গেস্ট রুম

দরজা খুলেই হতবাক দিয়া। এই মোবাইলের যুগেও যে কেউ ফোন না করে আসতে পারে এটা বিস্ময়কর! তবুও হাসিমুখে বলতে হল,

আসুন, ভিতরে আসুন।

দিয়ার বড় জা আর একমাত্র ছেলে তমাল। সুতি প্রিন্টের শাড়ি যথাসম্ভব পরিপাটি করে পরেছেন ভদ্রমহিলা। আর তমালও চুলে মোটেই তেল মেখে গ্রাম্য সরল ছেলেটি নয় বরং শ্যাম্পু করা চুল বলেই মনে হচ্ছে। যদিও চেক শার্ট আর কালো হাফ প্যান্টটাই মেরে দিয়েছে। হাল ফ্যাশন সম্পর্কে এরা জানবেই বা কি মানবেই বা কি !

আরে দাঁড়িয়ে কেন? বসুন।

এক চিলতে বারান্দা কাম ড্রইং কাম ডাইনিং-এ বসালো দিয়া। বেশ কুণ্ঠিত ভঙ্গিতে বসলেন দিয়ার জা। দুই গ্লাস ঠান্ডা পানি ট্রেতে এনে দিয়াও বসল। ঢকঢক করে দুজনেই পানিটা খেয়ে নিল।

ফজরের ওয়াক্তে চারটে খেয়ে বেরিয়েছে। খিদেও পেয়েছে ভয়ানক। কিন্তু এই মহিলা কী করবে বলা মুশকিল। মনে মনে ভাবছে তমাল।

হঠাৎ কী মনে করে ভাবী?

তমালের পরশু জেলা স্কুলে ভর্তি পরীক্ষা। আমি ফয়সালকে ফোন করেছিলাম…।

উফ ! এই লোকটা আমার জীবন ধ্বংস করে দেবে। মনে মনে গজ গজ করে দিয়া। ফোনে বলে দিলেই হত আমরা বাসায় থাকছি না। এখন এই স্কুলে চান্স পেলেই তো এখানেই উঠবে এই ছেলে। একটা বাড়তি মানুষের খাবার রান্না করা, কাপড় ধোয়া কম কথা? এটা কি ঐ গর্দভ বোঝে? রাগে মাথা ফেটে যাবে মনে হচ্ছে দিয়ার।

মোটে দুটো ঘর আর এক চিলতে ড্রইং ডাইনিং। একটা ঘরে দিয়া, ফয়সাল আর একমাত্র মেয়ে ফাইজা থাকে। আরেকটা ঘর আপাতত ফাঁকা। মাঝে মাঝেই অসুস্থ হয়ে পড়েন দিয়ার বাবা মা তখন এসে থাকেন। চিকিৎসা করান। মেয়ে জামাই চেম্বারে চেম্বারে দৌড়ায়, ওষুধ পথ্য কিনে দেয়।

ঐ রুমের কোন স্থায়ী বাসিন্দা চায় না দিয়া। আর কেনই বা চাইবে? ফ্ল্যাটের এককালীন টাকা দেয়ার সময় ফয়সাল নিজের ভাগের জমি বিক্রি করতে চেয়েছিল। তখন বড় ভাই বললেন এই জমির আয় দিয়েই তার সংসার চলে। ছেলে মেয়েদের খাওয়া পরা, পড়াশোনা চলে। তখন ফয়সাল আর কিছু বলতে পারেনি। দিয়ার বাড়ির লোকেরাই লোন দিয়ে সাহায্য করেছে। আর এখন এরা এসেছেন সুবিধা নিতে।

-কী এত ভাবছ দিয়া? খুব কি অসুবিধা করে ফেললাম তোমাদের?

-না না ভাবী। আসলে, ও আমাকে বলেনি যে আপনারা আসবেন।

-সেকি? এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন তো ফয়সাল কখনো ছিল না। হয়ত কাজের চাপে ভুলে গেছে।

-আপনারা বসুন। আমি আপনাদের খাওয়ার ব্যবস্থা করি।

-এই ব্যাগটা ধর। এতে ফয়সালের প্রিয় কিছু পিঠা আছে।

উফ আদিখ্যেতা ! আবার ঢঙ দেখানো হচ্ছে। ভ্রু কুঁচকে পিঠার ব্যাগটা হাতে নেয় দিয়া। কতটা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন কে জানে।

রান্নাঘরে গিয়ে দ্রুত ভাত বসিয়ে দিয়ে, ফ্রিজ ঘেটে গত রাতের তরকারি বের করে গরম করতে দিল ওভেনে। দুশ্চিন্তায় মাথা কাজ করছে না দিয়ার।

খাওয়া শেষে মা ছেলে গড়িয়ে নিচ্ছে বিছানায়।

এ দিকে ফোনেই তুমুল ঝগড়া সেরে নিয়েছে দিয়া! স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে তমাল আর মা।  ফয়সাল ইচ্ছা করেই চেপে গেছে। যখন ওরা আসবে দিয়া দেখতেই পাবে। আগেই অশান্তি করার তো কোন মানে হয় না।

বিকেলে অফিস থেকে ফেরার পথে এক গাদা নাস্তা আর কাঁচা বাজার কিনে এনেছে ফয়সাল। ভাবী, ভাতিজাকে নিয়ে একেবারে গদগদ। ভাতিজাকে কোলে নিয়ে নানা প্রশ্ন। ঘুরে বেড়ানোর প্ল্যানও করে ফেলছে। রান্না ঘরে ঢুকে দিয়া অবাক। সব থালা বাসন মাজা শেষ করে কাঁচা বাজার নিয়ে বসেছেন ভাবী।

-আরে ভাবী একি করেছেন?

-ফয়সাল অনেক দিন আমার হাতের রান্না খায় না। তোমরা তো গ্রামে যাওয়ার সময় পাও না। তাই ভাবলাম…

আহ! ছেলেকে ঘাড়ে চাপানোর মতলব করে এখন ভালো মানুষ সাজা হচ্ছে? কথাটা অবশ্য দিয়ার মনেই রইল। এক দিক দিয়ে ভালোই হল। দুচারদিন রান্নার ঝামেলা থেকে মুক্তি পেলে খারাপ কী?

ফাইজাকে পড়াতে বসল দিয়া। এবিসিডি, রাইমস ভালোই পারে। খুব চটপটে। আগামী বছর স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেবে মেয়েকে। তাড়াতাড়ি পড়া শেষ করে তমালের গ্রামের খেলার গল্প শুনতে যেতে বায়না ধরেছে।

ফয়সাল রুমে ঢুকেই বলল,

-তুমি আজ অন্তত মেয়েটাকে খেলতে দাও। আর ভাবী এভাবে একা একা রান্নাঘরে কাজ করবে। এটা কেমন দেখায়?

-ভাবীই তো বললেন তোমাকে নিজের হাতে রেধে খাওয়াবেন।

-তাহলে তুমি তমালের জন্য নুডলস বা চিকেন ফ্রাই কর।

-করতে তো হবেই।

-এভাবে বলছ কেন?

-জেলা স্কুলের ভর্তি পরীক্ষায় চান্স পেলে তমাল কোথায় থাকবে?

-কেন? এই বাসায়? একটা রুম তো পড়েই থাকে।

-তাহলে বাবা, মা এসে কোথায় থাকবে?

-কেন? তোমার তিন ভাই এই শহরেই থাকে, সেখানে থাকবেন।

-ও! তার মানে বলছ আমার বাবা মার কোন অধিকার নেই এ বাসায় থাকার?

-না তা কেন? এতদিন তো ছিলেন। আমার সাধ্যমতো করেছি, তোমাকেও বাধা দেইনি কখনো। এখন আমাদের এই বিষয়টা উনারা অবশ্যই বুঝবেন। আমাকে এই ভাই, ভাবী মানুষ করেছেন। আমারও দায়িত্ব আছে।

-বুঝেছি। সব তোমার ষড়যন্ত্র।

-কীসের ষড়যন্ত্র? এখন অশান্তি করো না প্লিজ। ভাবী শুনতে পেলে কষ্ট পাবে।

রাতে খুব তৃপ্তি করে খেল ফয়সাল।

-আহ! কতদিন পর। সেই ছোটবেলার স্বাদ। ফয়সাল বলে।

-তোমরা তো বিয়ের পর একবার গ্রামে গেলে। আর তো ঐ পথ মাড়ালেই না। ভাবীর কণ্ঠে অভিমান।

না ভাবী। আসলে ফাইজাকে নিয়ে যাওয়াটা ঝামেলা। ও আবার সব জায়গার পানি এডজাস্ট করতে পারে না।

প্রসঙ্গ বদলাতে ফয়সাল বলে,

-তোমার মেয়েদের কী খবর?

বড় মেয়েটা এবার এসএসসি দেবে আর মেঝটা ক্লাস এইটে।

-বাহ! ওদের পড়িও। তাড়াতাড়ি বিয়ে দিয়ে বিদায় করার চেষ্টা করো না।

-নাহ! তা কেন? আমি সবসময় চেষ্টা করি ওরা একটু ভালো ভাবে পড়ুক, কাজ শিখুক। রান্না, সেলাই সব শিখে গেছে। ওদের হাতের কাজ দেখলে মুগ্ধ হয়ে যেতে। ছেলেটার জন্যও তো কম করলাম না। এখন আল্লাহ মুখ তুলে চাইলে হয়।

-ইনশাআল্লাহ হয়ে যাবে। তমালকে দেখেই বোঝা যায় ও খুব মেধাবী।

হঠাৎ দিয়ার দিকে চোখ পড়তেই ভাবী বললেন,

-দিয়া অমন মুখ ভার করে ভাত নাড়াচাড়া করছ কেন? রান্না ভালো হয়নি?

-না না ভাবী। রান্না খুব ভালো হয়েছে। ঐ একটু এসিডিটি।

-ওহ তাহলে কি একটু ঠান্ডা দুধ খাবে পানি আর চিনি মিশিয়ে? এনে দেব? নাকি ইসবগুল গুলিয়ে দেব?

-না না, আমি ওষুধ খেয়ে নেব। বলে উঠে পড়ল খাবারের টেবিল থেকে।

দুইদিন রান্নাঘর থেকে পূর্ণ ছুট ছিল দিয়ার এমনকি দুবেলা চা ও ভাবীই করেছে। চায়ের সাথে ভাবীর আনা পিঠা বেশ আয়েশ করে খাচ্ছে ফয়সাল। কিছুতেই সমস্যাটা বুঝতে পারছেনা দিয়া, ভাবী কি প্রমাণ করতে চায়?  দিয়া অলস? ভোরে উঠেই গরম গরম ভাত, তরকারি,  রুটি, সবজি, রান্না করছে ভাবী। যা দিয়া স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারে না।

সকালে ঘুম থেকে উঠে কফি হাতে বারান্দায় বসে এলোমেলো ভাবছিল দিয়া।

-একটু বসি? ভাবীর প্রশ্ন।

-হ্যাঁ হ্যাঁ। প্লিজ। একটু হাসির ভঙ্গিতে বলার চেষ্টা করল দিয়া।

-আমি বুঝতে পারছি তোমাদের বড় অসুবিধা করে ফেলেছি। ফয়সাল যদি আমাকে ফোনে বলত তবে আমি তমালকে পরীক্ষার দিন সকালে আনতাম। বিকেলে বাড়ি ফিরতাম।

-না না, সেসব কিছু না। তমাল চাচার বাসায় আসতেই পারে, থাকতেই পারে।

-তাহলে ফাইজাকে একটু খেলতে দাও না কেন?

-ঐ ছোট মানুষ। কখন মারামারি করে…

-আচ্ছা যা ভালো মনে কর। তোমাদের চায়ের পানি বসালাম।

বলে চেয়ার থেকে উঠলেন ভাবী।

-আমারটা বাদে, দিয়া বলল। আমি কফি খাচ্ছি। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাহিরে তাকিয়ে রইল দিয়া।

ভর্তি পরীক্ষার দিন সকালে ফয়সালকে আর ডাকতে হল না। নিজেই উঠে নাস্তা করে তৈরি, ভাইপোকে পরীক্ষা দিতে নেওয়ার জন্য। দিয়া নিস্পৃহ ভঙ্গিতে দেখল চুপচাপ। কিছু বলল না। নাস্তা না করেই ঘরে দরজা দিল।

পরীক্ষা দিয়ে, বাহিরে খেয়ে, শিশু পার্কে বেড়িয়ে সন্ধ্যায় বাসায় ফিরল ফয়সাল, তমাল, ফাইজা। বাসার থমথমে পরিবেশ আন্দাজ করেই সে দিনটা বাহিরে কাটানোর প্ল্যান করেছিল।

রেজাল্ট একদিন পরেই দিল। তমালের চেয়ে দিয়ার টেনশন বেশি। ঘরময় পায়চারি করে বেড়াচ্ছে। তমাল আর ফয়সাল গেছে স্কুলে রেজাল্ট জানতে। রেজাল্ট শুনে ফিরে তো হুলুস্থুল কাণ্ড। আজ রান্না বন্ধ। সবাই মিলে চাইনিজ খাওয়া হবে। ফাইজা তো নাচানাচি আরম্ভ করে দিয়েছে। দিয়াও হতবাক। সেখানে এত কোচিং, টিউশন করেও বাচ্চারা চান্স পায় না, সেখানে তমালের মত ছেলে কিভাবে চান্স পেল? আজব কাণ্ড। আজ তাকে শাড়ি পরতে হল। ভাবীকে একটা নতুন শাড়ি ধার দিতে হল। সাজতেও হল। সবার আনন্দে সামিল হয়ে উঠেছিল নিজের অজান্তেই।

এবার বিদায়ের পালা, ক্লাস শুরু হবে জানুয়ারি মাসের বিশ তারিখে। এ কদিন গ্রামে গিয়ে গোছগাছ সেরে ফিরবে।

-এত গোছগাছের কী আছে? এখানে তো সব গোছানোই আছে। ফয়সালের প্রশ্ন।

-ও তো এখানে থাকছে না। ঘরে বাজ পড়লেও এত চমকাতো না দিয়া।

-কী বলছ ভাবী? ও কোথায় থাকবে? আহত স্বরে প্রশ্ন করে ফয়সাল।

-ওর গ্রামের স্কুলের অংকের শিক্ষকের ছেলে এখানে কলেজে পড়ে। মেসে থাকে। ঐ ছেলের সাথে থাকবে। ছেলেটার চোখের অসুখ আছে। ভালোমত দেখতে পারে না। চলাফেরা, বাজার, রান্না করতে সমস্যা হয়। তমাল ওখানে থাকবে, সাহায্য করবে। নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যাবে। ওর অংকের শিক্ষকের অনুপ্রেরণাতেই আজ এই পর্যন্ত এসেছে ছেলেটা। দিন রাত এক করে ছেলেকে পড়িয়েছেন। উনার মত মানুষকে পারিশ্রমিক দেয়ার সামর্থ্য নেই আমাদের। এখন এই প্রতিদান দিতেই হবে।

-তাই বলে ফুট ফরমায়েশ খেটে দিন কাটাবে? ফয়সাল জিজ্ঞেস করে।

-আর পড়ার খরচ? দিয়ার প্রশ্ন।

-আমরাই দিব। দৃঢ়  কণ্ঠ ফয়সালের!

-তোমার ভাই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

-না না, এ হয় না… ফয়সাল বলে উঠল।

-কেন হয় না? অবশ্যই হয়। বরং সম্মানের সাথে কাজ করে শহরে থাকার সুযোগ পাচ্ছে তমাল। আসি তাহলে দিয়া। তিনদিন অনেক অসুবিধা করেছি তোমাদের। এভাবে আসাটা আসলে উচিত হয়নি। ভালো থেক।

ফয়সাল ঐ অতিরিক্ত ঘরটাতে তালা মেরে রেখেছিল পুরো দশ বছর। দিয়া ফয়সাল কারো আত্মীয়ের জন্য ঐ রুম কখনো খোলা হয়নি। ফাইজা বড় হলে ওকে রুমটা খুলে দেওয়া হয়।

কমেন্ট করুন
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ

0