নশ্বরতা

কোয়ারেন্টিনের এক পড়ন্ত বিকেলে আইনস্টাইন এবং তার থিওরি অফ রিলেটিভিটি বিষয়ক একটি  ডকুমেন্টারি দেখছি আর ভাবছি, কিভাবে তার ১২৩০ গ্রামের ব্রেইন থেকে এমন সব থিওরি বেরিয়ে আসতে পারে! বিস্ময় নিয়ে চোখ বন্ধ করে ভেবেই চলেছি। কই? আমার মাথায় তো এমন কিছু আসে না? আসলে কি খুব ক্ষতি হতো? কিন্তু আমার ছোটখাটো ব্রেইনের ভেজাফ্রাই শেষে সকল ভাবনা চিন্তার ফলাফল শূন্যেই ঠেকলো। অবশেষে বাধ্য হয়ে চোখ মেললুম ডকুমেন্টারির বাকি অংশ হজম করার জন্য।

হঠাৎ করেই চোখ পড়লো আমার পড়ার টেবিলে রাখা ম্যাক্সিলারি bone টার দিকে। ওটা যেন আমায় কিছু বলছে; যেন ওটার সকল features একদিনে পড়ে আইটেম এক্সাম ক্লিয়ার করে ধুলোয়  ফেলে রাখা টা খুবই অন্যায় কিছু হয়েছে, আর ওর ব্যাপারে আরও ঢের কিছু জানার আছে যাতে আমি আগ্রহ ও সময় কোনটাই দিতে ইচ্ছুক   ছিলাম না বলে ডেব ডেব করে চেয়ে শাসাচ্ছে। হয়তো সেই তীব্র শাসনে ভীত হয়েই ডকুমেন্টারি ফেলে ওটার দিকে মনোনিবেশ করে দেখি বেচারা ম্যাক্সিলার ব্যাপারে আসলেই অনেক কিছু জানার আছে। হঠাৎ কি সব আজগুবি চিন্তার ঘোরে চলে গেলাম।

এই ম্যাক্সিলা যে ব্যক্তির মুখমণ্ডলে স্থান পেয়েছিল সেই ব্যক্তিটিও একসময় আমার মতোই স্বাভাবিক মানুষ ছিল, তার জীবনেও কত ব্যস্ততা ছিল, কত স্মৃতি ছিল, কত হাসি ছিল, কত বেদনা ছিল, কত অভিজ্ঞতা ছিল, ভালোবাসা ছিল, কত না পাওয়া ছিল, কত ছুটে চলা ছিল আর সেই ছুটে চলার সময় এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে ছুটে চলেছিল এই ম্যাক্সিলাও। আচ্ছা এই ম্যাক্সিলার “owner” মানুষটি কি কখনো ভেবেছিল, কোন এক সম্পূর্ণ অপরিচিত ব্যক্তি শুধুমাত্র প্রফ এক্সামে পাস করার জন্য তার কঙ্কালের এই অংশটিকে কিনে নেবে? সে কি ভেবেছিল তার কঙ্কালের অংশগুলো অজ্ঞাত কতগুলো মেডিকেল স্টুডেন্টের ঘরের কোণে কিংবা পড়ার টেবিলে ঠাই পাবে?

হঠাৎ আমার সমস্ত শরীর কাঁটা দিয়ে উঠলো, ভাবলাম একদিন আমারও মৃত্যু হবে তখন আমার এই পাঁচ ফুটের শরীর, হাড়গোড় সমেত মাটির সার হয়ে যাবে, ছোট ছোট গাছ গাছালির পুষ্টি যোগাবে। কোনো কিছুই যেন অবিনশ্বর নয় এই পৃথিবীতে, এমনকি আইনস্টাইনের বারোশো ত্রিশ গ্রামের সেই extraordinary ব্রেইনটিও নয়। আইনস্টাইনের মৃত্যুর পর তাঁর প্যাথলজিস্ট থমাস হার্ভে অটোপসি শেষে তার ব্রেইনটিকে চুরি করে নিয়ে যায় এবং ব্রেইনটিকে  দুইশ চল্লিশ খন্ডে বিভক্ত করে নানা রকম গবেষণা  চালিয়ে বিশ বছরেরও বেশি সময় নিজের বেজমেন্টে সংরক্ষণ করে রাখে। কি অবাক কান্ড! এত বড় লিজেন্ডারি মানুষের মস্তিষ্কের কি ভয়ানক পরিণতি!

হঠাৎ নানা ভাইয়ের কথা খুবই মনে পড়ছে। আমার নানাভাই খুবই ইন্টারেস্টিং মানুষ ছিলেন। আমাদের গ্রামের মসজিদের পাশের কবরস্থানের প্রথম কবরের জায়গাটি নানাভাই নিজের কবরের জন্য সংরক্ষণ করেন এবং টানা দশ বছর ধরে সেই জায়গাটির রক্ষণাবেক্ষণ করেন, এমনকি তাঁর কবরটি যাতে বাকি সব কবর থেকে একটু বেশিই দৃষ্টিনন্দন হতে পারে সেই লক্ষ্যে তিনি নিজ হাতে সেই প্রথম কবরের জায়গাটির পাশে শিউলি ফুলের গাছ রোপন করেন। আজ নানা ভাই আমাদের মাঝে নেই। নানা ভাইয়ের দশ বছরের পরিশ্রমের ফল স্বরূপ আমরা এখন পড়ন্ত শিউলি ফুলে নিমজ্জিত তার কবরটি দেখতে পাই । এখন সেই কবরের উপর বেশ কিছু গাছ গাছালি ও গজিয়ে গেছে। ভাবতেই কেমন যেন লাগে; নশ্বর জীবনের এত বড় একটা উদাহরণ আমার ভিতরের স্বত্তাকে অনেক বড় একটা ধাক্কা দিয়ে গেল এবং ভাবাতে বাধ্য করলো যে আমাদের সকলেরও সেই একই পরিণতি হবে। অথছ আমরা মৃত্যুকে কত সহজেই ভুলে থাকি!

মনে পড়ল “Dead poet society” তে Robin Williams এর মুখের সেই নিষ্ঠুর সত্য লাইন: We are foods for worms lads. ভাবতেই কষ্ট হচ্ছে কত নশ্বর আমাদের জীবন! এমনকি আমাদের এই visible body টাও। তবুও সারাজীবন আমরা এরকমন অসংখ্য ক্ষনস্থায়ী জিনিসের পেছনেই ছুটি, ছুটতে থাকি। এ ছুটে ছলার সময় কিছু পার্থিব প্রাপ্তির জন্য আমরা আমাদের চারপাশের ভালোবাসার মানুষদের সাথে অপার্থিব সম্পর্ক নষ্ট করি, সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় মাঝে মাঝে মুখের কিছু কথা দিয়ে আমরা আমাদের চারপাশের মানুষকে কষ্ট দেই, ছোট করি; কিন্তু আমরা চাইলেই কথা না বলে থাকতে পারি। কিন্তু কজনেরই বা এই অভাবনীয় ক্ষমতা রয়েছে! কজনই বা বুকে সেই এরাবিয়ান প্রবাদকে ধারণ করতে পারে, “ Speak when it’s more beautiful than silence”. তবুও আমরা কথা বলি, কথা দিয়ে মানুষকে কষ্ট দেই, আঘাত দেই, আমরা বেমালুম ভুলে যাই আমাদের যেকোন দিন, যেকোন সময় মরে যেতে হবে।আমাদের দেখলে মনেই হবেনা যে আমরা কোন দিন মারা যাবো।

We, Humans are those material which can’t last forever as human form but still running after all the materialistic things in this short period of life.ভাবতে ভাবতেই মেন্টিসেন্টাল ( not sentimental )  হয়ে গেলাম, তাহলে কি আমাদের মৃত্যুর পর জামা-জুতো আর ব্যবহার্য জিনিস ছাড়া কিছুই থাকবে না এই নশ্বর পৃথিবীতে? অন্তত আরো কিছু সময়ের জন্যও ?

হঠাৎ কলিংবেলের একটা অদ্ভুত গানের পর please open the door কন্ঠে আমি সম্বিত ফিরে পেলাম। মা বুঝি বাইরে থেকে এল, বাবা’ই দরজাটা খুলে দিল। হাত মুখ ধুয়ে মা ভাত, তরকারি গরম দিচ্ছে। দুপুরেই আমাদের সবার খাওয়া সারা, শুধু মা কিছু জরুরী কাজে বাইরে গিয়েছিল। যেই মা খাওয়া শুরু করবে ঠিক তখনই দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। মা উঠে দরজা খুলে দিল; এক বৃদ্ধ ভিক্ষুক হাপাতে হাপাতে বলল, “আজ অনেক পথ হাটছি, বাসাতই ফিরতাছিলাম কিন্তু বাসাত তো ভাত রান্ধা নাইরে, কিছু খাইতে দে মা।” আমার মা জানে টেবিলে তার খাওয়ার জন্য সাজানো ভাত, তরকারি, ডাল ছাড়া আর কিছু এই মুহুর্তে রাধা নেই। আমি জানি মা ভীষণ ক্ষুধার্ত এবং সে ক্ষুধা সহ্য করতে পারেনা। কিন্তু মা ক্ষুধা সহ্য করল এবং তার জন্য সাজানো খাবারটা বৃদ্ধটিকে খেতে দিয়ে রান্নাঘরে ভাত রাধতে চলে গেল।

এই ছোট্ট ঘটনাটি আমাকে বেশ নাড়া দিল। ভাবলাম আজ আমি মা এর কাছ থেকে তার অগোচরেই যা শিখলাম, এটা তো আমার সাথে আজীবন থাকবে আর আমি যদি আমার জীবনেও এ শিক্ষা প্রয়োগ করি আর আমাকে দেখে যদি কেউ এই শিক্ষা তার জীবনেও প্রয়োগ করে এবং তাকে দেখে যদি আরও মানুষ তাদের জীবনেও প্রয়োগ করে তাহলে আমার মা’র এই কাজটি তো আর নশ্বর রইবে না। হয়ত আমরা গত হওয়ার অনেক পরও থেকে যাবে এই ধুলোর পৃথিবীতে, অজ্ঞাত ভবিষ্যত প্রজন্মের হৃদয়ে। মনটা হঠাৎ ভাল হয়ে গেল এই উপলব্ধিতে যে, এই নশ্বর পৃথিবীতে শুধুমাত্র আমাদের শিক্ষা or idea যা আমরা আমাদের  ভবিষ্যত প্রজন্মের মাঝে রেখে যাব এবং তারা যা তাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে রেখে যাবে সেটাই আমাদের ছাপিয়ে অবিনশ্বর হয়ে রবে। But every notion of happiness triggers a sense of fear, আমি বুঝতে পারলাম যে ভাল শিক্ষার মতো খারাপ শিক্ষাও দীর্ঘায়ু প্রাপ্ত হয়, তাইতো অভ্যাসবশতই without thinking আমরা যখন অনেক বাজে কাজ করি (যেমন: বডি সেমিং)  আমাদের  brain নিজেও বুঝেনা যে আমরা কোন অপরাধ করছি। তাই এখন  মনে হচ্ছে “lnception” movie তে Leonardo Decaprio,  Mr Cobb character টি play করার সময় বড্ড সত্যই বলেছিল যে  “An idea is like a virus RESILIENT, highly  CONTAGIOUS and even the smallest seed of idea can grow. It can grow to DEFINE or DESTROY you.”

কমেন্ট করুন
শিক্ষার্থী | সিটি ডেন্টাল কলেজ

সেশনঃ ২০১৯-২০

তানিকা ইসলাম

সেশনঃ ২০১৯-২০

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

0