তাজিংডং-ই কি বাংলাদেশের সর্বোচ্চ চূড়া?

পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপ, বাংলাদেশ, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক লীলাভূমি। এদেশ পুরোপুরি যেন প্রকৃতির রূপের ভাণ্ডার। আমরা ভ্রমণপিপাসু মানুষগুলো চাই, এই সৌন্দর্য্যের হাতছানি সকলের মণিকোঠায় পৌঁছাক। সবাই যেন পাহাড়-প্রকৃতির টানে বেড়িয়ে পরে স্বদেশের সৌন্দর্য্যের চাক্ষুস স্বাক্ষী হতে।
বাংলাদেশের উঁচু-নিচু পাহাড়-পর্বতগুলো এক চিত্তহারী সৌন্দর্যের সৃষ্টি করেছে। এদেশের দক্ষিণ ও পূর্ব ভাগ বনাঞ্চল ভূমিখ্যাত। তার মধ্যে দক্ষিণ-পূর্ব ভাগের পার্বত্য চট্টগ্রামের চিরহরিৎ পত্রের বনাঞ্চল দেশের মধ্যে একটা সুবিশেষ জায়গা দখল করে আছে; আর তার মধ্যেও বান্দরবান পর্বতপ্রেমীদের কাছে অধিক সমাদৃত। বাংলাদেশের ৩০০০+ ফুট উচ্চতার পর্বত রয়েছে ১৮টি (বেসরকারি ও ব্যক্তিবিশেষের হিসাব অনুযায়ী) যার মধ্যে ১৩টিই অবস্থিত বান্দরবানে।

১) সাকা হাফং; ছবিঃ উইকিপিডিয়া


যখনই পাহাড় পর্বত নিয়ে কথা আসে ঠিক তখনই প্রশ্ন উঠবে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পাহাড়/চূড়া কোনটি? শুরুতে গারো পাহাড়, চিম্বুক, সিপ্পি, কেওক্রাডং সহ অনেক পাহাড়কেই সর্বোচ্চ চূড়া ধরা হলেও শেষে তাজিংডং-কে সরকারি ভাবে সর্বোচ্চ পাহাড় ঘোষণা করা হয়। কিন্তু দূঃখের বিষয় হচ্ছে তাজিংডং এর উচ্চতা এতই কম যে, একে উচ্চতার ভিত্তিতে শীর্ষ ৩০ পাহাড়ের মধ্যেও ফেলা যায় না। এমনকি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিশুদের সাধারণ জ্ঞান বই এও এখনো তাজিংডংকেই সর্বোচ্চ চূড়া বলে আখ্যা দেয়া হয়। এমনকি আমরাও এই ভুলটাই পড়ে এসেছি স্কুলে। এতগুলো বছর পরেও যার তেমন কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। যেটি খুব-ই দুঃখজনক।

তাহলে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পাহাড় বা চূড়া কোনটি?
২০০৬ সালে ইংরেজ পর্বতারোহী জিং ফুলেন স্থানীয় একজন গাইডের সহায়তায় একটি চূড়া আরোহণ করেন। জিপিএস, কো-অরডিনেট, স্যাটেলাইট ডেটা এসব কিছুর সাহায্যে তিনি যে সবচেয়ে উঁচু জায়গাটিতেই গিয়েছিলেন সেটায় কোনো সন্দেহের অবকাশ ছিল  না। তিনি জায়গাটিকে চিহ্নিত করেন “মদক মুয়াল” নামে। প্রাচীন ম্যাপগুলোতে ‘মদক মুয়াল এবং ‘মদক তং দুটো নামই পাওয়া যায়। যদিও গুগল আর্থে বর্তমানে ‘মদক মুয়াল নামে যেই জায়গা টি চিহ্নিত করা আছে সেটি প্রকৃতপক্ষে “জোত্ল্যাং” এর চূড়া। জোত্ল্যাং হচ্ছে বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ চূড়া! ফুলেন সাহেব তার আরোহণ করা চূড়াটির উচ্চতা নির্ণয় করেন ১০৬৮ মিটার বা ৩৪৯০ ফুট এবং অবস্থান দেখান  21°47′11″ উ. 92°36′36″ পূ. / 21.78639° উ. 92.61° পূ.। তার দেখানো এ অবস্থান রাশিয়া নির্মিত ভৌগোলিক মানচিত্রে (Russian Topographic Map) অবস্থানের সাথে হুবহু মিল পাওয়া যায়।

২) সাকা হাফং সামিট; ছবিঃ হাসান শিহাব

পরবর্তীতে বেসরকারি ও ব্যক্তিবিশেষের নিজস্ব উদ্যোগে সংগ্রহকৃত তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে এবং প্রায় সকলের মাপা এলিভেশনের ভিত্তিতে দেশের স্বনামধন্য সকল পর্বোতারোহীরা ঐকমত্যে পৌঁছতে পেরেছেন যে, দেশের সর্বোচ্চ চূড়া হলো সাকা হাফং/ত্ল্যাংময়/মদক তং। আনুষ্ঠানিকভাবে (সরকারিভাবে) একে এখনও বাংলাদেশের সর্বোচ্চ চূড়া হিসেবে ঘোষণা করা হয়নি।
২০০৭ সালে প্রথম বাংলাদেশী দল ত্লাংময় আরোহণ করেন। জিং ফুলেন যেই গাইড লাল মিয়া’র সহায়তায় সাকা হাফং আরোহণ করেছিলেন, সেই লাল মিয়াকে সাথে নিয়ে ইয়াহিয়া খানের নেতৃত্বে সেই দল সাকা হাফং আরোহণ করেন। সেই দলে ছিলেন দেশের এভারেস্ট আরোহণকারী পর্বতারোহী সজল খালেদ। তাঁরা এর উচ্চতা পান ১০৫৫ মিটার বা ৩৪৬০ ফুট। তাঁদের পর নেচার এডভেঞ্চার ক্লাব সাকা হাফং এর উচ্চতা পান ৩৪৯৪ ফুট, পর্বোতারোহী সালেহীন আরশাদী এর নেতৃত্বে থাকা টিম এর উচ্চতা পান ৩৪৭৭ ফুট।

যেহেতু সাকা’র অবস্থান একদম মায়ানমার বর্ডারের কাছাকাছি তাই সরকারি ভাবে নিরাপত্তাজনিত কারণে সাকা হাফং যাওয়া এখন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বিশেষ করে ২০১৪ সালে এক দল বান্দরবানের গহীনে ঘুরতে গিয়ে নিখোঁজ হয় এবং তাঁদের লাশ ৮ বছর পরেও তাঁদের পরিবার পায় নি।

একজন পাহাড়প্রেমী হিসেবে সাকা হাফং চড়ার (সামিট করার) স্বপ্ন আমি প্রতিদিন দেখি। জেগে কিংবা ঘুমে দুইভাবেই! তখনই খারাপ লাগে মানুষের এইরকম ভ্রান্ত ধারণা দেখে, আমি চাই সবাই সঠিক তথ্য জানুক। পাহাড় নিয়ে পড়াশোনা করুক। মনে প্রাণে আমি একটা কথা বিশ্বাস করি সেটা হচ্ছে, পাহাড়কে যাপন করলে, মনে প্রাণে ভালোবাসলে পাহাড় আপনাকে কখনো খালি হাতে ফিরিয়ে দিবে না। সে তার সর্বস্ব উজাড় করে দিবে আপনার কাছে; সেটা বুঝার জন্য কিংবা অনুভব করার জন্য শুধু আপনার পাহাড়কে অনুভব করা লাগবে।

৩) বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বিন্দুতে বাংলাদেশের পতাকা; ছবিঃ ইন্টারনেট



সাকা হাফং সামিট করার প্রচলিত র‍্যুটঃ
১. বান্দরবান – থানচি – পদ্মঝিড়ি – হরিশচন্দ্র পাড়া – থুইসা পাড়া – সাজাই পাড়া – নেফিউ পাড়া – সাকা হাফং সামিট
২. বান্দরবান – থানচি – বোর্ডিং পাড়া – শেরকর পাড়া – দোতং পাড়া – বুলং পাড়া – নয়াচরণ পাড়া – হান্জরাই পাড়া – নেফিউ পাড়া – সাকা হাফং সামিট
৩. বান্দরবান – রুমা – বগালেক – কেওক্রাডং – থাইক্ষ্যাং পাড়া – ফাইনুয়াম পাড়া – দুলাচরণ পাড়া – হাঞ্জরাই পাড়া – নেফিউ পাড়া – সাকা হাফং সামিট
* সব কটি র‍্যুট-ই এখন নিরাপত্তাজনিত কারণে পর্যটকদের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

বেসরকারিভাবে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ৫টি চূড়ার নাম, গড় উচ্চতা, অবস্থান, রেঞ্জ এবং কো অর্ডিনেট নিম্নে দেয়া হলোঃ
১) সাকা হাফং
উচ্চতাঃ ৩৪৭৫ ফুট
অবস্থানঃ থানচি, বান্দরবান
রেঞ্জঃ মদক
কো-অর্ডিনেটঃ 21.7864° N, 92.6100° E
২) জোত্ল্যাং
উচ্চতাঃ ৩৩৪৫ ফুট
অবস্থানঃ থানচি, বান্দরবান
রেঞ্জঃ মদক
কো-অর্ডিনেটঃ 21°40′23.76″N, 92°36′16.03″E
৩) দুমলং
উচ্চতাঃ ৩৩১৪ ফুট
অবস্থানঃ বিলাইছড়ি, রাঙ্গামাটি
রেঞ্জঃ র‍্যাং ত্ল্যাং
কো-অর্ডিনেটঃ 22.0414° N, 92.5839° E
৪) যোগী হাফং
উচ্চতাঃ ৩২২২ ফুট
অবস্থানঃ থানচি, বান্দরবান
রেঞ্জঃ মদক
কো-অর্ডিনেটঃ 21°42’13.0″N 92°36’5.38″E
৫) কেওক্রাডং
উচ্চতাঃ ৩১৭২ ফুট
অবস্থানঃ রুমা, বান্দরবান
রেঞ্জঃ পলিতাই
কো-অর্ডিনেটঃ 21°57′00″N 92°30′53″E

তথ্যসূত্র:
১। সাকা হাফং

কমেন্ট করুন
শিক্ষার্থী | পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়