খুনির ডায়েরি

২১/০৭/২০০১ ইং

বিলাইমারি থানা, চান্দুরা, টাংগাইল

সকাল  ১০:০০ টা

বিলাইমারি থানার পেছনের ভাগাড়টা প্রতিদিন ফাঁকাই পড়ে থাকে। এমনিতেই মূল রাস্তা থেকে কিছুটা দূরে তার উপর থানার গেইটে ঢুকে ময়লা ফেলতে হয়। আর গ্রামের লোক পারতপক্ষে থানার কাছ ঘেষতে চায় না। অন্যদিকে পুলিশরাও অতদূর হেঁটে আসার বিলাসিতার চেয়ে রাস্তায় ফেলতেই বেশি পছন্দ করে। তবে আজকের ঘটনা ভিন্ন। বেশ ভিড় লক্ষ করা যাচ্ছে ভাগাড়টা ঘিরে। কারণ আর কিছুই না একটা লাশ। তবে পুলিশ সদস্যদের বলে দেয়া আছে কাউকেই ধারে কাছে না আসতে দিতে। লাশকে ঘিরে এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছেন থানার ওসি হারুন সাহেব। এই জায়গায় লাশ কী করে এলো এই নিয়েই তার চিন্তা করা উচিত ছিলো কিন্তু তিনিসহ সবাই চিন্তিত অন্য এক বিষয় নিয়ে।

-“মারছেটা কেমনে দেখছেন? ১৪ বছর পুলিশের চাকরি কইরাও এমন ভাবে কোনো খুন হইতে দেখি নাই। কোনো মানুষের পক্ষে এইটা সম্ভব না। এইগুলান হইলো জ্বীন ভূতের তেলেসমাতি কাণ্ড। খুঁইজা দেখেন নিশির ডাকে সাড়া দিয়া বাইর হইছিলো। আমার এক দাদারে মারছিলো নিশি ভূতে এমন কইরা”, কন্সটেবল সিদ্দিকের কাঁধে হাত রেখে বলছিলো আরেক কন্সটেবল জয়রাম সরকার।

জয়রামের কথা কানে এসেছে ওসি হারুনেরও। কথা জয়রাম খুব একটা ভুল বলেনি। উনি নিজেও এমন কিছু দেখেননি, অন্তত এতটা নৃশংস খুন তো নয়ই।

লাশটার প্রতিটি অঙ্গ আলাদা আলাদা করে কাটা হয়েছে। হাত-পা প্রতিটি জয়েন্টে কেটে দুই খণ্ড করে মাটিতে পুতে দেওয়া হয়েছে। আর তার মাঝে মাথাটা কেটে রাখা হয়েছে। অনেকটা চতুর্ভুজের ভেতর বৃত্তের মতোন। উপরের দিকে তাক করে রাখা হাতের মুঠোয় রাখা আছে খণ্ড বিখণ্ড হার্ট। বলে দেয়ার কোনো প্রয়োজনই পড়ে না যে মৃত ব্যক্তির হার্টটাকেই কেউ একজন প্রবল আক্রোশে কুপিয়ে ছিন্ন ভিন্ন করে তার হাতেই ধরিয়ে দিয়েছে। চারদিকে লাল রক্তের ধারা দিয়ে তৈরি করা হয়েছে ১১টা বৃত্ত। রক্ত শুকিয়ে এখন অবশ্য কালচে ভাব ধারণ করেছে। ১১টা বৃত্তের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে দেহের বাকি অংশগুলোও। মুখেও এসিড এমন ভাবে ঢালা হয়েছে  চেনার কোনো উপায় নেই। চোখ নাক কান সবগুলোই জ্বলে গেছে। নৃশংসতার চূড়ান্ত যাকে বলে।

ওসি হারুন নিজে খুব কষ্টে বমি আটকে রেখেছেন বাকিদের সামনে মান সম্মান খোঁয়ানোর ভয়ে। এমনিতেই চাকরির মেয়াদ আছে আর মাস সাতেক। এই বয়সে এসব আর সহ্য হয় না। তবে এটুকু বুঝে গেলেন এখানে তিনি আর বেশিক্ষণ থাকতে পারবেন না। তাই জয়রামকে লাশ মর্গে পাঠাতে বলে আর উপর মহলে জানিয়ে সরে পড়তে নিতেই ব্যাপারটা তার প্রথম চোখে পড়লো। লাশের বুকের অংশটুকু সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে এক কোণায় পড়ে আছে আর তার মাঝে বিশাল এক গর্ত। ঠিক যেখান থেকে হৃৎপিণ্ডটা কেটে বের করে নেয়া হয়েছে সেখান থেকেই পলিথিন জাতীয় কিছু উঁকি দিচ্ছে। সিদ্দিক একটু গাইগুই করলেও হারুন সাহেবের বিশাল একটা ঝাড়ি খেয়ে পলিথিন টান দিতেই বেড়িয়ে আসলো একটা ডায়েরি। বেশ যত্নেই রাখা হয়েছে। ডায়েরিটা হাতে নিয়ে চলে গেলেন হারুন সাহেব প্রমাণ খোঁজার জন্য।

রাত ১২:০০টা

রাতের বেলা বউয়ের সাথে বেশ একচোট ঝগড়া করে হারুন সাহেব আলাদা শুতে এসেছেন। তবে, মশার প্যানপ্যানানিতে সে আশা শুন্যের কোটায় গিয়ে ঠেকেছে।

ঘুমের আশা ত্যাগ করে তাই ডায়েরিটা নিয়ে বসলেন। অল্প সময় পড়েই তার সমস্ত মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে পড়লো ডায়েরিটা।।

এই ডায়েরি যদি কখনো কারো হাতে পড়ে থাকে তার দুইটি অর্থ হতে পারে। ১. আমি মারা গেছি,  ২. আমি আমার আজন্ম জমিয়ে রাখা মিশন আর মাকে দেয়া কথা রাখতে পেরেছি। তবে দুইটির যেটাই হোক না কেন আমি অবশ্যই কারো ধরা ছোঁয়ার নাগালের মাঝে নেই ইতিমধ্যে। যাই হোক এবার আমার মিশনের কথাটা বলি। গল্পের শুরুটা আজ হতে ৩০ বছর আগে, ১৯৭১ সালে। বিলাইমারি গ্রামে বাস করতো আমার পরিবার। ২৫শে মার্চের পর যুদ্ধের আঁচ বাকি সব জায়গার মতো বিলাইমারিতেও লাগে।মিলিটারী এসে আস্তানা গাঁড়ে বিলাইমারী থানাতেই। আমার বাবা হাকিম মুন্সিসহ আরো কয়েকজন মিলিটারীকে আটকাতে স্থানীয় গেরিলা বাহিনী গঠন করেন। তখনকার চেয়ারম্যান লিয়াকত আলীও ছিলেন তাদের সাথে। কিন্তু নিজেকে বাঁচাতে বিশ্বাসঘাতকতা করেন দলের বাকিদের সাথে। থানার সেই ক্যাম্পে আমার বাবাসহ ১১ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয় ও লাশ ভাগাড়ে ফেলে রাখা হয়। আর্মির ক্যাম্প থেকে লাশ আনার সাহস কারোরই ছিলো না, কাজেই লাশ আর শেষ পর্যন্ত কেউই পেয়ে উঠে নি। এ ঘটনার পর আমার মা পাগল হয়ে যান। শুধু যখনই দেখতেন তখনই বলতেন, “বাবা তুই বদলা নিবি না বাবা? তোর বাপটারে মাইরা ফালাইলো। মানুষটা বেগুনের সালুন দিয়া ভাত খাইতে চাইছিলো। লোকটার পেটে তো খিদা রইয়া গেলোরে বাপ।”

এই যন্ত্রণা অবশ্য তাকে বেশিদিন বইতে হয়নি। এর পাঁচ বছর পরেই মা মারা যায় তবে তার আগে ওয়াদা করিয়ে নেন যে আমাকে আমার পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নিতে হবে।

মার মৃত্যুর পর আমি ঢাকায় চলে আসি ও এক দয়ালু লোক আমাকে নিয়ে এতিম খানায় ভর্তি করে দেন। সেখানে এক দম্পতি আমাকে পালক নিয়ে চলে যান। শুরু হয় আমার নতুন জীবন। স্কুল, কলেজ, ভার্সিটি, পার্টি সবকিছুর মাঝে নিজের জীবনকে মানিয়ে নিয়েছিলাম। এতোকিছুর মাঝেও মাকে দেয়া কথা ভুলতে পারি নি কোনোদিন। কয়েকবছর ধরে প্ল্যান করেছি। মানুষকে শারীরিকভাবে কষ্ট দেয়ার যতো উপায় আছে, বিকৃত যতো পদ্ধতি আছে সব শিখেছি। মিলিটারী টর্চার ট্রেনিংও করেছি শুধু ওই মানুষরূপী নরপশুটাকে শাস্তি দিতে। কিন্তু কাজটা করার সাহসই করে উঠতে পারছিলাম না। কী একটা যেনো পেছন থেকে টেনো ধরছিলো। কিন্তু ১ মাস আগে মা আমার সপ্নে দেখা দিয়ে তাকে দেয়া কথা মনে করিয়ে দিতেই বুঝতে পারি সময় এবার হয়ে এসেছে। এই সময়ে আমি ঢাকার একটি হোটেলে বসে থাকলেও লিয়াকত আলীর সব খবরাখবর আমার হাতে। বেশি কিছু করতে হয় নি তার এক চাটুকারকে কিছু টাকা দিতেই সারাদিনের ফিরিস্তি শুনিয়ে দিয়েছে। যদিও তার সন্দেহ হয়েছিলো কিন্তু ক্রাইম রিপোর্টার এর ভূয়া পরিচয় দিতেই আর কোনো ঝামেলা হয় নি। যদিও ওর পরিচয় প্রকাশ পাবে না এমন কথা দিতে হয়েছে। যাই হোক এবার আমি তৈরি। অপেক্ষা শুধুই আঘাত হানার।

এরপর বেশ কয়েক পৃষ্ঠার বিরতি মাঝে মাঝে কয়েকটা মানুষ, রক্ত, সিম্বল, নদী ইত্যাদির ছবি আঁকা। আনুমানিক দশ থেকে বারো পৃষ্ঠা পার হয়ে হারুন সাহেব আবার নতুন লেখার দেখা পেলেন।

এই মুহুর্তে আমি আমার ডায়রিতে শেষ সময়ের কিছু কথা লিখে যাচ্ছি। শুরুতে পরিকল্পনায় কোনো খুঁত রাখবো না ভাবলেও এখন মনে হচ্ছে এর পরিণতি সবার জানা উচিত। যেনো সামনে কখনো কেউ এমনটা করার সাহস না পায়। এমনিতেও আর ৬ ঘণ্টা পর আমার ফ্লাইট। আমেরিকায় চলে গেলে আমি এখানকার পুলিশের নাগালের বাইরে। অবশ্য কোনোভাবে খবর চলে গেলে আমাকে পড়াশোনা আর চাকরিতে বিপদে পড়তে হতে পারে তবে ওইটুকু স্যাক্রিফাইস করার সাহস আমার আছে। যাইহোক মূল কথায় ফিরে আসি। লিয়াকত আলী কখনোই তেমন ভালো হয়ে উঠেন নাই। বিবাহিত হলেও প্রতি বুধবার বাবুবালা থানার পল্লীতে অবকাশ যাপনে যেতেন নিয়মিত। সেখান থেকে বের হওয়ার পথেই তুলে নিয়ে আসি তাকে। আগে থেকে ভাড়া করে রাখা সিএনজি তে করে তাকে নিয়ে আসি দেলদুয়ারের আমার ভাড়া নেয়া রুমে। রুমে আনার ঘণ্টা দুয়েকের মাঝেই জ্ঞান ফিরে লিয়াকত আলীর। জ্ঞান ফিরেই চমকে উঠে সে। চমকানোরই কথা অবশ্য। আমার বাবার যৌবনকালের চেহারার সাথে আমার চেহারার অস্বাভাবিক মিলের কথা মা বহুবার বলেছে। চতুর লিয়াকত আলীর বুঝতে খুব একটা সময় লাগেনি যে তার সাথে কী হতে চলেছে। প্রথমেই কিছুক্ষণ চালালাম ওয়াটার ট্রিটমেন্ট। ঠিক যে সময়ে দম ফুরিয়ে আসছিলো তখনই টেনে তুলছিলাম পানি থেকে। তবে এতে তার মুখের অভিব্যক্তি আমি দেখতে পাচ্ছিলাম না। কাজেই হালকা বদল আনলাম পরিকল্পনায়। মাথাটাকে পলিথিনে পেঁচিয়ে চেপে ধরতেই বেশ একটা দৃশ্য দেখা গেলো। কী সুন্দর  হাঁসফাঁস করে বাঁচার কী প্রাণান্ত অর্থহীন চেষ্টা। এবারেও অল্প সময়েই ছেড়ে দিলাম। এর পর হালকা বিশ্রামের পালা। ভালো করে বেঁধে সামনে খাবারগুলো ফেলে রাখলাম। চোখগুলো দেখে মনে হচ্ছিল ফেটে বেড়িয়ে আসবে।

একদিন না খাইয়ে রাখার পর সিদ্ধান্ত নিলাম খুনটা আজকেই করতে হবে। কেননা পুলিশরা বেশ নড়েচড়ে বসেছে। আমি চেয়েছিলাম জ্যান্ত অবস্থাতেই সর্বোচ্চ যন্ত্রণা দিতে। কাজেই হাত-পায়ের দিকে নজর দিলাম এবার। পুরোনো মরচে ধরা একটা হাতুড়ি জোগাড় করা ছিলো। আঙ্গুলগুলো ভাঙার শব্দ কানে বেশ মধুর হয়ে বাজছিলো। একবার ভাবলাম কেটে ফেলি কিন্তু পরে মনে হলো থাকুক কাটলে তো ফুরিয়েই গেলো। তার থেকে কষ্ট পাক কিছুটা। শরীরের বিভিন্ন জায়গায় কাটাছেড়া করলাম কিছুক্ষণ মনমতো। উদ্দেশ্য রক্তগুলো বের করে নেয়া। শুয়োরটার রক্ত দিয়ে কিছু সিম্বল আঁকার ইচ্ছা আছে। হঠাৎ শেষ মুহুর্তে একটা কথা মনে পড়লো। এতো অপরাধ করা শুয়োরটার হৃদয় বলে কী আছে? হুট করেই দেখতে ইচ্ছে করলো। তখনো বেঁচে ছিলো লোকটা। সার্জারী সম্পর্কে আগেই পড়াশোনা ছিলো। শুরু করলাম কেটে বের করা। জ্যান্ত অবস্থাতেই শুয়োরটার হৃৎপিণ্ডটা খুলে আনার পর চোখের চাহনিই বলে দিচ্ছিল আমার কষ্ট সার্থক। এরপর আর মিনিটখানেক দম ছিলো লোকটার। বেশ আগ্রহভরেই অন্তিম যাত্রা দেখলাম। ত্রিশ বছরের পুরোনো ঋণ শোধ হলো আজ। এই মুহুর্তের পর ডায়েরিটা যথাস্থানে স্থাপন করে লাশটাকে সেখানেই রেখে আসবো যেখানে সেই ১১জনকে হত্যা করা হয়েছিলো। কোনো পাঠক ডায়েরিটি পড়ে থাকলে আমার কৃতকর্মের বিচার তার হাতেই ন্যস্ত করে গেলাম। কেননা আমি আমার দায়মুক্ত হয়েছি। এখন আর কিছুতেই কিছু যায় আসে না। বিদায় হে অচেনা বন্ধু।

ডায়েরিটা এখানেই শেষ। হারুন সাহেব পাগলের মতো পৃষ্ঠা উলটালেন কিন্তু কিছুই খুঁজে পেলেন না। কিছুক্ষণ পাগলের মতো উদভ্রান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন সিলিং এর দিকে। মনে পড়লো তিনদিন আগে চেয়ারম্যান সাহেবের স্ত্রী এসে উনার মিসিং রিপোর্ট লিখিয়ে গিয়েছিলেন। লাশ পাওয়ার আগে এ নিয়েই ব্যস্ত ছিলো পুরো পুলিশ ডিপার্টমেন্ট। মজার ব্যাপার হলো চেয়ারম্যানের নামটা “মুক্তিযোদ্ধা লিয়াকত আলী (বীর প্রতীক)”।

১১/১১/২০০২

দীর্ঘ এক বছর চারমাসের তীব্র অনুসন্ধানের পর “লিয়াকত আলী মিসিং” ও “অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি খুন” কেস  দুটি   অমীমাংসিত  ঘোষণা  করে  বন্ধ   করে দিচ্ছে  পুলিশ বিভাগ। হারুন সাহেব শেষ পর্যন্ত আর ডায়েরিটার ব্যাপারে কাউকে বলেন নি। বরং একই রকম দেখতে নতুন একটা ডায়েরি দিয়ে বলেছিলেন সেখানে কিছু লিখা ছিলো না। অবশ্য অন্যরা কতটুকু বিশ্বাস করেছিলো তাতে তার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। কিন্তু এ ব্যাপারে তার জবাবদিহি করতে হয় নি। মাঝেই মাঝেই নিজের বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে তিনি ভাবেন তার কাজটায় কি কোনো ভুল ছিলো? লিয়াকত আলী নিজেকে এমন জায়গায় নিয়ে গিয়েছিলেন যেখানে আইন আদালত তার বিচার করতে পারতো না। রাজাকার লোকটা নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা বানিয়ে নিয়েছিলো। তাই প্রকৃতিই অন্য কাওকে দিয়ে বিচার করিয়ে নিয়েছে। তিনি শুধুই নীরবতা পালন করেছেন। এতটুকু অপরাধ হয়তো বিধাতা ক্ষমা করবেন।

কমেন্ট করুন
শিক্ষার্থী | পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

0