আগস্ট 14, 2026

উপসম্পাদকীয় – আগস্ট ২০২৬

ইংরেজিতে একটা প্রবাদ বাক্য আছে, “Crossing the Rubicon।” এর মানে হলো এমন কোনো কাজ, এমন কোনো ঘটনা, এমন কোনো সিদ্ধান্ত যা একবার হয়ে গেলে আর ফেরত আসা যায় না।

এর ইতিহাসটা হলো, ৪৯ খ্রিষ্টপূর্বে ইতালিতে একটা শান্ত নদী ছিলো। এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিলো যে, যে এই নদী পার করবে সে রোম রিপাবলিকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে বলে ধরে নেওয়া হবে। যেকোনো জেনারেলের জন্য আইনত নিষিদ্ধ ছিলো এই নদী সেনাবাহিনী নিয়ে পার হওয়া। তৎকালীন সময়ে রোম রিপাবলিকের জেনারেল ছিলেন “জুলিয়াস সিজার”। তিনি গল (তৎকালীন ফ্রান্স) বিজয় করার পর এই নদীর সামনে এসে দাঁড়ালেন। তার উদ্দেশ্য ছিলো ক্ষমতা দখল করা। তিনি সেখানে দাঁড়িয়ে বললেন, “The die is cast” (অর্থাৎ, ছক্কা নিক্ষেপ করা হয়ে গেছে, আর ফেরার উপায় নেই)। তারপর তিনি এই নদী পার করলেন এবং সেনেট-সমর্থিত জেনারেল পম্পেইয়ের বিরুদ্ধে গৃহযুদ্ধে জয়ী হয়ে রোমের একচ্ছত্র ক্ষমতা দখল করলেন। এই ঘটনার সূত্র ধরেই পরবর্তীতে তার উত্তরসূরি অগাস্টাসের হাত ধরে শুরু হয় ইতিহাসের “দ্যা গ্রেট রোমান” সাম্রাজ্যের। আর সিজার যেই নদীটি পার করেছিলেন তার নাম ছিলো “Rubi” এবং এর থেকেই আসে “Crossing the Rubicon” প্রবাদ বাক্যটি।

জুলাই ২০২৪ এবং ৫ই আগস্ট হলো আমাদের জাতীয় জীবনে রুবিকন ক্রস করার মতন। ৫ই আগস্ট তাহলে কেন রুবিকন ক্রস করার মতন?

৫ই আগস্ট পূর্ববর্তী সময়ে অনেক বাংলাদেশীর মনে এই ধারণা বা ভয় গেঁথে গিয়েছিলো যে, মৃত্যু ব্যতীত হয়তো ফ্যাসিস্ট, গণহত্যাকারী শেখ হাসিনার পতন সম্ভব নয়। বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত ও মেধাবী তরুণদের বিশাল অংশ তখন রাজনীতি এবং রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত সবকিছুকেই এক প্রকার এড়িয়ে চলতে পছন্দ করতো। ১৯৬০-এর দশকে মূলত চে গুয়েভারা, ফিদেল কাস্ত্রো, আমেরিকা-রাশিয়া স্নায়ুযুদ্ধ, হিপ্পি মুভমেন্ট ইত্যাদির প্রভাব যখন সারা বিশ্বে তুঙ্গে, তখন তার প্রভাব এই দেশের তরুণদেরও প্রভাবিত করে। তার ফলশ্রুতিতে সিরাজুল আলম খান, সিরাজ সিকদারদের মতন বামপন্থী নেতার দেখা পাওয়া যায়। এভাবেই মধ্যবিত্ত পরিবারের তরুণদের রাজনীতিতে প্রবেশ বলা যায়। কিন্তু হাসিনা আমলে তা প্রায় শেষের পথে ছিলো বলেই ধরা যায়। অধিকাংশ মধ্যবিত্ত পরিবারের তরুণদের মুখে একটা কথা কমন ছিলো, “The greatest Bangladeshi dream is to leave Bangladesh.” কিন্তু ২০২৪-এর ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি পরিবর্তন হয়েছে। এখনকার মধ্যবিত্ত পরিবারের মেধাবী তরুণেরা রাজনীতি সচেতন হচ্ছে। চায়ের দোকানে, ক্লাসের ফাঁকে, রেস্টুরেন্টে এমনকি পরিবারের খাবার টেবিলের আড্ডায় তারা রাজনীতি নিয়ে কথা বলছে। তবে এই তরুণদের রাজনীতি সম্পর্কিত চিন্তাধারা কোনো গতানুগতিক চিন্তাধারা নয়। বর্তমানের সাধারণ তরুণরা শুধু দলীয় রাজনীতি নয়, বরং রাজনৈতিক কাঠামো নিয়ে কথা বলে। গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, সাধারণতন্ত্র ইত্যাদি সবকিছুর ব্যাপারে তারা প্রশ্ন তোলে। শিক্ষা, অর্থনীতি, সেবাখাত ইত্যাদির ডাইমেনশনে যেভাবে পরিবর্তন হয়েছে, একইভাবে তারা ভিন্ন রাজনৈতিক ডাইমেনশনে চিন্তা করে, আলোচনা করে। আর এটাই আমাদের সুন্দর ভবিষ্যতের আশা দেখায়। কেননা পলি-ক্রাইসিস যখন মেটা-ক্রাইসিসে পরিণত হয়, মেধাবীরা তখন বিদ্যমান কাঠামোকে প্রশ্ন করবেই! ৫ আগস্ট আমাদের সেই চিন্তা এবং চিন্তাশীলদের ফিরিয়ে দিয়েছে, যারা এখন এই জমিন এবং কওমকে নিয়ে ভাবে।

Facebook
Threads
LinkedIn
Telegram
X
Reddit
Email
WhatsApp

আরও লেখা সমূহ