নোনতা ফুচকা

সালমা বেগমের মনডা আজকা বেজায় খুশি। আজকা তার কইলজার টুকরা সুমাইয়ারে লইয়া বাইর হইতাছে। এমনে সময় পারে না। সুমাইয়ার মা রেশমায় খালি ক্যাটক্যাট করে। সুমাইয়া হইলো গিয়া সালমার ভাই কাদের, মানে কাদুর মাইয়া। কাদু সালমার একামাত্র ভাই। কাদু আর সালমার বাপ শুক্কুর আলী – ওরা যহন ছোট তহনই ট্রাকের লগে এক্সিডেন্ট কইরা মইরা যায়। সবাই কয় ট্রাকওয়ালা লোড আছিলো। পরথমবার ধাক্কা খাইয়া শুক্কুর আলী খাড়ায়া হাত দেহাইছিলো মাগার ট্রাকওয়ালা উঠায়া দিছে  আবার। এইবার একদম পিষা দিয়া গেছে। শুক্কুর মিয়া মরার পর হাজেরা বেগম মানে ওগোর মায় বাসা বাড়িতে ঝি এর কাম লয়। মাগার ঝিয়ের কামের এত কষ্ট যে হাজেরা বেগমের দূর্বল শরীরে সহ্য হয় না। ৫-৭ বছর যাইতে না যাইতেই ওগোর মায়ও ব্যারামে মইরা যায়গা। এতিম সালমার বয়স তহন সতরো আর কাদুর এগারো। সালমা বুইজা সারবার পারতাছিলোনা ওয় কী করবো ছোট ভাইডারে লইয়া। তয় পরায় ঠিক কইরাই হালাইছিলো গার্মেন্টসে ঢুকবো। মাগার একদিন এলাকার মুরুব্বি হক সাহেব আয়া কইল,

“তোর মায় আমাগোর বাড়িত কাম করত। তুই এলাকার মাইয়া, আমগোর একটা কর্তব্য আচে। আর কী গার্মেন্টসের মাইয়াগোর মতোন চ্যাডাং চ্যাডাং হাইটা বেড়াইবি। আমার বাড়িতে কাম শুরু কর। পরে আরো দুই একটা কাম পাবি। এই মাসটা আমাগোর এহানেই তোরার দুইডা খাইস।”

সালমা আর বেশি দূর চিন্তা করতে পারেনা। কালকে তো খাইতে হইবো। সালমা তাই কাম করা শুরু করে হক সাহেবের বাসায়। হক সাহেবের বউতো মেলা খুশি। কম ট্যাকায় জুয়ান কাজের মাইয়া পাওয়া সোজা কথা নিহি! এমতেই কাদুরে লইয়া কয়েকটা বছর চালাইতে থাকে সালমা। এমনে কয়ডা বছর গেলে পরে হক সাহেব তার দারোয়ান কুদ্দুসের পোলা হিরুঞ্চি মাসুমের লগে বিয়া ঠিক করে সালমার। বাপ-মা মরা সালমার তো কেউ নাই। তাই হিরুঞ্চি মাসুমরেই স্বামীর মর্যাদা দেয় সালমা। সংসারও চলতে থাকে ভালাই তয় বিয়ার পরেও হিরুঞ্চি মাসুম হিরুঞ্চি মাসুমই রয়া যায়। সালমার কাছে ট্যাকা লয়া নেশা করতে থাকে মাসুমে। এই লয়া মাঝেমাঝেই মেলা ক্যাচাল বাধে মাসুমের লগে সালমার। সালমা ট্যাকা না দিতে চাইলেই ধামধুম মারে মাসুম। কাদু রিক্সা চালায়া খাইত। মাগার ওর মেলা কষ্ট হয়া যাইত। তাই সালমা কিছু ট্যাকা জমাইছিলো কাদুরে দিবো কইয়া যাতে কাদু একটা চায়ের দোকান দিবার পারে। কাদু চায়ের দোকান দেয় মাগার হিরুঞ্চি মাসুম কেমনে জানি জাইনা যায় ট্যাকা কেডায় দিছে। আর কী মাইর! সালমারে মাইরা ভর্তা বানায়া ফালায় হালায়। সালমার মাজার হাড্ডি ভাইংগা যায়। বিছানায় শোয়া আছিলো মেলা দিন। সালমা আর কাম করবার পারেনা। সংসার চলেনা। সালমার শ্বশুর কুদ্দুস মিয়া তাই ঠিক করে হিরুঞ্চি মাসুমরে আরেকটা বিয়া দিবো। পোলামানুষ হিরুঞ্চি হইলে কিছু যায় আসেনা তাই আরেকটা বউও পাইয়া যায় মাসুম। সালমারে তাড়ায়া দেয় ওরা। সালমা কাদুর ঘরে আইয়া উঠে। এর মাঝে কাদু বিয়া কইরা ফালায়। কাদুর বউ রেশমা সহ্য করবার পারেনা সালমারে। কথায় কথায় রেশমা সালমারে কয়-

“বইয়া বইয়া খাইবো এই লুলা মাগি, আর আমি কাম কইরা মরি!”

বিভিন্ন ঝামেলা কইরা রেশমা বাইর করে সালমারে। কাদু আবার বউ এর উপরে কিছু কইবার পারেনা। সালমায় তাই আল্লাহু গলির বস্তিতে গিয়া উঠে। সালমা পরে ভিক্ষা করা শুরু করে। মাঝে মাঝে ভাইয়ের চায়ের দোকানে যায়া ভাইডারে দেইখা আহে। পরথম পরথম কাদু কিছু ট্যাকা দিতো সালমারে মাগার রেশমার কড়া গোয়েন্দাগিরিতে আর হেইডা করতে পারেনা। সালমা গোপীবাগ, ওয়ারী, সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ি এলাকায় ভিক্ষা কইরা খায়। মাগার মাজার জ্বালায় বেশিক্ষণ বাইরে থাকতারেনা। তাই সকাল সকাল ঘরে ফিরা আহে মাঝে মইদ্যেই। পেডে ভাত জোটে তো জোটেনা। এর মাঝেই কাদুর ঘরে মাইয়া হয়। মাইয়ার নাম সালমাই ঠিক করছিলো। মাগার কাদু রেশমারে কইসে ওয় ঠিক করছে। এই সুমাইয়ারে লইয়াই আজকা সালমা বাইরাইছে। এমতে সময় কাদুরে দিয়া দোকানে লয়া আইনা সুমাইয়ারে চুমা খাইতো। তারপরে যাইতোগা। তয় এইবার রেশমার মামতো ভাইয়ের বিয়া তাই রেশমা বাড়ি যায় কয় দিনের লাইগা। সালমা আইয়া হুইনা কাদুরে কইসিলো সুমাইয়ারে লইয়া বেড়াইবো। হেরপরেই সুমাইয়ারে লইয়া হাঁটতে থাহে সালমা। হাটতে হাটতে হারুন মিয়ার ফুচকার দোকানের সামনে খাড়ায়া সুমাইয়ায় কয়,

“ফুবু, ফুচকা খামু, সাদা লাহান যেইডা ঐডা।”

 হারুন মিয়ার ফুচকার দোকানে গিয়া সালমা জিগায় সাদা ফুচকার দাম। দোকানের ছেড়ায় ওগোরে জানায় দই ফুচকার দাম ১১০ টাকা। সালমার মাথায় বাড়ি! কেমতে খাওয়াইবো! সালমা সুমাইয়ারে কয়, “আম্মা, আইজকা না তুমারে কাইলকা খাওয়ামু।”

মাগার সালমারে খাওয়াইতেই হইবো ফুচকা। সালমার আর এই দুইনাত আছেই কেডা? সালমা সুমাইয়ারে দিয়া বাড়িত আহে। বাড়িত আইয়া চিন্তা করে কালকা সকাল সকাল বাইর হইতে হইবো।

পরদিন সকাল সকাল সালমা বাইর হয় ভিক্ষা করতে। হাঁটতে হাঁটতে সালমা জানবার পারে আজকা নাকি নির্বাচন। নির্বাচন  টির্বাচন আবার কী জিনিস? সালমার পেডে ভাতই নাই। আবার নির্বাচন! কইলজার টুকরাডারে ফুচকাই খাওয়াইতে পারলোনা আবার নির্বাচন।

এদিকে এইবার এমপি নির্বাচনে খাড়াইসে মানিক মিয়া। মানিক মিয়ার কাছের লোক হক সাহেবের বড় পোলা মিজাইন্যা। মানিক মিয়া এমতেই জিতবো। দেশের আর নির্বাচনের বেল নাই। জিতাজিতি লইয়া তাই কারুর চিন্তা নাই। তয় চিন্তা হজ্ঞলের নিজের এলাকায় যাতে ভোট বেশি পড়ে। সামনে এলাকার যুব পার্টির পোস্ট দিবো। তাই মিজাইন্যার মাথায়ও এই চিন্তা। ওয়ার্ড কাউন্সিলর শফিক ভাই কইছে  এলাকায় বেশি ভোট পড়লে একটা আলাদা নাম হইবো। কিন্তু হালার এর মইদ্যে আবার নতুন যন্ত্র দিয়া নির্বাচন হয় অহন।

মিজাইন্যায় কয়, ” হালার আবার যন্ত্র মারাইছে। কাগজে সিল ছাপ্পড় মাইরা ভোট সব মানিক ভাইরে দেওয়াইতাম।”

কিন্তু মিজাইন্যায় পড়ে ফাঁপড়ে। পাশের এলাকার ফারুইক্যায় নাকি সকালের তনই মেলা ভোট মারাইতাছে।

মিজাইন্যায় পোলাপানরে কয়, “তোগোরে কইলাম একটা ভোটার আইনা দিবার পারলে দেড়শ কইরা দিমু। তাও পারতাছোস না। তোরা আমারে ডুবাবি। সবডিরে গ্যাঞ্জি দিলাম, খাওন দিলাম। আকাইম্যাচোদার দল।”

এর মইদ্যে এক হালায় কয়, ” মিজান ভাই, মান ইজ্জত তো থাকলোনা। অহনতরি গ্যাঞ্জি পাইনাইকা।”

মিজানের মাথা চাংগে।

“দেখসোস মাদারচোদে কয় কী? হালার তোরে আমি…”

অবস্থা গরম বুইজা লগে লগে আরেক পোলা কয়, “ভাই, মাইনষে হালার আবালচোদা আছে। ভোট দিতেই আহেনা। ভোট দিতে আইলে নাইলে দুইটা চোপাড় মাইরা আমগোর সিলটাই বহাইতাম। ট্যাকাও লাগতোনা, না আইলে কী করুম?”

মিজাইন্যার মাথা আরো গরম হয়া যায়। তাই  দুপুরবেলা ভোটের রুমে ঢুইকা রুম আটকায়া প্রিজাইডিং অফিসাররে দাবড় মারে।

“ঐ মিয়া, এই যন্ত্র মন্ত্র বুঝিনা। জলদি ভোট বাড়ান। আমগোরে হিগান নিহি?”

“দেখেন ভাই আমাদের হাতে কিছু নাই।”

“দুইডা ঘাড় খাইলে সব হাতে আইবো।”

“সর্বোচ্চ আমরা আমাদের ফিংগার দিয়ে ১% কি ২% ভোট দেওয়াইতে পারব।”

“হেইডাই আগে দেন।”

“ঐ তোরা ফিংগার মারতে থাক।” পোলাপানরে হাক ছাড়ে মিজাইন্যায়।”

কিন্তু এমনেও ভোট উঠেনা। পাশের মহিলা কক্ষে ঢুকে মিজাইন্যার পোলাপান।

আবার অফিসাররা কয়, ” ভাই আমরা সবাই তো পার্টিরে চাই। কিন্তু একটা নিয়ম আছে তো। মহিলা রুমে আপনারা মহিলা দিয়া ভোট দেওয়ান।”

মিজাইন্যায় চেইতা যায়। কিন্তু ওর পোলাপান বাইরে নিয়া আহে ওরে।

“ভাই, হালায় কিন্তু ঠিকই কইছে।”

“হালার গুস্টি মারি।  জলদি মাইয়ামানুষ জোগাড় কর।”

এমন সময় ভিক্ষা চাইতাছিলো সালমা। মিজাইন্যায় ডাক দেয়।

“বুজি, তোমারে ভোট দেয়া লাগবো।”

“আমি তো কিছু জানিনা আর ভোট দিয়া কী করমু?”

“আরে, তোমারে জানতে কইসে কেডা? ভোট আমগোর, এলাকা আমগোর, নেতা আমাগোর, সব আমগোর। তুমি খালি খাড়াইবা। ১০০ টাকা  দিমু বুজি।”

সালমার মাথায় তখন দই ফুচকার কথা মনে পইড়া যায়। সাথে সাথে সালমা আর আট দশটা মানুষের মত নিজের পায়ে নিজের কুড়াল মারতে যায়। তয় পার্থক্য হইলো সালমার সাক্ষাত লাভ আছে মাগার যাগোরে পোলাপান আবালচোদা কইসিলো ওগোর সাক্ষাত কোন লাভ নাই।

সালমা ঢুকে ভোটকেন্দ্রে। সালমারে যেমতে হিগায়া দেয় সেমতেই সালমায় কাম সারে। এমনে কইরা সালমা আটটা ভোট দেয়। কিন্তু এমন সময় ম্যাজিস্ট্রেট দরজা ধাক্কায়া ভিত্তে ঢুকে। পোলাপান দৌড়ায়া পালায়। দুইডা পোলা ধরা খায়া যায় আর লগে সালমা। সালমারে পুলিশ ধইরা লায়। সাংবাদিকরা আহে।

ম্যাজিস্ট্রেটে কয়, “এই কেন্দ্রে আমরা হালকা বিশৃংখলার কথা জানতে পারি। তবে সঠিক সময়ে আমরা এসে তা প্রতিহত করি। কয়েকজন সন্দেহভাজনকে আমরা চিহ্নিত করে আটক করেছি। তারা দোষী প্রমাণিত হলে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা। সামগ্রিকভাবে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হচ্ছে।”

ম্যাজিস্ট্রেট পুলিশ জিপের কাছে আসে। সালমা গিয়া পায়ে লাফ দিয়া পড়ে।

“স্যার, আমি ভিক্ষা কইরা খাই। আমারে ছাইড়া দেন স্যার। আমারে কইলো ভোট দিতে তাই গেলাম।”

“কে বলছে?”

“মিজাইন্যায় কইেছে, স্যার। আমারে ছাইড়া দেন, স্যার।”

অঝোরে কানতে থাহে সালমা।

ম্যাজিস্ট্রেট এস আই রতনকে ব্যাপারটা দেখতে কইয়া যায়গা।

এস আই রতন ফোন দেয় মিজানরে।

“মিজান সাহেব, আপনাগোর কোন লোক ধরা পড়ছে নাকি?”

“হ, আমগোর দুইডা পোলা ধইরা খাইছে।”

“আর এই মহিলা কেডা?

“ওয় ভিখারি, ফকিরনি। দেহেন আপনারা কী করবেন। কিন্তু ঐ দুইডারে ছাড়েন।”

“তা নাইলে ছাড়লাম, কিন্তু…”

“আপনাগোরডা রাইতে না পৌছায়া দিলাম।”

“তা ঠিক আছে। কিন্তু দুইটা পোলা ধরা খাইেছে। একটা প্রটোকল আছে তো।”

“মিয়া, আপনেরা জালিম। আচ্ছা ঐডা দেখতাছি।”

এস আই রতন আবার জিপের কাছে আসে।

“এই দুইজনরে ছাইড়া দেন।”

সালমা আবার কাইন্দা উঠে।

“স্যার, মাফ কইরা দেন, স্যার। আমারেও ছাইড়া দেন।”

“এইসব কাম করেন ক্যান? অন্যায় কাম করলে হইবোনি কন। দেশে একটা নিয়ম নীতি আছেনা?”

“ভুল হয়া গেছে স্যার। মাফ কইরা দেন।”

এস আই রতন তখন কন্সটেবল আবদুল হালিমকে সালমারেও ছাইড়া দিতে কয়। এই ফকিরনিরে রাইখাই বা ওর কী!

“স্যার আল্লায় আপনের ভালো করবো। আপনেরে আল্লায় বেশত দিবো।”

সালমা জিপ থেইকা নাইমা মিজানের কাছে যায়। সালমারে দেইখাই মিজান কয়,

“কী বুজি আমি না কইলে জীবনে ছাড়া পাইতানি?”

“হ, ভাই বাচাইছো। তা আমারে ট্যাকাডা দাও।”

“ঐ ৫০ টা টেকা দে বুজিরে।”

” ১০০ টেকা না দিবা কইসিলা!”

“জেলের ভাতের তন বাচাইলাম, আবার টেকা লইয়া ক্যাওক্যাও করো?”

সালমা চুপচাপ ৫০ টেকা নিয়া আইয়া পড়ে। কিন্তু হদিশ হয় ওর টেকার খুতিডাও এর মাঝে ওয় হারায়া লাইসে। সকাল থেইকা ৫০ টেকার মত কামাইসিলো। আবার চিন্তায় পইড়া যায় সালমা। হারুন মিয়ার দোকানে গিয়া ভয়ে ভয়ে ৫০ টেকার সাদা ফুচকা চায় সালমা। হারুন মিয়ার পোলা হাসমতে ক্যাশের তন তাকায় সালমার দিকে। হাসমতের মায়া হয়। কারণ ভাত চায়নাইকা ফুচকা চাইসে। পরে দোকানের ছেড়ারে হাসমতে দুইডা ফুচকা বাড়ায়া দিয়া হাফ দিতে কয় সালমারে। সালমারে ছয় পিস দই ফুচকা একটা প্লেটে দেয়। সালমায় ভাবে দুই পিস খাইয়া চার পিস ওর আম্মার লাইগা লয়া যাইবো। সালমার চোখ  জ্বলজ্বল করে না ছলছল করে তা বুজা যায়না।

আহা! বড়ই স্বাদের ফুচকা!

নোনতা ফুচকা!

কমেন্ট করুন
প্রাক্তন শিক্ষার্থী | মৎস্যবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সেশনঃ ২০১১ - ১২

সৌরভ মাহমুদ

সেশনঃ ২০১১ - ১২

0