নিনিথের শেষদিন(ইনকা সভ্যতা)

প্রাক কথাঃ এটি ইনকা সভ্যতার কিছু চরিত্রের অবলম্বনে গড়ে উঠা ফিকশন বা গল্প। চরিত্র গুলো সভ্যতার হলেও কাহিনী কাল্পনিক। ভিন্ন সভ্যতার হওয়ায় চরিত্রের নামগুলো অন্যরকম লাগতে পারে। তার জন্য অগ্রীম ক্ষমাপ্রার্থী। সকলের বোঝার স্বার্থে দরকারী টীকা আগেই দেয়া হলো-

১.ভিরাকোচাঃ আদিপিতা যে মহাবিশ্ব তৈরী করেছে।

২.পাচামামাঃ পৃথিবীর দেবতা

৩.ইনতি/ইন্তিঃ সূর্যের দেবতা

৪.ইল্লাপাঃ যুদ্ধের দেবতা(বজ্র,বৃষ্টি,বাতাস তার অধীনস্ত)

৫.মানকোচাপাকঃ ইনকাসভ্যতার সূচনাকারী

৬.চানাকাঃ জীবনবৃক্ষ

৭.লেক টিটিকাকাঃ পবিত্রতম জলাশয়

অতীত:

ঘটনার সূত্রপাত আদিপিতা ভিরাকোচার হাত ধরে।এ মহাবিশ্বকে সৃষ্টির পর তিনি তার সন্তানদের দায়িত্ব দেন রক্ষণাবেক্ষণের। আর তাতেই বাধে বিপত্তি। সূর্যের দায়িত্ব পাওয়া ইনতি আপত্তি জানায় দূর্বল মানব সম্প্রদায়কে রক্ষা করতে। বরং নিজের দেহ থেকে তৈরী এক বিশেষ সম্প্রদায়কে শ্রেষ্ঠ ঘোষণা করতে চাপ দিতে থাকে ভিরাকোচাকে। যুক্তি হিসেবে দেখায় একে তো মানুষ জাতি হিসেবে দূর্বল তার উপর লোভী, অকৃতজ্ঞ। তবে তাতে বাধা দেয় প্রকৃতি মাতা পাচামামা। তিনি পৃথিবীর মানবদের নিজের সন্তান বলে দাবী করেন। তখন ভিরাকোচা একটি সমাধানে আসেন।  

বছরের ঠিক সে সময়টায়, যখন পৃথিবী আর সূর্যের মাঝে হাজির হবে চাঁদ ঠিক সেসময় ইনতি আর পাচামামার একশত সন্তানের মাঝে যেকোনো একজনের সাথে যুদ্ধ হবে। যদি যুদ্ধে ইনতি হারে বা জয় অর্জন করতে ব্যর্থ হয় ওই সময়ের মাঝেই তবে সে বাধ্য হবে পরের বছরও পাচামামাকে সেবা দিতে। আর যদি জয়ী হয় ইনতি, তবে সেই সন্তানের মৃত্যুর সাথে সাথে ধ্বংস হবে বিদ্যমান সভ্যতা। তবে ইনতি যেহেতু বেশি শক্তিশালী সেহেতু একটা সুবিধা পাবে পাচামামার সন্তান। যদি পুরো সভ্যতায় একজনও সৎ,নির্লোভ লোক থাকে তবে পাচামামার সন্তান যুদ্ধে ধার পাবে যুদ্ধের দেবতা ইল্লাপার শক্তি(বৃষ্টি,বাতাস,বজ্র)। আর এভাবেই সে হারাতে পারবে ইনতিকে। তবে,হ্যাঁ যেদিন পাচামামার সর্বশেষ সন্তানও যুদ্ধে হেরে যাবে সেদিনই ধ্বংস হবে পাচামামার সাধের পৃথিবী। আর রাজত্ব শুরু হবে ইনতির। কোনো উপায় না পেয়ে রাজি হয়ে যায় পাচামামা। আর এভাবেই বারবার সভ্যতার ধ্বংস ও বিনির্মাণের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যেতে থাকে মানবসম্প্রদায়।

বর্তমান:

ইনকা সভ্যতার সূচনা করেন মানকোচাপাক। সর্বশেষ সভ্যতার পতনের পর লেক টিটিকাকার বিশুদ্ধ পানি ও মাটি থেকে মানকোচাপাককে জন্ম দেন ভিরাকোচা। চাকানা বা জীবন বৃক্ষের তলে তাকে নতুন করে দীক্ষা দেন পাচামামা। কিভাবে সভ্যতাকে কম সময়ে আবার গড়ে তুলতে হবে সব শিখিয়ে দেয়া হয় তাকে। সাথে মনে করিয়ে দেয়া হয় সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্র “সততা”। সাথে দেয়া হয় একটি বই যাতে লেখা কখন বোঝা যাবে তাদের শেষ সময় আসন্ন যাকে নাম দেয়া হয় ‘ইনকা ক্যালেন্ডার’।

       সময়ের তালে তালে জল অনেকদূর গড়িয়েছে। ইনকারা আজ সভ্যতার সর্বোচ্চ চূড়ায়। নিনিথ বর্তমানের প্রধান পুরোহিত। এই নিনিথই হুট করে খেয়াল করলেন,শেষদিনের যে হিসেব আর লক্ষণ দেয়া ছিলো তার প্রায় সবই মিলে যাচ্ছে। শুধু একটি বাদে, সৎ ও নির্লোভ লোক। রাজ্যে সৎ বা নির্লোভ লোক আছে কিনা তাতো কোনোভাবেই জানা সম্ভব নয়। তাই আজকের এই বিশাল আয়োজন। নিনিথের মন্দিরের সামনে আজ অনেক ভীড়।গুণগুণ শব্দে ভেসে আসছে ইনকাদের প্রাচীন মন্ত্রের শ্লোকঃ

“অ্যাঁ মাদিবাতি স্লোং ত্যঁ ভিরাকাওচা

          অ্যাঁ মাদিবাতি স্লোং ত্যঁ পাচামামা

                  জ্যঁ হু দুয়িত্যাম্মাসিকাং পাচামামা

                                দুয়্যত্ম্যাক্কাসি আয়কাহানিমামা ইন্তি।“

নিনিথ আকাশের দিকে তাকিয়ে বুঝলেন সময় আসন্ন। হাতের ইশারায় সবাইকে বুঝিয়ে দিলেন মন্ত্র পড়া শুরু করতে হবে যাতে আদিমাতার সন্তানকে সাহায্য করা যায়।

ঠিক দুমিনিট পর চারিদিক অন্ধকার হয়ে এলো।

রঙ্গমঞ্চের ওপাশে:

সিংহাসনে বসে আছেন ভিরাকোচা এবং পাচামামা। যুদ্ধ ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। পাচামামার সন্তান সেলুকাস আজ যুদ্ধে অংশ নিয়েছে। তবে আজ একটু চিন্তিত পাচামামা। কারণ অতীত অভিজ্ঞতায় দেখেছেন মানুষ নিজেদের সততাকে তখনই বেশি হারিয়ে ফেলে, যখন সে তার সভ্যতার শিখরের কাছে চলে যায়। “লোভ হচ্ছে তোমাদের সবথেকে পুরাতন ও বড় শত্রু” মানকোচাপাককে বলা কথা মনে পড়ে গেলো পাচামামার। তবে,বজ্রের তীব্র শব্দে সামনের দিকে চোখ ফেরালেন পাচামামা। যুদ্ধের আর মাত্র মিনিটখানেক বাকী আছে। সেলুকাস এখন পর্যন্ত ভালোই লড়ে যাচ্ছে। এই তো মাত্রই ইনতি তার বাম হাতের ইশারায় তৈরী করে ফেললো এক বিশাল ব্যাঙ। ব্যাঙটার নাম “সারিয়াখামা”। ইনতির আঙুলের তুড়ির সাথে সাথেই ব্যাঙের গলার ভেতর থেকে উগড়ে বেরিয়ে এলো গনগনে লাভা। ছুটে গেলো সেলুকাসের দিকে। প্রস্তুত ছিলেন সেলুকাস। হালকা বামে সরে গিয়েই তৈরী করে ফেললেন বজ্র আর পানির বিশাল এক সাপ ”মানহারিসা”। চোখের পলকেই লাভাসহ সারিয়াখামাকে গিলে নিলো মানহারিসা। মুহুর্তেই ইনতি হাজির করলেন “ক্রাউলি”কে। ক্রাউলি ঠিক কোন প্রাণী তা এখনো কেউ বুঝে উঠতে পারে নি। মুখটা পেঁচার মতো, তবে ঠোঁট থেকে বের হতে থাকে আগুন, নিঃশ্বাসে বের হয় কালো ধোঁয়া, চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ে রক্ত, শরীর কাকের মতো কালো এবং দেহাকৃতি পাখির ন্যায় হলেও আকারে তা বিশাল বড়। সুবিশাল স্তন্যপায়ী প্রাণি হাতিও যেন তার এক একটা আঙুলের সমান। আক্রমনের দশ সেকেন্ডেই মানহারিসাকে হারিয়ে দিলো ক্রাউলি। ঘাড়ে কামড় দিয়ে সুবিশাল পাহাড়ের আড়ালে হারিয়ে যাবার পর যখন বেড়িয়ে এলো তখন শুধু মানহারিসার চামড়াটাই দেখা যাচ্ছিল। ক্রাউলির এই ভয়ানক রূপ দেখে সেলুকাস ডাকলেন তার সর্বশ্রেষ্ঠ সৈনিক “রানতি”কে। সিংহের হিংস্রতা,নেকড়ের গতি আর হায়েনার ক্ষিপ্রতা দিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে রানতিকে। তার কাঁধ থেকে ঝুলছে বজ্রের তৈরী তীর, দুই হাতে হীরকের তৈরী ধারালো তলোয়ার, কোমরে হাঁড় হিম করা ঠান্ডা বাতাসের তৈরী বাতাসাস্ত্র। শুরু হলো দুই অদম্য, অকল্পনীয় সৃষ্টির মাঝে লড়াই। কেউ কারো থেকে কম যায় না। যুদ্ধে এক পর্যায়ে ফুরিয়ে গেলো রানতির তীর। পরাজয় সুনিশ্চিত জেনে সেলুকাসকে কুর্নিশ করে ক্রাউলিকে জড়িয়ে ধরে নরকের ভয়ানক আগুনের দিকে লাফিয়ে পড়লো রানতি। পাচামামা খেয়াল করলেন, এর মাঝেই নিজের নতুন সব সৃষ্টিকে হারিয়ে কোনঠাসা হয়ে পড়েছে ইনতি। সেলুকাস এখন কি করবে বেশ ভালোমতোই জানেন পাচামামা। বজ্র আর হাওয়ার তৈরী টর্নেডোর মাঝে বজ্র ছুটে যাবে ইনতির দিকে। একটি বজ্র থেকে জন্ম নেবে শত, সেখান থেকে হাজার, সেখান থেকে লাখে লাখে বজ্র। এভাবেই সকল লড়াই জিতে আসছে সেলুকাস। এইতো হাত উপরে তুলে সেলুকাস বজ্রকে ডাকতে শুরু করেছে। ইনতিও হাল ছেড়ে ভাগ্যকে বরণ করতে প্রস্তুত। কিন্তু একি! কোথায় হাওয়া, বজ্র, বৃষ্টি। মুহুর্তেই সব উধাও! অবাক হয়ে ইল্লাপার দিকে তাকালো সবাই। ইল্লাপা মাথা নেড়ে জানালো সর্বশেষ সৎ লোকটি এই মাত্র অনাহারে মারা গেছে। তাই শর্ত মতে ইল্লাপার শক্তি আর ব্যবহার করতে পারবে না সেলুকাস। বিপদ বুঝতে পেরে মাতা পাচামামার থেকে পাওয়া শক্তিই ব্যবহার করে চারিদিকে পাহাড় আর উদ্ভিদের আবরণ তৈরী করে ফেললো সেলুকাস। কিন্তু ইনতির প্রবল আক্রমণ শুরু হলো ঠিক তখনই। যুদ্ধ শেষ হতে ঠিক যখন ১০ সেকেন্ড বাকী তখনই ইনতি তার বুক খুলে দিলো। আর সূর্যের সকল উত্তাপ সেলুকাসের চারপাশের আবরণসহই তাকে ভস্ম করে দিলো। হাটু ভেঙে মঞ্চে পড়ে গেলেন পাচামামা। ইল্লাপা তাকালো আদিপিতা ভিরাকোচার দিকে। ভিরাকোচা একবার তাকালেন অশ্রুসজল পাচামামার দিকে। হাত তুলে বোঝালেন ইনতির জেদের কাছে তারও হাত পা বাধা। তারপর চোখের ইশারায় তান্ডব চালানোর অনুমতি দিয়ে দিলেন ইল্লাপাকে। অনুমতি পেয়েই হাওয়া, বজ্র আর বৃষ্টি কে আদেশ জানিয়ে দিলো ইল্লাপা। আর দূর থেকে ভেসে আসতে লাগলো ইনতির অট্টহাসি।

রঙ্গমঞ্চের এপাশেঃ:

স্থানঃ নিনিথের মন্দির-

    অ্যাঁ মাদিবাতি স্লোং ত্যঁ  ভিরাকাওচা

অ্যাঁ মাদিবাতি স্লোং ত্যঁ পাচামামা

   জ্যঁ হু দুয়িত্যাম্মাসিকাং পাচামামা

       দুয়্যত্ম্যাক্কাসি আয়কাহানিমামা ইনতি

শিঙার প্রচন্ড শব্দে মন্ত্র পড়া থামিয়ে দিলেন প্রধান পুরোহিত নিনিথ। এ শব্দের অর্থ জানেন তিনি। লেক টিটি কাকার পানি সর্বোচ্চ সীমা অতিক্রম করেছে। বাকী সকলে বেশ আগেই মন্ত্র পড়া থামিয়ে দিয়েছে। আকশের ঘন কালো মেঘ আর দূর থেকে ভেসে আসা ধ্বসের শব্দ তৈরী করেছে আতংক। আর্তচিৎকারে ভারী হয়ে আসছে চারপাশ। নিনিথ সামনে তাকিয়েই খেয়াল করলেন, একে একে ধ্বসে পড়ছে সব পাহাড়। খেয়াল করছেন আরো একজনও। তিনি রাজা সাথিয়াতিমাচোকা। নিনিথের উপর ভরসা করেই রাজ্য চালান তিনি। তবে এই মুহুর্তে কি করবেন বুঝে উঠতে পারছেন না। অসহায়ের মতো তাকালেন নিনিথের দিকে। পাহাড়ধস থেকে সৃষ্ট মাটির ফাটল বাড়তে বাড়তে মন্দিরের দিকেও এসে পৌঁছেছে। তার দিকেই নিনিথের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন রাজা সাথিয়াতিমাচোকা। মাথা নেড়ে নিনিথ জানালেন তার হাতে এখন আর কিছুই নেই। বিস্ফোরিত চোখে আসন্ন দূর্বিপাকে নিজেকে সঁপে দিতে প্রস্তুত হলেন প্রধান পুরোহিত নিনিথ। মাত্র ১০ মিনিটেই শুধুমাত্র একজন সৎ লোকের অভাবে ধূলিস্যাৎ হয়ে গেলো ইনকা সভ্যতা।

১০ মিনিট পর:

মাত্র ঘটে যাওয়া দূর্যোগের ফলাফলের দিকে তাকিয়ে আছেন পাচামামা। এতো যত্নে গড়া সভ্যতাকে মুহূর্তেই শেষ হয়ে যেতে দেখতে খারাপ লাগছে তার। এখন পর্যন্ত ৬০খানা সন্তান ও ৬০খানা সভ্যতাকে বিলীন হয়ে যেতে দেখেছেন তিনি। কিন্তু অভ্যস্ত হতে পারেননি। প্রতিবারই তীব্র ব্যাথায় বুক ভেঙে আসে তার। শব্দ শুনে পেছনে তাকাতেই ইনতিকে দেখতে পেলেন পাচামামা। “কি লাভ এই লোভী, অকৃতজ্ঞগুলোর জন্য নিজের সন্তানগুলোর জীবন শেষ করে! ভালো করেই জানো লোভকে হারাবার সামর্থ্য এদের নেই। তবুও কেন জেদ করে আছো?” পাচামামার পাশে এসে বললেন ইনতি। “সন্তানকে কে কি কোনো মা ফেলতে পারে? মার ধর্মই হলো তাদের রক্ষা করা। এরা সবাই আমার সন্তান, শুধু ওই ১০০জনই নয়। আর স্বাধীন ইচ্ছা আছে বলেই, লোভ এদের আজন্ম শত্রু বলেই লোভকে জয় করে এদের বেঁচে থাকা আমার এতো প্রিয়”-ইনতির দিকে তাকিয়ে ম্লান হেসে বললো পাচামামা।

“ঠিক আছে শুভকামনা রইলো। দেখা যাক তোমার পরবর্তী সভ্যতা কতদিন টিকে থাকতে পারে”, বলে উড়ে চললেন ইনতি। আর পেছনে পড়ে রইলো পাচামামা, তার সাধের পৃথিবী, আর গঠিত হতে যাওয়া নতুন কোনো মানব সভ্যতা যার আজন্ম লালিত শত্রু “লোভ”।

কমেন্ট করুন
শিক্ষার্থী | পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

প্যাপাইরাসের অনলাইন সংস্করণের ৪র্থ বর্ষপূর্তি

প্রতিযোগিতাটি শুধুমাত্র পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের জন্য