মুক্তি মেটার্নিটি ক্লিনিক

(১)

আগারগাঁ কলোনীর ছয় নম্বর গলির মুখে দাঁড়িয়ে আছে বজলুল।

সে বেশ জটিল এক ঝামেলার মধ্যে আছে। তার মত এমন চালাক একটা লোক এইরকম একটা জঘন্য ঝামেলার ভিতরে পড়ে যাবে এটা সে কখনোই ভাবে নাই। কয়েকদিন ধরে এই ঝামেলা তারে ভিতর ভিতর খুন করে ফেলতেছে। “ধুত্তোরি” বলার পর বেশ অশ্লীল একটা গালি দিয়ে বাম হাত দিয়ে নিজেই নিজের চুলের মুঠিধরে হ্যাচকা একটা টান মারে। নিজেরে নিজে বিশ্বাস করতে পারে না সে।

পকেট থেকে গোল্ডলিফ সিগারেটের একটা প্যাকেট বের করে বজলুল। সিগারেটের গায়ে বিভৎস একটা ছবি। সাথে সাথে বজলুল প্যাকেটটা ঘুরিয়ে ধরে ভেতর থেকে একটা সিগারেট বের করে। মনে মনে সিগারেট কোম্পানীগুলোর গুষ্টি উদ্ধার করতে থাকে সে। সিগারেটের প্যাকেটে এরকম ছবি দিয়ে পাবলিককে ভয় ধরানোর কোনো মানে আছে? যারা খাওয়ার তারা তো এমনেও খাবে, অমনেও খাবে। তবে ইদানিং সিগারেটের গায়ে শ্বাসকষ্টের ছবি বেশি দেখতে পাওয়া যায়। তাতে অবশ্য সিগারেট খেতে গেলে একটু আরাম পাওয়া যায়। বেশ ইনোসেন্ট ইনোসেন্ট একটা ফিল আছে ছবিটায়।

লাইটার বের করার জন্য পকেটে হাত দিয়ে বজলুল দেখে পকেটে লাইটার নেই। নিশ্চয়ই ফরিদের বাসায় ফেলে এসেছে সে। ফেলে আসাটা বললে ভুল হবে। ফরিদ বোধহয় ইচ্ছে করেই লাইটারটা রেখে দিয়েছে। ফরিদের লাইটার রেখে দেয়ার এমন অভ্যাস পুরনো। তার বাসায় লাইটার নিয়ে ফেরত আনা মোটামুটি যমের কাছ থেকে জান নিয়ে ফিরে আসার মতই অসাধ্য। কয়েক মাস আগে ফরিদের উপর এহেন সন্দেহের কারণে তার বাসা সার্চ করার পর ড্রয়ারের ভেতর থেকে তেইশটা লাইটার বের হয়েছে। ফরিদকে জিজ্ঞাসা করা হলে ফরিদ উদাসীন ভঙ্গিতে অন্যদিকে তাকিয়ে গুনগুন করে গান গাইছিল। যেন লাইটার সংক্রান্ত কোন ব্যাপার তার জানার কথা না।

বজলুল পাশের টং দোকানের দিকে হাঁটা দেয়।

টং দোকানের ঝাপের কাঠ থেকে সুতা দিয়ে ঝুলানো একটা লাইটার ঝুলছে। ঢাকা শহরে এই জিনিসটা দেখতে পাওয়া যায়। লাইটার ঝুলানো আছে, সিগারেট ধরাতে কোন পয়সা লাগে না।

বজলুলকে বেশ কসরত করে সিগারেট ধরাতে হল। লাইটারটা এত ছোট একটা সুতা দিয়ে বাঁধা ছিল যে, পায়ের বুড়ো আঙুলের উপর ভর দিয়ে হালকা করে শরীরটা বাঁকিয়ে তাকে সিগারেট ধরাতে হলো। বজলুল এতে আবার বিরক্ত হলো।

“এরচে’ তোর কোলের মইধ্যে লাইটার বাইন্ধা রাখতি… হালার পো”-বলে গজগজ করতে করতে দু’কদম সামনে এগিয়ে আসে সে। লম্বা একটা টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বজলুল তার পরবর্তী কর্মপরিকল্পনা নিয়ে ভাবতে থাকে।     

তার মাথায় দুনিয়ার টেনশন। ভাল্লাগতেছে না। একটা নেড়ি কুত্তা কিছুক্ষণ ধরেই তার পায়ের কাছে ঘুরঘুর করছিল। বিরক্ত বজলুল তীক্ষ্ণ চোখে কুত্তাটার দিকে তাকায়।

“শালা কুত্তার বাচ্চা! তুইও দেখি মাইয়াগো লাহান। পিছ ছাড়স না। আমি সিগ্রেট খাই। সিগ্রেট খাবি হালার পো?” বলেই বাম পা দিয়ে কষে একটা লাত্থি দেয় কুত্তাটার পেট বরাবর। কুঁই কুঁই করতে করতে কুত্তাটা দৌঁড় মারে।

দ্রুত সিগারেটে টান দিতে থাকে সে। পারুল আসবে কিছুক্ষণের মধ্যেই।

উদ্দেশ্য- মিরপুর ১২।

(২)

রিকশা চলছে। একটা বয়স্ক রিকশাওয়ালা রিকশা চালাচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই খুব দ্রুত গতিতে রিকশা যাচ্ছে না। বজলুল তৃতীয় বারের মত বিরক্ত হচ্ছে। বিরক্তি দমাতে না পেরে বজলুল জোরে রিকশাওয়ালাকে ডেকে বলে-

বুড়া মিয়া, জোরে চালান। এইভাবে চালাইলে তো রাইত দশটা বাজবো!

জোরে চালাইতাম হারি না গো বাজান। শইল্যে জুর নাই।

রিকশাওয়াালা জবাব দেয়। তার শরীরে যে জোর নেই- এটা দেখেই বুঝা যায়। বজলুল কিছু বলতে গিয়ে থেমে যায়। “শইল্যে জুর নাই, তো রিকশা চালাস ক্যান ব্যাটা?” মনে মনে রিকশাওয়ালাকে বলতে বলতে ‘থুঃ’ করে একদলা থুতু ফেলে সে।

অনেকক্ষণ ধরেই পাশে বসে বারবার চোখ মুছছে পারুল। বজলুল তার দিকে তাকিয়ে প্রায় ধমকের সুরে বলে উঠে-

ফ্যাচফ্যাচ কইরা কাইন্দো না তো! মেয়েমানুষের এই এক ঝামেলা। কথা নাই, বার্তা নাই। কিছু একটা হইলেই ফ্যাচফ্যাচ ফ্যাচফ্যাচ। চুপ করো।

পারুল কান্নার গতি কমালেও চুপ থাকতে পারে না। দ্বিধা, ভয় আর শঙ্কামিশ্রিত কন্ঠে বজলুলের দিকে তাকিয়ে বলে-

তোমার দুইডা পায়ে পরি। এতবড় নিষ্ঠুর হইও না। চল আমরা ফিরা যাই।

চুপ থাক। আর একটা কথাও কইবি না। আমার টাইম শট। রাইতে আমার টিপ আছে। 

গজগজ করতে করতে বজলুল পারুলকে থামিয়ে দেয়। বজলুল পেশায় ড্রাইভার। ভাড়ায় মাইক্রো চালায় সে। কলোনীতেই একটা একতলা বাসায় ভাড়া থাকে। পাশাপাশি এলাকার লোকাল ছেলেপেলেদের সাথে বেশ ভাল খাতির। একসাথে বসে। মদ-তামাক খায়। পারুলের সাথে পরিচয় হঠাৎ করেই। পারুল কাছের এক গার্মেন্টেসে কোয়ালিটি কন্ট্রোল করে।

বজলুলের আর এইসব ভাল্লাগে না। পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে আরেকটা সিগারেট ধরাতে গিয়ে মনে পড়ে লাইটার নাই। রিকশাওয়ালাকে জিজ্ঞেস করে-

বুড়া মিয়া, লাইটার আছে নি?

বৃদ্ধ রিকশাওয়ালা টানতে টানতে জবাব দেয়-

বিড়ি খাওন বাদ দিছি। শ্ইল্যে জুর নাই।

বিরক্তিতে কিড়মিড় করতে করতে বজলুল হাতের সিগারেটটা দূরে ছুড়ে ফেলে দেয়। পারুল আবার কাঁদছে। বজলুল আর ওর দিকে তাকায় না। দূরে তাকিয়ে থাকে। কাঁদুক। মেয়েমানুষ আর বাচ্চা পোলাপানরা এক। যত না করা হবে, তত সেটা করবে। কাঁদুক হারামজাদী। 

রিকশা প্রায় মিরপুর দশ নম্বর গোল চত্বরের কাছাকাছি এসে পড়েছে। পাশের ইলেক্ট্রনিক্সের দোকান থেকে স্পিকারে গান ভেসে আসে-

“হয় যদি বদনাম হোক আরো

আমি তো এখন আর নই কারো…”

(৩)

মিরপুর ১২। মুক্তি মেটার্নিটি ক্লিনিকের তিন তলায় বজলুল আর পারুল বসা। তাদের সামনে একজন ডাক্তার। সুদর্শন। বয়স অল্প। তবে অল্প বয়সে মাথায় টাক পড়ে গেছে। ডাক্তার পারুলকে নানাকিছু জিজ্ঞেস করছেন। পারুল কিছু বলতে পারছে না। এখনো ফুঁপিয়ে কেঁদে যাচ্ছে সে। বজলুলই প্রায় সব প্রশ্নের জবাব দিচ্ছে।

উনি আপনার কী হয়?

আমরা স্বামী-স্ত্রী।

অ্যাবরশন করাবেন কেন?

আয়-ইনকাম কম। দুইজনেরই চলে না। সেইখানে তিনজনের ক্যামনে!

কিন্তু, আপনার স্ত্রীকে দেখে তো মনে হচ্ছে উনি সন্তানটা চান। আপনারা আবার ভেবে দেখেন।

ভাবাভাবির কিছু নাই। অয় তো আসমানের চানও চায়। পারবেন আইনা দিতে? বেশি কথার কাম নাই ডাক্তার সাব। ঘটনা ঘটায়ে ফেলেন, বিদায় হই।

ওকে। ফর্মটা ফিলাপ করার পর ওনাকে নার্স নিয়ে যাবেন। পাশের রুমে তার ব্লাড টেস্ট করা হবে। এক ঘন্টা পর অপারেশন শুরু হবে।

ডাক্তার উঠে চলে যায়। বজলুল ফর্ম ফিলাপ করতে থাকে। কাঁদতে কাঁদতে শাড়ির আঁচল ভিজিয়ে ফেলা পারুল শেষবারের মতো বজলুলকে ফিসফিস করে অনুনয় করে-

আমার প্যাটে তোমার বাচ্চা। তুমি একটু দয়া করো। আমি ওরে যত কষ্টই হোক, আগলায়া রাখুম। ওরে তুমি মাইরো না। 

বেশি কথা কইবি না। চুপ কর বান্দী।

তুমি আমারে কথা দিছিলা আমারে বিয়া করবা। আমি সব হারাইলে মইরা যামু। আমি তোমার সব কথা শুনমু। আমি…

চোপ। একদম চোপ।

চোখ দুটো বিস্ফাারিত করে পারুলকে থামিয়ে দেয় বজলুল। ফর্মফিলাপ শেষে নার্স এসে পারুলকে নিয়ে যায়। যাবার সময়ও পারুল বজলুলের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। এতদিনের চেনা একজন মানুষ হঠাৎ অচেনা হলে কেমন দেখায় তা বোধহয় দেখতে চেষ্টা করে পারুল। অন্যরুমে ঢুকে পড়ে সে। একটা অবিশ্বাস আর ভুলের সরলরৈখিক দ্বন্দের মাঝে তার মন ঘুরপাক খায়। আশেপাশের বেডে শুয়ে আছে অনেকেই। কেউ কেউ মা হয়েছে, কেউ কেউ প্রচন্ড যন্ত্রণা নিয়ে মা হবার আনন্দের অপেক্ষায়। পারুল কারো দিকে তাকাতে পারে না। এক ধরণের চাপা যন্ত্রণায় সে নিশ্চুপ হয়ে আছে। তাকে যে বেডে নিয়ে বসানো হলো, তার পাশের বেডে এক নারীর বুকের কাছে একটা নবজাত শিশু। দুধ খেতে খেতে ছোট্ট হাতে মায়ের এক আঙুল ধরে আছে।

পারুল সেদিকে তাকিয়ে আর সহ্য করতে পারে না। হুহু করে কেঁদে ফেলে সে।

(৪)

মুক্তি মেটার্নিটির বাইরে একটা চায়ের দোকানে বসে সিগারেট খাচ্ছে বজলুল। পারুলের সাথে এই ঝামেলাটা কবে হইলো ঠিক মনে করতে পারে না সে। যেমন মনে করতে পারে না পারুলের সাথে তার দেখা হওয়াটাও।

“ক্যান যে ওর উপ্রে বিশ্বাস রাখছিলাম। শালা!” বলে আবার সিগারেটে টান দেয়।

“ফরিদা, আল্পনা বা কুলসুমের সাথেও তো প্রেম ভালবাসা হইছে। এই ঝামেলা তো হয় নাই কখনো। শালা, আমার মতো ঘাঘু একটা লোকরেও বুকা বানায় দিলো। যাকগা, ঝামেলা শ্যাষ হইতেছে এইটাই শান্তি। এরপর ফোন নম্বর আর বাসা পুরা চেইঞ্জ কইরা লগে লগে আমিও চেইঞ্জ। যাহ শালা! এত নাটক ভাল্লাগে না।”

নিজের মনে বলতে বলতে কার যেন ফোন আসে। কল রিসিভ করেই বজলুল একটু সাইডে এসে বলতে থাকে-

আর বলিস না। মিজাজ খারাপ খুব। টেনশন লাগতেসে। ঝামেলা খালাস কইরা তোরে ফোন দিতেছি। কিছু মাল রেডি রাখিস। মন-মিজাজ ভালো না।

ফোন রেখে সামনের ফুট ওভারব্রিজের দিকে তাকায় সে। মানুষজন তাদের প্রাত্যহিক ব্যস্ততায় উঠছে, নামছে। কারো কারো ব্যস্ততা খুব একটা নেই বলে কোথাও থামছে। কয়েকটা ফকির সুর করে ভিক্ষা করছে। একটা বাচ্চার কান্নার আওয়াজ কানে আসছে। দুজন কমবয়সী ছেলেমেয়ে ওভারব্রিজের রেলিংয়ে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে গল্প করছে। ওভারব্রিজ লাগোয়া একটা বিশাল বিলবোর্ড। বাচ্চাদের ডায়াপারের বিজ্ঞাপন। একটা হাসিখুশি বাচ্চা মায়ের দিকে তাকিয়ে আছে।

বজলুলের অস্থির লাগে। টেনশনে তার মাথার শিরাটা দপদপ করে জ্বলতে থাকে। বজলুলের কী যেন হয়ে যায় হঠাৎ। একমুহূর্ত সেদিকে অপলক তাকিয়ে থাকে। এরপর তড়াক করে উঠে দাঁড়ায়। হাতের সিগারেটটা ছুঁড়ে ফেলে দেয়। তারপর দ্রুতপায়ে সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠতে থাকে। হুড়মুড় করে ব্লাড সেকশনে ঢুকে দেখে পারুল বসে আছে বেডের উপর। সামনের দিকে উদাস তাকিয়ে আছে। ফ্যাকাশে দৃষ্টি। যেন পৃথিবীর কোন কিছুই তাকে আর আকৃষ্ট করছে না।

বজলুল দৌঁড়ে গিয়ে তার হাতটা খপ করে ধরে হ্যাচকা টানে দাঁড় করায়। কোন কিছু বুঝে উঠার আগেই পারুলকে নিয়ে হাঁটা দেয়। সিঁড়ি ভেঙে নামতে থাকে দ্রুতপায়ে। বাইরে বের হবার পর হতবাক পারুল কিছু বুঝতে পারে না। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থেকে কাঁপাকাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করে-

এইভাবে কই লইয়া যাও?

কাজী অফিস।

বলে পারুলের হাত নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরে হাঁটতে থাকে বজলুল। ঘোরলাগা বিস্ময় নিয়ে পারুল বজলুলের পায়ের সাথে পা মিলিয়ে হাঁটতে থাকে। তার পা কাঁপছে। 

সেই ইলেক্ট্রনিক্সের দোকানটা পার হবার সময় ওরা শুনতে পায় স্পিকারে অপরিচিত গলায় কে যেন গাইছে-

“আমার হাঁটুজলে

স্মৃতিরা ভেসে চলে

জীবন কথা বলেবাকিরা চুপ…”

কমেন্ট করুন
প্রাক্তন শিক্ষার্থী | পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সেশন: ২০০৭ - ২০০৮

মানিক মাহ্‌মুদ

সেশন: ২০০৭ - ২০০৮