Taare Zameen Par: ভ্রমন ভারতে

প্রথম পর্ব পড়তে ক্লিক করুন

দ্বিতীয় পর্ব- জয়পুর

(৭)

হারিয়ে গেলেন।

পথ হাটছিলেন দুজন মুসলাম পথিক। দুজনের হাতেই বন্দুক। সাথে ছোট্ট আরবী ঘোড়া। ঘোড়ার পিঠে মালপত্র। জনমানবহীন পাহাড়ি রাস্তা। নদীর কাছে গাছের নিচে একদল মানুষ।

একজন এগিয়ে এসে তাদের সালাম দিয়ে বললেন- আমি রোসন জমাদার। খেতে বসেছিলাম। আপনারা মেহমান মানুষ। দূর থেকে হেঁটে এসেছেন। আপনাদের না দিয়ে খেলে গুনাহ হবে।

আরেক জন এসে দুই থালা খাবার এগিয়ে দিয়ে গেল। রোসন জমাদার খুবই আন্তরিক ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করলেন, “কোথায় যাবেন আপনারা?”

-আউরঙ্গাবাদ।

-আমরাও যাব আউরঙ্গাবাদ । এসেছি ঝাঁসী থেকে। পথঘাট নির্জন, দিনকালও ভাল না। তাই বড় দল হলে সুবিধে।

নতুন সঙ্গী পেয়ে পথিকরা নিশ্চিন্ত হল। খাওয়া-দাওয়া সেরে একসঙ্গে হাটতে আরম্ভ করলো। সন্ধ্যা যখন নামলো তখন একটা গ্রামের কাছাকাছি। রোসন জমাদার বলল, “রাতটা এখানেই কাটানো ভাল হবে। পাশেই গ্রাম।“

ঘোড়ার পিঠ থেকে জিনিসপত্র নামিয়ে রাতের আয়োজন করা হচ্ছে। কাছাকাছি একটা আমবাগান। রাতটা বেশ আনন্দময় মনে হচ্ছে। কেউ শুকনো ডালপালা কুড়াচ্ছে, কেউ রুটি বানাচ্ছে, কেউ তামাক সাজছে। হাতে হাতে কাজ শেষ। 

রাতের খাওয়া দাওয়া শেষে রোসন জমাদার অতিথিদের সঙ্গে নিয়ে গল্প করতে বসলেন। গল্পের ফাকে ফাকে গুরগুর করে তামাক টানছেন। গল্প শুনতে শুনতে অথিতিদের ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসে। তারপরও গল্প শুনতে ইচ্ছে করে। কি মিষ্টি গলা আর কি বলার ভঙ্গী। রাত বাড়তে থাকে, গল্পও জমতে থাকে। 

তারপরও হারিয়ে গেলেন। এতগুলো মানুষের মধ্য থেকেও সেই দুজন মানুষ হারিয়ে গেলেন। পরদিন ভোরে কোথাও তাদের খুঁজে পাওয়া গেল না। দুটো বন্দুক, একটি ঘোড়া, এক ঘোড়া সওদা আর দুজন জলজ্যান্ত মানুষ – সবসুদ্ধ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল।

চিন্তিত বুড়ো জমাদার চারদিক ভাল করে দেখে শুনে ভোর হবার আগেই বাকি দলটা নিয়ে চললেন। পড়ে রইলো শুধু পাতানো সেই মাদুরটি।

কিন্তু তারা হারালেন কিভাবে?

(৮)

এখন প্রায় সন্ধ্যা। যদিও আগ্রা থেকে জয়পুর কাছেই, তারপরও এটাসেটা করতে করতে সন্ধ্যা করে ফেলেছি। সকালে তাজমহল দেখে দুপুরেই রওনা দিয়েছি জয়পুরে, রাজস্থানের রাজধানী।

আজকে ট্যুরের কত দিন হলো? প্রভাতী আপুর ফেসবুক ওয়ালে ঢুকে দেখি তিনদিন ছবি আপলোড দিয়েছেন। সুতরাং আজকে ট্যুরের ৪ দিন। ট্যুরের হিসাব রাখার ব্যবস্থাই এটা। কারণ সে নিয়মিত এবং সময়মত ছবি আপলোডের কাজটা করেন।

আচ্ছা একটা প্রশ্ন করি- দেখি উত্তর দিতে পারেন কিনা, বলুন তো আমরা যদি কোন নতুন স্থানে যাই তাহলে সেখানকার কোন জিনিসটা আমরা আগে ঘুরে দেখি?

মার্কেট! পারা উচিৎ ছিল। আগেও একবার বলেছিলাম।

তাহলে বলেন তো, এখন আমরা কোথায় যাব?

হ্যাঁ, উত্তর সঠিক, মার্কেটে যাব। 

তবে বলতে পারেন, এখন তো সন্ধ্যা। ঘুরে দেখার মত তো কিছু পাওয়া যাবে না। এটা তো মার্কেটে যাবারই সময়। কথা সত্য, তবে সন্ধ্যা না হলেও আমরা মার্কেটেই যেতাম। সেটার প্রমাণ সামনে পাবেন।

তবে শপিং ছাড়াও আজকে আরেকটা বড় ইভেন্ট আছে। সবাই মিলে রাতে মুভি দেখতে যাব। আমির খানের মুভি। তিন দিন আগে রিলিজ পেয়েছে। ব্ল্যাকে টিকিট কাটা হয়েছে।

ছবি দেখবো ‘রাজমন্দির’ সিনেমা হলে। বিরাট হল। যাকে বলা হয় ‘One of the greatest Cinema Hall in Asia’। হাতে সময় কম। ১০টায় মুভি শুরু হবে। ৮টার মধ্যে শপিং শেষ করে হোটেলে গিয়ে খাওয়া দাওয়া সারতে হবে।

তাড়াহুড়া করে সবাই চলে গেলাম মার্কেটে। জয়পুরের পুরো মার্কেটটাই মেয়েদের জিনিসপত্রে ভরা। ছেলেদের জন্য কেনার তেমন কিছুই পেলাম না। অবশ্য ছেলেদের কেনার মত জিনিসপত্রই কম।

এখানাকার গহনাগুলো অন্য রকম। মনে হয় ‘টিন’ দিয়ে বানানো। রুপালি কালার ও বলে যেত কিন্তু অতোটা উজ্জ্বল না। মনে হয় রুপায় মরিচা পড়ে গেছে। মেয়েদের থ্রি-পিসগুলোও দেখতে ওল্ড ফ্যাশনের। তবে সেগুলো ভাল ছিল দেখতে। এখানকার প্রায় সব জিনিসই ওল্ড ফাশনের। রাজ-রাজার আমলের।

মেয়েরা প্রায় সবাই রাজাদের আমলের হাতিমার্কা হাতব্যাগ (পার্টস) কিনেছে। ব্যাগের এইপাশে ওইপাশে শুধু হাতি আঁকা। লাল রঙের হাতি। এখানকার জিনিস-পত্রের দাম মনে হল তুলনামুলক একটু কম।

এক বন্ধু হাসতে হাসতে এসে আমাকে বলল, “নঈমুলের হিন্দির অবস্থা খারাপ। দোকানে দোকানে গিয়ে দোকানদারকে শুধু জিজ্ঞেস করে- ‘ভাইসাব! কিতনে?’ এর বাইরে কিছু বলতে পারে না।”

আমি ওর হাসির কারণটা বুঝতে পারলাম না। আমারও হিন্দির অবস্থাও খারাপ। এটা শোনার পর অবশ্য একটু সাহস পেলাম। “নঈমুল রুল” মেনে আমিও দোকানে দোকানে যাই আর এটা-ওটা দেখিয়ে  জিজ্ঞেস করি, “ভাইসাব! কিতনে?” তারপর এমন একটা দাম বলি যে দামে সে দিবে না।

তারপর আরেক দোকানে গিয়ে বলি- “ভাইসাব! কিতনে?” দেখতে দেখতে একটা খেলা আবিষ্কার হয়ে গেল। দামাদামি খেলা। খেলতে ভালই লাগছে। কেনার মত কিছু নাই। সময় কাটানোর ভাল ব্যবস্থা। তবে সতর্ক থাকতে হচ্ছে, যদি আমার বলা দামে দিয়ে দেয়!

বানিজ্য মেলায় একবার একটা ট্রিমার দেখে দাম জিজ্ঞেস করলাম -“কত?”

বলল- “একদাম ১৮০০ টাকা।”

তারপরও আমি Safe Position এ দাম বললাম ৮০০ টাকা। ওমা! দেখি দোকানদার রাজী। এখন কি করি?

বললাম- “ভাই, যারা একদামের জিনিস অর্ধেক দামে দিয়ে দেয় তাদের কাছ থেকে কিছু কেনা যায় না। আপনি রেখে দিন। আমি নেব না।” ঝাড়ি মেরে ওইদিন বেঁচে গেছিলাম।

এত কিছু করেও ৮টা বাজে নি। আমার যেন সময় কাটছে না। হোটেলে ফিরে যাওয়ার লোকও পাচ্ছি না। শপিং ছেড়ে কেউ যেতে চাচ্ছে না।

এদিকে দেখি প্রভাতী আপু এক ব্যাগ শপিং করে ফেলেছেন। এই নিয়ে তার চার ব্যাগ জিনিসপত্র হলো। কিন্তু পরদিন দেখি আবারো তিনটা ব্যাগ। আরেকটা গেল কই?

টের পেলাম পরদিন লাগেজ তুলতে গিয়ে। তিনটা লাগেজের মধ্যে একটা একটু বড়। আপু এই লাগেজটা বাসে তুলতে পারছেন না। মুনিম বলা হলো তুলতে। ও এসে যেই হাতল ধরে উঠাতে যায় ওই হাতলই ভেঙ্গে চলে আসে। তিন দিকে তিনটা হাতল ছিল। এখন একটাও নেই। অবশেষে দুই তিন জন মিলে উঠাতে হয়েছিল।

যারা একবার তার এই লাগেজ তোলার কাজটা করেছি, এরপর থেকে তারা আর কেউ ওই লাগেজের আশেপাশে তারা যাই না। প্রভাতী আপুকে খুঁজে খুঁজে বের করতে হতো এইবার কাকে দিয়ে একটু লাগেজটা তোলাবেন?

 (৯)

সুরাইয়া জান

শপিং শেষ করতে ৮টার বেশি বেজে গেল। হোটেলে ফিরে তাড়াতাড়ি খাওয়া-দাওয়া সেরে সিনেমা হলে চলে গেলাম। মুভির নাম “Thugs of Hindustan”। কিছুক্ষন দেখার পড়েই বুঝতে পারছি ফালতু মুভি।

গত ২০ বছরে আমির খানের সবচেয়ে ফালতু মুভি এটা। ঘুম চলে আসার মত মুভি। শুধু শুধু বসে আছি। বসে বসে টাকা উসুল করছি। জাফর স্যার থাকলে বলতেন, “কি ব্যাপার এখনো বসে আছো কেন? পয়সাঁ তো নষ্ট করেছোই, এখন বসে বসে সময় টাও নষ্ট করেছো কেন? চলো, হোটেলে চলো।”

জাফর স্যার “টাকা” না বলে সব সময় “পয়সাঁ” বলতে পছন্দ করেন। এত পয়সাঁ খরচ করে ব্ল্যাকে টিকিট কিনে এখন আমাদের চলে যাওয়া অসম্ভব। সময় নষ্ট করে হলেও আমাদের পয়সাঁ বাঁচাতে হবে। ইংরেজিতে এটার একটা সুন্দর টার্ম আছে, ‘Sunk-cost fallacy’.  

বসে থাকা পুরোপুরি বৃথা গেল না। ছবি ভাল না লাগলেও একটা গান ভাল লেগেছে। তবে দুষ্টু গান। আইটেম সং জাতীয় গান- ‘সুরাইয়া জান লে গি কেয়া’। ক্যাটরিনা কাইফের আইটেম সং যে রকম হয় ওই রকমই। ক্যাটরিনার এক ঝটকায় ঘুম চলে গেল।

কিন্তু সিট পড়েছে এরশাদ স্যারের কাছেই। অবস্থা শোচনীয়। স্যারদের কাছাকাছি বসে এই গান দেখা যায় না। আমার আর স্যারের মাঝে পরছে তৌজিয়া শারমিনের সিট। ওর অবস্থা তাই আরও শোচনীয়।

শারমিন কানে কানে বলল, “এখন কি করা যায় বলতো? স্যারের পাশে বসে দেখতে লজ্জা লাগছে।”
বললাম, “চোখ বুজে আল্লাহ আল্লাহ কর।”
বলল, “কি বলিস এইগুলা?”
বললাম, “আচ্ছা ঠিক আছে, শুধু চোখ বুজে থাক তাইলে।”

ও চোখ বুজে ছিল কিনা জানিনা, আমি চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। সবই তো ঠিকই দেখছে আমি বাদ যাব কেন? স্যারের ডান পাশে পড়েছিল মাহাদীর সিট। মাহাদী হল থেকে বের হয়ে বলল, “আমি তাকিয়ে ছিলাম স্যারের দিকে, দেখি স্যারের অবস্থা কি? হা হা হা।”

এই অবস্থায় কার কি করার থাকবে? ছবি দেখে হোটেলে এসেই অনেকেই গানটা শোনার জন্য গুগলে সার্চ দিতে শুরু করেছে। আমাদের দুই জন মামুন আগেই বলেছি, মোটা মামুন ও চিকনা মামুন। মোটা মামুন ভয়েস সার্চ দিয়ে গান খুঁজছে।

মামুন, “তাগস অফ হিন্দুস্থান সুরাইয়া।“

গুগল, “No result found.”

মামুন, “তাগস অফ হিন্দুস্থান সুরাইয়া জান।“

গুগল, “No result found.”

মামুন, “এ রতন! গুগল তো নষ্ট হয়ে গেছে। গানটা মাত্র শুনে আসলাম মাত্র এখন কয়- No result.”

রতন, “ধুর হালা! তুই তো কইছোছ ‘তাগস অফ হিন্দুস্থান’। এটা হবে- থাগস অফ হিন্দুস্থান।”

পরদিন থেকে এই গানটা হয়ে গেল আমাদের ট্যুরের ‘থিম সং’। সারাদিনই কেউ কেউ গাচ্ছেই। আমাদের ব্যাচে কিছু ছেলে-পেলে আছে যারা রূপে, গুনে, কর্মে ভদ্র বলে পরিচিত। রাফি তাদের মধ্যে অন্যতম। কিন্তু সে সারাক্ষনই এই দুষ্টু গানটা গায়। “সুরাইয়া ধারকান ধারকান জান লেগি কিয়া”- এই লাইনটাই বেশি গায়। ভদ্র হলেও এই পোলা তলে তলে বহুত দুষ্টু। পুরো ট্যুরটা সে এই গান গেয়ে কাটিয়ে দিয়েছে। 

আরেক ভদ্র পোলা সাদিদ। তারও ওই একই কাজ, সারাদিন “সুরাইয়া জান, সুরাইয়া জান”। এই দুই ভদ্রের মধ্যে কোন ভদ্র যে এই গানটা বেশি গাইছে এটা এখন বলা মুশকিল।

(১০)

 ঠগী

দারুন একটা ঘটনাকে নিয়ে একটা ফালতু মুভি বানিয়েছে। ঘটনা দারুন বলছি কারণ “Thug”দের সব কিছুই দারুন। “Thug” ইংরেজি শব্দটা এসেছে বাংলা শব্দ “ঠগী” থেকে।

ঠগীরা কেনো দারুন? বলছি।

ঠগীদের কাজ হলো খুন করে জিনিসপত্র হাতিয়ে নেয়া। কিন্তু তাদের খুনের কিছু নিয়ম কানুন আছে। ডাকাতের মত খুন তারা করে না। খুন করে আপোসে!

আপোসে খুন করা যায়?

হ্যাঁ যায়। খুন করার আগে যাদের তারা খুন করবে তাদের খাওয়াবে, আদর আপায়ন করবে। গল্প শুনাবে। গল্প শুনতে শুনতে যদি ঘুমিয়ে পড়েন তাইলে আর খুন করবে না। যদি জেগে থাকেন শুধু তাইলে খুন করবে।

তাইলে কি ঘুমিয়ে পড়তে পারলেই তাদের হাত থেকে বাঁচা যেত?
উত্তর- না। ঘুম থেকে জাগিয়ে আবার গল্প শুনাবে। তবে তাদের গল্প কিন্তু ফালতু গল্প না। মজার গল্পই বলতো। সহজে ঘুম আসত না সে গল্প শুনে। তারপর চারদিক শুনশান নিরবতা নেমে আসলেই দল বল নিয়ে তাদের হত্যা করা হত। দারুন নাহ!

রোসন জমাদারের নাম মনে আছে? ঐযে দুই পথিকের হারিয়ে যাবার গল্পে বলেছিলাম। কি ভাল মানুষের মত ব্যাবহারটাই না করেছিলেন! সারাদিন একসাথে থাকলেন। আদর করে খাওয়ালেন, গল্প শুনালেন। কিন্তু তিনি আসলে ঠগী। তার সাথে বাকি যারা সবাই ছিল ঠগী।

এত আদর যত্ন করে শেষে খুন করে মাটিতে পুতে রাখলেন সেই পথিকদের, ঘোড়াটা সহ। তাদের কোন চিহ্নই যাতে না পাওয়া যায় আর।

ঠগীদের একটা বিশ্বরেকর্ড আছে- খুনের বিশ্বরেকর্ড। খুন করে করে GUINNESS WORLD RECORD করে ফেলেছে। এক ঠগী একাই খুন করেছে ৯৩১ জন মানুষকে। পারলে খুঁজে বের করুন তার নাম কি?

[গল্পের উৎসঃ ‘ঠগী’ – শ্রীপান্থ।]

আবার ট্যুরে ফিরে আসি।

রাজপুতের দরবারে

(১১)

আম্বার ফোর্ট

জয়পুর যে আসলে কি দেখতে আসছি এখন পর্যন্ত আমি জানি না। আমার মত অনেকেই জানে না। শুধু শুনেছি আম্বার ফোর্ট দেখতে যাব সকালে। কিন্তু আম্বার ফোর্টে দেখার যে কি কি আছে জানি না।

যেই আম্বার ফোর্ট দেখার জন্য জয়পুর আসছি সেই আম্বার ফোর্ট দেখার জন্য সময় বরাদ্দ ছিল সবচেয়ে কম। সকালবেলা এরশাদ স্যার এসে বললেন, “আমাদের বারোটার মধ্যে ফোর্ট দেখে ফিরতে হবে না হলে আমাদের ট্রেন মিস করবো।“

-স্যার, ট্রেন কয়টায়?

-ট্রেন দুইটায়।

ফোর্টে পৌঁছাতেই দশটা বেজে গেছে। দুই ঘন্টার মধ্যে সব দেখে ফিরতে হবে। এত সুন্দর আর এত বড় একটা জায়গার জন্য মাত্র দুইঘন্টা বরাদ্দ?

যাইহোক সময় অল্প, সময় নষ্ট করা যাবে। এরশাদ আমাদের কোথাও দাড়াতে দিচ্ছেন না। ঠেলে ঠেলে সামনে নিয়ে যাচ্ছেন। কোনটা কি কিছুই বুঝতে পারছি না। না বুঝতে পারলেও কোন দুঃখ নেই। দুঃখ হলো ছবি তুলতে পারছি না ঠিক মত।

ছবি তুলতেই হবে। ভাল জায়গা দেখে দু একবার দাড়ালাম, কিন্তু প্রত্যেকবারই দল হারিয়ে ফেললাম। আধাঘন্টা পর খেয়াল করলাম আমাদের সাথে একজন গাইডও আছে। গাইড টুকটাক এটা সেটা বর্ণনা করছেন।

গাইডরা ট্যুরিস্টদের বিভিন্ন আজব আজব কাহিনী বলে ভড়কে দিতে চেষ্টা করে। আমাদের গাইডও চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু কোন লাভ হলো না।

এরশাদ স্যার গাইডকে বলে দিলেন, “আমাদের এত কিছু শোনার সময় নেই। কি কি দেখার আছে সেইগুলো দেখান।“

গাইড মনে হলো একটু কষ্ট পেল এই। গাইডের কথা মানুষজন টাকা খরচ করে মনোযোগ দিয়ে শোনে। তাই তার কথার একটা দাম আছে। আমরা মোটেই দাম দিলাম না। কষ্ট পাওয়ারই কথা। সেই কষ্টে সে নিজ থেকে অনেকক্ষণ কিছুই বলল না। কিছু জিজ্ঞেস করলে উত্তর দেয়। না হলে চুপচাপ হাটে।

তবে তার কথার দাম দিলো আমাদের মোটা মামুন। গাইডের গল্প শোনার একমাত্র ব্যক্তি। এই মামুন জীবনের সব কিছু করবে নিয়মমত। সেই নিয়ম অনুসারে এখন আম্বার ফোর্ট সম্পর্কে জানার চেষ্টা করছে।

বিভিন্ন প্রশ্ন করে গাইডকে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করে ফেলেছে। দেখে মনে হচ্ছে কালকে তার আম্বার ফোর্ট কোর্সের উপর পরীক্ষা। আজকেই ফুল সিলেবাস কভার করতে হবে।

আম্বার ফোর্ট

মামুন ক্লাস করতেছে আর আমরা সবাই ছবি তোলায় ব্যস্ত, মহাব্যস্ত। মহাব্যস্ততার মধ্যেও দু একবার মামুনকে সঙ্গ দিলাম। এতে যা শুনছিলাম তার মধ্যে শুধু মনে আছে বিয়ের গল্প, রাজাদের বিয়ের গল্প। আকবরের সেনাপতি মান সিং (বা সিংহ) বিয়ে করেছেন ১৩টা। ১৩জন স্ত্রীর জন্য সমান সাইজের ১৩টা ঘর ছিল। গাইড ঘুরে দেখালেন।

কিন্তু মান সিংয়ের ছেলে জয়সিং বিয়ে করেছেন ১টাই। তার স্ত্রীর জন্য একটাই ঘর তবে বড় সাইজের, বাকিদের ৩টার সমান একটা। এইখানে বেশ কিছু ছবির শুটিং হয়েছে। এর মধ্যে বিখ্যাত হল – যোধা আকবর।

প্রশ্নঃ সম্রাট আকবর মোট কয়টা বিয়ে করেছিলেন?

তবে আকবরের বিয়ে ছিল রাজ্য দখলের একটা অস্ত্র। কোন রাজ্যের সাথে যুদ্ধ করতেন, কোন রাজ্যে বিয়ে করতেন। আম্বার ফোর্ট দখল করেন যোধা বাঈকে বিয়ে করে।

এইটুকুই শুধু মনে আছে আম্বার ফোর্টের গল্পের, বাকি সব সফলভাবে ভুলে গেছি। আমি তাও ২-৪টা কথা শুনেছিলাম। অনেকে বর্ণ না শুনে ঘুরে চলে আসছে। অনেকে আম্বার ফোর্ট নামটাও বলতে পারবে না আমি নিশ্চিত। ছবি যা তুলেছে তাতেই খুশি। ভুল বললাম, ছবি তুলেও কাউকে খুশি হতে দেখিনি কখনো।

বের হবার সময় গাইড বললেন, “নামাজ ছোড়না চাহি হে। ইয়ে বিল্ডিং কিতনা সেইফ হে, লেকিন মউত সে হাত হতি বাচনেকে লিয়ে যাদা সেইফ নেহি হে। আসসালামু-আলাইকুম।“ 

লোকটা দেখতে হুজুর টাইপের। মনে হয় তাবলীগ করেন। তিনি বোধ হয় বাংলাদেশী দেখে ধরেই নিয়েছেন আমরা মুসলিম। তাই আমাদের সম্পর্কে কিছু না জিজ্ঞেস করেই সোজা দ্বীনের দাওয়াত দিয়ে দিয়েছেন।  

(১২)

আম্বার ফোর্ট

শাফকাতের পাগড়ী

জয়পুর আসার পর থেকেই মনে হচ্ছিল কমপক্ষে দুইশ বছর পেছনে চলে এসেছি। এখনাকার মানুষের পোষাক-আশাক, বিক্রির জিনস-পত্র সবাই দুই-আড়াইশ বছরের পুরনো। কয়েকজনকে দেখলাম ফোর্টের বাইরে বসে তিনশ বছর আগের একটা পোশাক পরে, আড়াইশ বছর আগের একটা বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে একশ বছর আগের বিভিন্ন গানের সুর তুলছে।  

কেউ কেউ দুইশো বছর পুরনো রাজ রাজাদের আমলের টুপি বিক্রি করছে। কোনটায় বরের টুপির মত লেজ আছে, কোনটায় নেই। লেজওয়ালাটা দেখতে পাগড়ীর মত। টুপি ছেলেদের জিনিস হলেও মেয়েরাই কিনেছে বেশি। তবে কারোটাতেই লেজ নেই। শুধু শাফকাত ছাড়া।    

ওইযে দের মিনিটে ঘুমিয়ে পরে বলেছিলাম নাহ, সে হলো শাফকাত। কেনার পর থেকে সারাক্ষণ সে লেজওয়ালা টুপিটা পরে থাকে। ছবি-টবি তোলার পর আমাদের টুপিগুলো ব্যাগে ঢুকে গেছে। ওরটা মাথায় আটকে আছে। যেখানেই যায়, টুপি পরে যায়।

এই টুপি পরার পর তাকে বর বর লাগছে। এটা বলার পর একটু লজ্জা পেল। লজ্জা পেয়ে মুখ ঢাকলো, কিন্তু টুপি খুললো না। মুখ ঢাকলে আরো বর বর লাগে। লজ্জাবতী বরের মত মুখ ঢেকে টুপি পরে বাসের পিছনের সিটে গিয়ে বসে থাকলো। স্যারেরাও হাসছে।

সাইফ মজা করার জন্য গান পর্যন্ত বানিয়ে ফেললো। তাও হিন্দি গান। শুনে শাফকাতও আর মুচকি মুচকি হাসে। কিছু বলে না। মনে হয় তার বরযাত্রার ফিলিং পাচ্ছে। 

শাফকাতের পাগড়ী

সেই পাগড়ী শাফকাত যত্ন করে রেখে দিয়েছে। সাইফ তার বিয়ের গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান করেছে শাফকাতের ঐ পাগড়ী পরে। পাগড়ী সার্থক। কিন্তু যার পাগরী তার বিয়েটাই বাকি।

জলমহল ও হাওয়ামহল

জলমহল

ফেরার সময় জলমহল দেখতে নামলাম। সময় বরাদ্দ দশ মিনিট। নেমে গ্রুপ ছবি তুলে চলে আসবো। গ্রুপ ছবি তুলতে সবাইকে পাওয়া যাচ্ছে না। কয়েকজন চলে গেছে শপিং করতে। কোন মতে ছবি তুলে সবাইকে ঠেলে-ঠুলে বাসে উঠানো হলো। বাস ছাড়তে পারছে না। রুমি নেই, শপিং করে ফেরেনি এখনো। শায়েখ গেছে রুমিকে ডেকে নিয়ে আসতে।

রুমিকে নিয়ে এসে দেখে পৃথ্বী নেই, শপিং করতে চলে গেছে। শায়েখ আবার গেল পৃথ্বীকে আনতে। পৃথ্বীকে ধরে নিয়ে আসার পর দেখে আবারও রুমি নেই।

আমরা বাসে বসে শায়েখের দৌড়াদৌড়ি দেখছি। রুমি, পৃথ্বী তার গ্রুপের মেম্বার, শায়েখ ওই গ্রুপের লিডার। সুতরাং দায়িত্ব নিয়ে আবারও গেল রুমিকে আনতে। দ্বিতীয়বার রুমিকে আনতে গেছে এই ফাঁকে পৃথ্বী আবারও এক দৌড় দিয়ে আরেকটা দোকানে চলে গেছে। এরা মনে হয় জয়পুর ছেড়ে যেতে চায় না। ইশ! সারাজীবন যদি শপিং করা যেত।

হাওয়া মহলে আর নামা হল না। দেখতে হলো চলন্ত বাসে বসেই, জানালা দিয়ে। এখানে নামাও রিস্কের, আশেপাশে দোকান-পাট গিজগিজ করছে।

হাওয়া মহল

ট্রেন স্টেশনে এসে জানলাম ট্রেন আসলে দুইটায় না, চারটায়। ঘুরার জায়গায় তাড়াহুড়া করে এসে এখন ট্রেনের জন্য চুপচাপ বসে আছি। ঠিকমত ঘুরতে না পারার জন্য এতক্ষণ দুঃখ ছিল, কিন্তু এখন নেই।

তবে মন খারাপ, মন খারাপ করে বসে আছি দুইজন মেয়ের মাঝে। নবনীতা ও স্বর্ণালী, তারা দুইজন দুইদিক দিয়ে ধরে রেখেছে। আমার সাথে ছবি তুলবে। এতে তো মন খারাপের কিছু নেই! মন খারাপের কারণ হলো শার্ট।

ট্যুরের জন্য অনেক চয়েজ করে শার্টটা কিনেছিলাম। লাল-কালো চেকের একটা শার্ট। প্রথমবার পরে বের হলাম। এসে দেখি মেয়ে দুজনও একই রকম দুইটা শার্ট পরে এসছে। তাই তারা এখন ছবি তুলবে আমার সাথে। এটা যে মেয়েদের কালারের শার্ট সেটা তো বুঝার কোন উপায় ছিল না। শার্টটা কেনার পর দেখি হলের একটা ছেলের বালিশের কাভারও এই ডিজাইনের। এখন চিন্তার বিষয় এই শার্টের ডিজাইনটা আসলে কিসের? মেয়েদের ড্রেসের নাকি বালিশের কভারের?

একটু পর সাদিদ আসলো, ওর গায়েও একই বালিশের ডিজাইন মার্কা শার্ট। একই ডিজাইনের শার্ট সবাই কিনেছি ব্যাপারটা যতটা না কাকতালীয়, তার চেয়ে বেশি কাকতালীয় সবাই একই দিনে পরে আসছি। আমরা তিনজন মিলে ছবি তুলছি, সাদিদকেও ডাকছি কিন্তু সে তুলবে না আমাদের সাথে ছবি। তার মন হয়তো বেশি খারাপ।

ট্রেন চলে এসেছে। রাজস্থান পর্ব শেষ। এরপরে যাব হিমাচল প্রদেশ। যেতে যেতে একটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করি- রাজস্থানেরা আরেকটা বিখ্যাত জায়গার নাম বলতে পারবেন যার নাম বাংলাদেশের প্রায় সবাই শুনেছে?

ক্লুঃ আপনিও শুনেছে। উত্তর দিতে পারলেই বুঝতে পারবেন প্রশ্নটা কেন করা হয়েছে।

না এটা মূল প্রশ্ন না। মূল প্রশ্নের আগে গত পর্বের প্রশ্ন নিয়ে একটু বলি, গত পর্বের প্রশ্ন ছিল- তাজমহলের স্থাপতি কে? 

অনেকেরই জানা উত্তরটা। আবার অনেকে উত্তর খুঁজে বের করেছেন। খুঁজে হোক আর জেনেই হোক AJ Aakhi এবং Farjana Zaman Snighdha এই দুইজন আবার উত্তর পাঠিয়েছেনও। তাই যারা খোঁজাখুঁজি করতে চান তাদের জন্য এই পর্বের প্রশ্ন-

প্রশ্নঃ জয়পুরকে Pink City বলা কেন?

(চলবে)…

কমেন্ট করুন

রোল- শহ-৩৪
সেশন-২০১৪-১৫
ড। মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ হল

মোঃ আজমির হোসেন

রোল- শহ-৩৪ সেশন-২০১৪-১৫ ড। মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ হল

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.