এল ডোরাডো: The lost city of gold

স্মৃতি তৈরি হয়, একটা নির্দিষ্ট সময় পর হয়তো হারিয়ে যায়। কিন্তু এল ডোরাডো’ এমন একটা শহর যা আদৌও তৈরি হয়েছিল কিনা তা এখন জানা যায় নি, তবে তার আবার আছে শত খোঁজ আর হারিয়ে যাওয়ার কাহিনী!

এল ডোরাডো” নামটি হয়তো আপনার কাছে পরিচিত হতে পারে কিংবা অপরিচিতও হতে পারে। তবে যারা কখনো রুপকথার কোনো অভিযানের গল্প পড়েছেন, তাদের বেশিরভাগেরই নামটি শুনলেই মনে ভেসে উঠার কথা এক সোনার রাজ্যের।

এল ডোরাডো, হারিয়ে যাওয়া সেই “সোনার শহর”, আজ পর্যন্ত বহু অনুসন্ধানীদের মন্ত্রমুগ্ধের মত আকর্ষণ করেছে। সেই আকর্ষণ কিন্তু শুধু অজানা কে জানার নেশায় নয়, বরং এল ডোরাডো অভিযানের পেছনে রয়েছে সোনার প্রতি মানুষের এক অদম্য লোভ। শত শত বছর ধরে ধন রত্নের প্রতি তীব্র আকাঙ্ক্ষা থেকেই জন্ম নিয়েছে কাল্পনিক সেই সোনার শহরের গল্প। ষোড়শ শতকে এই শহরকে নিয়ে উল্লেখযোগ্য একটি লিখা হলো হুয়ান রড্রিগজ ফ্রেইলের ‘দ্য কনকোয়েস্ট অ্যান্ড ডিসকভারি অব দ্য নিউ কিংডম অব গ্রানাডা’। মার্কিন লেখক এডগার অ্যালান পো বলেছিলেন, ‘এল ডোরাডো যেতে চাও, তবে চাঁদের পাহাড় পেরিয়ে, ছায়ার উপত্যকা ছাড়িয়ে, হেঁটে যাও, শুধু হেঁটে যাও।‘

ষোল এবং সতের শতকের দিকে ইউরোপীয়রা বিশ্বাস করত যে দক্ষিণ আমেরিকার কোন  একটা অংশে লুকিয়ে আছে সোনায় মোড়ানো একটি শহর যার নাম এল ডোরাডো। সেই সোনার শহরের স্বপ্নে বিভোর হয়ে বহু অভিযাত্রী দল দক্ষিণ আমেরিকার রেইন ফরেস্ট এবং পার্বত্য অঞ্চল সমূহে ব্যর্থ অভিযান চালিয়ে আসছে কিন্তু এই সোনার সন্ধান আজও মেলেনি। কারণ সেই সোনার শহর কোন স্থান নয় বরং একজন ব্যক্তি! এল ডোরাডো Myth(কল্পকথা) এর উৎপত্তির কাহিনী মূলত দক্ষিণ আমেরিকার কলম্বিয়ায় বসবাসকারী মুইসকা(Muiska) সম্প্রদায় এর সাথে জড়িত। ‘এল ডোরাডো’ একটি স্প্যানিশ শব্দ, যার অর্থ ‘স্বর্ণের তৈরি’ । মূলত, স্প্যানিশরা ‘এল হমব্রে ডোরাডো’ (সোনায় খচিত মানুষ) বা ‘এল রেই ডোরাডো’ (সোনায় খচিত রাজা) এই শব্দগুলো ব্যবহার করত একটা প্রাচীন উপজাতি, কলম্বিয়ার ‘মুইসকা’ জাতির প্রধান ‘জিপা’-কে নির্দেশ করতে।

‘মুইসকা’ সম্প্রদায় এর মানুষরা নিচু এলাকা থেকে স্থানান্তরিত হয়ে বসবাসের জন্য  কলম্বিয়ার চুন্দিনামার্কা ও বয়াকা অঞ্চলের উঁচুভূমিতে আসে যথাক্রমে খ্রিষ্টপূর্ব ১২৭০ ও খ্রিষ্টপূর্ব ৮০০-৫০০ সালের মধ্যে। এসময়ে পৃথিবীতে থাকা অন্যান্য অনেক সমৃদ্ধ সম্প্রদায়, যেমন মায়া ও ইনকা সমপ্রদায়ের লোকেরাও উচু ভূমিতে এসে বসবাস শুরু করে। মায়া বা ইনকার মত মুইসকা সম্প্রদায় ও যথেষ্ট সমৃদ্ধ ছিলো। তাদের যখন নতুন রাজা নিযুক্ত হতো, তখন তার দায়িত্ব গ্রহণের আগে নানান আচার-অনুষ্ঠান আয়োজিত হতো। এরকমই একটা প্রথা ছিলো যা পালন করতে নতুন রাজাকে গুয়াতাভিতা হ্রদের কাছে আনা হতো, তারপর তাকে সোনা দানায় সজ্জিত করা  হতো। তারপর  সোনা তৈরি উপকরনে সজ্জিত একটা ভেলায় অনেক সোনা ও দামী পাথরের সাথে তাকে ও তার সাথীদেরকে রাখা হতো। তারপর ভেলাটাকে হ্রদের কেন্দ্রে পাঠানো হতো, যেখানে হবু রাজা হ্রদের পানিতে ডুব দিয়ে সূর্য্য দেবতার সমস্ত সোনা দানা বিসর্জন দিতো। সেসময়ে ভেলায় থাকা রাজার সাথীরা ও সোনা ও মূল্যবান পাথরগুলো হ্রদের পানিতে নিক্ষেপ করতো। এই প্রথাটাকে মুইসকা্রা দেবতার প্রতি তাদের ত্যাগ বলে বিবেচনা করতো। সেখানে ‘এল ডোরাডো’ নামে কোনো শহর ছিলো না, বরং ঐ প্রথার মধ্যমণি রাজাকেই ‘এল ডোরাডো’ (স্বর্ণে খচিত) বলা হতো। যদিও ‘এল ডোরাডো’ একমাত্র রাজাকেই বলা হতো, তবে পরবর্তীতে ‘সোনার হারানো শহর’ বা দ্রুত সম্পদ আহরণ করা যায়, এমন কোন জায়গা বোঝাতেও এ শব্দটির ব্যবহার শুরু হয়।

মুইসকা সম্প্রদায় এর ধন রত্ন বিসর্জনের সেই কাহিনী সময়ের সাথে বদলে গিয়ে আজকের এই হারানো সোনার শহরের কল্পকাহিনিতে পরিণীত হয়েছে। কিন্তু অনেকের কাছে এই শহরের সত্যিই অস্তিত্ব রয়েছে এবং এই সত্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা করেছে। লোভের বশবর্তী হয়েই হউক বা খ্যাতির মোহে অথবা রহস্যের সন্ধানে , অনেকেই এল ডোরাডো’র সন্ধানে বহু অভিযান পরিচালনা করেছে। কল্পকাহিনী যেমন পরিবর্তিত হয়েছে তেমনি বদলেছে এল ডোরাডো’র অবস্থান। সোনার শহরের সন্ধান শুধু কলম্বিয়া বা গুয়াতাভিতা হ্রদের আশে পাশে সীমাবদ্ধ থাকেনি সমস্ত ল্যাটিন আমেরিকায় এর অনুসন্ধান কার্য ছড়িয়ে পড়েছিলো এবং আজো শেষ হয়নি সে অনুসন্ধান। এল ডোরাডোর অনুসন্ধান এর ফলে মানুষ যে শুধু ব্যার্থই হয়েছে তাই না। তারা তাতের কাঙ্ক্ষিত সোনার শহর না পেলেও, অনেক ইতিহাস ঐতিহ্য এ স্থাপনা আমাদের সামনে এনেছেন যা লোকচক্ষুর আড়ালে ছিলো।

১৫৪১ সালে সোনার শহরের খোঁজে অভিযাত্রী ফ্রান্সিসকো দে ওরেয়ানা আর গনসারো পিসারো অভিযানে বেরিয়েছিলেন। আমাজন নদীর পাশ দিয়ে যেতে যেতে নদীর পুরো দৈর্ঘ্যটাই জানা হয়ে যায় ওরেয়ানার। ২০০১ সালে রোমের এক পাঠাগারে হঠাৎ এক ধুলোমাখা নথি আবিষ্কৃত হয়। তাতে এল ডোরাডো শহরের কথা লেখা রয়েছে। আন্দ্রিয়া লোপেজ নামের এক ধর্মযাজক ১৭ শতকের সেই নথি লিপিবদ্ধ করেছেন বলে জানা যায়। লিপি থেকে জানা যায়, সেই শহরের অমিত ধনসম্পত্তির কথা। এল ডোরাডোর সন্ধান পেতে গত ১০০ বছরে নানা দেশের সংগঠিত অভিযানই হয়েছে অন্তত ১৪টি। এই অভিযানে ইনকা সভ্যতার অনেক নিদর্শন পাওয়া গেলেও দেখা মেলেনি সেই স্বর্ণ শহরের। ১৯৭১ সালে গহীন জঙ্গলে এমনিভাবে হারিয়ে গেছেন ফরাসি এবং মার্কিন একদল অভিযাত্রী। ব্রিটিশ মিউজিয়ামের প্রত্নতাত্ত্বিকদের ধারণা, দক্ষিণ আমেরিকার বিস্তীর্ণ রেইনফরেস্ট আর পার্বত্য অঞ্চলের কোনো এলাকায় এ স্বর্ণ নগরীর খোঁজ পাওয়া যেতে পারে। এই এল ডোরাডোর অনুসন্ধান করতে গিয়ে আবিষ্কৃত হয়েছে ইনকা সভ্যতার অন্যতম এক স্থাপনা ‘মাচুপিচু’। সন্ধানী মানুষ তাই আশায় বুক বাধতেই পারে যে, মাচুপিচু আর ট্রয় নগরীর মতো হঠাৎ একদিন তারা পেয়ে যাবেন সেই আরাধ্য সোনার শহর এল ডোরাডোর।

Early morning in wonderful Machu Picchu

এই সোনার শহর নিয়ে জল্পনা কল্পনার প্রতিফলন রূপে বানানো হয়েছে কিছু মুভিও। ১৯৬৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র নির্মিত ”El Dorado” কিংবা হালের এনিমেশন মুভি ”The road to El Dorado” এর প্লট সোনার শহরকে কেন্দ্র করেই। আর ২০১৭ তে মুক্তি পাওয়া জেমস গ্রে এর ”The lost city of Z” মুলত সোনার শহরের খোঁজ কেই বড় পর্দায় নিয়ে আসে।

গহীন আমাজনের ভেতরে আমজন নদীর কথা কেউ কোনদিন কল্পনাও করেনি কিন্তু মানুষ তা আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছে। হাজার বছর আগের ডাইনোসর নামক  প্রাণী ছিল মানুষের কল্পনা, কিন্তু মানুষ তা আজ ঠিকই প্রমাণ করেছে যে, একসময় পুরো পৃথিবী জুড়ে ছিল ডাইনোসরদের আধিপত্য। ঠিক তেমনি “এল ডোরাডোর” কল্পকথার শহরও বাস্তবতার জালে ধরা দিলেও দিতে পারে কোন এক সময়। সোনার শহরের খোঁজে বের হওয়া অভিযাত্রীদের উদ্দেশ্যে আডগার আলেন পো লিখেছেন:

Eldorado

Gaily bedight,
A gallant knight,
In sunshine and in shadow,
Had journeyed long,
Singing a song,
In search of Eldorado.

But he grew old—
This knight so bold—
And o’er his heart a shadow—
Fell as he found
No spot of ground
That looked like Eldorado.

And, as his strength
Failed him at length,
He met a pilgrim shadow—
‘Shadow,’ said he,
‘Where can it be—
This land of Eldorado?’

‘Over the Mountains
Of the Moon,
Down the Valley of the Shadow,
Ride, boldly ride,’
The shade replied, —
‘If you seek for Eldorado!’

By-Edgar Allan Poe  

তথ্যসুত্রঃ
https://.nationalgeographic.com/history/article/el-dorado
https://www.nationalgeographic.com/history/article/el-dorado
https://www.history.co.uk/shows/curse-of-lost-amazon-gold/5-legendary-lost-cities-of-gold-from-akakor-to-el-dorado
কমেন্ট করুন
শিক্ষার্থী | পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

শিক্ষাবর্ষঃ ২০১৯-২০

মোঃ সাবিত আল-সাবা রিয়ন

শিক্ষাবর্ষঃ ২০১৯-২০

প্যাপাইরাসের অনলাইন সংস্করণের ৪র্থ বর্ষপূর্তি

প্রতিযোগিতাটি শুধুমাত্র পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের জন্য