উপলব্ধি

আজ একটি গল্প বলবো, আসলে ঠিক গল্প না জীবনের কোন এক অধ্যায় থেকে অন্য অধ্যায়ে পদার্পণের সময়ে ঘটা কিছু উপলব্ধি নিয়ে কথা বলবো।

কলেজ লাইফটা যখন শুরু হলো কেমন যেন হঠাৎ করেই মস্ত মস্ত পড়ার বোঝা মাথায় এসে পড়লো। কিভাবে তার সামাল দিবো কিছুই যখন বুঝে উঠতে পারছিলাম না ঠিক ওই সময়টাতেই যেন কিছু মানুষ দেবদূতের মতো এসেছিল। হ্যাঁ, সেই মানুষগুলো আর কেউই নয়, তারা হচ্ছেন আমার খুব পছন্দের কিছু শিক্ষক। যাদের অবদানেই আমি এ পর্যন্ত আসতে পেরেছি।

আমি ছোটবেলা থেকেই খুব যে ভালো ছাত্র তা নয়। অনেক বড় বা ছোট নয় বরং মধ্যম নামক যে শব্দটি আছে আমি ওই দলেরই একজন। পড়ালেখা যে খুব ভালো পারতাম তা নয় ঐ যে বললাম! মধ্যম দলের লোক আমি। ঠিক যখন কলেজ জীবনে আসলাম, দেখলাম পুকুর থেকে যখন আমাকে একটি সাগরে আনা হলো, আমি তো তার কোন তলই খুঁজে পাচ্ছি না। (এখানে পুকুর আর সাগর বলতে আমি পাঠ্যপুস্তকের পড়ার পরিধিকে বুঝাতে চেয়েছি ) সেই সাগরের তল খুঁজে দিতে আমার প্রিয় কিছু শিক্ষক এতটা সাহায্য করেছিল তা আমি কখনোই ভুলবো না।

আমি দেখেছি তাদের মধ্যে কয়েকজন, শিক্ষার্থীদের পড়ানোর চেয়ে পড়ানোকে উপোযোগী করতেই বেশি চেষ্টা করতো। দিন যাচ্ছে আর কলেজ লাইফটাও ফুরিয়ে আসছে। একসময় এইচএসসি পরীক্ষা হয়ে তার সম্পূর্ণ সমাপ্তি হলো।

তারপর শুরু হলো ভার্সিটিতে ভর্তি হওয়া নিয়ে ভর্তিযুদ্ধ নামক এক যুদ্ধের সমুখ্খীন হওয়া। এইচ.এস.সিতেও তেমন ভালো একটা ফলাফল করলাম না। কিন্তু সৃষ্টিকর্তার অশেষ কৃপায় সেই তীব্র যুদ্ধের মাঝে কিভাবে যেন আমি টিকে গেলাম। সুযোগ পেলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার। সেই সুযোগটি হাতছাড়া না করে ঢাবিতে ভর্তি হয়ে ঢাবিকে নতুন করে চেনা শুরু করলাম। তাকে আরো গভীরে উপলব্ধি করা শুরু হলো। এর মধ্য দিয়ে জীবনের নতুন এক অধ্যায়ের যাত্রা শুরু হলো। ক্লাস শুরু হওয়ার পর নতুন নতুন মানুষের সাথে পরিচয় হলো, তাদের একেকজন একেক জেলা থেকে এসেছে, সবার কথা বলার মাঝে ভাষার আঞ্চলিকতা মিশে ছিল, সবার সাথে কথা বলতে খুব ভালো লাগছিলো। ক্লাসের প্রথম দিনটাতেই খুব সুন্দর এক ধরনের অভিজ্ঞতা হলো।

সেই সাথে পরিচয় হলো আরো নতুন কিছু শিক্ষকের সাথে। ক্লাস শুরু হওয়ার পর তাদের সাথে আরো ভালো করে পরিচয় হওয়া শুরু হলো। ক্লাসসহ সবকিছুই স্বাভাবিক ভাবে চলছিল। কিন্তু ক্লাস শুরু হওয়ার আড়াই মাস পরই করোনা হানা দেয়াতে সব বন্ধ হয়ে গেল। ভার্সিটি লাইফের শুরুতেই এমন হবে কখনো ভাবতেও পারিনি। তারপর সেই বন্ধ যে এত দীর্ঘ সময়ের জন্য হবে তা কল্পনার বাইরে ছিল। দীর্ঘ দেড় বছরের অধিক সময় পর তা ঢাবি তার আগের রুপে পুরনায় জেগে উঠলো দীর্ঘ ঘুম থেকে। তারপর আর কী! সে তার মতই চলছে আপন ছন্দে।

এবার আমি ভার্সিটিতে ভর্তি হওয়া থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত আমার মনে ভার্সিটি নিয়ে যেসমস্ত উপলব্ধি জন্ম নিয়েছে সেগুলা নিয়ে কিছু কথা বলি।  আমি শুরুতেই বলতে চাই যে ভার্সিটি লাইফের শুরুর দিকটাতেই এত ভালো কিছু বন্ধু পেয়ে যাবো তা সত্যিই অনেক বড় একটা পাওয়া। সাথে এমন কিছু সিনিয়র ভাই-আপুদের সাথে পরিচয় হলো যারা আপন ভাইবোনের থেকে কম কিছু নয়। সাথে এমন কিছু শিক্ষক পেয়েছি যাদের সংস্পর্শে না আসলে হয়তো অনেক কিছুই পাওয়া হতো না।

তবে এখানে আমি ভার্সিটি ক্লাসের শুরুর দিন থেকেই একটা বিষয় খুব মিস করছি। স্কুল কলেজে থাকাকালীন কিছু শিক্ষক আমাদের পড়ানোর পাশাপাশি আমাদের মানসিক শক্তি জুগাত। আমার খুব পছন্দের একজন শিক্ষক আছেন যার কাছে আমি পড়তে যেতাম শুধু তার বলা কথাগুলো শোনার জন্যই। তার কথা শুনে এতটা মনের জোর পেতাম, যে আমি নিজেই অনেক কঠিন বিষয় সমাধান করে ফেলতে পারতাম। আমি আসলে তাদের কাছে যেতাম সেই মনের জোরটুক পাওয়ার জন্যই। তারা আসলে পড়ানোর আগে মানুষটাকে পড়ার উপযোগী করে গড়ে তুলত, তা নাহলে শিক্ষার্থীরা পড়তে পারবে কী করে! আমি সেই শিক্ষকটাকে মিস করছি যিনি আমাদের এমন প্রেরণা দিত। ভার্সিটিতে এখন পর্যন্ত অনেক ভালো কিছু শিক্ষকের সাথে পরিচয় হয়েছে। যারা এত সুন্দর করে ক্লাস নেয় তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

কিন্তু আমি আমার কলেজের সেই আদর্শ শিক্ষকটার মতো কাউকে পাচ্ছি না। আমি এমন কাউকে পাচ্ছি না যে কিনা শুধু শিক্ষা দিবে এমন নয় তার আগে শিক্ষার্থীদের মানসিক ভাবে গড়ে তুলবে। এই বিষয়টা আমি ভার্সিটিতে এসে কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না, সবাই ভালো পড়ানোর চেষ্টা করে কিন্তু পড়ানোর আগে পড়াটা নেওয়ার মতো মানসিক জোরটুকু দিচ্ছে না কেউ। এই করোনাকালীন সময়ে কত শিক্ষার্থী যে মানসিকভাবে ভেঙ্গে পরেছে সেই খবর কি কেউ রাখে? এখানে শিক্ষার্থীরা শারীরিকভাবে ভালো আছে মানেই যে সে মানসিকভাবেও ভালো আছে তা কিন্তু নয়। অথচ সেই মানসিক শক্তি জোগানোর মানুষ নাই এখন। এ কারণেই হয়তো এতো সুইসাইড কেসের কথা অহরহ শোনা যায়।

আমি আশাবাদী এমন কোন শিক্ষককে আমি ভার্সিটি লাইফেও পাবো। যে কিনা সকল ছাত্রের কাছে আদর্শ শিক্ষকের মর্যাদা পাবে।

কমেন্ট করুন