পার্থ

পার্থ, মহাভারতের অব্যর্থ ধনুর্বিদ অর্জুনের আরেক নাম। তসলিম স্যারের এই ডাকনামটি সম্পর্কে আমি স্নাতক চতুর্থ বর্ষের আগে অবগত ছিলাম না। বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে যখনই তসলিম স্যারকে নিয়ে আলোচনা করেছি তখনও প্রায় কখনোই আমরা পার্থ নামে তাঁকে সম্বোধন করিনি। কিন্তু আজ যখন স্যারকে নিয়ে সামান্য কিছু স্মৃতিচারণ করার প্রয়াস করছি তখন কোনোভাবেই পার্থ শব্দটিকে এড়িয়ে যেতে পারছি না।

তসলিম স্যার হয়তো অর্জুনের মতো ধনুর্ধর ছিলেন না, হয়তো আপাতদৃষ্টিতে অকুতোভয় বীর ছিলেন না, কিন্তু তিনি পার্থ নামের যথাযথ অধিকারী ছিলেন। পার্থ বা অর্জুন শব্দের মূল অর্থ সাদা, স্বচ্ছ, আলোকিত, বিশুদ্ধ। আমি বিশ্বাস করি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগ পরিবারের যে কোনো সদস্য এটি অকপটে স্বীকার করবেন যে তসলিম স্যার ছিলেন একজন স্বচ্ছ, আলোকিত, বিশুদ্ধ মানবের মূর্ত দৃষ্টান্ত।

তসলিম স্যারের শ্রেণিকক্ষে নিজেকে আবিষ্কার করার আগেই তাঁর গুণগ্রাম আমাদের মাঝে ছড়িয়ে যায়। বিভাগের জ্যেষ্ঠ ভাই বা বোনেরা কথায় কথায় স্যারের প্রসঙ্গ এলেই তাঁর মানবিক এবং শিক্ষকসুলভ স্বভাবের স্তুতি প্রকাশের কোনো কার্পণ্য করতেন না। তাই পরিসংখ্যান বিভাগের একজন গড়পড়তা ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও স্যারের ক্লাস করার একটা চাপা অভিলাষ আমার ভেতরে ছিল এবং তৃতীয় বর্ষে ‘টেস্ট অফ হাইপোথিসিস’ কোর্সে সেই সুযোগ হাতে এসে ধরা দেয়। প্রথম ক্লাসেই স্যারের সহজ, সৌম্য আর বিনয়ী স্বর শুনে নিশ্চিত হই তাঁর বিষয়ে শোনা বন্দনাবাক্যগুলো অমূলক নয়। যতই তাঁকে আরও আবিষ্কার করতে থাকি ততই সে ধারণা বদ্ধমূল হতে থাকে এবং কিছুদিনের মধ্যে আমার অনুজপ্রতিমদের কাছে আমিও স্যারের সম্পর্কে প্রশংসাসূচক বাক্যগুচ্ছ পাচার করতে থাকি। পাঠদানের ব্যাপারে স্যার ছিলেন নিষ্ঠাবান এবং উদারমনা। ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে পরিসংখ্যানের বিষয়গুলো সহজপাচ্যরূপে উপস্থাপন এবং তাদের সাথে পাঠ্য এবং পাঠ্যবহির্ভূত নানা বিষয়ে খোলামেলা আলোচনার গুণে মুগ্ধ হয়ে শুধু আমিই না, আমার সহপাঠীদের প্রত্যেকেই স্যারকে পরম শ্রদ্ধার আসনে অধিষ্ঠিত করতে বাধ্য হয়; একজন গুণী শিক্ষক এবং উষ্ণ হৃদয়ের অধিকারী হিসেবে।

স্যার ছিলেন অত্যন্ত ছাত্রবান্ধব। ক্লাসে এবং ক্লাসের বাইরে ছাত্র-ছাত্রীদের যে কোনো সমস্যা, অভিযোগ-অনুযোগ তিনি মন দিয়ে শুনতেন। নিজের এখতিয়ারে থাকলে সেগুলো সমাধানের চেষ্টা করতেন। কিন্তু আমার মনে হয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে তাঁর সম্মানের ভিতটি আরও পোক্ত হয়েছে সেই আচরণগুলোয়, যেগুলো ফুঁটে উঠত সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে তাঁর অপারগতায়। মিষ্টি হাসি হেসে তিনি ছাত্র-ছাত্রীদের বাস্তবতার কথা বলতেন, মানিয়ে নিতে বলতেন, বলতেন ধৈর্য ধরতে; এসব ক্ষেত্রে স্যারের একটি প্রিয় বাক্য ছিল, ‘কী আর করবেন বলেন!’ বিশেষ করে পরিসংখ্যানের মতো তাত্ত্বিকভাবে ভারী একটি বিজ্ঞানের বিভাগে স্যারের ধীরস্থির কণ্ঠনিসৃত আশ্বাসসূচক কথাগুলো আমার মতো গড়পড়তা ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য জমজমের পানির মতোই প্রশান্তিদায়ক ছিল। ছাত্র-ছাত্রীদের বিভিন্ন ব্যাপারে তাঁকে কখনোই রাগতে দেখিনি। বিনয়ের চাদরে ঢাকা তসলিম স্যারের কথাগুলো শিক্ষার্থীদের আর প্রেরণা যোগাবে না, সান্ত্বনার স্থৈর্যে বাঁধবে না, একথা ভাবতেই মনটা প্রচণ্ড বিষণ্ন বোধ করে।

একদিন ইন কোর্স পরীক্ষা চলছে। পরীক্ষাকেন্দ্রে কর্তব্যরত শিক্ষকদের মধ্যে তসলিম স্যার একজন। পরীক্ষার মাঝে হঠাৎ করেই স্যার আমার সামনে এসে আমাকে ডাকলেন। বললেন, ‘জাহিদ সাহেব, পরীক্ষা দিয়ে আমার রুমে একটু আসবেন তো, কথা আছে।’ আমি তো ভাবনায় পড়ে গেলাম। “কী ব্যাপার! কোনো ঝামেলা করলাম নাকি আবার!”, দুশ্চিন্তা ছেঁকে ধরল। পরীক্ষা শেষ করেই স্যারের ঘরে গেলাম। স্যার স্বভাববশতই তাঁর ঘরে আমাকে স্বাগত জানালেন। জিজ্ঞাসা করলেন, ‘জাহিদ সাহেব, আপনি নাকি খুব ভালো গান গান?” আমি তো একেবারে হতবাক। আমি বিভাগের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান গেয়েছি কিন্তু স্যার তো কখনোই সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। আমি প্রশ্ন করলাম, ‘স্যার আপনি কোথ্বেকে জানলেন?’ স্যার বললেন, ‘শুনলাম অনেকের কাছে। কথা কি সত্য?” আমি বললাম, ‘স্যার চেষ্টা করি টুকটাক। ঐরকম কিছু না।’ স্যার জানতে চাইলেন আমার গানের কোনো রেকর্ড আছে কি না। আমি বললাম, ‘স্যার আপনি কোন ধরনের গান শুনে থাকেন?’ স্যার বললেন, ‘আমি ভজন থেকে শুরু করে হেভি মেটাল পর্যন্ত সবই শুনি।’ আমার মোবাইলে তখন ঘরোয়া পরিবেশে রেকর্ড করা বিভিন্ন গানের মিশ্রণে একটি মেডলি বা পাঁচমিশালী ছিল। স্যারকে সেটাই দিলাম আর বললাম শুনে জানাতে।  দুই-একদিন পর স্যারের ঘরে গেলাম। স্যার বললেন, ‘আরে জাহিদ সাহেব, আপনি তো মারাত্মক শিল্পী। আমি তো মুগ্ধ হয়ে শুনলাম, খুবই ভালো গাইছেন। নিয়মিত চর্চা-টর্চা করেন নাকি?’ আমি বললাম, ‘না স্যার, এমনিই গাই।’ স্যার বললেন আমার কণ্ঠের যত্ন নিতে। গায়ক হিসেবে জীবনে গুটিকয়েক গর্বিত মুহূর্ত আমার আছে। কিন্তু স্যারের কণ্ঠে নিজের প্রশংসা শোনার সেই মুহূর্ত পরিসংখ্যান বিভাগে অধ্যয়নকালীন সময়ে শিল্পী হিসেবে আমার সেরা মুহূর্ত। স্যারকে এরপরেও আমার দু-একটা সৃষ্টিশীল কাজ আমি দেখিয়েছি বা শুনিয়েছি এবং প্রত্যেকবারই স্যার এগুলো চালিয়ে যাওয়ার উৎসাহ দিয়েছেন। এবং অন্যান্যদের কাছ থেকেও আমি শুনেছি যে স্যার সবসময়ই এভাবে তাদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন।

পার্থ শব্দটির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে আরেকটি শব্দ, সারথি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের কাজী মোতাহার হোসেন পরিসংখ্যান ক্লাবের সারথি ছিলেন তসলিম স্যার। পরিসংখ্যানের আপাত ম্যাড়মেড়ে বিষয়গুলো ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে নতুন মোড়কে উপস্থাপন করা, বাইরের জগতের সাথে পরিসংখ্যানের সম্পর্কগুলো শিক্ষার্থীদের গোচরে আনা  এবং শিক্ষাক্রমের বাইরের দুনিয়ার বিভিন্ন কার্যক্রমে পরিসংখ্যানের শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধ করার একটি মাধ্যম এই ক্লাবটি। একজন স্বপ্নবাজ সারথির মতো স্যার হাটি হাটি পা পা করে ক্লাবটিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন, অনেক স্বপ্ন ছিল স্যারের ক্লাবটিকে নিয়ে। ক্লাবটি নিঃসন্দেহে তাঁর সারথির অভাব অনুভব করবে। তবে স্যারের স্বপ্নকে সার্থক করে, তাঁর সারথির স্পৃহাকে লালন করে ক্লাবটি দুর্নিবার ক্ষিপ্রতায় এগিয়ে যাবে, এই প্রত্যাশা রাখছি।

স্যারের সাথে শেষ দেখা হয়েছিল করোনাকালের একদম শুরুতে। ভেবেছিলাম করোনাকালীন অস্বাভাবিক পরিস্থিতি শেষ হলে স্যারের সাথে আবার দেখা করব। স্বভাবসুলভ হৃদ্যতা, উষ্ণতা ও আন্তরিকতায় মাখা তাঁর সান্নিধ্য থেকে যে বঞ্চিত হব একথা মেনে নিতে মন প্রচণ্ড বাদ সাধছে। তসলিম স্যারের অকাল প্রয়াণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগে যে এক গভীর শূন্যতার সৃষ্টি করেছে, এ ব্যাপারে আমি প্রায় নিঃসংশয়। স্বচ্ছতা, শুদ্ধতা, নিষ্কলুষতার রথের সারথি হিসেবে তিনি যে পথ আমাদের দেখিয়েছেন সে পথে যেন চিরকাল হাঁটতে পারি, ছাত্র এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে স্যারের প্রতি এটিই আমার গুরুদক্ষিণা।

কমেন্ট করুন
শিক্ষার্থী | পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সেশন: ২০১৩ - ২০১৪

জাহিদ নূর

সেশন: ২০১৩ - ২০১৪

0