সমস্যা : বাঘ-শাপলা খেলা

বিদ্যাগঞ্জ হাটের পশ্চিম পাশে বাঁশতলার মেলা প্রতিবারের মতো এবারও জমে উঠেছে। আগামীকাল পহেলা বৈশাখ। আজ সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত মেলা থাকবে জমজমাট। মেলার আয়োজন গেলো বারের মতোই জাঁকজমকপূর্ণ। মুড়ি-মুড়কি-খই, লাড্ডু-মিষ্টি-জিলাপী, পুতুল নাচ, নাগরদোলা, লেইস ফিতা, খেলনা, সদাই পাতি – সব কিছুর এক বিশাল হৈ-হুল্লোড়। এর সাথে রয়েছে নানান ধরনের ম্যাজিক আর খেলার আয়োজন। দূর-দূরান্ত থেকে নানান রং বেরং-এর পসরা নিয়ে হাজির হয়েছে দোকানিরা।

তবারক মিয়া বিদ্যাগঞ্জের বাঁশতলার মেলায় আজ চৌদ্দ বছর যাবৎ বাঘ-শাপলার খেলা দেখায়। মেলায় লোকে লোকারণ্য অবস্থা দেখে তবারক মিয়ার বুকের রক্তে যেন খুশির বন্যা ডেকে যাচ্ছে আজ। মানুষকে মোহিত করার মতো সুর তবারক মিয়ার গলায় রয়েছে। সেই গলা যেন আজ আরও খোলতাই হয়েছে এই বিশাল জনারণ্যে। তবারক মিয়ার পসরার চারপাশে লোকের ভিড় জমেছে অনেক। ভিড়ের বাইরে থেকে শোনা যাচ্ছে তবারক মিয়ার কন্ঠস্বর, “উপস্থিত হাজেরানে মজলিশ, ভাই-ব্রাদার-চাচা-খালু খেলা খেলবেন অসুবিধা নাই, কিন্তু ভাই সকল, পকেট সাবধান! পকেট ভরতে খেলা খেলবেন, বেহুশ হইছেন তো পকেট খোয়াইছেন।“

“ভাইসব, তবারক মিয়া আপনাদের সামনে হাজির হইছে মজাদার বাঘ-শাপলা খেলা নিয়া। যে খেলবেন সে আওয়াজ দিবেন, যে খেলবেন না, সে পকেট সামলাইয়া খেলা দেখবেন। খেলা হইবো জবর, আপনের হইবো খবর! পকেট হইবো গরম, মনডা হইবো নরম!! একবার খেলবেন দশ টাকায়, জিইত্যা নিবেন হাজার টাকা। দশ টাকায় হাজার টাকা!”

দশ টাকায় হাজার টাকার জয় শুনে ভিড়ের মধ্যে অনেকেই হৈ হৈ করে হাত তোলে। তবারক মিয়ার বুকের রক্ত আবার চঞ্চল হয়ে উঠে। গলা যেন আরও খোলতাই হয়। “ভাইসব, খেলা শুরু হইবো এক্ষনই। নিজ নিজ পয়সা হাতে প্রস্তুত হন। খেলা শুরুর আগে খেলার নিয়ম জাইনা লন খেয়াল কইরা। এক দিকে বাঘের মাথা আর এক দিকে শাপলা ফুল এর পয়সা নিজের হাতে হাওয়ায় ছুইড়্যা মারবেন আবার হাওয়ার থেইক্যা হাতের তালুর মধ্যে লইবেন। প্রথমবার ছুইড়্যা মারা পয়সা হাতের তালুর মধ্যে ধইরা যদি পান শাপলা তাইলেই ভাই কপাল বড় হওয়া শুরু করবো আপনের। পাইবেন দুই টাকা আর পাইবেন আবার পয়সা হাওয়ায় মারোনের চান্স! কত পাইলেন, ভাইসব?”

চারদিক থেকে রোল উঠলো, “দুই টাকা, দুই টাকা, দুই টাকা।“ হা হা করে হেসে উঠে তবারক মিয়া উঁচু গলায় বলতে লাগলো, “এই যে, ভুল কইরা বসছেন ভাইজানেরা। পাইলেন বার টাকা। দুই টাকা নগদ আর দশ টাকা দামের আর একটা খেলার সুযোগ। ভুল করোন যাইবো না ভাইজানেরা। বাঘ শাপলার খেলা, পকেট ভরনের খেলা। ভুল করছেন তো পকেট খালি হইছে আপনের।“

“ভাবনার কিছু নাই, ভাই সকল। খেলা হইবো এর পর। এর পর আবার হাওয়ায় মারবেন পয়সা, হাতে ধইরা যদি পান শাপলা তাইলেই পাইবেন চাইর টাকা, আর আরও একবার পয়সা ছুড়ার সুযোগ। আরও একবার যদি হাওয়ায় মাইরা শাপলা তুলতে পারেন তাইলে পাইবেন আট টাকা, এর পরও যদি শাপলা তুলতে পারেন তাইলে পাইবেন ষোল টাকা। এমনে চলতেই থাকবো বত্রিশ টাকা, চৌষট্টি টাকা, আরও টাকা আর টাকা। তয়, ভাইসব মনে রাখতে হইবো, পয়সায় বাঘ উঠছে তো খেল্ খতম। বাঘে আপনেরেও খাইছে, আপনের পয়সারেও খাইছে। বাঘের চেহারা দেইখা ঐ দানের পয়সা নিয়া বিদায়। যদি ভাই দশ বার পয়সা মারতে পারেন,  তাইলেই পাইবেন এক হাজার চব্বিশ টাকা। দশবার পয়সা মাইরা, দশ টাকায় হাজার টাকা! কে ভাই কামাইতে চান, আওয়াজ দেন।“ এই কথা শুনে গুন গুন শুরু হলো জনতার ভিড়ে৷ একজন বলে বসলো, “তোমার তো মিয়া পয়সাই দুই নম্বর, হাওয়ায় ছুড়লেই খালি বাঘ উঠবো।“

তবারক মিয়া আবারও আওয়াজ দিয়ে উঠলো, “পয়সায় সমস্যা? কে কইলেন ভাইজান যদি একটু আওয়াজ দেন। ভাইজান, বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর। বিশ্বাস রাইখেন, হাজার টাকা জিতবেন। তবে ভাইজান, চৌদ্দ বছর ধইরা খেলা দেখাই, অনেকেই কইছে তবারক মিয়ার পয়সায় তবারক নাই। যে ভাই কইছেন, সেই ভাই নিজের পয়সায় খেলবেন। আপনের পয়সার তবারক আপনে লইবেন। আর কুনু কথা নাই। শুরু হইবো খেলা এক্ষনই। কে খেলবেন প্রথমে, চইল্যা আসেন ময়দানের মাঝখানে।“

বিদ্যাগঞ্জের ছেলে হাসান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ কল্যাণে ২য় বর্ষে পড়ে। মেলা দেখতে এসে ভিড়ের মধ্যে অনেকক্ষণ ধরেই শুনছিলো তবারক মিয়ার টাকা বানানোর খেলার কথা। হাসান ভাবলো এভাবে সবাইকে দশ টাকার বিনিময়ে টাকা দিতে থাকলে এই ব্যাটা তো ফতুর হয়ে যাবে! কিন্তু যদি তাই হয় তবে তবারক মিয়া চৌদ্দ বছর যাবৎ টিকে আছে কী করে এই খেলা দেখিয়ে? হাসান চিন্তা করতে থাকলো। চিন্তা করতে করতেই হাসান ভাবলো ছোট মামাকে জিজ্ঞেস করতে হবে। হাসানের ছোট মামা পরিসংখ্যানের ছাত্র ছিলেন।

পাঠকদের কাছে আমাদের প্রশ্ন – তবারক মিয়া কেন এই খেলা দেখিয়ে এখনও ফতুর হয়নি? তবারক মিয়ার পয়সায় কোনো সমস্যা নেই, কোনো ধরনের কৌশলও নেই, আছে শুধু একটি হিসাব কী সেই হিসাব?

সমাধান দেখুন
কমেন্ট করুন