সে থেমে যায় নি

ছেলেটার বয়স তখন মাত্র ছয় বছর। ওইটুকু বাচ্চা কিইবা  বুঝে আর কতটুকুই বা বুঝে। রোজকার মতন স্কুলে যায় আবার ফেরত আসে। দুপুরের ব্রেকে  বাসায় খেতে আসে। প্রতিদিনই তার লাঞ্চে থাকে দুধ আর পাউরুটি। সেদিনটা অন্য সব দিনের মতন ছিলো না। সে দেখলো তার মা কী যেন একটা মেশাচ্ছেন তার দুধে। খুব ভালো করে মেশাচ্ছেন। সে তখন বুঝতে পারলো তার মা আর কিছু না, দুধে পানি মেশাচ্ছলেন কারণ তাদের পুরো সংসার সপ্তাহ জুড়ে চালাতে হবে। মুখে সেই চিরচেনা হাসি ও সাথে দুধ পাউরুটি নিয়ে মায়ের প্রবেশ। ছেলেটা চুপচাপ খেয়ে স্কুলে চলে গেলো। ওইটুকু ছেলেটা হয়ত বুঝতে পারছিল যে তাদের জীবন হয়ত এখানেই শেষ অথবা এখান থেকেই শুরু। রাতে ইলেকট্রিসিটি থাকতো না। সপ্তাহের পর সপ্তাহ কালো আধাঁরে রাত কাটাতে হয়েছে তাদের। প্রতি সোমবার তার মা পাশের বেকারী থেকে পাউরুটি বাকিতে আনতেন। পরে সুদে পরিশোধ করা লাগতো। ছোটবেলা থেকেই এত কঠিন পরিস্থিতি ছেলেটাকে কঠিন করে তুলছিল। তার বাবা ছিলেন  প্রফেশনাল ফুটবলার। সে জিজ্ঞেস করলো, “বাবা, কত বছর থেকে প্রফেশনাল ফুটবল খেলা যায়?”। উত্তরে তিনি বললেন, “১৬”। সে বলল, “তাহলে ১৬তেই আমি ‘আন্দারলেখট’- এ প্রফেশনাল কন্ট্রাক্ট সাইন করবো, দেখে নিও”।

তখন বয়স ১২। ইউথ টিমে ছেলেটার ঝুলিতে সেবার ২৬ ম্যাচে ৭৫ গোল। তার বয়সী ছেলেদের তুলনায় সে প্রচুর লম্বা। ফাইনাল ম্যাচ। সে  যখন মাঠে নামছিল তখন বিপক্ষ দলের খেলোয়াড়দের একজনের বাবা রীতিমত তার আইডি কার্ড দেখতে চেয়ে বসেন। মনে মনে সে বলে, “মাঠে নেমে আপনাদের ছেলেদের ছিঁড়ে ফেলবো আজকে।” সে ওই ম্যাচে করে হ্যাটট্রিক। ম্যাচ শেষে ফোন পায় তার নানার কাছ থেকে। তিনি বরাবরই ছেলেটার ফুটবল নিয়ে খবর রাখতেন। “নানা, আমি এবার কাপাচ্ছি।” “সাবাস বেটা, তবে আমার একটা কথা রাখবি, বাবা?”  “কি?” “আমার মেয়েটাকে দেখিস তুই।” ছেলেটা ভাবছিল উনার মেয়ে মানে তো আম্মু। হঠাৎ উনি এই কথা কেনো বলছেন। তার ঠিক ৫ দিন পরেই তার নানা মারা গেলেন। ছেলেটা তখন বলেছিল, “তোমার মেয়ের দায়িত্ব আমারই।”

ছেলেটা সেবার ১৫ তে। বেঞ্চ গরম করা ছাড়া আর কোনো কাজই নেই তার। সে ভাবলো এভাবে থাকলে তো আমার কন্ট্রাক্ট সাইন করা হবে না। কোচ কে বললো, “আমাকে নামালে আমি ডিসেম্বরের মধ্যে ২৫ গোল করবো।” কোচ হাসতে হাসতে বললো, “না পারলে সোজা বেঞ্চে আবার।”  সে বলল, “বাজি! যদি আমি জিতি তাহলে প্রতিদিন আপনি আমাদের বাস পরিষ্কার করবেন আর আমাদের প্রতিদিন পানকেক বানিয়ে খাওয়াবেন।” এটাই হয়ত কোচের জীবনের সবচেয়ে খারাপ বাজির মধ্যে একটা ছিলো। সেবার নভেম্বরেই সে ২৫ গোল করে ফেলে। যে ছেলেটা ক্ষুধায় জর্জরিত, যার নিজের চোখে মাকে দুধে পানি মিশাতে দেখতে হয়, তার সাথে মজা হয়ত করাটা উচিত হয় নি কখনো।

তখন ফাইনাল ম্যাচ; আন্দারলেখট বনাম স্টার টিম। প্রথম লেগ সে বাসায় বসেই দেখলো। বিকালে সে ফোনে কোচের কল, ফার্স্ট টিম তাকে চাচ্ছে। বাবাকে বললো, “চলো। তোমার ছেলের ফার্স্ট টিমে ডাক পড়েছে।” এতদিন পর্যন্ত সব গোল সে করেছে বাবার জুতা পায়ে দিয়ে। ফার্স্ট কন্ট্রাক্ট সাইন করলো তার জন্মদিনে, ১৩ ই মে। সে তার কথা রেখেছে, শুধু দেরি হয়েছিল ১১ দিন। ৬১ তম মিনিটে কোচ মাথায় হাত দিয়ে বললেন, “ওয়ার্ম আপ কর,নামবি এবার।” অবশেষে  ১৬ বছর বয়সেই অভিষেক ঘটে তার। তার পর থেকে তার আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। শুধু তার আফসোস ছিলো একটাই। তার নানা দেখে যেতে পারেনি যে তাঁর মেয়ে এখন কত ভালো আছে।

তারও ১২ বছর পর সে বিশ্বকাপ খেলছে। হয়ত ছন্দপতন হচ্ছে। মিডিয়া তাকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নামে ডাকছে। যখন ভালো খেলে  তখন সে ‘বেলজিয়ান স্ট্রাইকার’, খারাপ সময়ে সে ‘কঙ্গো বংশোদ্ভূত বেলজিয়ান স্ট্রাইকার’।  সে এগুলো আমলে নেয়নি। কারণ যখন তার জীবনের খারাপ সময় ছিল তারা কেউ ছিল না। আজকেও তাদের কথায় তার কিছুই যায় না, আসেও না।

ছোটবেলায় তার ছিলো না প্লে স্টেশন, না গেমিং ডিভাইস, ছিলো না টেলিভিশন। সে তখন মাঠে খেলে বেড়াতো। ক্লাসের সবাই যখন এই খেলা, ওই গোল নিয়ে কথা বলত সে তখন নির্বাক শ্রোতা। কারন সে এগুলার কিছুই দেখে নি, দেখতে পারে নি। ২০০২ এর চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালে জিদানের করা সেই দুর্দান্ত ভলি সে দেখেছে বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে। প্রতিটা স্ট্রাগল ই তাকে এক কঠিন মানসিকতার অধিকারি করে তুলেছে। ফুটবলে সবসময় বলে কোন খেলোয়াড় কতটা মানসিক চাপ নিতে পারে। যে দারিদ্রতার চাপ নিতে পেরেছে তার কাছে এ আর এমন কি! ছেলেটা প্রিমিয়ার লিগ খেলার স্বপ্ন দেখতো না, না দেখতো চ্যাম্পিয়ন্স লিগ খেলার স্বপ্ন। শুধু স্বপ্ন দেখতো তার মা যেনো ভালো থাকে, মুছে যেন যায় তাঁর সকল অশ্রু।

আরে দেখুন না সেই কখন থেকেই সেই ছেলেটা সেই ছেলেটাই করে যাচ্ছি। সে আর কেউ নয়, বর্তমান সময়ের এক দুর্দান্ত স্ট্রাইকার রোমেলু লুকাকু।

কমেন্ট করুন
শিক্ষার্থী | পরিসংখ্যান বিভাগ

সেশনঃ ২০১৮-১৯ 

রাফিইউ হোসেন অর্নব

সেশনঃ ২০১৮-১৯