামের, এ গল্পের জীবনটা গ্রামের, এ গল্পের চরিত্রগুলো গ্রামের; গ্রামের গন্ধ যে কখনও নেয় নি, গ্রামের স্নিগ্ধতা যে কখনও দেখে নি, গ্রামের নিষ্ঠুরতার সাক্ষী যে কখনও হয় নি, এ উপন্যাস তার জন্য নয়।

কমেন্ট করুন
শিক্ষার্থী | প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সেশন: ২০১৩-১৪

শাহ্‌ পরাণ

সেশন: ২০১৩-১৪

0