ম্যারাথন দৌড়

মানুষ কেন ম্যারাথন দৌড়ায়?

এই সহজ ছোট একটা প্রশ্নের উত্তর খুজতে গুগল করে দিস্তার পর দিস্তা পড়ে ফেলা যায়। যারা দৌড়েছেন তারা নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা, চড়াই উৎরাই পেড়িয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে যাবার কথা লিখেছেন ,বলেছেন। কিন্তু কোন কিছুই যেন উত্তরটা দিতে পারছে না। কেন এত লম্বা দূরত্ব দৌড়াতে হবে? স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য নিয়মিত ৫-১০ কিলোমিটার দৌড়ালেই আর কিছু ইনটেনস এক্সারসাইজ করলেই হচ্ছে, এর বেশি দৌড়াবার খুব একটা প্রয়োজন পড়ছে না, তবে কেন ৪২ কিলোমিটার টানা দৌড়ানো?

গ্রীক ইতিহাস মতে, গ্রীস খ্রীষ্টপূর্ব ৪৯০সালে পার্সিয়ানদের সাথে যুদ্ধ জয়ের পর সে সংবাদ গ্রীসের ম্যারাথন নামক শহর থেকে এথেন্সে পৌঁছানোর দায়িত্ব এসে পড়ে পিডিপিডীস নামক এক গ্রীক সৈন্যের কাঁধে, যে ম্যারাথন শহর থেকে এথেন্সে দৌড়ে গিয়ে যুদ্ধ জয়ের সংবাদ পৌছে দিয়েই মারা যান। সে থেকে এই দূরত্বের পায়ে দৌড়ানো রেইসকে বলে ম্যারাথন। প্রথম যে রেইসটা আয়োজন করা হয় সেখানে ২৫জন অংশগ্রহণ করেন এবং মাত্র ৯জন দৌড়বিদ পুরো দূরত্বটা অতিক্রম করেন। তার মানে বোঝা যায় এই দূরত্ব দৌড়ানো সহজ কিছু নয়। তবু কেন মানুষ ম্যারাথন দৌড়াচ্ছে?

প্রতিযোগিতাপূর্ণ খেলার নিয়মই হচ্ছে এখানে কেউ না কেউ চ্যাম্পিয়ন হয় এবং সবাই চায় সে খেলায় জিততে। ম্যারাথন যদি একটা দৌড়ের খেলাই হয়ে থাকে, তবে এর মধ্যে কেউ না কেউ চ্যাম্পিয়ন হবে। আমি অত বড় মাপের দৌড়বিদ নই। আমার মত অসংখ্য দৌড়বিদ আছেন যারা নিজের পকেটের পয়সা খরচ করে এই দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছেন, তারা সকলেই জানেন রেইসে প্রথম তিনি হবেন না, তবুও কেন দৌড়াচ্ছেন? নিশ্চিত পরাজয় জেনেও কেন দৌড়ানোর জন্য এত টাকা, শ্রম ও সময় নষ্ট করছেন?

আমি দৌড়াই ২০১৬ সালের জুলাই মাস থেকে। দৌড়াই বললে ভুল হবে, বলা ভাল দ্রুত গতিতে হাঁটা শুরু করি। প্রথম দিকে দৌড়ানোটাকে শরীরের বাড়তি মেদ কমানোর মাধ্যম হিসেবে নিই। ২০১৭ সাল আসতে আসতে একটা সময় খেয়াল করলাম, আমি দৌড়াচ্ছি আনন্দে। দৌড়াতে ভাল লাগছে। যখন দৌড়াই তখন নিজেকে খুব স্বাধীন লাগছে, একটা অন্যরকম স্বাধীনতা। সম্ভবত আমাদের পূর্বপুরুষেরা যখন খাদ্যের সন্ধানে বা বন্য প্রাণি থেকে নিজেদের রক্ষা করতে দৌড়াতেন তখনও এমন স্বাধীনতা অনুভব করতেন। কে জানে? নিয়ম করে দৌড়াচ্ছি। যখন মন খারাপ তখন দৌড়াচ্ছি, মাথা কাজ করছে না তখন দৌড়াচ্ছি, একটা লম্বা দৌড় দিয়ে আসলে সব ঠিক হয়ে যাচ্ছে। প্রায় সবগুলো দৌড়ই ৫-১০ কিলোমিটার দূরত্বের। আনন্দ পাচ্ছি, সুস্থ আছি।

দৌড়ানোর এই যাত্রায় বিডিরানার্স নামে ফেইসবুক কেন্দ্রিক একটা গ্রুপের সাথে পরিচয় হয়। বাংলাদেশি দৌড়পাগল একটা গ্রুপ; যেখানে মানুষ নিজেদের দৌড় নিয়ে আলাপ করছে, সপ্তাহান্তে কারণে অকারণে হাতিরঝিল রমনাপার্কের মত জায়গাগুলোয় ভোরবেলা উঠে একসাথে দৌড়াচ্ছে, কেউবা দেশের বাইরে যেখাছে বসবাস করছেন সেখানেই দৌড়াচ্ছেন, ফেইসবুকের এই গ্রুপটায় এসে সবাই আলাপ করছেন, ছবি শেয়ার করছেন, নিজেদের মধ্যে একটা অন্যরকম দৌড়কেন্দ্রিক সম্পর্ক গড়ে তুলছেন। সেখানেরই কিছু লোককে দেখছি দেশের বাইরে গিয়ে ম্যারাথন (৪২.২কিলোমিটার বা ২৬.২ মাইল) দৌড়াচ্ছেন, কেউ কোলকাতায়, কেউবা লাদাখে গিয়ে দৌড়াচ্ছেন। উনারা আমার মতই সাধারণ মানুষ। নিজের পয়সা খরচ করে বিদেশে যাচ্ছেন শুধু দৌড়াতে, কিন্তু কেউওই প্রথম হচ্ছেন না, উনারা সকলে মোটাদাগে জানেন কেউ চ্যাম্পিয়ন খেতাব নিয়ে ঘরে ফিরবেন না, তবু যাচ্ছেন। যদি প্রথম হওয়াই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করার কারণ না হয়ে থাকে তবে আসল কারণটা কী?

ল্যাক্সিংটনে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশেই একটা রানিং গ্রুপ আছে। নাম জন’স স্ট্রাইডার্স। এই গ্রুপটার সাথে দৌড়াতে দৌড়াতে খেয়াল করলাম সত্তরোর্ধ সুজান নামক নারী দৌড়বিদ কোনমতে হেঁটে-দৌড়ে ম্যারাথন দূরত্ব অতিক্রম করছেন, ডেইল বাটনার নামক একজন লাইব্রেরিয়ান আছেন যিনি পণ করেছেন আমেরিকার ৫০টা স্টেইটের প্রতিটায় ম্যারাথন দৌড়াবেন, এ পর্যন্ত ২৮টা স্টেইটে দৌড়েও ফেলেছেন। মেলডি মার্শাল নামক একজন ব্যবসায়ী নারী দৌড়বিদ আছেন যিনি ৫৪বছর বয়সে প্রথম ম্যারাথন দৌড়েছেন এবং প্রতিযোগিতা শেষেই পণ করেছেন উনি আরো অনেকগুলো ম্যারাথন দৌড়াবেন। উনাদের কেউই প্রথম হচ্ছেন না, হবেনও না। কিন্তু কেন তবে এই নেশা?

উনাদেরকে দেখতে দেখতেই এবং নিজের অজানা প্রশ্নের উত্তর জানতে কবে যেন রেজিস্ট্রেশন করে ফেললাম ফ্লাইং পিগ নামক সিনসিনাতি শহর কেন্দ্রিক একটা ম্যারাথন প্রতিযোগিতার। ডিসেম্বর ২০১৮তে খেয়াল করলাম আর মাত্র ৫ মাস বাকি। মে মাসের ৫ তারিখের দৌড়ে অংশগ্রহণের প্রস্তুতি নেয়ার সময় হয়ে গেছে।

দৌড়ের প্রস্তুতির জন্য একটা ট্রেইনিং প্ল্যান তৈরি করে ফেললাম। সে মতে ক’দিন দৌড়ে খেয়াল করলাম নানান ধরনের ব্যথায় কাতর হয়ে যাচ্ছি। এর আগে সর্বোচ্চ দূরত্ব দৌড়েছি ২১কিলোমিটার। ২১এর বেশি যখনই দৌড়াতে যাচ্ছি তখনই পায়ের মাসল থেকে সারা শরীর কেমন অস্বাভাবিক ব্যথা করছে। এই ব্যথাকে অতিক্রম করতে অভিজ্ঞ দৌড়বিদদের নানান টোটকা মেনে চলছি, আবার দৌড়ানোর চেষ্টা করছি। এর মাঝে ১০দিনের মত জ্বরে ভুগে, ১৫দিনের মত পায়ের পাতার মাসলে ব্যথা এবং পড়ালেখার অমানসিক চাপে পড়ে খেয়াল করলাম যে প্ল্যান করেছিলাম তার কিছুই হচ্ছে না। তবুও দৌড়াতে যে হবেই। ৮০০০টাকা দিয়ে প্রতিযোগিতায় নাম লিখিয়েছি, দৌড় শুরু করার আগেই হেরে যাবার জন্য তো নয়!

মে মাসের ৫তারিখ যত এগিয়ে আসে বুকে অজানা ভয় ততই দানা বাঁধতে থাকে, আর মনেহয়, যদি পুরোটা শেষ না করতে পারি? যদি ব্যথা পেয়ে বা অন্য কোন কারণে থেমে যাই, যদি নিজের মনমত পারফরমেন্স না করতে পারি? এই যদির চক্র থেকে বেরুতে পারছি না। তবু দৌড়াতে যে হবেই।

৪ তারিখ রাতে সিনসিনাতি পৌছে পরের দিন দৌড়ের নিয়মকানুন জেনে ও সরঞ্জামাদি সংগ্রহ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের মাহি ভাইয়ের বাসায় উঠলাম। মাহি ভাই সিনিসিনাতি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করছেন। রাতটা এখানেই কাটাতে হবে। মাহি ভাইয়ের একরুমের বাসায় উনার শোবার ঘরটা আমার ও প্রভাতির জন্য ছেড়ে দিয়ে ভাবিকে নিয়ে বসার ঘরের মেঝেতে গিয়ে শুলেন। উনাদের বাসায় পাওয়া আপ্যায়ন ও আন্তরিকতা দেখে আমার নিজেকে খুব ছোট মনে হচ্ছে। বড় ভাইয়ের বাসায় আসলাম, উনি আমার জন্য নিজের শোবার ঘর পর্যন্ত ছেড়ে দিয়েছেন, ভাবতেই কেমন শ্রদ্ধায় মাথানত হয়ে যাচ্ছে। ৫ তারিখ ভোর সাড়ে চারটায় আমাকে ডেকে তুলেছেন, আগের রাতেই আমার কাছ থেকে জেনে রেখেছেন আমি দৌড়ের আগে কী ধরনের খাবার খাব। আমার পছন্দমত সেই খাবার প্রস্তুত করে রেখেছেন এই কাকডাকা অন্ধকার ভোরে। ভাবা যায়!

মাহি ভাইয়ের বাসা থেকে ওটমিল, দুধ আর খেজুর খেয়ে আমি আর প্রভাতি রওয়ানা দিলাম রেইসের স্টার্ট লাইনের দিকে। সিনিসিনাতির অলিগলি তখন দৌড়বিদদের আনাগোনায় উৎসবমুখর। আমরাও দৌড়বিদদের স্রোতে ঢুকে গেলাম। চারপাশে সব দৌড়বিদদের দেখে, তাদের সাথে মিনিট পাঁচেক হাঁটার পরই লক্ষ করছি আমার মধ্যে এড্রেনালিন রাশ তৈরী হচ্ছে, খুব উত্তেজনা বোধ করছি। দৌড়বিদদের স্রোত ধরেই এসে পড়ছি স্টার্ট লাইনের সামনে। প্রথমে আমেরিকার জাতীয় সঙ্গীত এবং পরবর্তীতে ওহায়ো স্টেইটের সঙ্গীত গাওয়া হলো। আমি প্রভাতিকে বিদায় জানিয়ে দৌড় শুরুর নির্ধারিত স্থানে গিয়ে সবার মাঝে দাঁড়ালাম, চারপাশ থেকে দৌড়ের উত্তেজনা ও আনন্দ যেন আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আমি উপভোগ করছি প্রতিটা মূহুর্ত।

এতদিন যে ভয় ও যদিগুলো কাজ করছিল সেগুলো এখন আর আমাকে ভাবাচ্ছে না। সব ভুলে গেছি, আমার জন্য এখন এই মূহুর্তটাই সত্য। ৪০ হাজার মানুষ আমার সামনে পিছনে, সবার কাছ থেকে এক ধরনের ভরসা পাচ্ছি, মনে হচ্ছে আমরা সকলেই এক, সকলেই সমান।

দৌড়বিদদের ছয়টা কোরালে ভাগ করা। প্রথমে এলিট রানাররা শুরু করবেন, এরপর সাধারণ দৌড়বিদদের প্রথম কোরাল, দ্বিতীয় কোরাল এভাবে ছয়টা কোরালে থাকা দৌড়বিদেরা দৌড় শুরু করবেন। প্রত্যেক দৌড়বিদের জন্য একটা নির্দিষ্ট নম্বর আছে যা শার্টে ঝুলিয়ে রাখতে হয়, সেই নম্বর যে কাগজে লেখা তাতে একটা ইলেক্ট্রনিক ট্র্যাকিং চিপ আছে, যা দিয়ে প্রত্যেকের দৌড় ট্র্যাক করা হবে। তাই কোন দৌড়বিদ যখন থেকে দৌড়ানো শুরু করবেন, তার নিজস্ব সময় ঠিক তখন থেকে শুরু হবে।

আমি তিননম্বর কোরালে দৌড় শুরু করেছি। শুরুর বাঁশি বেজে গেছে, চারপাশে আনন্দ ও উত্তেজনা এখন স্রোতের মত এগিয়ে যাচ্ছে। স্টার্ট লাইন পার করে দৌড় শুরু করেছি। চারপাশে মুহুর্মুহু তালি বাজছে, কেউ ঘণ্টা বাজাচ্ছে, কেউ তার পরিচিত জনকে চিৎকার করে উৎসাহ দিচ্ছে, শুভ কামনা জানাচ্ছে। এ এক অন্যরকম আয়োজন ও অনুভূতি।

দৌড় শুরুর পর সময় খুব দ্রুত চলে যাচ্ছে, সিনসিনাতি রিভারফ্রন্ট পার্ক থেকে দৌড় শুরু হয়ে ওহায়ো আর কেন্টাকির সংযোগ ঝুলন্ত সেতুর উপর দিয়ে দৌড়াচ্ছি। চারপাশে সবাই যে গতিতে দৌড়াচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে সবাই একটা ঢেউয়ের অংশ, আমরা সবাই মিলে এক সাগর তৈরী করেছি, আনন্দ ও উৎসবের সাগর।

প্রথম মাইল মার্ক পার করলাম, খুব ভাল বোধ করছি। পা খুব ফ্রেশ আছে, শরীর ধীরে ধীরে গরম হচ্ছে। প্রথম তিনমাইল টের পাইনি দৌড়াচ্ছি, মনে হচ্ছিল সবার সাথে আমি ভেসে বেরাচ্ছি। তিনমাইল পর প্রথমে লক্ষ্য করলাম আমার এবডমিনাল মাসলে কেমন ব্যথা হচ্ছে, বুঝতে পারছি আমার যে গতিতে দৌড়ানোর কথা তার চেয়ে দ্রুত দৌড়াচ্ছি যা পুরো রেইস এর জন্য শুভ কোন লক্ষণ নয়। গতি কমাতে হবে। সকালে উত্তেজনায় খুব একটা নাস্তা করা যায় নি, আর ওদিকে টয়লেটও চেপেছে ভাল। তিনমাইল মার্ক পার হয়ে রাস্তার পাশে পোর্টেবল টয়লেটে প্রয়োজনীয় কাজ জলদি সেরে আবার দৌড় শুরু করলাম।

সিনিসিনাতি ডাউনটাউনের মধ্যে দিয়ে দৌড়াচ্ছি। রাস্তার চারপাশে বাচ্চারা হাত বাড়িয়ে দিয়ে আছে, আমি তাদের সবাইকে হাইফাইভ দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি, যতবার হাইফাইভ দিচ্ছি মনে হচ্ছে আমার শক্তি আরো বেড়ে যাচ্ছে। ভেতরে একধরনের তৃপ্তি অনুভব করছি।

প্রথমবার ম্যারাথন দৌড়াচ্ছি। আমার বুকে যে নাম্বার ঝুলানো সেখানে লেখা First Time Marathon Runner. এই লেখা দেখে সম্পূর্ন অপরিচিত কেউ কেউ জোরে চিৎকার জন্য আমাকে শুভ কামনা জানাচ্ছেন। আমি তাঁদের ধন্যবাদ জানিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। নিজেকে খুব গুরুত্বপূর্ণ ও অপরাজিত একজন মনে হচ্ছে।

ততক্ষণে প্রায় ১০ মাইল পার করে এসেছি। এখনো খুব ভাল বোধ করছি। পায়ে কিছুদিন আগেও যে ব্যথাটা ছিল সেটা আর নেই, হয়ত ব্যথাটা আছে কিন্তু খুব একটা বোধ করছি না কিছু। প্রতি মাইল পরপর পানির স্টেশন আছে। দলবেঁধে বিভিন্ন স্কুল, ইউনিভার্সিটি, বৃদ্ধাশ্রম, হসপিটাল থেকে সবাই নানান সাজে এসে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে পানির গ্লাস হাতে। কেউবা কমলালেবু হাতে, কেউ দাঁড়িয়ে আছে কলা, বিস্কুট, চকলেট ইত্যাদি নিয়ে। যেখানে যেখানে পানি খাবার কথা সেখানেই পানি খাচ্ছি, এনার্জি জেল খাচ্ছি।

১৩ মাইল বা হাফম্যারাথন মার্ক পার করেছি কেবল। হাঁটুতে চিনচিনে একটা ব্যথা অনুভব করছি। এই ব্যথাটার সাথে আমি পরিচিত নই। আগের কোন দৌড়ের সময় এই ব্যথাটা অনুভব করি নাই। ভাবছি এটা হয়ত স্বাভাবিক একটা ব্যথা। যারা ম্যারাথন দৌড়ায় তাদের সবারই হয়ত এমন হয়, এ আর আমার জন্য বিশেষ কিছু না। এগিয়ে যাচ্ছি। ব্যথাটা বাড়ছে, আমার গতি কমছে।

১৬ মাইল পার করার পর লক্ষ্য করলাম ব্যথাটা যাচ্ছে না, আরো তীব্রতর হচ্ছে। হাঁটুর ব্যাথাটা হাঁটু থেকে পায়ের নিচের অংশে ছড়িয়ে পড়ছে। কী করা যায়! ভাবলাম একটু হেঁটে নিই, হাঁটলে হয়ত ব্যথাটা একটু কমবে। এরপর আবার দৌড়াবো। মিনিট দুয়েক হাটার পর আবার ধীরে ধীরে দৌড়াতে শুরু করলাম, এবার খুব সাবধানে দৌড়াচ্ছি। নাহ, ব্যথাটা আরো প্রবল হচ্ছে। বা পায়ের হাঁটুতে ব্যথাটা অনেকটা হাতুড়ি দিয়ে পায়ে আঘাত করলে যেমন তীব্র ব্যথা হয় তেমন ব্যথা, ডান পায়েরটা একটু কম।

ততক্ষণে ১৮ মাইল পার করেছি। একটা মেডিকেল টেন্টে (দৌড়ের রাস্তায় কয়েকমাইল পরপর মেডিকেল টেন্ট বসানো, দৌড়বিদদের ইমার্জেন্সিতে হেল্প করার জন্য) সামনে থেকে ওদেরকে বিষয়টা জানাতেই ওখানের একজন আমাকে হট এন্ড আইস নামক একটা মলম দুই হাঁটুতে মালিশ করে দিল। আমি ওকে ধন্যবাদ জানিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। এখন এমন একটা এলাকার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি যেখানে প্রতিটা বাড়ি থেকে শিশু কিশোর, বৃদ্ধ, যুবক সকলে রাস্তার পাশে কিছু না কিছু খাবার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ কমলালেবু, কেউবা আইসক্রিম, কেউ জুস, কেউ এনার্জি ড্রিংক, কেউবা গিটার নিয়ে কয়েকজন মিলে গান গাচ্ছে, সবাইকে উইশ করছে। পায়ে যতই ব্যথা থাকুক এমন পার্টি মুডে সবাই থাকলে এবং উৎসাহ দিতে থাকলে আর যাইহোক হাঁটা যায় না, মুখে বিস্তৃত হাসি রেখে দৌড়াচ্ছি।

বেশিক্ষণ পারলাম না, ১৯ নম্বর মাইলে এসে আর দৌড়াতে পারছি না। প্রতিটা কদম মনে হচ্ছে একেকটা ব্যথার মাইনের উপর দিয়ে যাচ্ছি। চোখে ধীরে ধীরে ঝাপসা দেখা শুরু করেছি। মাথায় মনে হচ্ছে অক্সিজেন কমে গেছে। নেশাগ্রস্তের মত এগিয়ে যাচ্ছি। মাইল ২০ এ এসে লক্ষ্যকরলাম, আমার শরীরে একবিন্দু শক্তি অবশিষ্ট নেই। যা ছিল সব ফুরিয়ে গেছে, পায়ের ব্যথা এখন প্রায় সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে। অনেকটা খুড়িয়ে আগাচ্ছি। আমাকে দেখে এক মাঝ বয়েসি নারী দৌড়বিদ থামলেন, বললেন, আমি তোমার সাথে কিছুক্ষণ হাঁটি। আমাকে নানান কথায় উৎসাহ দিচ্ছেন। উনার প্রথম রেইসের কথা বললেন। বললেন, থেমো না। এগিয়ে যাও। আমার পিঠে চাপড়ে দিয়ে উনি আবার দৌড় শুরু করলেন। আমি উনাকে ফলো করে পিছন পিছন দৌড়াচ্ছি। থামা যাবে না।

২২ মাইলে এসে লক্ষ করলাম আমি দৌড়াচ্ছি না, হাঁটছি। খুব ধীর গতিতে হাঁটছি, কিন্তু আমার মনে হচ্ছে আমি দৌড়াচ্ছি। মনের যত শক্তি আছে তা দিয়ে নিজেকে টেনে নিচ্ছি। মনে মনে পণ করলাম, আর যাই হোক, শেষ আমাকে করতেই হবে। আরতো কেবল ৪মাইল বাকি।

একটা মেডিকেল টেন্টে থামলাম। আমাকে ওখানে থাকা যুবক জিজ্ঞেস করলেন, কেমন বোধ করছি। আমার ঝাপসা দেখা ও পায়ের অসম্ভব ব্যথার কথা জানাতে ও আমার পায়ে মালিশ করে দিয়ে বলল আমার কাছে রেলিশ আছে, তোমার শরীরে সোডিয়াম কমে গেছে। একটু রেলিশ মুখে দাও, দেখবে ভাল লাগবে। আমি কিছু বুঝার আগেই ও মুখে রেলিশ তুলে দিল। মনে হলো অত্যন্ত লবনাক্ত শশার একটা আচার। খেয়ে মুখে পানি দিতেই বুঝলাম ঝাপসা লাগাটা ধীরে ধীরে কমছে। আর ছেলেটার আমার পায়ে মালিশ করে দেয়াটা এতটার ভাল লাগছিল যে চোখে পানি চলে এসেছে। ওকে ধন্যবাদ দিয়ে আবার চলা শুরু করার সময় ছেলেটা চিৎকার করে পেছন থেকে বলল, থেমে যেও না। আর মাত্র কয়েকমাইল।

একটু এগিয়ে যেতেই ব্যথাটা বেড়ে চলেছে। পায়ের ব্যথায় এখন কাঁদছি। রাস্তার পাশে মানুষ তাকিয়ে আছে, উৎসাহ দিচ্ছে। আমি বুঝতে পারছি আমি কাঁদছি, কিন্তু মুখে হাসি আছে। সানগ্লাসের ভেতরে চোখ ভিজে গেছে। আমার মতই অনেকেই এমন ব্যথায় কাতর হয়ে কেউ হাঁটছে, কেউবা দৌড়াচ্ছে। কিন্তু কেউ থামছে না। এ যেন জীবনের অন্য এক প্রতিচ্ছবি, সবাই নিজের নিজের যুদ্ধে আছে; সবাই অসহ্য যন্ত্রণা পার করে এগিয়ে যাচ্ছে হাসিমুখে। কেউ থামছে না। ম্যারাথনের সাথে জীবনের কত মিল!

পাশ থেকে কে যেন বলল, আর দুইমাইল বাকি। এগিয়ে যাও তোমরা। থেমো না এখন! আশা ফিরে পাচ্ছি, ২৪ মাইল ইতোমধ্যে দৌড়ে ফেলেছি, আর বাকি দুই। পিছনে ফেলে আসা ২৪ মাইলের চেয়ে সামনের দুইমাইল বেশি দূর মনে হচ্ছে। সময় খুব দ্রুত চলে যাচ্ছে, আমি যাচ্ছি শ্লথ গতিতে, তবুও একটাই পাওয়া; এগিয়ে যাচ্ছি, থামছি না। থেমে গেলেই হেরে যাবো। আর হারতেতো এতদূর এসিনি! নিজের ভেতরে ভাঙ্গাগড়া চলছে। যত ইগো ছিল সব ভেঙ্গে কেমন ভালনারেবল সাধারণ একটা পর্যায়ে চলে এসেছি, যেখানে লড়ে যাওয়াটাই বড় যুদ্ধ, থেমে গেলে হেরে যাওয়া।

আর মাত্র একমাইল বাকি, এতক্ষণ যতই খুড়িয়ে আসি না কেন, এবার একটু দৌড়াতে হবে। ফিনিশ স্ট্রং একটা কথা আছে। আবার দৌড়াতে শুরু করলাম, আবার খুব আনন্দ হচ্ছে। প্রচন্ড ব্যথাটা আছেই, তবে সহ্য ক্ষমতাটাও বাড়ছে। ধীর গতিতে দৌড়ে ফিনিশ লাইনের দিকে এগুচ্ছি। ওহায়ো নদীর পাড় ধরে এগিয়ে যাচ্ছি এক যুদ্ধজয়ীর মত। ২৬ মাইল পার করেছি মাত্র, ফিনিশিং লাইন দেখা যাচ্ছে। চারপাশে মুহুর্মুহু চিৎকার, উলুধ্বনি, আনন্দ উল্লাস। আমি হাসিমুখে নিজেকে টেনে নিয়ে যাচ্ছি ফিনিশ লাইনে। চোখে পানি ঝরছে, মুখে বিস্তৃত হাসি। চারপাশ থেকে ছবি উঠছে। নিজেকে মনে হচ্ছে এক অন্যরকম আমি।

৫ ঘন্টা ১৬ মিনিট দৌড়ে ফিনিশিং লাইনে এসেই হাত আকাশের দিকে তুলে দিয়ে সব দুঃখ ভুলে অতিক্রম করলাম জীবনের প্রথম ম্যারাথন। শিখলাম, জীবন একটা ম্যারাথন দৌড়। প্রথম পর্যায়ে আমরা চারপাশে যা দেখি আনন্দ উত্তেজনায় তা উপভোগ করি, উৎসবে মেতে থাকি। তারপর কঠিন সত্য সামনে আসে। আমরা অসহ্য যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাই। এই যন্ত্রণা আমাদের ভাঙ্গে আবার গড়ে, গড়ে তুলে অন্য এক আমাকে। আমরা শিখতে শুরু করি। এগিয়ে যাই জীবনে ও ম্যারাথনে; অন্য কারো বিপক্ষে নয়, যুদ্ধে নামি নিজের অশুভ চিন্তা, শক্তি ও পেছনে টেনে ধরা নিজের বিরুদ্ধেই। এখানে এগিয়ে যাওয়াই সত্য। থেমে গেলেই হেরে যাওয়া হয়। এখানে প্রত্যেকে নিজে নিজের রেইস দৌড়ান, নিজের সময়ে তা শেষ করেন। কিন্তু পথে একে অন্যকে সাহায্যে হাত বাড়িয়ে দেন, তখনই হয়ে উঠে এক অন্যন্য জীবন, অনন্য ম্যারাথন!

গলায় বিজয়ীর মালা পরিয়ে দিয়েছেন একজন। এই অর্জন ও শিক্ষা আমাকে অন্য এক আমিতে পরিণত করেছে নিশ্চিত।

আমি আমার উত্তর খুঁজে পেয়েছি। যে কখনো ম্যারাথন দৌড়ায়নি, তাকে কথায় বুঝিয়ে বলা মুশকিল। আর যে দৌড়েছে, তাকে বুঝিয়ে বলার কিছু নেই, সে জানে!

প্রশ্ন হচ্ছে, আমি কি আবার ম্যারাথন দৌড়াবো? উত্তরঃ অবশ্যই। নিজেকে ছাড়িয়ে কে না যেতে চায়!

কমেন্ট করুন

তোফায়েল আজম

সেশন: ২০০৭-০৮