এক জোড়া ক্লান্ত হাত যখন টেবিলের ওপর কলমটা শেষবারের মতো রাখল, তখন হলের দেয়ালঘড়ির শেষ ঘণ্টাটা টনটন করে বেজে উঠেছে। খাতা জমা পড়ার সাথে সাথে একটা পুরো বছরের ক্লান্তি যেন ওই শেষ কালির টানের মধ্য দিয়ে বিদায় নিল। গত একটা বছর যে কী পরিমাণ ঝড় ও মানসিক চাপ গিয়েছে, সেটা হয়তো শুধু সেই কলমটাই জানে। ৪ ঘণ্টার এই নীরব যুদ্ধ শেষে কার্জনের সেই চিরচেনা লাল ইটের বিল্ডিংয়ের বাইরে পা রাখতেই মনে হলো, অবশেষে এই বুঝি তবে এক বুক মুক্তির বাতাস মিললো।
হল থেকে বের হয়ে আশেপাশে সবাই প্রশ্নের উত্তর মিলাতে ব্যস্ত। তবে আশেপাশের চেনা মুখগুলোর উত্তর মেলানোর তীব্র চেঁচামেচিকে ছাপিয়ে দূর থেকে বাস ছেড়ে দেওয়ার ইঞ্জিনের শব্দটাই কানে সবচেয়ে বেশি গিয়ে বাজল। কাঁধের ব্যাগটা শক্ত করে ধরে, কোনো কিছু না ভেবেই সব শক্তি পায়ের উপর ভর করে শুরু হলো গেটের দিকে অন্ধ দৌড়। কোনোমতে হাত বাড়িয়ে চলন্ত বাসের পেছনের রডটা আঁকড়ে ধরতেই শরীরটা এক ঝটকায় ফুটবোর্ড গলে ভেতরে চলে এল। পিঠের ব্যাগটা সামলে বাসের হাতল ধরে সোজা হয়ে দাঁড়ানো গেল। ফুটবোর্ডে শান্ত হয়ে থাকা ক্লান্ত পা আর বুকের ভেতরের ধকধকানিটা জানান দিলো, অবশেষে তাহলে শেষ বাসটা ধরা গেছে।
ক্লান্ত দু’চোখ মেলে ভিতরে তাকিয়েই বোঝা গেল, ভেতরে তিল ধারণেরও জায়গা নেই। অগত্যা লোহার হাতল ধরে গেটেই দাঁড়িয়ে থাকতে হলো। কার্জন পার হয়ে বাসটা ফ্লাইওভারে উঠতেই ড্রাইভার স্পিড বাড়িয়ে একটা চেনা টান দিলো। বাসের গেট দিয়ে ধেয়ে আসা বাতাসে এলোমেলো হয়ে উড়তে লাগলো চুলগুলো। সারাদিনের সব ক্লান্তি যেন চোখের নিমিষেই বাতাসে মিশে হারিয়ে গেল। ঠিক ওই মুহূর্তেই ওপরের তলা থেকে হইচই করতে করতে নেমে এলো পরিচিত কিছু মুখ। ব্যস, নিস্তব্ধতা ভেঙে বাসের গেটটাই যেন হয়ে উঠল একটা মিনি টিএসসি। হাতল ধরে ঝুলতে ঝুলতেই পরীক্ষা আর সিজির ট্রমা ভুলে শুরু হলো তুমুল আড্ডা। হাসাহাসি আর তুমুল আড্ডার খেই হারিয়ে কার যেন ঠোঁটের কোণে একটা মেলোডি গুনগুন করে উঠল। পরের মুহূর্তেই সবাই সেই সুরে গলা মেলাতেই পাল্টে গেল পুরো বাসের পরিবেশ।
বাসটা তখন শহরের সবচেয়ে ব্যস্ততম সিগন্যালটায় এসে দাঁড়িয়ে পড়েছে। পুরো রাস্তা স্থবির হয়ে পড়লেও বাসের গেটের সেই গান এখনও চলছে। গানের সাথে গলা মেলাতে মেলাতে একসময় তার দৃষ্টি আটকে গেল। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে কলেজ ড্রেস পরা, কাঁধে ব্যাগ ঝুলানো একদল ছেলে। ওদের কপালে ঘাম জমলেও তাদের চোখগুলো স্থির হয়ে আছে বিশ্ববিদ্যালয়ের এই জীর্ণ লাল বাসটার দিকে। সেই চোখে এক অপার্থিব স্বপ্ন, মোহ আর আকুতি। বাসের জানালার সিটে বসা মুখগুলোর দিকে তাকিয়ে ওরা হয়তো মনে মনে ভাবছে, “কবে আমিও ওই বাসে চড়ে ওই স্বপ্নের স্বাধীন জীবনটায় পৌঁছাব?” ওদের চোখের ওই তীব্র চাহনি এক ঝটকায় তার মনের ভেতরের সময়টাকে উল্টে দিল। চারপাশের জ্যামের হর্ন আর ধোঁয়া ম্লান হয়ে চার-পাঁচ বছর আগের একটা দুপুর সামনে এসে দাঁড়াল।
সেদিন আকাশটা হয়তো এমনই তপ্ত ছিল। পকেটে কলেজের আইডি কার্ড, বন্ধুদের সাথে ক্লাস বাঙ্ক দিয়ে এক বুক উত্তেজনা নিয়ে প্রথমবার আসা হয়েছিল সেই স্বপ্নের লাল ইটের বিল্ডিংটার গেটের সামনে। ইচ্ছে ছিল ভেতরে ঢুকে শতাব্দী-প্রাচীন মায়াবী করিডোরগুলো ছুঁয়ে দেখার, ওখানকার ঘাসে বসে এক টুকরো স্বাধীন আকাশ দেখার। কিন্তু গেটের মুখে আসতেই সিকিউরিটি গার্ডের কর্কশ হাত আর কঠিন কণ্ঠস্বর পথ আটকে দিয়েছিল, “আইডি কার্ড ছাড়া বাইরের কারও ঢোকা নিষেধ।”
একরাশ অপমান আর তীব্র এক জেদ নিয়ে সেদিন বন্ধুদের ভিড়ে গুটিগুটি পায়ে ফিরে যেতে হয়েছিল তার। কিন্তু ফেরার পথে লোকাল বাসের জানালায় চোখ রেখে মনের কোণে একটা অবাধ্য প্রতিজ্ঞা জমে বসেছিল, “একদিন এই গেট আমার পথ আটকাবে না। একদিন আমি ওখানেরই একজন হয়ে বুক ফুলিয়ে ভেতরে ঢুকব।”
সেই একটা জেদকে টিকিয়ে রাখতে কত রাতের ঘুম বিসর্জন দেওয়া হয়েছে, কত শত সূত্র আর থিওরির ভিড়ে ভেতরের সহজ-সরল মানুষটাকে একটু একটু করে খুন করা হয়েছে, তার কোনো হিসেব নেই।
আজ সেই প্রতিজ্ঞা পূরণ হয়েছে। আজ আর কেউ গেটের মুখে পথ আটকে দাঁড়ায় না। এখন প্রতিদিন সকাল-বিকেল ওই লাল ইটের আঙিনায় পা পড়ে, করিডোর দিয়ে হেঁটে যাওয়া হয়, ওখানকার বাসেই নিয়মিত যাতায়াত। কিন্তু এ কী নির্মম সত্য! আজ ভেতরে ঢোকার পর সেই পুরোনো দুপুরের চেনা উত্তেজনাটার আর কোথাও অস্তিত্ব নেই। করিডোরের লাল ইটগুলোকে তার কাছে এখন আর কোনো মায়াবী রাজপ্রাসাদ মনে হয় না; কেবলই রোজকার চেনা এক ক্লান্তিকর বদ্ধ খাঁচা মনে হয়। যে ‘আমি’টা সেদিন গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে অতটুকু মায়ার জন্য ছটফট করছিল, তাকে তো সেই জেদের চোটে পড়ার টেবিলেই কোথাও ফেলে আসা হয়েছে। আজ এই গন্তব্যে পৌঁছানোর পর দেখা গেল, এখানে কোনো জাদুকরী আনন্দ নেই; আছে শুধু এক ক্লান্তিকর Rat Race।
বাসটা যখন একটা ঝাঁকুনি দিয়ে সিগন্যাল ছেড়ে ধোঁয়া উড়িয়ে এগিয়ে যেতে লাগল, সে তখন বাস্তবতায় ফিরে এলো। তার চারপাশে সবাই গান গাচ্ছে, কিন্তু সেই গানের লাইন এখন আর তার ব্রেইনে ঢুকছে না। তখন সে ভাবছে, ওরা যাকে ‘স্বাধীনতা’ ভেবে হাহাকার করছে, সেই ভার্সিটির রঙিন দেয়ালগুলোর আড়ালে যে কী নিদারুণ নিঃসঙ্গতা আর যুদ্ধের গল্প লুকিয়ে আছে, তা ওই স্বচ্ছ চোখগুলো টের পেল না। আজ থেকে চার-পাঁচ বছর আগে ঠিক এই ড্রেসটা গায়ে চাপিয়ে সে নিজেও তো ঠিক এভাবেই রাস্তার ওপার থেকে দেখা স্বপ্নগুলোকে পরম মমতায় ছুঁতে চাইত। ভাবত, ওই সীমানা পেরিয়ে গেলেই বুঝি পাওয়া যাবে এক দিগন্তবিস্তৃত আকাশ।
অথচ আজ এই ইনকোর্স-ফাইনাল পরীক্ষার ট্রমা, সিজিপিএ- এর ইঁদুরদৌড় আর ক্যারিয়ারের অনিশ্চয়তার পেছনে ছুটতে ছুটতে তারা একেকজন যেন সেই স্বপ্নের খাঁচাতেই বন্দি। স্বাধীনতার যে রঙিন চাদর দূর থেকে দেখা যায়, তার নিচে লুকিয়ে থাকা ক্লান্তি আর অন্ধকারের গল্পটা আজ বড় পরিষ্কার তার কাছে। ওই কলেজপড়ুয়া ছেলেগুলো আজকে কেবল ওদের এই বাসের গেটের ক্ষণিকের হাসিমুখ আর উচ্ছ্বাসের অভিনয়টুকুই দেখল; কিন্তু এই কৃত্রিম আনন্দের আড়ালে প্রতিদিন যে চেনা যুদ্ধটা তাদের গিলে খাচ্ছে, তা ওই কাঁচা স্বপ্নের আড়ালেই রয়ে গেল।
বাসটা গতি বাড়াতেই ধুলো আর কালো ধোঁয়ার আস্তরণে ছেলেগুলোর অবয়ব আস্তে আস্তে ঝাপসা হয়ে গেল। ফ্লাইওভারের ওপর থেকে পাওয়া সেই এক চিলতে হাওয়াটাও ততক্ষণে বাসের ভেতরের গুমোট গরমে উবে গেছে। সে একটা শুকনো দীর্ঘশ্বাস চেপে জানালার বাইরের ওই ধূসর জ্যামের দিকে চোখ ফেরাল, যেখানে প্রতিটা মানুষই কোনো না কোনো মরীচিকার পেছনে অন্ধের মতো ছুটে চলেছে।
মানুষ বোধহয় কখনো স্বপ্নের পেছনে ছোটে না। সে ছোটে নিজের কল্পনার পেছনে। আর কল্পনার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, দূর থেকে সবকিছু খুব সুন্দর দেখায়। দীর্ঘ এক ক্লান্তিকর যাত্রার শেষে এসে আজ স্পষ্ট বোঝা গেল, গন্তব্য বলে আসলে কিছুই ছিল না; চারপাশ জুড়ে জমে ছিল শুধু পথের ধুলো…..
- This author does not have any more posts.







