ব্যাটেল অব শিরোমণি: দ্য ট্যাংক ওয়ার

প্রতিটি জাতির জাতীয় জীবনে কিছু কিছু ঘটনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ যা সেই জাতিকে করে গর্বিত ও মহিমান্বিত। আমাদের জন্যও মুক্তিযুদ্ধ ঠিক সেইরকম। তবে যুদ্ধের সেই নয়টি মাস মুক্তিযোদ্ধাদের  জন্য মোটেই সহজ ছিল না। বীর সেনানীদের পাড়ি দিতে হয়েছে এক বন্ধুর পথ, অবতীর্ণ হতে হয়েছে অনেক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে। এমনি একটি যুদ্ধ হয়েছিল খুলনার শিরোমণিতে যা আমাদের অনেকেরই অজানা। ট্যাংক ব্যাটেলের অসাধারণ যুদ্ধকৌশল ও অভাবনীয় নেতৃত্ব নৈপুণ্যের কারণে রণাঙ্গনের এ ঐতিহাসিক যুদ্ধ স্থান করে নিয়েছে ইতিহাসের পাতায়। হয়ে উঠেছে ট্যাংক ব্যাটেলের আদর্শ। ভারতসহ ৩৫ টি দেশের মিলিটারি একাডেমিতে পড়ানো হচ্ছে এ যুদ্ধ সম্পর্কে।

মুক্তিযুদ্ধের শেষদিক। একের পর এক খবর আসতে থাকে পাকবাহিনীর পরাজয়ের। পতন হতে থাকে একের পর এক ঘাঁটির। যশোর সেনানিবাস ছিল পাক বাহিনীর শক্ত ঘাঁটি। ভারতীয় ইস্টার্ন কমান্ডের সদর দপ্তর কলকাতায় থাকাতে পাকসেনারা যশোর সেনানিবাসে শক্ত অবস্থান তৈরি করে রেখেছিল কেননা কলকাতা ও যশোরের দূরত্ব ছিল মাত্র ১১০ কিলোমিটার। এই সেনানিবাসকে পাকিস্তান সেনাবাহিনী প্রাচ্যের স্তালিনগ্রাদ মনে করত। মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের সীমান্তবর্তী সেনানিবাস হিসেবে ব্যাপক সেনা সমাবেশ করেছিল যার নেতৃত্ব ছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নবম পদাতিক ডিভিশনের ১০৭ ইনফ্যান্ট্রি ব্রিগেডের ব্রিগেড কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হায়াতের কাছে। তাঁর নেতৃত্বগুণ ও রণকৌশল ছিল অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তার। ২১ নভেম্বর থেকে ৬ ডিসেম্বর মুক্তিবাহিনী যশোর সেনানিবাসের ১৫ কিলোমিটারের মধ্যে চলে আসে পাকবাহিনীর ‘বেনাপোল-কুষ্টিয়া’, ‘কৃষ্ণনগর-দর্শনা-চুয়াডাঙ্গা’, ‘মুর্শিদাবাদ-রাজপুর-­কুষ্টিয়া’- এই তিনটি দুর্ভেদ্য প্রতিরক্ষা লাইন অতিক্রম করে। সেখানে কয়েকটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয় যা ‘গরিবপুর যুদ্ধ’ নামে পরিচিত। ধীরে ধীরে সকল স্থান থেকে পাকবাহিনীর পরাজয়ের খবর আসতে থাকে। গেরিলাদের আক্রমণে নাকাল অবস্থা পাকসেনাদের, এরই মধ্যে যৌথবাহিনীর আক্রমণ শুরু হয়। এরই ধারাবাহিকতায় যশোর সেনানিবাস দখল করার জন্য মিত্রবাহিনী অগ্রসর হয় এবং প্রায় বিনা বাঁধায় যশোর সেনানিবাস দখল করে নেয়। কেননা মিত্রবাহিনী এখানে আবিষ্কার করে এক খালি ঘাঁটি। পাকসেনারা সেনানিবাস ছেড়ে অবস্থান নেয় খুলনার শিরোমণিতে। কৌশলগতভাবে এর কারণ ছিল প্রধানত তিনটি-

প্রথমত, ব্রিগেডিয়ার হায়াতের ধারণা ছিল অল্প কিছুদিনের মধ্যেই মার্কিন ৭ম নৌবহর এসে তাদের উদ্ধার করে নিয়ে যাবে রূপসা পশুর নদী দিয়ে। তাই নদীর কাছাকাছি থাকা ভাল।

দ্বিতীয়ত, শিল্পোন্নত এই স্থানে প্রতিরক্ষামূলক অনেক জায়গা ছিল। ব্রিগেডিয়ার হায়াত রেড আর্মির হিটলার বাহিনীকে স্তালিনগ্রাদ যুদ্ধে হারিয়ে দেয়ার অনুকরণে প্রত্যেকটি পাকা স্থাপনায় ডিফেন্সিভ অবস্থান নেন এবং সদর দপ্তর স্থাপন করেন ফ্যাক্টরিতে।

তৃতীয়ত, শিরোমণি আগে থেকেই পাকসেনাদের ভালো পরিচিত ছিল।সাথে নদী বেষ্টিত ভৌগলিক সুবিধাও ছিল।

৭-১২ ডিসেম্বর পাকসেনারা ইস্টার্ন গেট, আলীম জুট মিল, অফিল জুট মিল, আটলা, গিলাতলার প্রত্যেকটি পাকা স্থাপনায় অবস্থান পাকা করে। বস্তুত শিরোমণিকে এক দুর্ভেদ্য দুর্গে পরিণত করে। কয়েক গজ দূরে দূরে বাংকার, মাইনফিল্ড, ট্রেঞ্চ তৈরি করে। এক ইঞ্চি জায়গাও তারা বন্দুকের আওতার বাইরে রাখেনি। শিরোমণিতে পাকবাহিনীর শক্তিমত্তা ছিল অবাক করার মত। ৩২ টি শেরম্যান ট্যাংক, ২টি এম চাফি ট্যাংক (প্রকৃত পক্ষে আরও বেশি), ১৫০টি আর্টিলারি, ৪০০ কমান্ডো, ৫ হাজার সৈন্য, ১৫০ রাজাকার। এছাড়া ট্রেঞ্চ, বাংকার, মাইন, ক্যাম্যেফ্লাজ তো আছেই। ১০-১২ তারিখ একের পর এক হামলা চালায় যৌথবাহিনী। পাকসেনাদের অবস্থান দখল করার জন্য ভৈরব নদী পার করার চেষ্টা করা হলেও তা সম্ভব হচ্ছিল না। বস্তুত পাককমান্ডার হায়াতের রণকৌশলের কাছে যৌথবাহিনী বারবার পরাজিত হচ্ছিল। ১৩ তারিখ ভারতীয় বিমান বাহিনীর টানা হামলায় পাকবাহিনীর সাড়াশব্দ কমে যায়। মিত্রবাহিনী ধরে নেয় ভারতীয় বিমানের অবিরাম বোমা বর্ষণে পাকসেনারা মৃতপ্রায় অথবা তারা পালিয়েছে। কিন্তু মুক্তিবাহিনীর সূত্র ও যুদ্ধ বিশ্লেষণ অন্য কিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছিল। প্রকৃতপক্ষে ১০৭ ইনফ্যান্ট্রি ব্রিগেড তীব্র বিমান হামলার জবাব না দিয়ে কৌশলগত কারণে চুপ ছিল। ইতিমধ্যে রাজপুত রেজিমেন্ট যুদ্ধে যোগ দেয় এবং ভৈরব নদীর ওপর ভাসমান ব্রিজ তৈরি করে ভারতীয় ইঞ্জিনিয়ারিং ডিভিশন। কাছে থাকা মুক্তিযোদ্ধারাও আশেপাশের এলাকায় অবস্থান নেয়।

১৪ ডিসেম্বর মুক্তিবাহিনীর মতামত অগ্রাহ্য করে পাকবাহিনীর সদর দপ্তর দখল করার জন্য ফ্যাক্টরির দিকে রওয়ানা দেয় মেজর মহেন্দ্র সিং ও মেজর গণির নেতৃত্বাধীন ২৮ টি গাড়ির একটি সুসজ্জিত বহর। কিন্তু পথিমধ্যেই তারা এমবুশের শিকার হয় এবং ২৬ টি গাড়িই ধ্বংস হয়। ২৫০-৩০০ জন ভারতীয় সেনা নিহত হয়। আহত হয় অনেক। ভারতীয় সেনাদের লাশে ভরে যায় ট্রাকের পর ট্রাক। এ বিপুল পরিমাণ হতাহতের পর যৌথবাহিনীর কমান্ড আর ভারতীয় সেনাবাহিনী রাখেনি। এবার যৌথবাহিনীর নেতৃত্ব গ্রহণ করেন মেজর মঞ্জুর, প্রতিজ্ঞা করেন যুদ্ধ জয় করে ফেরার। সাথে সাথে শুরু করেন আক্রমণ। পাকবাহিনীকে বাধ্য করেন শিরোমণির মধ্যে চলে আসতে। ১৬ ডিসেম্বর নিয়াজী আত্মসমর্পণ করলেও ব্রিগেডিয়ার হায়াত যুদ্ধ চালিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নেন। মেজর মঞ্জুর চূড়ান্ত আক্রমণের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। ৭ ভাগে চারদিক থেকে আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেন। ভারতীয় সেনা কর্মকর্তারা যুদ্ধের ভয়াবহতায় কিছু দূরে অবস্থান নেন। ফ্রন্ট লাইনের ভারতীয় সেনাদের ডানে প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানের জন্য পাঠানো হয়। বামের দুইটি এবং পেছনের ৩ টি কমান্ডো ইউনিটকে ফ্রন্টলাইনে নিয়ে আসা হয়। মেজর মঞ্জুরের নির্দেশের সাথে সাথেই সড়কের নিচে থাকা দুটি ‘৭৬ পিটি ট্যাংক’ ক্ষিপ্রগতিতে পাকসেনাদের দিকে এগিয়ে যায় যার পেছনে ছিলেন মেজর মঞ্জুরসহ ১২ জন কমান্ডো। আরও ছয়টি ট্যাংক ডান দিক থেকে পাকসেনাদের ফ্রন্ট লাইনের উপর আছড়ে পড়ে। পেছনের লাইনে থাকা মুক্তিযোদ্ধারাও সামনে অগ্রসর হয়। পেছন থেকে শুরু হয় মিত্রবাহিনীর আর্টিলারি হামলা। পাকবাহিনীর ২৫ টি ট্যাংক ও অসংখ্য মর্টারের গোলাবর্ষণ সত্ত্বেও দুটি ৭৬ পিটি ট্যাংকের পেছন থেকে মুক্তিযোদ্ধারা বের হয়ে আসেন। তীব্র গোলাগুলির মধ্যেই ট্যাংকের উপরে উঠে স্টেনগান দিয়ে গুলি করতে থাকেন ড্রাইভার ও গানারদের। ট্যাংকের হ্যাচ খোলা দেখলেই গ্রেনেড মারা হয়। আকস্মিক এ আক্রমণে দিশেহারা হয়ে পড়ে পাকবাহিনী। বিস্ময়ের ঘোর না কাটতেই ব্রিগেডিয়ার হায়াত আবিষ্কার করেন তাঁর ফ্রন্টলাইন ও ট্যাংকবাহিনী নিস্তব্ধ হয়ে গেছে। ‘জয় বাংলা’ বলতে বলতে মুক্তিযোদ্ধারা সামনে এগোতে থাকেন। সকালে শুরু হয় ভারতীয় বিমানবাহিনীর বোমা হামলা। দিশেহারা পাকবাহিনী বুঝতে পারে তাদের সামনে আর কোন পথ খোলা নেই। ১৭ ডিসেম্বর দুপুরে আনুমানিক ৩৭০০ জন পাক সেনা মেজর মঞ্জুরের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। মেজর মঞ্জুর তাদের ব্যাচ খুলে ফেলার নির্দেশ দেন। মুক্ত হয় খুলনা। স্বাধীনতার স্বাদ পায় খুলনাবাসী।

পৃথিবীর ইতিহাসে এরকম ট্যাংক ব্যাটেল খুবই বিরল। স্থানীয় লোকজনদের মতে ঐ এলাকার চার কিলোমিটারের মধ্যেও কোন বাড়ি অক্ষত ছিল না। প্রতিটি গাছ ও ভবনে শত শত বুলেটের চিহ্ন দেখা গেছে। আজও কিছু তালগাছ এবং বড় পুরাতন গাছে তাঁর সাক্ষ্য পাওয়া যায়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর একই যুদ্ধক্ষেত্রে ট্যাংক, আর্টিলারি, পদাতিক এবং ফাইটিং শিরোমণি ছাড়া আর কোথাও সংগঠিত হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের সেই সাহসী, নির্ভীক যোদ্ধাদের প্রতি রইল সশ্রদ্ধ সালাম।

তথ্যসূত্রঃ

১. ট্যাংক ব্যাটেল অব শিরোমণি; গাজী সাইফুল হাসান
২. স্বাধীনতার দুর্জয় অভিযান; স. ম. বাবর আলী
৩. The battle of Khulna; defencejournal.com
৪. মুক্তিযুদ্ধে সামরিক অভিযান (৭ম খণ্ড); সেনাবাহিনীর শিক্ষা পরিদফতর-এশিয়ান পাবলিকেশন্সের পক্ষে
৫. মুক্তিযুদ্ধের হৃদয়ে মম; মুসা সাদিক
৬. মুক্তিযুদ্ধে খুলনা; মোল্লা আমির হোসেন

কমেন্ট করুন
শিক্ষার্থী | পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সেশনঃ ২০১৫-২০১৬

সায়েম শাফিন

সেশনঃ ২০১৫-২০১৬