বিমানের ধ্বংসাবশেষ উদ্ধারে পরিসংখ্যানের ব্যবহার

Bayes Theorem এর উপর ভিত্তি করে Bayesian Search Theory এর ধারণা দেন আমেরিকান পরিসংখ্যানবিদ Lawrence D. Stone। কোনো হারানো বস্তু খোঁজার জন্য বিশেষ করে গভীর সমুদ্রে কোনো নৌযান বা বিমান নিখোঁজ হলে এই থিয়োরি ব্যবহার করা হয়। এই থিয়োরি প্রয়োগ করে নিখোঁজ হওয়া একটি বিমান উদ্ধারের বিস্তারিত ঘটনা আলোচনা করা হয়েছে এখানে।

২০০৯ সালের ফ্রান্সের একটি বিমান (এএফ-৪৪৭) ব্রাজিলের রিওডি জেনোরিও থেকে প্যারিস যাওয়ার পথে আটলান্টিক মহাসাগরের উপরে ঝড়ো আবহাওয়ার কবলে পড়ে নিখোঁজ হয়। দেড় বছর ধরে অনেক খোঁজাখুঁজির পর ব্যর্থ হয়ে বিমান কর্তৃপক্ষ অবশেষে একদল পরিসংখ্যানবিদের শরণাপন্ন হয়। আমেরিকার পরিসংখ্যানবিদ Lawrence Stone ও তার দল Bayesian Search Theory প্রয়োগ করে খুব অল্প সময়ে বিমানের ধ্বংসাবশেষ খুঁজে বের করেন। এ সময় Collen Keller নামক একজন ডাটা অ্যানালিস্ট তাকে বুদ্ধি পরামর্শ দিয়ে বিশেষভাবে সাহায্য করেন।

পরিসংখ্যানবিদদের দলটি প্রথমেই বিমানটির সর্বশেষ জানা অবস্থান থেকে ৪০ নটিক্যাল মাইল এলাকা চিহ্নিত করেন। এই অনুসন্ধান এলাকাকে অনেকগুলো গ্রিডে ভাগ করেন। এরপর পূর্বের তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করে প্রত্যেকটি গ্রিডে বিমানের ধ্বংসাবশেষ পাওয়ার সম্ভাবনা হিসাব নিকাশ করে বের করেন। Bayesian Method ব্যবহার করে তারা তৈরি করেছেন ধ্বংসপ্রাপ্ত বিমানের সর্বশেষ অবস্থানের Probability Distribution অর্থাৎ এটি ছিলো প্রতিটি গ্রিডে বিমানের ধ্বংসাবশেষ পাওয়ার Probability Distribution। এক্ষেত্রে Prior Information ছিলো বিমানের সর্বশেষ GPS Location, সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর বিমানটি কতটুকু যেতে পারে, ভেসে যাওয়া মৃত দেহের অবস্থান, স্রোতের দিক ও গতি ইত্যাদি।

কিন্তু এসব তথ্যের উপর ভিত্তি করে ফ্রান্সের এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ চারটি বড় ধরণের ব্যর্থ অনুসন্ধান অভিযান পরিচালনা করেন। Mr. Stone ও তার দল চিন্তা করতে লাগলেন- কীভাবে এই চারটি ব্যর্থ অভিযানের তথ্য উপাত্ত কাজে লাগানো যায় এবং তারা ধরেই নিলেন এসব স্থানে বিমান খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা কম। কিন্তু সম্ভাবনা একেবারেই বাদ দিয়ে দেননি।

এরপর তারা বিমান দুর্ঘটনার ইতিহাসের তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করে বের করলেন- কী কী কারণে বিমান দুর্ঘটনা ঘটতে পারে এবং তার সম্ভাবনা কত। তারা দেখলেন- ধ্বংসপ্রাপ্ত বিমানে Black Box বা Voice Recorder থেকে সর্বশেষ সিগন্যাল লোকেশনের আশেপাশেই ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। কিন্তু Black Box যদি কোনো সিগন্যাল প্রদান না করে থাকে তাহলে কী হবে? এ ব্যাপারটি আমলে নিতে ভুলে গিয়েছিলেন পূর্বের বিশ্লেষকগণ। এসব তথ্য উপাত্ত ভিত্তিতে পরিসংখ্যানবিদদের দলটি আগের Probability Distribution টিকে একটু সংশোধন করলেন, যাকে আমরা বলি Posterior Distribution এবং ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পাওয়ার একটি Probability Map তৈরি করলেন। যেসব গ্রিডে খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি, সেসব গ্রিডেই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অনুসন্ধান অভিযান পরিচালনা করা হবে এবং প্রতিটি ব্যর্থ অনুসন্ধানের পর Probability Distribution টিকে পুনরায় সংশোধন করা হবে বলে সিদ্ধান্ত নেয়া হলো। এখানে উল্লেখ্য যে, কোনো গ্রিডে যদি বিমান ধ্বংসের আলামত না পাওয়া যায় সেক্ষেত্রে তার আশেপাশের গ্রিডগুলোতেও ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা কম।

প্রাপ্ত Probability Map কে ভিত্তি করে পরিসংখ্যানবিদদের দলটি একটি সীমাবদ্ধ স্থানে একটি অনুসন্ধান অভিযান পরিচালনা করেন। কিন্তু সেখানে কিছুই পাওয়া গেলো না। এরপর তারা পুনরায় তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করলেন এবং দেখলেন- বিমান দুর্ঘটনার ইতিহাসে দুর্ঘটনার পর ৯০% ক্ষেত্রে Black Box সর্বশেষ সিগন্যাল দিয়েছিলো। অর্থাৎ ১০% ক্ষেত্রে না দেয়ার সম্ভাবনা আছে।

এসব তথ্যের ভিত্তিতে তারা তাদের মডেল পুনরায় সংশোধন করলেন। যেখানে পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি সেখানে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অনুসন্ধান পরিচালনা করতে লাগলেন। এভাবে অনুসন্ধান পরিচালনা করে মাত্র সাত দিনের মধ্যে বিমানের ধ্বংসাবশেষ খুঁজে বের করতে সক্ষম হলেন তারা। সেই দিনটি ছিল ২০১১ সালের ৩ এপ্রিল।

ধ্বংসপ্রাপ্ত বিমানটির ধ্বংসাবশেষ পাওয়ার আশা যখন সবাই প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন তখন পরিসংখ্যানবিদ্গণ তাদের জ্ঞান ও বিশ্লেষণ দক্ষতা দিয়ে চিহ্নিত করতে সক্ষম হলেন বিমানের ধ্বংসবশেষটি। এ প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের পরিসংখ্যানবিদদের কাছে একটি প্রশ্ন উত্থাপনের সুযোগ থেকে যায়- অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় কোনো বিমান বা জাহাজ যদি নিখোঁজ হয়, তাহলে আমরা কি আদৌ প্রস্তুত?

কমেন্ট করুন

সেশনঃ ২০০৩-২০০৪

শ্যামল আতিক

সেশনঃ ২০০৩-২০০৪

0