ফিনিক্স

চারদিকে শুনশান নীরবতা। নীরবতার মাঝে থাকতে থাকতে আমি আবিষ্কার করেছি নিঃশব্দতারও নিজের একটা শব্দ আছে। কেমন যেন একটানা একটা আওয়াজ, বিরতিহীন ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকের মত অনেকটা। অথবা হয়ত কোন শব্দ নেই, পুরোটাই আমার নিরবধি অলস মস্তিষ্কের কল্পনা। কল্পনা আর বাস্তবের সীমারেখা আমার কাছে খুবই সূক্ষ্ম লাগে এখন। শেষ কবে এই বাড়ির বাইরে গিয়েছি আমার মনে পড়ে না। ধুলোর পুরু আস্তরণ পড়েছে সেই স্মৃতিতে। প্রতিটি দিনের অস্তিত্ব এখন আমার কাছে আর আলাদাভাবে ধরা পড়ে না। ক্যালেন্ডারের পাতায় লেখা কিছু সংখ্যার বাইরে তার কোন আলাদা তাৎপর্য নেই। বেঁচে থাকাটা এখন শুধুই অভ্যাস।

আমার একটা অসুখ আছে। খুবই অদ্ভুত রকমের একটা অসুখ। সূর্যের আলোতে আমার শরীর পুড়তে শুরু করে। অদ্ভুত না? শরীরজুড়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ফোসকা পড়তে দেখে আমি এটাকে শুরুতে সামান্য এলার্জি টাইপ কিছুই ভেবেছিলাম। আমার এই সমস্যার কথায় আমি যতটা না অবাক হয়েছিলাম তারচেয়ে বহুগুণ অবাক হয়েছিলেন আমার ডাক্তার। তার সেই অদ্ভুত অবাক অবিশ্বাসের দৃষ্টিটা এখনও আমার চোখে ভাসে। সেটা হয়ত তিনি সমস্যাটার ভয়বহতার গুরুত্বটা অনুধাবন করতে পেরেছিলেন বলেই। তারপর তিনি আমাকে নানা রকম পরীক্ষা নিরীক্ষা করলেন কিন্তু কিছুতেই এর কোন কারণ বের করতে পারলেন না। তিনি একটা তত্ত্ব অবশ্য আমাকে দিয়েছিলেন। অক্সিজেন রক্তের সাথে শরীরের প্রতিটি কোষে গিয়ে জমা থাকা খাদ্যকে পুড়িয়ে শক্তি উৎপাদন করে। তার ধারণা কোন অজানা কারণে সূর্যের আলোয় আমার শরীরে এটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। সহজ ভাষায় এরকম কিছু একটাই বলেছিলেন তিনি। কারণটা যদিও আমার কাছে তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু ছিল না। কারণের চেয়ে সমস্যাটাই আমাকে গ্রাস করে নিয়েছিল।

আমার ছোট্ট পৃথিবীটা ওলটপালট হয়ে যেতে খুব বেশি সময় লাগল না। আমার বেঁচে থাকার একমাত্র উপায় ছিল সূর্যের আলোর সংস্পর্শে না আসা। ফলশ্রুতিতে আমার দিনের আলোয় বের হওয়া বন্ধ হয়ে গেল। দিনের পর দিন কাটতে লাগল ঘরের ভেতর। শুরুতে সন্ধ্যা নামলে বাইরে বের হতাম। তারপর সেটাও একসময় বন্ধ করে দিলাম। মানুষ কেমন এক অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকাত আমার দিকে। কিছু চোখে সহানুভূতি থাকলেও বেশিরভাগ দৃষ্টিতেই মিশে থাকতো উপহাস আর ঘৃণা। আর থাকতো ভয়। কিছু মানুষ তো আমাকে মিথলজির ভ্যাম্পায়ারের বাস্তব রূপ হিসেবে ভাবতে শুরু করলো। এসব দেখতে দেখতে কবে যে আমি নিজেই নিজেকে একটা দানব হিসেবে কল্পনা করতে শুরু করেছিলাম টের পাই নি। নিজের প্রতি ভীষণ রাগ হত আমার। শেষ করে ফেলতে ইচ্ছে হত নিজেকে। মনে হত এ পৃথিবী বোধকরি আমার মতো দানবের জন্য নয়।

স্বভাবতই পরিচিত সবাই একে একে আমাকে ত্যাগ করতে আরম্ভ করলো। নিজের থেকে ভিন্ন কাউকে মেনে নেওয়ার ক্ষমতা স্বভাবগতভাবেই মানবজাতির কম। এ কঠিন সময়টাতে আমার পাশে ছিল শুধুমাত্র একজন মানুষ। আমার ভালবাসার মানুষ, রথি। এ অসুখ ধরা পড়ার আগে আমারও একটা স্বাভাবিক জীবন ছিল। ভালবাসা ছিল, ভালবেসে ঘর বাঁধার স্বপ্ন ছিল। রথিকে যখন আমি আমার অসুখের কথা বললাম তখন প্রথমে ও অনেকক্ষণ চুপ করে ছিল। ওর চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছিল ফোঁটা ফোঁটা অশ্রুজল। তারপর ও আমাকে জড়িয়ে ধরে কখনো না ছেড়ে যাওয়ার প্রতিজ্ঞার কথা বলেছিল। আমার বুকের ভেতর কাঁপতে থাকা ওর কথা বিশ্বাস করতে খুব ইচ্ছে হয়েছিল আমার। ও প্রায়ই আসত আমার কাছে, আমি ওর হাত দুটি শক্ত করে ধরে বসে থাকতাম। আমার দুলতে থাকা অস্থির পৃথিবীর মাঝে ওইটুকুই ছিল একমাত্র বাস্তব স্থিরতা। আমরা তখনও অদ্ভুতভাবে ঘর বাঁধার গল্প করতাম। ও হাসতে হাসতে আমাকে নাইট গার্ডের চাকরি নিতে বলত। আর ও হবে একটা কিন্ডারগার্টেনের টিচার। ওর কথাগুলো কেমন যেন অদ্ভুত জীবন্ত শোনাত। এত সুন্দর একটা চাঁদ থাকতে সূর্যের কী দরকার, বলত ও। ওর সাথে যেবার আমার শেষ দেখা সে রাতে আমরা ছাদে পাশাপাশি শুয়ে ছিলাম। ওর হাতে হাত রেখে তারাভরা আকাশ দেখতে দেখতে আমার মনে হয়েছিল এভাবেই বুঝি কাটিয়ে দেওয়া যায় সহস্র রাত। বেঁচে থাকার এক তীব্র আকাঙ্ক্ষায় পূর্ণ হয়েছিল আমার হৃদয়। ভালবাসা বোধকরি এভাবেই মৃত স্বপ্নেও প্রাণের সঞ্চার করে! তবে স্বপ্ন থেকে বাস্তবতার জমিনে নেমে আসতে খুব বেশি সময় লাগেনি। ওই দিনের পর রথির সাথে আর কোন যোগাযোগ হয়নি আমার। ব্যাপারটা খুব বেশি অস্বাভাবিকও ছিল না। ওর বাসার লোকেরা নিশ্চয়ই জেনে গিয়েছিল এ ব্যাপারে, আর জেনেশুনে কেউই একটা দানবের সাথে তাকে থাকতে দিতো না। তারপর থেকে আমি এভাবেই আছি। রথি চলে গেলেও অবশ্য একটা ব্যাপার আমার মাঝে জাগিয়ে রেখে গিয়েছিল। বেঁচে থাকার ইচ্ছে। জানি না এ বেঁচে থাকার ইচ্ছের উৎস কী। হয়তবা ওকে ভালবাসারই অভ্যেসটাই।

রাত গভীর হলে নিঃশব্দে বারান্দায় গিয়ে বসি। সত্যিকারের ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শুনতে খারাপ লাগে না। সারাদিন দরজা জানালা বন্ধ করে রাখতে রাখতে ক্লান্ত হয়ে গেলে মাঝেমাঝে জানালা খুলি। পর্দাটা আস্তে আস্তে সরিয়ে দিই। আমার সূর্যালোকে অনভ্যস্ত চোখজোড়া ঝলসে যায়। কয়েক মুহূর্ত আমি কিছুই দেখি না। তারপর আলো একটু সয়ে এলে হাতটা বাড়িয়ে দেই জানালা দিয়ে। আলো পড়ে আমার হাত জুড়ে। প্রথমে একটু জ্বালা করে, তারপর লাল হতে শুরু করে। ফোসকা পড়ার ঠিক আগমুহূর্তে আমি হাতটাকে ভেতরে নিয়ে আসি। এটা আমার নতুন খেলা, আমার এ আপাত নিস্তরঙ্গ জীবনে একমাত্র উত্তেজনা।

এটা করতে গিয়েই বহুদিন পর নতুন কোন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হলাম। অভ্যেস মতন একদিন জানালা দিয়ে হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছি। হঠাৎ খেয়াল করলাম একটা মেয়ে গাছের আড়াল থেকে তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। চোখেমুখে কৌতূহলের ঝিলিক। আমার বাড়ির এদিকটায় এখন আর কেউ তেমন একটা আসে না। আমার চোখে চোখ পড়তেও মেয়েটা চোখ ফিরিয়ে নিলো না, একদৃষ্টিতে তাকিয়েই রইল। আমি ভীষণ অবাক হলাম। মেয়েটার চোখে ঘৃণা, উপহাস কিংবা ভয় কোনটাই ছিল না, ছিল শুধু জানার ইচ্ছে। আমার এই অন্যমনস্কতার সুযোগে যে এদিকে হাতজুড়ে ফোসকা পড়া শুরু হয়েছে সেদিকে খেয়াল করিনি। টের পাওয়া মাত্র হাতটাকে ছিটকে ভেতরে এনে জানালা বন্ধ করে দিলাম।

এরপর থেকে প্রায়ই এমন হতে থাকল। আমি জানালা খুলে হাত বের করলেই দেখি মেয়েটা গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে। এটা যেন আমাদের নিত্যদিনের একটা খেলায় পরিণত হল। মেয়েটা এখন আর গাছের আড়ালে দাঁড়ায় না, সামনে আসে। আমরা চোখে চোখে কথা বলি। মেয়েটার নিদারুণ কৌতূহল মেটাতে আমি হাঁপিয়ে উঠি সময় সময়। চোখের ইশারায় যে এত কথা বলা যায় তা আমার জানা ছিল না। কত অল্প একটু সময় অথচ কত তার ব্যাপকতা।

একদিন মেয়েটা এসে দাঁড়িয়েছে। আমি অবাক হয়ে খেয়াল করলাম মেয়েটার চোখে জল। মেয়েটা কাঁদছে। আমার খুব ইচ্ছে হল মেয়েটার পাশে গিয়ে বসি, কোমল গলায় জিজ্ঞেস করি তার কী হয়েছে। আমার সেই ক্ষমতা নেই।
হঠাৎ আমাকে অবাক করে দিয়ে মেয়েটা প্রথমবারের মতো কথা বলে উঠল।
“সবাই আপনাকে যেরকম দানব বলে আপনি কি সত্যিই সেরকম কেউ?”
আমি তার কথার উত্তর দিলাম না। মেয়েটা আবার বলল,
“আপনি সবাইকে মিথ্যা প্রমাণ করে দিন।”


ওর কথায় আমার ভেতরটা কেমন যেন কেঁপে উঠল। শান্তি আর স্থিরতায় ভরে গেল সমস্ত ভেতর বাহির। মনে হল কতকাল পরে যেন কেউ আমার ওপর বিশ্বাস রেখেছে, খোলসের আবরণে থাকা আমার ভেতরের আমিটাকে দেখতে পেয়েছে। আমি জানি এর প্রতিদানে আমাকে কী করতে হবে।
“সবাইকে মিথ্যা প্রমাণ করে কী হবে? আমি বরং তোমাকেই সত্য প্রমাণ করি।”
বলে আমি দরজা খুলে বাইরে বের হয়ে এলাম। আমার সারা শরীরটা যেন দপ করে জ্বলে উঠল। সেদিকে ভ্রূক্ষেপ করার মতো সময় আমার নেই। আমি হাসিমুখে মেয়েটার দিকে এগিয়ে গেলাম। কান্না থামিয়ে মেয়েটা আমার দিকে তাকিয়ে আছে। তার চোখে ভয় নেই, আছে মায়া। অসম্ভব মায়া। আমার শরীর থেকে ধোঁয়া বের হতে শুরু করেছে, যে কোন মুহূর্তে আগুন জ্বলে উঠবে। মিথলজিতে ছাই থেকে পুনর্জন্ম নেওয়া ফিনিক্স পাখির কথা আছে। আমার এ মুহূর্তে বড্ড ফিনিক্স পাখির মতো হতে ইচ্ছে করছে। আবার জন্ম নিয়ে এ চোখভরা মায়া পোহাতে মন চাইছে। আমি যে বড্ড মায়ার কাঙাল!

কমেন্ট করুন
সিভিল ইঞ্জিনিয়ার | আহসানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

0