একজন মহান শিক্ষকের কথা বলছি

আতাহার স্যার আমার কাছে একজন বিস্ময়! আমরা কখনও ভালো মানুষ পেয়ে থাকি, কখনও ভালো শিক্ষক, কখনও ভালো গবেষক, আবার কখনও বা ভালো মেনটর পেয়ে থাকি। কিন্তু একই সাথে একজন ভালো শিক্ষক, একজন ভালো গবেষক, একজন ভালো মেনটর এবং একই সাথে একজন ভালো মানুষ পাওয়া, সেটা খুবই বিরল। আর যারা এমন মানুষের সান্নিধ্য পেয়ে থাকেন তারা ভাগ্যবান। আমি তেমনই একজন ভাগ্যবান ব্যক্তি যে আতাহার স্যারের মত একজন বিরল মানুষের সান্নিধ্য পেয়েছি।
প্রথমেই আসি স্যার কেমন শিক্ষক ছিলেন। আমরা স্যারের ক্লাস প্রথম পেয়েছি যখন আমরা তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। একদিন আমি অসুস্থতার জন্য ক্লাসে যেতে পারিনি। আমার খুব কাছের একজন বন্ধু যে অন্য হলে থাকত, সে দেখি দুপুরে আমার রুমে হাজির। ও হঠাৎকী মনে করে আমার কাছে জিজ্ঞেস করতেই বলল তোকে আতাহার স্যারের ক্লাসে না দেখেই মনে হল তুই আবার অসুস্থ হয়ে পড়িসনি তো? তুই তো সুস্থ থাকলে কখনও আতাহার স্যারের ক্লাস মিস করবি না! স্যার এতই ভালো পড়াতেন যে শুধু আমি না, আমার মত আরও হাজারো ছাত্র স্যারের পড়ানো পছন্দ করত, স্যারকে পছন্দ করত।

এবার আসি তিনি কত ভালো গবেষক ছিলেন। স্যারের পি.এইচ.ডি থিসিস ওই বছরে আমেরিকার বেস্ট থিসিস অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিল, পেয়েছিল স্বর্ণপদক। তাঁর কত গবেষনা পত্র কত ভালো সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে তা তো অনেকেরই জানা। কিন্তু তিনি তার কত ছাত্রকে গবেষক বানিয়েছেন সেটা হয়ত অনেকেরই অজানা। আমার গবেষক হবার হাতে খড়ি এই মহান মানুষটির হাত ধরে। আমি নিশ্চিত আমার মতো অনেকেরই তাই। আমার মনে আছে, মাস্টার্স থিসিসের সময় আমার কাজ একদমই এগোচ্ছিল না। তার উপর আমি স্যারের সাথে ঠিকমত দেখা করতাম না লজ্জায়। স্যার অন্যদেরকে দিয়ে ডেকে পাঠিয়ে আমার সাথে দেখা করতেন, আপডেট জানতে চাইতেন। এক মিনিটের সিদ্ধান্তে আমার গবেষনার বিষয়বস্তু বদলে দিয়েছিলেন। কতটা জ্ঞানী হলে আর ওই বিষয়ের উপর দক্ষতা থাকলে এটা সম্ভব! আমাদের কাজের সুবিধার্থে তিনি শুক্রবারেও ডিপার্টমেন্টে আসতেন। আমাদের থিসিস জমার দিন তিনি সন্ধ্যা পর্যন্ত ডিপার্টমেন্টে ছিলেন। আমার বন্ধু জুয়েনা যখন তার থিসিস পেপারটা বুকে ধরে আছে, স্যার বললেন দেখেন মনে হচ্ছে মা তার সন্তানকে বুকে আগলে রেখেছে। একটা থিসিস তো আসলে একটা সন্তানের মতই। আমি, আক্তার, সুমি, সানোয়ার, নাজনিন, জুয়েনা সবাইকে স্যার খুব ভালোবাসতেন। স্যার বললেন আপনাদের প্রত্যেকের থিসিস থেকে এখনই পেপার লিখে পাবলিশ করেন। মনে রাখবেন, হয় এখন না হয় আর কখনই নয়। আমি তখন করিনি, আর তা আজও করতে পারিনি!

স্যার তার মেয়েদের প্রতি ভালোবাসা নিয়ে কবিতা লিখেছেন, কিন্তু ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতিও তার অগাধ ভালোবাসা ছিল। স্যার একবার তার প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে কিছু গবেষনা কাজ শুরু করতে চেয়েছিলেন। তার জন্য একটা মিটিং হয়েছিল ব্র্যাক সেন্টারে, আমি আয়োজন করেছিলাম। মিটিং শেষে একজন ছাত্রীকে স্যার তাঁর গাড়ী করে (নিজে গাড়িতে বসে থেকে) বাসায় পৌছে দিয়েছিলেন সেই সুদুর উত্তরা, যেখানে স্যারের বাসা ছিল কিনা নিকেতন! পুরোটা সময় আমি স্যারের সাথে ছিলাম। উনি একইভাবে আমাকেও পৌছে দিতে চেয়েছিলেন, আমি অনেক অনুরোধ করে শেষ পর্যন্ত স্যারকে থামাতে পেরেছিলাম। যেসব ছাত্র-ছাত্রীর স্যরের সাথে ন্যুনতম যোগাযোগ ছিল, স্যার সবার খোঁজ রাখতেন। এক নি:শ্বাসে বলে দিতে পারতেন কে কোথায় কাজ করছে, কেমন আছে, কার কয়টা পাবলিকেশন হয়েছে!
আতাহার স্যার কত ভালো লিডার ছিলেন সেটা তো DUSDAA তাঁকে আউটস্ট্যান্ডিং লিডারশিপ এ্যাওয়ার্ড দিয়েই বুঝিয়ে দিয়েছে! তাছাড়া তাঁর প্রচেষ্টায় DUSDAA গঠিত হওয়ার খবর তো আমরা সবাই জানি।

আমার কাছে স্যারের সবচেয়ে বড় দুটো গুণ ছিল – তিনি অসম্ভব ভালো একজন মানুষ আর অসাধারণ মেন্টর। একটা মানুষ কিভাবে সারাক্ষণ মুখে একটা প্রাণবন্ত হাসি নিয়ে কথা বলতে পারেন, কাজ করে যেতে পারেন! কীভাবে পারেন প্রতিদিন হজারো মানুষকে ভালো কাজের অনুপ্রেরণা দিয়ে যেতে! অসম্ভব ইতিবাচক মানসিকতার মানুষ ছিলেন তিনি। স্যারের মরদেহটা আমি দেখতে পাইনি। হয়তো ভালোই হয়েছে। সবসময় আমার চোখের সামনে তাঁর হাসিমাখা উজ্জ্বল মুখখানা ভেসে বেড়াবে, আজীবন।

যে কোন বিষয়ে সিদ্ধান্তের প্রয়োজন হলে সবার আগে এই মানুষটির সাথেই যোগাযোগ করতাম – কোথায় চাকরী করব, কোন সময় পি.এইচ.ডি করতে যাবো কিংবা কোন বিষয়ে গবেষণা করব। তিনিই ছিলেন আমার মেনটর, আমার পরামর্শদাতা। আজ আমি যেখানে পৌছেছি তার সিংহভাগ কৃতিত্ব এই মহান মানুষটির। একবার আমি ব্রাকের গবেষণার চাকরী ছেড়ে কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হতে চেয়েছিলাম। স্যার তখন বিদেশে। আমার পরীক্ষার ঠিক দুদিন আগে স্যার দেশে আসার খবর পেলাম। একটুও দেরি না করে ছুটলাম স্যারের সাথে দেখা করতে। স্যার সবকিছু শুনে এক মিনিটের মধ্যে আমার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে দিলেন। আমাকে বললেন আমি এখানেই ভালো আছি। কুষ্টিয়া গেলে আমার কাজের গতিটা কমে যাবে, গবেষণাটা বন্ধ হয়ে যাবে। আমার বরং আইসিডিডিআর,বি তে চেষ্টা করা উচিৎ। আমি এখন আইসিডিডিআর,বি তেই কাজ করি। কিন্তু জীবনের তো এখনও অনেক সিদ্ধান্ত নেয়া বাকী। কার কাছে যাবো স্যার?

কমেন্ট করুন
সহকারী বিজ্ঞানী | আইসিডিডিআর,বি

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

0