শূন্য! পরিপূর্ণ!

এক পা দোকানে তুলে হাঁটুতে ভর দিয়ে রবিউল মিয়া সিগারেট ফুঁকছে। দোকান বলতে তার একখানা তক্তা। শনির আখড়া আন্ডারপাসের নিচে বিভিন্ন জিনিসের পসরা নিয়ে বসে সে। চিরুনী, কটন বাড, কান খুঁজানি, পিঠ খুঁজানি, টুথপিক, আয়না, মাছি মারার ডান্ডি, আর করোনার পর থেকে মাস্কও রাখে সে। মলিন, উসকো খুসকো বাদামী রংয়ের চুলে তার ইদানিং হালকা পাক ধরেছে। গালে রবিউলের খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি। আন্ডারপাসের দেয়ালের দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবছে রবিউল। হঠাৎ চ্যাঁচামেচিতে তার ভাবনাচ্যুতি ঘটে।

“খাংকির পোলা, ব্রেক ধরতে পারোস না নিহি?”

মারমুখী ভংগিতে দুই রিক্সাওয়ালার মধ্যে ঝগড়া চলছে। বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। এমনিতেই আন্ডারপাসে রোদের মধ্যেও কাঁদা পাওয়া যায় আর এখন বৃষ্টি! কাঁদায় মাখামাখি অবস্থা। ওদিকে দুই রিক্সাওয়ালা রিক্সা থেকে নেমে নিজেদের মধ্যে গালি বর্ষণ করছে।

“গাইল দিয়া কথা কস ক্যা? বুইড়াচোদা দেইখা কিছু কইতাসি না। ধাক্কা লাগতেই পারে। আমার গাড়িতে লাগেনা?”

এরই মধ্যে দুই লাইনে জ্যামে থাকা রিক্সার মাঝ দিয়ে ভু ভু করতে করতে একটা বাইক সামনে আগায়। আর আগানোর সময় কাঁদা ছিটিয়ে যায় লোকজনের গায়ে। এদের মধ্যে রবিউলও আছে। মানুষের গোলমাল, গাড়ির হর্নের আওয়াজ আর রিক্সাওয়ালা গালাগালি। এর উপরে যদি কাঁদার হামলা হয়, তবে কী আর সহ্য করা যায়?

“মাদারচোদেরা রাস্তা কি তোগোর বাপের?

বলেই দেয়ালের সাথে লাগানো লাঠিটা নিয়ে তক্তা থেকে নামে রবিউল। চোয়াল ভাংগা রবিউলের চোয়াল রেগে গেলে আরো শক্ত ও স্পষ্ট হয়ে উঠে। দেখতে তাকে ভয়ানকই লাগে তখন। রিক্সাওয়ালা তখন ভড়কে যায়।

“পিডায়া তক্তা বানায়া ফালামু। সামনে বাড়া।”

হুমকিতে কাজ হয়। রিক্সা সামনের দিকে চলে যায়। তক্তায় বসতে বসতে রবিউলের মনে পড়ে কী যেন ভাবছিল সে। কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারে না। কিছুক্ষণ চেষ্টা করে কিন্তু লাভের লাভ আর হয় না৷ রবিউলের মেজাজ আরো তিরিক্ষি হয়ে যায়।

“মনডায় চায় হালার পো হালাগোরে খিচাই ইচ্ছামত।”

বিড়বিড় করে রবিউল।

এমন সময় এক লোক তার দোকানের সামনে আসে।

“ঐ মিয়া, এই চিরুনির দাম কত?”

গোল চিরুনিটা উঠিয়ে রবিউল বলে,

“দশ টাকা”

“কয়ডা? তিনডা নাকি?”

নাহ! আর কই যায়! রবিউলের কপালের দুপাশের রগ আরো ফুলে যায়।

“ঐ মিয়া, মশকরা করি নিহি আপনের লগে? আপনেরে কি তিনডা দেহাইসি, হ্যাঁ?

“ঐ মিয়া, চিল্লাও ক্যালা?”

“চিল্লামুনা তো কী করমু? দশ টাকায় তিনডা চিরুনি কিনছেন নি জীবনে?”

“ঐ বেটা, বেয়াদবি করোছ কেলা? একটা দিমু চোপাড় বরাবর।”

তর্ক-বিতর্ক শুনে পাশে দাঁড়ানো চানাচুর বিক্রেতা আনিসুদ্দীন এগিয়ে এসে বলে,

“বাদ দেন, মুরুব্বি।”

“নাহ,উই চিল্লাইবো কির লাইগা?”

রবিউল আর নিতে পারে না। একটা গরম চোখ মুরুব্বির দিকে ছুঁড়ে দিয়ে সে আন্ডারপাসের মাথায় চলে যায়

“দেখছোনি কামডা? হালা ভাদাইম্যা চিরুনিই বিক্রি করবো না!”

মুরুব্বি কথা বলতে থাকে।

“বাদ দেন মুরুব্বি, বাড়ি যান। হালায় এমনই।”

আনিসুদ্দীন বলে,

“হালার পো হালা”, গালিটা দিয়ে চোখেমুখে জয়ের মহিমা নিয়ে মুরুব্বি সামনের দিকে হাঁটা ধরে।

ওদিকে আন্ডারপাসের মাথায় গিয়ে রবিউল আরেকটা সিগারেট জ্বালায়। বৃষ্টি এখনো পড়ছে। ঘরফেরত মানুষগুলো বৃষ্টিতে ভিজতেই ভিজতেই বাড়ির দিকে এগোয়। সবার চোখে মুখেই অপেক্ষা। কখন নিজের বাড়ির সামনে এসে পৌঁছাবে। সারাদিন খাটুনির পরে ঘরে ফেরার অপার আনন্দই এই লোকগুলার চালিকাশক্তি। আস্তে আস্তে বৃষ্টি থামে কিন্তু রিক্সা, সিএনজি আর মানুষের ভিড় কমে না। বাজারে ফলের দোকানদার পর্দা সরাতে থাকে। রবিউল দাঁড়িয়ে সিগারেটই ফুঁকছিল। হঠাৎ রবিউলের চোখ পড়ে যায় আকাশে। অনেকক্ষণ বৃষ্টি হওয়ার পরে আকাশটা অনেক সময় মেলা পরিষ্কার হয়ে যায়। যেন পৃথিবী তাঁর কষ্ট ভুলে গিয়ে নতুন আমেজে আবার জেগে উঠে অসীম ভালবাসা নিয়ে। হঠাৎই বুকটা আনচান করে উঠে রবিউলের। অনেকগুলো স্মৃতি একসাথে এসে রবিউলকে নাড়া দেয়। প্রেম, বিরহ, ভালবাসা, দুঃখের এক মিশেল আছে তাতে। রবিউলের মনে পড়ে যায় শীতলক্ষ্যা নদীর কথা, সাজনপুর গ্রামের কথা, আসমার কথা। মনে পড়ে এরকমই এক বিকেলের কথা।

রবিউল নৌকার এক কোণায় বসে বৈঠা বায়। আরেক কোণায় বসে আসমা খুটখুট করে হাসে। রবিউলও তা দেখে হাসে। রবিউলের কেমন যেন নেশা নেশা লাগে সব। পুরো পৃথিবী মনে হয় যেন এই নদীতে শেষ হয়ে গিয়েছে। নদী না আসলে এই নৌকাতেই সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে তার পৃথিবী। আসমার ঠোঁটে হাসি লেগেই আছে। বাতাসে আসমার চুলগুলোও যেন হেসেখেলে বেড়াচ্ছে। রবিউল অবাক নয়নে মুগ্ধ হয়ে সব দেখে। হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হয়। এ যেন দুটি প্রাণের মিলনে ধরণীর আনন্দের কান্না। বৈঠা রেখে রবিউল ছাতা খুলে নৌকার মাঝে এসে বসে। আসমাও তার পাশে এসে বসে। নদীর পানিতে বৃষ্টির শব্দ মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনে রবিউল। বুকের ভেতর কেমন যেন ধুঁকধুঁক করতে থাকে রবিউলের। আসমার দিকে তাকায় সে। ধীরে ধীরে আসমার ঠোঁটের দিকে এগোয়। আসমাও সলজ্জে এগিয়ে যায়। দুজন দুজনের ঠোঁটে ভালবাসার চিহ্ন এঁকে দেয়। আস্তে আস্তে বৃষ্টি থেমে যায়। রবিউল ছাতা বন্ধ করে আকাশের দিকে তাকায়। এক স্নিগ্ধ, অপরুপ পরিচ্ছন্নতা আকাশে। এ যেন তার ভালবাসার মতোই নির্মল। রবিউল আসমার ঘাড়ে হাত রেখে চোখ বন্ধ করে জোরে নিঃশ্বাস নেয়। এই মুহূর্তের জন্যই যেন রবিউলের সৃষ্টি হয়েছে।    

রবিউলের শরীরের প্রত্যেকটা রক্তকণা যেন দাঁড়িয়ে উঠে আন্ডারপাসের মাথায়। চোখ বন্ধ করে সে পুরোটাই অনুভব করতে পারে। কিন্তু সাথে একটা বিরহ ও চলে আসে। রবিউল তার তক্তার দোকানে ফিরে আসে। গামছার নিচ থেকে তক্তার উপরে রাখা বাঁশিটা বের করে বাজাতে শুরু করে রবিউল। প্রেম আর বিরহের এক অপূর্ব মাদকতা তার সুরে।

চারিদিকে আওয়াজ, গ্যাঞ্জাম, কাদা-পানি, গাড়ি-ঘোড়া, হর্নের আওয়াজ আর মানুষের চ্যাঁচামেচি। আর এর মাঝেই রবিউল চোখ বন্ধ করে বাঁশিতে সুর তুলে যাচ্ছে।

কমেন্ট করুন
প্রাক্তন শিক্ষার্থী | মৎস্যবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সেশনঃ ২০১১ - ১২

সৌরভ মাহমুদ

সেশনঃ ২০১১ - ১২

0