“শিক্ষা উন্নয়নে বঙ্গবন্ধুর ভাবনাঃ প্রেক্ষিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়”

ভূমিকা:

বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশ আজ একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে সুপরিচিত। কোন দেশের উন্নতি সাধনের জন্য যে সকল মৌলিক উপাদান প্রয়োজন তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে শিক্ষা। শিক্ষা ছাড়া কোন জাতি মর্যাদার উন্নতির শিখরে উপনীত হতে পারে না। উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা অর্জনের ক্ষেত্রে এদেশের আধুনিক ও উচ্চমানের শিক্ষা পদ্ধতির গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। যে পদ্ধতির ভিত্তি স্থাপন করেন স্বয়ং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যিনি এদেশের পরাধীনতা মোচন করেই ক্ষান্ত হননি, দেশকে উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছাতে ছিলেন দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ। উন্নত রাষ্ট্রে পরিনত করার মহা পরিকল্পনায় জাতির পিতার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল শিক্ষার বিকাশ। শিক্ষা বিকাশের গুরুত্ব বুঝতে তিনি শিক্ষাকে আখ্যা দিয়েছিলেন মুক্তির হাতিয়ার হিসেবে। সেই মুক্তির পথ অনুসরণের মাধ্যমে বাংলাদেশ আজ এগিয়ে যাচ্ছে দূর্বার গতিতে। বঙ্গবন্ধু নিজেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন এবং ছাত্র থাকাকালীন অবস্থাতেই শিক্ষার গুরুত্ব বুঝতেপেরেছিলেন। দেশ পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণের পর শিক্ষার উন্নয়নে নানামুখী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে তাঁর পরিকল্পনা ছিল ব্যাপক।

বঙ্গবন্ধুর জন্ম পরিচয়:

শেখ মুজিবুর রহমান ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ তৎকালীন ভারতীয় উপমহাদেশের বঙ্গ প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমার পাটগাতি ইউনিয়নের টুঙ্গিপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা শেখ লুৎফর রহমান গোপালগঞ্জ দায়রা আদালতের সেরেস্তাদার (আদালতের হিসাব সংরক্ষক) ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর মায়ের নাম সায়েরা খাতুন লুৎফর- সায়েরা দম্পতির চার কন্যা এবং দুই পুত্রের সংসারে মুজিব ছিলেন তৃতীয় সন্তান। তার বড় বোনের নাম ফাতেমা বেগম। মেজো বোন আছিয়া বেগম সেজো বোন হেলেন ও ছোট বোন লাইলী। ছোট ভাইয়ের নাম শেখ আবু নাসের। বঙ্গবন্ধু এক সম্ভ্রান্ত বংশে জন্মগ্রহণ করেন। উচ্চ বংশীয় ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় তার মাঝে আশৈশব ধর্মীয় মূল্যবোধ ও মানবিক চেতনাবোধের উন্মেষ ঘটে। তিনি ‘শেখ’ বংশীয় উত্তরাধিকার বহন করেন। ‘শেখ’ শব্দটির অর্থ হচ্ছে শক্তিশালী, বলবান বিপুল ক্ষমতাসম্পন্ন। এটি সম্মানসূচক আরবি অভিধা বা পদবি হিসেবেও পরিচিত।

       একদা মহামতি শেখ আউয়াল নামে এমন দরবেশের আগমন ঘটে এ বঙ্গে। বঙ্গবন্ধু তারই বংশের সৌভাগ্যবান অধস্তন বংশধর। তাকে খোকা বলে ডাকতেন বাবা লুৎফর ও মা সায়েরা। তাদের ধারণকৃত ভিডিও দলিলের বরাত দিয়ে বলা যায়, ১৯২০ সালের ১৭ই মার্চ মঙ্গলবার রাত ৮ টায় বঙ্গবন্ধু জন্মগ্রহণ করেন। তিনি আজীবন অকুতোভয়, সৎ, সাহসী, আপোষহীন, সচ্চরিত্রবান, উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে দৃঢ়চেতা, স্বাধীনতা প্রিয়, নেতৃত্বের গুণাবলীসম্পন্ন, দরিদ্রের প্রতি দয়ালু, মানুষের প্রতি মমত্ববোধ সম্পন্ন এবং বাবা মায়ের কথা পালনে অন্যরকম বাধ্য ছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ আউয়াল দরবেশেরই সপ্তম অধস্তন বংশধর ছিলেন। আউয়ালের ছেলে শেখ জহির উদ্দিনের দৌহিত্র ছিলেন শেখ বোরহান উদ্দিন। বোরহান উদ্দিনের ছেলে শেখ আকরাম হলেন বঙ্গবন্ধুর বাবা শেখ লুৎফর রহমানের দাদা। আর শেখ লুৎফর রহমান হলেন শেখ আব্দুল হামিদের সন্তান।

বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা জীবন:

১৯২৭ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ বছর বয়সে শিক্ষা জীবন শুরু হয়। নিজ বাড়ি থেকে সোয়া মাইল দূরে গিমাডাঙ্গা প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি হন তিনি। নয় বছর বয়সে পিতার কর্মস্থল গোপালগঞ্জ পাবলিক স্কুলে ভর্তি হননি। স্থানীয় মিশনারী স্কুলেও তিনি পড়া লেখা করেছেন। মিশনারী স্কুলটি পাকিস্তান আমলে কায়েদে আযম মহাবিদ্যালয় এবং বর্তমানে বঙ্গবন্ধু মহাবিদ্যালয়ে নামে পরিচিত। বঙ্গবন্ধুর পূর্ব পুরুষ এদেশে ধর্ম প্রচারের জন্য এসেছিলেন। তাই শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতেন বেশি। ১৯৩১ সালে পিতা শেখ লুৎফর রহমান পুত্র শেখ মুজিবুর রহমানকে নিজ কর্মক্ষেত্রে নিয়ে এলেন। ভর্তি করে দিলেন মাদারিপুর ইসলামিয়া হাই স্কুলের চতুর্থ শ্রেণিতে। ১৯৩৪ সালে মাদারিপুর হাই স্কুলে ৮ম শ্রেণির ছাত্র থাকা আবস্থায় বঙ্গবন্ধু বেরিবেরি রোগে আক্রান্ত হলে লেখাপড়ায় ব্যাঘাত ঘটে। ডাক্তারের পরামর্শে পিতা লুৎফর রহমান পুত্র মুজিবকে কলকাতা নিয়ে গিয়ে একটি চোখ অপারেশন করান। এ কারনে তিনি তিন বছর পড়ালেখা করতে পারেন নি। যার ফলে ১৯৩৭ সালে পুনরায় অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি হন। একটু ‍বিলম্বিত হলেও পড়ালেখায় মনোযোগ রাখতেন ১৯৩৮ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। বঙ্গবন্ধু অষ্টম শ্রেণিতে থাকাকালীন তার নেতৃত্বের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। বাংলার মুখ্য মন্ত্রী শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হক বিদ্যালয় পরিদর্শনে আসলে বঙ্গবন্ধু নির্ভয়ে বিদ্যালয়ের সমস্যাগুলো তুলে ধরেন। ১৯৪০ সালে তিনি নিখিল ভারত মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনে যোগ দেন। ১৯৪২ সালে শেখ মুজিব প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৪৩ সালে ইসলামিয়া কলেজে থাকাকালীন মুসলিম লীগের রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৪৪ সালে তিনি আই. এ পাশ করেন। ২য় বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্তকালে তিনি বি.এ ক্লাসের ছাত্র ছিলেন। ১৯৪৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৪৮ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন।

পাকিস্তান আমলে শিক্ষা ব্যবস্থা:

পাকিস্তান শাসনামলে বাংলাদেশ তথা পূর্বপাকিস্তান সকল দিক দিয়েই পিছিয়ে ছিলো। সব ক্ষেত্রেই শিকার হতে হতো বৈষম্যের। শিক্ষা বিভাগের প্রশাসনিক কাজে বাঙালির পরিমাণ ছিলো ২৭.৩%। আর পাকিস্তানি অর্থাৎ পশ্চিম পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের ভাগ ছিলো ৭২.৭% পশ্চিম পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষা ব্যবস্থার ব্যাপারে কোনো ভ্রুক্ষেপই ছিলো না। পাকিস্তানের সৃষ্টির আগে পূর্ব বাংলা পশ্চিম পাকিস্তানের চেয়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় এগিয়ে ছিলো। পাকিস্তান সৃষ্টির পর শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দে পশ্চিম পাকিস্তান পূর্ব পাকিস্তানের দ্বিগুণের চেয়ে বেশি বরাদ্দ লাভ করতে থাকে। ফলে পশ্চিম পাকিস্তানে প্রাথমিক, মাধ্যমিক উচ্চশিক্ষার জন্য নতুন নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। অন্যদিকে পূর্ব পাকিস্তান পিছিয়ে পড়তে থাকে। এভাবে পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠী চেয়েছিল পূর্ব পাকিস্তানকে অশিক্ষার অন্ধকারে ডুবিয়ে রাখতে চেয়েছিলো শিক্ষাবিহীন মেরুদণ্ডহীন এক জাতিতে পরিণত করতে। তার শেষ চেষ্টার প্রতিফলন দেখা যায় ১৪ই ডিসেম্বরের বুদ্ধিজীবী নিধনের মাধ্যমে। কিন্তু বাঙালি ঘুরে দাঁড়াতে জানে। বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য নেতৃত্বে বাঙালি জাতি ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছিলো। দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে পাকিস্তানের দুঃশাসনের বেড়াজাল থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করে বাংলা মায়ের দামাল ছেলেরা। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু দেশ গড়ার কাজে হাত দেয়। আর সে কাজে তাঁর সবচেয়ে বড় ভিত ছিলো শিক্ষা।

বঙ্গবন্ধু এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়:

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নামটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাঙ্গালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর কর্ম এবং স্মৃতি। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের বিকাশ ঘটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাককালীন সময়েই তিনি মূলত দেশ গঠনের রাজনীতির সূতিকাগারে প্রবেশ করেন। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ই ছিলো সকল আন্দোলনের জন্মস্থান। আর সেই সকল আন্দোলনের নেপথ্যে ছিলেন বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যেই ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিটি তাকে নিয়ে গিয়েছে ইতিহাসের সোনালী পাতায়। সেই উপাধিটি দিয়েছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা। ১৯৪৭ সালে কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ থেকে বি.এ পাশ করে ভারত বিভাগের পর তিনি চলে গেলেন ঢাকায়। সেপ্টেম্বরে পা রাখলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে। পিতা লুৎফর রহমানের ইচ্ছে ছেলেকে আইনজীবী বানাবেন। ভর্তি হলেন আইন বিভাগে। এস.এম হলের সংযুক্ত ছাত্র হলেও তিনি থাকতেন মোগল টুলিতে। একটি সাইকেল করে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে আসতেন। তার রোল নাম্বার ছিলো-১৬৬। সে সময় আইন বিভাগের হেড অব ডিপার্টমেন্ট ছিলেন অধ্যাপক এম ইউ সিদ্দিক। ভর্তির সময় তিনি শেখ মুজিবকে মন দিয়ে পড়তে বলেন। তিনি আড্ডা দিতেন ফজলুল হক হলের পুকুর পাড়ে। সেখানেই তিনি সমকালীন রাজনীতি নিয়ে সহপাঠীদের সাথে আলোচনা করতেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে তিনি অধিকাংশ সময় কাটাতেন ১৫০ নম্বর মোগলটুলিতে। ১৯৪৪ সাল থেকে এ বাড়িতেই শামসুল হক, কামরুদ্দিন, তাজউদ্দীন প্রমুখ নেতার আনাগোনা ছিলো। বাড়িটির নাম ছিল পার্টি হাউজ। পূর্ব পাকিস্তানে শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এখান থেকেই শুরু হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছাত্র আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। ১৯৪৮ সালে ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন শেখ মুজিবুর রহমান। এ কারণে তাকে কারাবরণ করতে হয়। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি ছাত্র নেতাদের নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ গঠন করেন। শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৪৯ সালে আইন বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র থাকা অবস্থায় বহিষ্কার হন। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারীদের মধ্যে দাবি-দাওয়া নিয়ে অসন্তোষ চলছিলো। কর্মচারীদের মাসিক বেতন ছিলো নগণ্য। ১৯৪৯ সালের ৩রা মার্চ থেকে কর্মচারীরা ধর্মঘট শুরু করে। তাদের সমর্থনে ছাত্র সমাজ ক্লাস বর্জন করে। শেখ মুজিবুর রহমান শুরু থেকেই তাদের সমর্থন দিয়ে আসছিলেন ১১ই মার্চ বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ এবং ২৬ মার্চ ২৭ জন ছাত্র ছাত্রীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে কতৃপক্ষ বঙ্গবন্ধুসহ ৫ জনকে ১৫ টাকা করে জরিমানা করা হয়। তাদের মুচলেকা দিতে বলা হয়। অনাদায়ে ছাত্রত্ব বাতিল। এর প্রতিবাদে ১৯৪৯ সালের ২০শে এপ্রিল বিশ্ববিদ্যালয়ের হরতাল ও ধর্মঘট ডাকা হয়। এ সময় শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেপ্তার হন। ছাত্রত্ব ফিরে পেতে তাকে জরিমানা ও মুচলেকা দিতে বলা হলেও তিনি অস্বীকৃতি জানান। এর ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিলের সিদ্ধান্তে শেখ মুজিবুর রহমানের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে। এ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন অধ্যাপক সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন। পরবর্তীতে নিজ যোগ্যতায় শেখ মুজিবুর রহমান জাতীয় নেতায় পরিণত হলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল গণতান্ত্রিক ও যৌক্তিক আন্দোলন সংগ্রামে তিনি সংশ্লিষ্ট ছিলেন।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ৬ মে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বঙ্গবন্ধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যায় প্রাঙ্গণে আসেন। কলা ভবনের সামনে বটতলায় তাঁকে সংবর্ধনা দেয়া হয়। তাঁকে ডাকসুর আজীবন সদস্যপদ দেয়া হয়। সংবর্ধনা সমাবেশে বঙ্গবন্ধুর সামনে তাঁর ছাত্রত্ব বাতিলের আদেশের কপি ছিঁড়ে ফেলা হয়, স্বাধীনতার পর দেশে যখন চরম খাদ্য সংকট চলছিলো তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আবাসিক হলগুলোতে এক বেলা ভাত ও এক বেলা রুটি দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, কিছুদিন পর ছাত্ররা দুই বেলা ভাতের দাবিতে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুজাফফর আহমেদ চৌধুরীকে ঘেরাও করলে বঙ্গবন্ধু নিজে তাদের শান্ত করেন। 

১৯৭৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ জারি করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে স্বায়ত্ত্ব শাসনের আওতায় আনেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট বঙ্গবন্ধুকে সংবর্ধনা দেয়ার জন্য তাকে আমন্ত্রণ জানায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তিনি আমন্ত্রণ সাদরে গ্রহণ করে। তখন বঙ্গবন্ধু একাধারে রাষ্ট্রপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর। তাকে সাদরে বরণ করে নেয়ার জন্য জমজমাট করে সাজানো হয় পুরো বিশ্ববিদ্যালয় কিন্তু সেই সাজানো চত্বরে আর পা রাখা হয় নি বঙ্গবন্ধুর ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট ভোররাতে একদল বিপথগামী সেনা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করে। থমকে যায় ইতিহাস।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার মহান সন্তান বঙ্গবন্ধু স্মৃতি নানাভাবে ধরে রেখেছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট তার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আগমন উপলক্ষ্যে যে চেয়ারটি তৈরি করা হয়েছিলো তা যত্ন করে রেখে দেয়া হয়েছে। সেদিন বঙ্গবন্ধুকে একটি মানপত্র দেয়ার কথা ছিলো। ২০১০ সালে সেই মানপত্রটি বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনার হাতে তুলে দেয়া হয়। ১৯৮৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শেখ মুজিবুর রহমান হল প্রতিষ্ঠিত হয় ২০১৮ সালে রোকেয়া হলে ৭ মার্চ ভবন উদ্বোধন করা হয়। এছাড়া বঙ্গবন্ধুর পরিবারের অনেক সদস্যই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। বর্তমান প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৬৭-৬৮ সেশনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বি.এ শ্রেণিতে বাংলা বিভাগে ভর্তি হন। বঙ্গবন্ধুর সর্বকনিষ্ঠ পুত্র শেখ রাসেল ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের একজন সদস্য। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ল্যাবরেটরি স্কুলের ছাত্র ছিলন। ল্যাবরেটরি স্কুল ও কলেজের সুবর্ণ জয়ন্তী (২০১৪) উপলক্ষ্যে প্রকাশিত আলোকের এই ঝর্ণাধারায় শীর্ষক একটি প্রকাশনায় এই এক সময়ের শিক্ষক আফরোজা বেগম একটি লেখার লিখেছেন, “চতুর্থ শ্রেণিতে পাঠরত ছোট্ট একটি ছেলে। মিষ্টি চেহারা, নম্র, ভদ্র, অমায়িক। হাঁটতো নিচের দিকে তাকিয়ে। সামনে কোনো শিক্ষক পড়লে সামান্য উচুঁ করে হাত তুলে সালাম দিত লজ্জা মিশ্রিত হাসি হেসে”। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের যে তিনটি ঘটনা স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে তা হলো ৭ মার্চ ১৯৭১ এর ঐতিহাসিক ভাষণ, ১৬ ডিসেম্বর এর মহান বিজয় এবং ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ এ বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন। ৩টি ঘটনাই ঘটেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিক্ষিপ্ত বুকে ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে। বিশ্ববিদ্যালয় একটি কাঠামোর নাম। একটি ধরাবাঁধা নিয়মের অধীন প্রতিষ্ঠানের নাম। বঙ্গবন্ধু ও একটি ধরাবাঁধা নিয়ম অনুসরণ করে তাঁর ৫৫ বছরের সংগ্রাম মুখর পথ পাড়ি দিয়েছেন। বাঙ্গালি জাতির মুক্তির ইতিহাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হলো “প্রাতিষ্ঠানিক রুপ।”

বঙ্গবন্ধু হলেন “মানবীয় প্রতীক”। একটিকে আমরা তত্ত্ব বলবো। অপরটিকে বলবো ব্যবহারিক। বঙ্গবন্ধু এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শব্দ দুটি একে অপরের পরিপূরক। বঙ্গবন্ধু এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্ম্পকের কোনো ভিন্ন শব্দ দ্বারা বিশেষায়িত করা যাবে না।

শিক্ষার উন্নয়নে বঙ্গবন্ধুর অবদান:

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুধু স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নই দেখেননি, তিনি উন্নত সমৃদ্ধ সুখী বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন। তিনি এ দেশকে সোনার বাংলায় পরিণত করতে চেয়েছিলেন। তিনি বলতেন, ‘সোনার বাংলা গড়তে হলে সোনার মানুষ চাই।’ এজন্য প্রয়োজন সুশিক্ষা। এই সুশিক্ষা নিশ্চিত করার জন্যই বঙ্গবন্ধু শিক্ষার একটি দর্শন প্রবর্তন করেছিলেন, যা বর্তমান সময়েও অমুল্য।

বঙ্গবন্ধুর শিক্ষাদর্শন ও শিক্ষা ভাবনা তার রাজনৈতিক দর্শন থেকেই উৎসারিত। তাঁর শিক্ষাচিন্তায় আত্ননির্ভরশীলতা, অর্থনৈতিক স্বাবলম্বীতা, মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন একটি জাতি গঠনকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন উপলক্ষে বঙ্গবন্ধু দেয়া বেতার ও টেলিভিশন ভাষণ থেকে আমরা তাঁর শিক্ষাচিন্তা সম্পর্কে ধারণা পাই। ভাষণে তিনি বলেছিলেন, ‘সুষ্ঠু সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য শিক্ষা খাতে পুঁজি বিনিয়োগের চেয়ে উৎকৃষ্ট বিনিয়োগ আর হতে পারে না। স্বাধীন বাংলাদেশ গঠনের পর যুদ্ধবিধবস্ত দেশটিকে পূর্ণগঠনের জন্য তিনি যখন ঘোষণা দিয়েছিলেন- ‘শিক্ষাই হবে মুক্তির হাতিয়ার।’ তখন তাঁকে অনেক উচুঁ মাপের শিক্ষা দার্শনিক বলা যায় নির্দ্বিধায়।

তিনি শিক্ষাবিস্তারের মাধ্যমে যে মুক্তির কথা বলেছেন, সেই মুক্তি হলো সংকীর্ণতা হতে মুক্তি। এই মুক্তি হলো দরিদ্র শোষিত জনগণের মুক্তি, এই মুক্তি হলো দেশের অর্থনৈতিক মুক্তি।

শিক্ষকদের উদ্দেশ্যে এক ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, “আগামী প্রজন্মের ভাগ্য শিক্ষকদের ওপর নির্ভর করছে। শিশুদের যথাযথ শিক্ষার ব্যত্যয় ঘটলে কষ্টার্জিত স্বাধীনতা অর্থহীন হবে।” এছাড়া বঙ্গবন্ধু প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাঝে বিনামূল্যে বই, শিক্ষা উপকরণ ও খাবার বিতরণের ব্যবস্থা করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু শিক্ষা নিয়ে ১৯৭০ সালে যে ভাষণ দিয়েছিলেন তা তিনি শুধু ভাষণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেন নি। বাস্তবে রুপায়ন করেছিলেন। তিনি দেশের সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করেছিলেন। প্রাথমিক শিক্ষা সবার জন্য উন্মুক্ত করে। বঙ্গবন্ধু প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চশিক্ষা, কারিগরি সব জায়গায় আধুনিক ও মানসম্পন্ন শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করেছিলেন।

তবে আমূল পরিবর্তনটা তিনি এনেছিলেন প্রাথমিক ও উচ্চ শিক্ষায়। উচ্চ শিক্ষাকেও যথেষ্ঠ প্রধান্য দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু ক্ষমতায় এসে দেশে উচ্চ শিক্ষা সবার জন্য উন্মুক্ত করে দিলেন এবং ধনী-গরীব বৈষম্য দূর করলেন বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বায়ত্বশাসন প্রদান করলেন এবং গঠন করলেন মঞ্জুরি কমিশন।

বঙ্গবন্ধু তার জীবদ্দশায় শিক্ষা সম্পর্কিত যে আইন প্রণয়ন করেছিলেন এবং বাস্তবায়নে চলমান ছিলেন সে গুলো হলো- প্রাথমিক স্কুল অ্যাক্ট ১৯৭৪, ইউনিভার্সিটি গ্রান্ট কমিশন অব বাংলাদেশ আদেশ ১৯৭৩, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ ১৯৭৩, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাক্ট-১৯৭৩, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়- অ্যাক্ট ১৯৭৩, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়- অ্যাক্ট ১৯৭৩, বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ান আদেশ ১৯৭৩।

এছাড়াও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. কুদরত-ই-খুদাকে প্রধান করে একটি শিক্ষা কমিশন করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। সেই শিক্ষা কমিশন বেশ কয়েকটি মূল্যবান পরামর্শ প্রদান করে। যার ভিত্তিতে দেশের শিক্ষা কার্যক্রম চলতে থাকে। বঙ্গবন্ধুর শাসন আমলে আরও দুটি শিক্ষা বিষয়ক প্রণীত হয়। তা হলো মাদ্রাসা এডুকেশন অর্ডন্যান্স ১৯৭২ প্রাইমারী এডুকেশন অ্যাক্ট ১৯৭৪।

বঙ্গবন্ধু দেশকে নিরক্ষরমুক্ত করতে চেয়েছিলেন। বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে শিক্ষা বিস্তার ও নিরক্ষরমুক্ত দেশ রক্ষার প্রথম পদক্ষেপ ছিল পূর্বে উল্লেখিত প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ। বঙ্গবন্ধু ১৯৭৪ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণের একটি আইন প্রণয়ন করেন। এই আইন প্রণয়নের পর প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হয়। বঙ্গবন্ধু প্রাথমিক শিক্ষাকে অবৈতনিক করে শিক্ষাকে সহজলভ্য করে দিয়েছিলেন। তাছাড়া তার আমল থেকেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিনামূল্যে বই বিতরণ শুরু হয়। বিতরণ হতো শিক্ষা উপকরণ খাতা, কলম, পেনিসল পর্যন্ত। দেশ স্বাধীন হওয়ার ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু ৩৭ হাজার প্র্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ, ১১ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন, ৪৪ হাজার শিক্ষক নিয়োগ ও চাকরি সরকারিকরণ, ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে বই ও গরিব মেধাবী শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে পোষাক প্রদানের ব্যবস্থা করেন।

বঙ্গবন্ধু সরকার স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম যে বাজেট ঘোষণা করেছিলেন তাতে প্রতিরক্ষা খাতের চেয়ে শিক্ষা খাতে ৭% বেশী বরাদ্দ রেখেছিলেন। কারণ বঙ্গবন্ধু জানতেন প্রতিরক্ষা খাতের চেয়ে শিক্ষা খাত অনেক বিশি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি জানতেন প্রতিরক্ষা খাত দিয়ে নিরক্ষরমুক্ত দেশ গড়ে তোলা যাবে না। শুধু শিক্ষা দিয়েই নিরক্ষরমুক্ত করে জাতিকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।

পাকিস্তান আমলে যে শিক্ষা কমিশন গঠিত হয়েছিল এবং এই কমিশন যা সুপারিশ করেছিল তা ছিল ক্রটিপূর্ণ। এ জন্য আমাদের দেশে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনও করেছিল। ১৯৬২-এর শিক্ষা কমিশন আন্দোলন তার জ্বলন্ত প্রমাণ। বঙ্গবন্ধুর উচ্চশিক্ষার অবদানকে তিনটি ক্ষেত্রে বিভক্ত করা যায়। যেমন- বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন গঠন, বিশ্ববিদ্যালয়কে স্বায়ত্বশাসন প্রদান, একটি কার্যকরী শিক্ষা কমিশন গঠন। বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ২৬ জুলাই ড. মুহাম্মদ কুদরত-ই-খোদা-কে সভাপতি করে একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করেন। এছাড়া ১৯৭৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি যে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন আইন প্রণীত হয়েছিল তার মোট ১৫ টি ধারা ছিল। ২০১০ সালে যে শিক্ষা কমিশন গঠিত হয় তা ১৯৭২ এর শিক্ষা কমিশনের আলোকে।

বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ১৯৭৩ সালের শুরুতে তৎকালীন আইনমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন বিশ্ববিদ্যালয় সমূহের জন্য গণতান্ত্রিক আইন প্রণয়নের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক সমিতি ও শিক্ষকদের কাছে মতামত চান। সবাই নিজ নিজ মতামত পেশ করেন। এসব মতামতের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় সমূহকে প্রশাসনিক ভাবে স্বায়ত্বশাসন, সরকারি হস্তক্ষেপ বন্ধ, বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় ছাত্র, শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী সকলকে গণতান্ত্রিক মতামত রাখার সুযোগ প্রদান, শিক্ষার্থীদের একাডেমিক পড়াশুনার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক বিকাশের বিষয়টি ওঠে আসে। এসব প্রস্তাব পাওয়ার পর ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য দ্রুত আইন জারি করা হয়। আইনগুলো ছিল যথেষ্ট গণতান্ত্রিক ও অংশীদারিত্ব মূলক। শিক্ষক-ছাত্রদের দীর্ঘদিনের চাওয়া-পাওয়ার প্রতিফলন ঘটে এই আইনগুলোতে। সবচেয়ে বড় ব্যাপর হলো বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে স্বায়ত্বশাসন দেওয়ার পরে একটা আমূল পরিবর্তন আসে। বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে স্বায়ত্বশাসন আসার পর সত্যিকার অর্থে জ্ঞান চর্চার তীর্থভূমি এবং মুক্তবুদ্ধি চর্চার প্রাণকেন্দ্র হয়ে ওঠে।

বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার পর দেশ পরিচালনার জন্য যে সংবিধন প্রণয়ন করেন তাতে তিনি শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। সংবিধানের ১৭নং অনুচ্ছেদে শিক্ষার বিষয়টি উল্লেখ আছে। তাতে রয়েছে ১৭ (ক) একই পদ্ধতির গণমুখী ও সার্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য এবং আইনের দ্বারা নির্ধারিত স্তর পর্যন্ত সকল বালক-বালিকার জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

(খ) সামাজের প্রয়োজনের সাথে শিক্ষাকে সঙ্গতিপূর্ণ করার জন্য এবং সেই প্রয়োজন সিদ্ধ করার উদ্দেশ্যে যথাযত প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত ও সদিচ্ছা প্রণোদিত নাগরিক সৃষ্টির জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

(গ) আইনের দ্বারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিরক্ষরতা দূর করার জন্য রাষ্ট্র প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। বাংলাদেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় (১৯৭২-১৯৭৬) সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব ও অগ্রাধিকার প্রাপ্ত বিষয় গুলো হচ্ছে অবকাঠামো, পুনর্বাসন ও নির্মাণ, শিক্ষা, পরিকল্পিত পরিবার সম্বলিত জনসংখ্যানীতি, দারিদ্র দূরীকরণ এবং আয় ও সুযোগ বৈষম্য হ্রাসকরণ। এই পরিকল্পনার ধারাবাহিকতায়, বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশকে সমৃদ্ধশীল রাষ্ট্রে পরিণত করার জন্য শিক্ষা ক্ষেত্রে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন এবং বাস্তবায়ন শুরু করেন। বঙ্গবন্ধুর সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসার গভীরতা অনুভব করে, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ও ব্যক্তিত্বের বিশালতা সম্পর্কে কিউবার প্রেসিডেন্ট ফিদেল ক্যাস্ট্রো বলেছিলেন-

“I have not seen the Himalayas, but I have seen Sheikh Mujib. In personality and in courage, this man is the Himalayas, I have thus had the experience of withessing the Himalayas’’

Fidel castro in 1973

সোনার বাংলা গড়ে তোলার জন্য যে রকম সোনার মানুষ শেখ মুজিব চাইতেন, সে রকম মানুষ গড়ার জন্য, নিরক্ষরতার অভিশাপ থেকে জাতিকে মুক্ত করে সব নাগরিককে শিক্ষিত করে তোলার জন্য বঙ্গবন্ধু শিক্ষার ওপর জোর দিয়েছিলেন অনেক বেশি। তিনি চেয়েছিলেন প্রতিটি শিশুর চিত্তে বাঙালি জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র আর ধর্ম নিরপেক্ষতার সুস্পষ্ট বোধ প্রোথিত হোক, তারা সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠুক, প্রত্যেকের মধ্যে সম্পূর্ণ ব্যক্তিত্বের বিকাশ সাধিত হোক।

বঙ্গবন্ধু আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। তার শিক্ষা দর্শন আমাদের মুক্তির পথকে সুগম করেছে। বঙ্গবন্ধুর দেখানো নির্দেশনাতেই একটি সুখী সমৃদ্ধ সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে।

উপসংহার:

নিরক্ষতা ও কুসংস্কার মুক্ত একটি আদর্শ জাতি তৈরির লক্ষ্যে শিক্ষা ব্যবস্থার যে মজবুত বুনিয়াদ জাতির পিতা গঠন করেছিলেন তারই ফলস্বরুপ দেশ ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শিক্ষা সংক্রান্ত সকল বিষয়ে এদেশের জনগণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বর্তমানে শিক্ষা বিষয়ক যে কোন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় প্রাথমিক স্তর থেকে শুরু করে উচ্চ স্তরে শিক্ষার্থীদের ফলাফল অন্যান্য দেশের জন্য ঈর্ষণীয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে সুশিক্ষা প্রদানের বাতিঘর হিসেবে এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এক অনন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন বঙ্গবন্ধু। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর শিক্ষাদর্শন ও শিক্ষা ভাবনা বাংলাদেশ গঠন ও বাঙালি জাতিকে দিকনির্দেশনা প্রদানে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে। শিক্ষা-সাহিত্য, সংস্কৃতি-নেতৃত্ব প্রতিটি ক্ষেত্রেই বঙ্গবন্ধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। শিক্ষা বিষয়ক যে স্বপ্ন জাতির পিতা দেখেছিলেন তা সম্পূর্ণ রুপে বাস্তবায়ন সম্ভব হলে উন্নত দেশের তালিকায় পৌঁছে যাবে বাংলাদেশ এবং সেই উন্নতির প্রতিটি স্তরে স্বর্ণাক্ষরে লিখা থাকবে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ২০২০-২০২১ সালকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ পুরো জাতি মুজিব বর্ষ হিসেবে উদযাপন করছে। এই দুই বছরে বঙ্গবন্ধু ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্ম শত বার্ষিকী উদযাপিত হবে। এক ব্যক্তি এবং একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পৃথিবীতে কত আশ্চর্যজনক ঘটনার জন্ম দিতে পারেন বঙ্গবন্ধু ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ই তার উজ্জল উদাহরণ। বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তি শক্তি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি একটি পরাধীন বিচ্ছিন্ন জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে স্বাধীনতা এনে দিয়েছে। বাঙালিকে করেছে মরণজয়ী, অকুতোভয়, স্বাধীনচেতা। পরিশেষে একটি কথাই শ্রদ্ধানত চিত্তে বলতে চাই, বঙ্গবন্ধু ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাঙালির গৌরবের দুই উৎসবিন্দু। বঙ্গবন্ধু ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একে অন্যের পরিপূরক এবং একই চেতনা হতে উৎসারিত।

মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষে পরিসংখ্যান বিভাগ কর্তৃক আয়োজিত রচনা প্রতিযোগিতায় ২য় স্থান অধিকারী
আবু সায়েম মুহাম্মদ শাফিন (সেশন: ২০১৫-১৬)

কমেন্ট করুন
শিক্ষার্থী | পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সেশনঃ ২০১৫-২০১৬

সায়েম শাফিন

সেশনঃ ২০১৫-২০১৬

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.