সেপ্টেম্বর 23, 2026

আজ মনটা ভীষণ খারাপ।
অসুস্থ শরীর নিয়ে শুয়ে আছি মেডিকেলের এক বেডে।

পুরো শহরের কোলাহল ছেড়ে, সব ব্যস্ততা ভুলে আজ আমি মেডিকেলে ভর্তি। একদিক দিয়ে ভালোই লাগছে। মনে হচ্ছে, এই বিষাক্ত শহরের যন্ত্রণা থেকে কিছুটা মুক্তি পেয়েছি।
কিন্তু শরীর যেন আর সাড়া দিচ্ছে না।

অবিরাম ছুটে চলা এক ক্লান্ত পথিক এভাবে শুয়ে থাকলে কি আর ভালো লাগে? কবে সুস্থ হয়ে উঠবো, কবে বাড়ি ফিরবো– এই ভাবনাতেই যেন ব্যস্ত হয়ে পড়েছি।

ওষুধের গন্ধে ভরে গেছে চার দেয়ালের আবদ্ধ এই ঘরটা। জানালার ফাঁক দিয়ে চোখ পড়ছে খোলা আকাশের দিকে।
স্বচ্ছ, রঙিন আকাশ যেন আমার পুরোনো বন্ধু হৃদয়ের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে।

মনে ভেসে উঠছে শৈশবের দিনগুলোর স্মৃতি।
মনে পড়ছে– বাবা-মায়ের সাথে একসাথে সেহরি ও ইফতার করার দৃশ্য। বন্ধুদের সাথে পুরো গ্রাম ঘুরে বেড়ানোর হাজারো স্মৃতি।

আমরা বিকেলবেলা যে বটগাছটার নিচে বসে আড্ডা দিতাম, সেই বটগাছটা এখন আর নেই। এতদিন যে গাছটি সবাইকে ছায়া দিয়ে এসেছে, সময়ের পরিক্রমায় মানুষের প্রয়োজনেই তাকে বিলীন হতে হয়েছে।
হয়ত তার দেওয়া ছায়ার কথা এখনও আমার মনে আছে।

আমিই বা বাঁচবো ক’দিন? নিঃস্বার্থভাবে যদি কারও উপকার করতে পারি, হয়ত ছায়ার মতো করেই কেউ আমাকে মনে রাখবে।

মেডিকেলের চার দেয়ালে বন্দি হয়ে শৈশবের কথা ভাবতে ভাবতেই একটা ফোনকল পেলাম।

ফোনটি আমার ছোটবেলার নিত্যদিনের সঙ্গী— হৃদয়ের।
যার সাথে কাটিয়েছি কত বেলা-অবেলা।
রমজান এলেই আমাদের আনন্দের শেষ থাকত না।

চাঁদ দেখা, ইফতারের সময় মসজিদে ছুটে যাওয়া— এসব ছিল ভীষণ আনন্দের মুহূর্ত।
একদিন মসজিদে আমি আর হৃদয় ইফতারের জন্য বসে আছি।
করিম চাচা বললেন,
“দেখো তো শরবতটা, চিনি ঠিক আছে কি না।”
হৃদয় তখন রোজা ছিল।
তবুও সে শরবত চেখে বললো,
“চিনি ঠিক আছে, আর লাগবে না।”
আমি হেসে বললাম,
“কি রে হৃদয়! তুই না রোজা রেখেছিস?”

হৃদয় হেসে বললো,
“পাগলা, রোজা নষ্ট হবে না। স্বাদ দেখছি, শরবত তো খাইনি।”

বন্ধু হৃদয়ের কথা মেনে নিতেই হয়।
সে আমার প্রিয় সঙ্গী ছিল। তবে কোথাও যেন একটা অমিলও ছিল।
আমি ছোলা-মুড়ির সাথে জিলাপি খেতে ভালোবাসতাম, কিন্তু সে সেটা পছন্দ করতো না।

সবার পছন্দ তো আর এক হয় না।
তার সাথে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত যেন এখন এক রঙিন সুতোয় বাঁধা স্মৃতি। রঙিন মুহূর্তগুলো কত দ্রুতই না শেষ হয়ে যায়! প্রকৃতির নিয়মে সব ধরে রাখা যায় না।

কত মান-অভিমান নিয়ে বড় হয়েছি আমরা দুজন। কখনো মন খারাপ হয়েছে, আবার কখনো হাসির আড্ডায় ফেটে পড়েছি।

কিছুক্ষণ আগে তাকে মজা করে “স্লিপার হৃদয়” বলে ক্ষেপাচ্ছিলাম।
তবুও আমার প্রিয় মানুষটি কিছু মনে করলো না। হেসেই উড়িয়ে দিল।
তাকে “স্লিপার হৃদয়” বলার পেছনেও একটা গল্প আছে।

সময়টা ছিল বর্ষাকাল,
চারদিকে পানি থইথই করছে।
২৭ রমজান— লাইলাতুল কদরের রাত।
সবাই নফল ইবাদতের আশায় মসজিদে রাত জাগবে।

আমি আর হৃদয়ও সওয়াবের আশায় মসজিদে গিয়েছিলাম। তবে আমাদের আরেকটা উদ্দেশ্যও ছিল— দোয়া শেষে খুরমা খাওয়া।

সারারাত জাগবো বলে আমরা মন স্থির করলাম। কিন্তু রাত বাড়ার সাথে সাথে চোখে ঘুমও বাড়তে লাগলো।

সেহরির সময় হওয়ার আগেই হৃদয় ঘুমিয়ে পড়লো।
আমি তার পাশেই শুয়ে ছিলাম।
হঠাৎ পায়ের শব্দে ঘুম ভাঙলো।
দেখি, আয়ান ভাই এসেছেন। তিনি খুব মজার মানুষ।
আজকে হৃদয় পড়লো আয়ান ভাইয়ের পাল্লায়।
আয়ন ভাই মসজিদের জায়নামাজ দিয়ে হৃদয়ের পুরো শরীর ঢেকে দিলেন। কাপড় দিয়ে চোখ-মুখ বেঁধে দিলেন।

আমি হাসিতে ফেটে পড়ছিলাম, তবে শব্দ করছিলাম না। পা দিয়ে হৃদয়কে জাগানোর চেষ্টা করছিলাম।

কিন্তু “স্লিপার হৃদয়” কি আর এত সহজে ওঠে!
আমি আর আয়ান ভাই বাইরে গিয়ে শুয়ে পড়লাম।
ঘণ্টাখানেক পর হঠাৎ হৃদয়ের চিৎকার—

“এই কে আছে?”

সবাই জেগে উঠলো।
হৃদয়ের দিকে তাকিয়ে সবাই হাসছে।
হৃদয় তাকিয়ে আছে আমার দিকে।

এরপরই শুরু হলো আমার দৌড়। হৃদয় আমাকে তাড়া করছে।

আমি দৌড়াতে দৌড়াতে বললাম,
“স্লিপার হৃদয়, এই কাজ আয়ান ভাই করেছে।”

কিন্তু আয়ান ভাই আমাকে রেখে আগেই পালিয়ে গেছে।

সবশেষে বাড়িতে ফিরে এলাম। সেহরি খেয়ে মায়ের কোলেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।
মায়ের হাতের রান্না এখন বড্ড মিস করি। মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়ানো, গল্প বলা— সেই ছোটবেলাটা কেন যে হারিয়ে গেল!

দু’দিন পরই ঈদ।
আমার তখনও কাপড় কেনা হয়নি। পরদিন আব্বুর সাথে বাজারে যাওয়ার কথা ছিল।

ঘুম ভাঙতেই আব্বুকে নিয়ে বাজারে যাওয়ার জন্য জেদ ধরলাম।
আমার পাঞ্জাবি, প্যান্ট আর জুতো কেনার খুব শখ ছিল সেদিন।
বাজারে গিয়ে দেখি দোকানে প্রচণ্ড ভিড়। মনে হচ্ছিল পুরো এলাকার মানুষ আজ কাপড় কিনতে এসেছে।
একটা লাল পাঞ্জাবি দেখে আমার মন আটকে গেল।

কিন্তু বিপদ হলো সাইজ নিয়ে। পাঞ্জাবিটা আমার সাইজে ছিল না।

মন খারাপ করেই অন্য রঙের পাঞ্জাবি কিনলাম।
সেদিন বুঝতে পারলাম— সবকিছু পছন্দ হলেও সবকিছু নিজের মতো হয় না। জীবনে অনেক সময় বাস্তবতাকে মেনে নিতে হয়।

বাড়ি ফিরে হৃদয়কে সব বললাম। দোকানের গল্প বললাম, লাল পাঞ্জাবির কথাও বললাম।
কিন্তু সে হাসছিল না।

চুপ করে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল।

আমি বললাম,

“কি রে হৃদয়, এমন গুম মুখে আছিস কেন?”
সে কিছু বললো না।

কিছুক্ষণ পরে কথা বলা শুরু করলো।

হৃদয়ের বাবা ছিলেন বর্গাচাষি কৃষক। তাদের নিজস্ব জমি ছিল না। অন্যের জমিতে চাষ করেই সংসার চলতো। অভাবের সংসার, নতুন পাঞ্জাবি কেনা হয়নি।

সেদিন হৃদয়ের কথাগুলো আজও আমার মনে আছে।

সে আমার চেয়েও অনেক আগেই বাস্তবতা বুঝে গিয়েছিল।

হৃদয় আকাশের দিকে তাকিয়ে বলছিল,
“বন্ধু, এসব বাদ দে। কিছুক্ষণ পর আকাশে ঝড় উঠবে।”
“ঝড়ের পরে বৃষ্টি নামবে। মনে হবে আকাশ কাঁদছে।”
“তারপর একসময় বৃষ্টি থামবে। তখন আবার আকাশে রংধনু উঠবে।”
“আমরা সবাই সেই রংধনু দেখে মুগ্ধ হয়ে যাবো।”

আমি গভীরভাবে তার কথা ভাবছিলাম।
তখনও বুঝতে পারিনি— হৃদয় আসলে তার মনের কষ্টটাই বলছিল।
কারণ সেদিন তাদের বাড়িতে ভাতের চাল ছাড়া আর কিছুই ছিল না।
পরশু ঈদের দিনে কী রান্না হবে– সেটাও তারা জানত না।

হৃদয় তখন বিলে মাছ ধরতে যাচ্ছিল।
বর্ষাকালে বিলে প্রচুর মাছ হয়। হৃদয়ের বাবা বিলে জাল ফেলেছে, মাছ ধরার জন্য।

আমি অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিলাম তার দিকে। ভাবছিলাম— একটি অভাবী পরিবারের ঈদের গল্প। অভাবের সংসারের প্রকৃতির নিয়মে বেড়ে ওঠা আমার বন্ধু হৃদয়ের কথা। হাঁটতে হাঁটতে হোঁচট খেয়ে বাড়িতে ফিরে গেলাম।

মা ইফতার সাজিয়ে রেখেছে। বাবা বসে, শরবত বানাচ্ছে। প্লেটে সাজিয়ে রেখেছে আপেল, খেজুর আর আনারস। এত ফলমূল দিয়ে আমাদের ইফতার হবে। অভাবের সংসারে এতকিছু দিয়ে কি ইফতার হয়?

সর্বোপরি, ইফতারের সময় হয়ে আসছিলো, বাবার কাছে বায়না ধরেছিলাম।
আমাকে আর একটা পাঞ্জাবি কেনার টাকা না দিলে, আমি ওই পাঞ্জাবি পরব না। কেন, কথার কোনো উত্তর নেই। টাকা নিয়েই ইফতার শেষ করেছিলাম সেদিন।

ইফতারের পর থেকে হৃদয়ের সাথে দেখা হয়নি। মন ছটফট করছিলো, হৃদয়ের কিছু হলো না তো আবার?
হৃদয়দের বাড়িতে গিয়েও হৃদয়কে খুঁজে পেলাম না।
মনে মনে ভাবলাম, হৃদয় হয়ত মন খারাপ করেছে আমার উপর, এভাবেই সময়টা পার করলাম।
বিকেল বেলা, রাস্তায় দাঁড়ায় আছি। হঠাৎ করেই হৃদয়কে দেখলাম বাজার থেকে ফিরছে।
কি রে হৃদয়, কই ছিলি এতক্ষণ?
তোকে কত খুঁজলাম, পেলাম না যে কোথাও।

আমি বাজারে গিয়েছিলাম, মাছ নিয়ে।
তো কেমন বিক্রি করলি?

বিক্রি বেশ ভালোই হয়েছে, কাল থেকে জালে ভালোই মাছ পাচ্ছি। আর কোনো চিন্তা নেই রে, পরশু তো ঈদ। ভালোই কিছুই খাবো।

খুশিতে দিশেহারা হয়ে গেলাম। যেই টাকাটা বাবার কাছে থেকে নিয়েছিলাম, ওই টাকা হৃদয়কে দিয়ে বললাম, আব্বু দিয়েছ, রেখে দে।

এই হৃদয় যে, অন্য একজনের মতো নয়। এত সহজেই ও টাকা নেবে না। হৃদয় বললো,

তুই ঈদের দিন আমাদের বাড়িতে আগে সেমাই খাবি, তারপর আমি তোর টাকা নেব।
হৃদয়ের সাথে কথা বলতে বলতে বাসায় আসলাম।

টিভিতে সংবাদ দেখছি, জাল ব্যবহার নিষিদ্ধ, এতে করে দেশীয় মাছ দিন দিন কমে যাচ্ছে। মনে পড়লো হৃদয়ের কথা।
মনে প্রশ্ন জাগলো, আজ যদি হৃদয়ের বাবা এই অপরাধটুকু নাইবা বা করতো, হৃদয়ের ঈদটা কেমন হতো?

বাস্তবতা সেদিনও বুঝতাম, এখনও বুঝার চেষ্টা করি। বাস্তবতাকেই আবার মানতে নারাজ হয়ে যাই মাঝে মাঝে। কেন জানি মনে হয়, বাস্তবতা এমন না হলেও তো পারতো।

অপরাধ একটু না হলে, ভালো খাবার রান্না করতে পারতো না। আমি আমার প্রিয় সঙ্গী হৃদয়ের হাসিমুখটা খুঁজে পেতাম কি?

ঈদের দিন নামাজ শেষে হৃদয়দের বাড়িতে গেলাম।
সেমাই খাওয়ার সময় আমি তাকে লুকিয়ে টাকা দিতে চাইলাম।
হৃদয় কানে কানে বললো,
“এই টাকা দিয়ে আমরা ঘুরতে যাবো।”
সারাদিন শহর ঘুরলাম। রিকশায় শহর ঘোরার মজা আলাদা।

সেদিন হৃদয় দুজন পথশিশুকে আইসক্রিম কিনে দিয়েছিল।

তার সেই উদারতা আজও আমার মনে আছে।
আজ সেই হৃদয়ই ফোন করে আমার খোঁজ নিচ্ছে।
মেডিকেলে ভর্তি শুনেই বলেছে— কালই আসবে।

হৃদয় আজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে।

সে এখনও আকাশের দিকে তাকিয়ে স্বপ্ন দেখে।
সে ঝড়কে ভয় পায় না।
সে আকাশে রংধনু দেখতে চায়।
সবসময় বৃষ্টির পরে রংধনু না উঠলেও, আকাশটা স্বচ্ছ হয়ে যায়।
আর যে রংধনু দেখা দেয়, তার দিকে সবাই তাকিয়ে থাকে।

এসব কথা ভাবতেই
কে যেন, দরজায় নক করলো।

ডাক্তার রুমে ঢুকলেন।
“কেমন আছেন?”

আমি বললাম, এই তো বেশ ভালো।
“ডাক্তার, জানালার দিকে তাকান তো। আকাশ ভারি মেঘলা, তাই না?”

ডাক্তার বললেন,
“হ্যাঁ, মনে হয় বৃষ্টি হবে।”

“বৃষ্টির পরে রংধনু উঠবে কি?”

ডাক্তার একটু থেমে বললেন,
“আপনাকে এখনও ছাড়পত্র দেওয়া যাবে না। ঈদটা এখানেই কাটাতে হবে।”

আমি চুপ করে থাকলাম।
“ডাক্তার, কাল যদি আমার বন্ধু হৃদয় এখানে আসে, আমার মনের আকাশে রংধনু উঠবে।”
“তখন আমি মানসিকভাবে সুস্থ হয়ে যাবো।”

“আর ডাক্তার, যদি পারেন… ঈদের দিনে এখানে থাকা গরিব রোগীদের জন্য ভালো খাবারের ব্যবস্থা করবেন।”

ডাক্তার দীর্ঘশ্বাস ফেললেন,

“সেটা আমার একার পক্ষে সম্ভব না।”

আমি হেসে বললাম,
“তাহলে সরকারের লোকদের বলবেন।”

তারপর জানালার দিকে তাকিয়ে বললাম—
“আর হ্যাঁ ডাক্তার, কাল হৃদয় এলে… আমি কিন্তু তার সাথে পুরো শহরটা ঘুরে দেখবো।”

কারণ—
ঝড় যতই হোক
বৃষ্টির পর
কোনো না কোনো দিন
আকাশে রংধনু দেখাবেই।

শিক্ষার্থী | পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
Facebook
Threads
LinkedIn
Telegram
X
Reddit
Email
WhatsApp

আরও লেখা সমূহ