মজলুমের প্যাপাইরাস

-আপনার নাম?

-মানিক মিয়া।

-পড়াশোনা করেছেন কোথায়?

-ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।

-বিষয় কী ছিলো?

-পরিসংখ্যান।

-এই বিষয়ে কী শেখানো হয়?

-স্যার, হিসাব নিকাশ।

-ক্লাস কোথায় হতো?

-কাজী মোতাহার হোসেন ভবনে।

-আগে যেটাকে এনেক্স বিল্ডিং বলতো…

-জ্বি, স্যার!

-আপনি কী বলতে পারবেন এই ভবনের নকশা কে করেছে?

-না, স্যার!

-আমি তারে পাইলে…

-কী করতেন, স্যার?

-মাথার ঘিলু বের করে দিতাম। ব্যাটা বজ্জাত, দেখে মনে হয় সাততলা বিল্ডিং কিন্তু এটা চারতলা।

-তাতে কোন সমস্যা, স্যার?

-অবশ্যই সমস্যা, যে ভবনে হিসাব নিকাশ পড়ানো হয়, সেই ভবনের হিসাব ঠিক নাই, এত উঁচু ভবন মাত্র চারতলা। এটাতো রীতিমত প্রহসন!

-আমিও আপনার সাথে একমত স্যার।

-এর কারণ আপনি জানেন?

-না, স্যার।

-আমি নিশ্চিত, ব্যাটা ইঞ্জিনিয়ার সব সময়ে পরিসংখ্যান ফেল করতো। তাই পরিসংখ্যানবিদদের একটু শায়েস্তা করার জন্য এই ভবন বানিয়েছে। যেন উপরে উঠতে উঠতেই আধ মরা হয়ে যায়। আপনার কী মনে হয়?

– হতে পারে, স্যার।

– লিফট ছাড়া উচু সিড়ি বেয়ে উপরে উঠলে তো জান খারাপ হয়ে যাবে।

– জ্বী স্যার, আমাদের খুব কষ্ট হয়।

-বয়স্ক শিক্ষকদের কী অবস্থা? এঁদের তো মারা যাওয়ার কথা।

– জ্বী স্যার, সিনিয়র শিক্ষকদের অবস্থা খুবই খারাপ। কয়েকজনের গুরুতর হার্টের সমস্যা।

-যাকগে, এবার আমরা আসল ব্যাপারে আসি। কী ব্যাপারে যেন আমরা কথা বলতে ছিলাম?

-স্যার, পরিসংখ্যান।

-জানেন মিস্টার মানিক, এই পরিসংখ্যান বিষয়টারে আমি খুব অপছন্দ করি।

-কেন স্যার?

-এরা সব সময় ঝামেলা করে।

-একটু বুঝিয়ে বলবেন?

-ধরেন, মাঠে অনেকগুলো গরু আছে। দুজনকে আলাদাভাবে গুনতে দেয়া হলো। একজন সাধারণ লোক এবং আরেকজন পরিসংখ্যানবিদ। সাধারণ লোক কয়টি গরু আছে, তা গুনে বলে দিবে। কিন্তু একজন পরিসংখ্যানবিদ এটাকে নিয়ে বারবার কচলাবে।

-বুঝলাম না, স্যার!

-পরিসংখ্যানবিদ প্রথমে গরুর পা গুনবে, তারপর পায়ের সংখ্যাকে চার দিয়ে ভাগ দিবে। এরপর বলবে কয়টি গরু আছে। যদি কোনভাবে ভাগ না মিললে, এই টেস্ট ঐ টেস্ট করতে করতে জান খারাপ করে দিবে।

-জ্বি স্যার, পরিসংখ্যানবিদরা সবসময়ই ঝামেলা করে।

– ঠিক ধরেছেন। এরা একটু আধা পাগল টাইপের।

-আধা পাগল কেন স্যার?

-পুরো পাগলকে আপনি সামলাতে পারবেন, কিন্তু আধা পাগলের পাল্লায় পড়লে আপনার জান খারাপ হয়ে যাবে।

-আমরা যারা পরিসংখ্যানের ছাত্র, আমাদের বাঁচার উপায় কী?

-বাঁচার উপায় নাই, তবে পরকালে আমরা শান্তিতে থাকব।

-কীভাবে স্যার?

-মৃত্যুর পর ফেরেশতারা আল্লাহকে বলবে- এরা পরিসংখ্যানের ছাত্র, দুনিয়ায় এদের শাস্তি হয়ে গেছে, দুইবার শাস্তি দিলে জুলুম হয়ে যাবে।

-তাহলে তো পরিসংখ্যানের সবাই স্বর্গে যাবে!

– না মানিক সাহেব, সব পরিসংখ্যানবিদ স্বর্গে যেতে পারবে না। কিছু বজ্জাত আটকা পড়ে যাবে।

-এরা কারা?

-এরা হচ্ছে পরিসংখ্যানবাজ, যাদের জ্বালায় সবাই বিপদে ছিল। এরা পরিসংখ্যানের গ্যাড়াকলে ফেলে ছাত্রদের ঘুম হারাম করে দিয়েছিল।

-পরকালে না হয় বেঁচে গেলাম, কিন্তু দুনিয়ায় এদের হাত থেকে বাঁচার উপায় কী?

-খুব সহজ, এদের প্রত্যেককে দুটি করে বিয়ে দিতে হবে। তখন দুই বউ সামলাতেই এদের জান খারাপ হয়ে যাবে। তখন আর আমাদের জ্বালাতন করার সময় পাবে না।

-কিন্তু স্যার, এদেরকে কেউ বিয়ে করতে চায় না।

-কেন?

– ঐ একই কারণ। এদের উৎপাত থেকে সবাই বাচঁতে চায়। শুনেছি, বাসর রাতেও নাকি এরা স্ত্রীকে পরিসংখ্যান শেখাতে যায়। কী জঘন্য ব্যাপার!

-তাহলে এদেরকে কী করা যায়?

-স্যার, আমার মনে হয়, এদের সবাইকে একটা করে পুরান গাড়ি কিনে দিই। এমনভাবে রং করা থাকবে, দেখলে মনে হবে লেটেস্ট মডেল, কিন্তু ইঞ্জিনটা হলো ব্রিটিশ আমলের।

-তাতে কী হবে?

-প্রতিদিন গাড়ি নষ্ট হবে আর গ্যারেজে যেতে হবে। আমাদের উৎপাত করার আর সময় পাবে না।

-আইডিয়াটা চমৎকার। কিন্তু ইঞ্জিনের শব্দ শুনলে তো পুলিশ ছাড় দিবে না, সোজা রেকার দিয়ে বুড়িগঙ্গায় ফেলে দিবে। তখন গাড়ির শোকে আমাদেরও ঘুম হারাম করে দিবে।

-তাহলে উপায় কী, স্যার?

-বাদ দেন, এই সব আধাপাগলদের নিয়ে সময় নষ্ট করার দরকার নাই।

-জ্বি স্যার! তবে আমার একটা প্রশ্ন আছে।

-কী প্রশ্ন বলেন?

-আপনি পরিসংখ্যান নিয়ে এত কিছু জানেন কী করে?

-এতক্ষণ কথা বলার পরেও বুঝলেন না। আমিও পরিসংখ্যানের ছাত্র ছিলাম। আমিও আপনার মতো মজলুম।

-তাই নাকি স্যার? নিশ্চয়ই অনেক দিন আগের কথা।

– আরে না। আমারে দেখলে মনে হয়, আমি বুড়া হয়ে গেছি। কিন্তু আমার বয়স বেশি না।

-কারণ কী স্যার?

-আর বইলেন না। প্রতিদিন এনেক্স বিল্ডিং উঠতে গিয়ে আমার যৌবন শেষ হয়ে গেছে। তার পরে আলফা-বিটা-গামার অত্যাচারে জীবনটা একবারে তেজপাতা।

-যাহোক, আপনারে আমার পছন্দ হয়েছে। আজ থেকেই আপনি কাজ শুরু করে দিন।  

-কিন্তু আমার একখান কথা আছে, স্যার।

-এই খানে আমার কাজটা কী হবে?

-খুব সহজ, আমাদের মতো মজলুমদের (পরিসংখানের ছাত্রদের) আপনি সংগঠিত করবেন।

-কিন্তু স্যার, এটা তো কোন কাজ না। এই কাজ করতে গিয়ে আমার নিজের কোন সৃজনশীলতা বিকশিত হবে না।

-আরে না মানিক সাহেব, মানুষকে সংগঠিত করাই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সৃজনশীলতা।

-কোত্থেকে শুরু করবো, স্যার?

-পরিসংখ্যান বিভাগের “প্যাপাইরাস“ নামে একটি প্রকাশনা আছে। তাদেরকে সহযোগিতা করাই আপনার কাজ।

-এটা তো তাহলে “মজলুমদের প্যাপাইরাস”।

-জ্বি, “মজলুমের প্যাপাইরাস”!

কমেন্ট করুন

সেশনঃ ২০০৩-২০০৪

শ্যামল আতিক

সেশনঃ ২০০৩-২০০৪