সাইকেল ছাড়া সাইক্লিস্ট

ছোট বেলা থেকেই সাইকেলের প্রতি আলাদা একটা ঝোঁক ছিল। এই ঝোঁক কেন তৈরি হয়েছিল তা বলতে পারব না। তবে সাইকেলের প্রতি দুর্বার আকর্ষণ আমি ছোট বেলা থেকেই অনুভব করতাম। মা’র কাছে এই নিয়ে বায়নাও কম ধরিনি। সাইকেল কিনে দেয়ার জন্য মায়ের আচল ধরে কত ঘুরেছি! ব্ল্যাকমেইল করারও চেষ্টা করেছি। বলেছি, “রিক্সাওয়ালাদেরও একটা রিক্সা থাকে, আমাদের তো অন্তত একটা সাইকেল থাকা উচিত”। কিন্তু কাজ হয়নি। মায়ের ভয় ছিল সাইকেল নিয়ে যদি বড় রাস্তায় উঠি আর একটা দুর্ঘটনা ঘটে! এক সময় মনে হত আমার এই জীবনে আর কোন দিন সাইকেল কেনা হবে না !    

         নিজের সাইকেল ছিল না, তাই বলে সাইকেল চালানো থেমে যায়নি। সাইকেল চালানোর হাতে খড়ি হয় বাড়িতেই। বাড়ির এক চাচাতো ভাইয়ের একটা লাল ছোট সাইকেল ছিল। ওই সাইকেল দিয়েই মূলত প্যাডেল মারা শেখা। ঐ সাইকেল চালানোর জন্য কত অনুনয় বিনয় করতে হত তাকে। সাইকেলের দুই চাকা যখন বশে চলে এসেছে তখন সাইকেল চালানোর নেশায় আশেপাশের মানুষের সাইকেল চালাতাম।

        মিজান ভাই বাড়ির এক চাচার দোকানে কাজ করতেন। থাকতেন আমাদের বাড়িতেই। উনার একটা ফনিক্স সাইকেল ছিল। ওই সাইকেলের হাতল রিক্সার মত। সেই বয়সে উচ্চতার কারণে সিটে বসে প্যাডেল নাগাল পেতাম না। তাই বলে তো সাইকেল চালানো বন্ধ করা যায় না! উচ্চতাজনিত ভার্টিকাল চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে সাইকেলের ফ্রেমের মাঝ দিয়ে পা গলিয়ে চালাতাম। তখন অবস্থা এমন হয়েছিল যে বাড়িতে যে-ই সাইকেল নিয়ে আসতেন তার সাইকেলই চালাতাম।

অন্যের সাইকেল চালাতে চালাতে একসময় বড় হয়ে হাইস্কুলে গেলাম। আমার সাইকেল কেনা হয়নি তখনো। হাইস্কুলে দ্রুতই অনেক বন্ধু-বান্ধব হয়ে গেল। ওদের অনেকেই সাইকেল নিয়ে আসত। এসময় অনেক ঘুরেছি বন্ধুদের সাথে ওইসব সাইকেলে। এমনি এক ঘুরে বেড়ানোর স্মৃতি এখনো মনে নাড়া দেয়।

        তখন ক্লাস নাইনে পড়ি। স্কুলের ক্রীড়া দিবসের দিন প্ল্যান করলাম বেড়ি বাঁধ যাব। আর ওখানে গিয়ে মাছ ধরার ট্রলারে করে খাল দিয়ে সমুদ্রের মোহনা পর্যন্ত ঘুরে আসব। যেই ভাবা সেই কাজ। আমরা ৬ জন বন্ধু চাপলাম ৩টা সাইকেলে। একটা সাইকেলের অবস্থা এতোই নড়বড়ে ছিল যে, ওটাতে ২ জন চড়াই মুশকিল। বেড়ি বাঁধ যাওয়ার পথে সাহেরখালি বাজার। বাজারে পৌঁছাতেই এক বুদ্ধি খেলে গেল। বাজারে মতিন নামের এক লোকের সাইকেলের দোকান ছিল। উনি সাইকেল ঠিক করতেন আবার সাইকেল ভাড়াও দিতেন। ওখান থেকে একটা সাইকেল ঘন্টায় ১০ টাকা দরে ভাড়া নিলাম। এবার ৬ জন ৪ টা সাইকেলে আবার শুরু করলাম যাত্রা। কিন্তু কপাল খারাপ হলে যা হয় আর কি। বেড়ি বাঁধ পৌঁছানোর পর দেখি স্কুলের সিরাজ স্যার। সিরাজ স্যার স্কুলের ভর্তির কাজ গুলো দেখতেন একারণেই প্রায় সব ছাত্রকেই উনি চিনতেন। তার উপর ক্রীড়া দিবসে অবশ্যই স্কুলে উপস্থিত  থাকতে বলা হয়েছিল। এই অবস্থায় উনার চোখে পড়লে আর রক্ষা থাকবে না। তাই স্যার আমাদেরকে দেখার আগেই যে যার মত গা ঢাকা দিলাম। সেদিন নৌকায় ঘোরা আর হল না। স্যারের ভয়ে যেই রাস্তায় গিয়েছিলাম সেই রাস্তায় না ফিরে অন্য রাস্তা দিয়ে অনেক ঘুরে স্কুলে পৌঁছালাম। ভাড়ার সাইকেলটা ছিল অনিকের কাছে। যেহেতু আমারা ভিন্ন রাস্তায় ফিরেছি, সাইকেলটা আর ফেরত দেয়া হয়নি ওই দিন। স্যার দেখে ফেলবেন এই ভয়ে আর ওই দিকে যাওয়ার কথা চিন্তাও করিনি। সাইকেলটা নিয়ে অনিক ওর বাড়িতে চলে গেলে। আমিও বাড়ি ফিরলাম।

বাড়ি ফেরার পর থেকেই আর এক দুশ্চিন্তা শুরু হলো। সাইকেলটা ২ ঘন্টার জন্য ভাড়া নিয়েছিলাম আর ফেরত না দিয়েই চলে এলাম। এখন যদি মতিন ভাই স্কুলে এসে জানিয়ে দেয়। তাহলে তো পুরাই মাঠে মারা। স্কুলে স্যারদের উত্তমমধ্যম তো চলবে আর বাড়িরটা তো বাদই দিলাম। আবার ভাবলাম অনিকের ঘর থেকে যদি সাইকেলটা চুরি হয়ে যায়! তাহলে তো এত্ত গুলো টাকা জরিমানা দেয়া লাগবে। সেই রাতে আর ঘুমই হল না। এই দুশ্চিন্তায় পরদিন ক্লাস শুরুর দেড় ঘন্টা আগে স্কুলে গেলাম। বাসায় বললাম অংক স্যারের পড়া আছে। এরপর স্কুল থেকে আমরা ৬ জন গেলাম মতিন ভাইয়ের কাছে। উনি হালকা ঝাড়ি দিলেন। একশ টাকা দিলাম আর সব মিটমাট করে আসলাম।

স্কুল জীবনে সাইকেল নিয়ে যত মাতামাতি ছিল কলেজে ওঠার পর তা অনেকটাই কমে গিয়েছিল। স্কুলের পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষ পর্যন্ত সাইকেল চালানো হয়নি বললেই চলে। আমার মামাতো ভাই চট্টগ্রামের সাইক্লিস্ট গ্রুপের নিয়মিত সদস্য ছিল। সে ঢাকায় আসে এমবিএ করার উদ্দেশ্যে। ঢাকায় এসে ও আমার বাসাতেই ওঠে। ভাই ঢাকায় আসার সময় ওর সাইকেলটাও নিয়ে আসে। আমি চালাতাম না, বেশ কয়েকদিন পড়েই ছিল সাইকেলটা। ভাই মাঝে মাঝে চালাতো।

এর মধ্যে আমার ভার্সিটির দুই কাছের বন্ধু সাইকেল কেনে। ওই দুইজন চাপাচাপি করতে লাগলো একসাথে সাইকেলে ঘুরতে যেতে। ভাইয়ের সাইকেল যেহেতু ছিলই ওটা দিয়েই আবার শুরু করলাম সাইকেল চালানো। রাত দিন দল বেধে এদিক সেদিক ঘোরা। মূলত আমাদের দল ৩ জনের। মাঝে মাঝে হলের কিছু বন্ধুও রাতে চালাতে বের হত। সংসদ ভবন, হাতির ঝিলে চক্কর দেয়াতো নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ালো। বিডি সাইক্লিস্টের ৪০-৫০ কি.মি. রাইড তো আছেই।

চতুর্থ বর্ষে ইন্ডিয়া ট্যুর ছিল। ভাবালাম ট্যুরের আগে ছোট একটা রাইড দেব। যাওয়া আসা মিলিয়ে ১৪-১৫ কি.মি. এর বেশি না। স্থান নির্ধারণ করা হল রামপুরা স্টাফ কোয়ার্টার। সকাল ৬:১৫ মিনিটে আমরা ৪ জন কারওয়ান বাজার মোড় থেকে যাত্রা করলাম। হাতিরঝিল হয়ে রামপুরা রোড দিয়ে প্রায় ২-২.৫ কিলোমিটার চালিয়ে বামের এক পিচ করা রাস্তায় নামলাম। আসেপাশে গ্রাম্য পরিবেশ, সাথে নভেম্বর মাসের সকালের কোমল ঠাণ্ডা বাতাস; ভালই লাগছিল। আঁকাবাঁকা রাস্তায় অনেক খানি চলার পর একসময় দেখি রাস্তা শেষ আর সামনে বালু নদী। স্থানীয়দের কাছ থেকে জানলাম বালু নদীর ওই পাড়ে রাস্তা আছে যেটা ধরে “খানিকটা” এগুলেই পূর্বাচল। একটা নৌকায় করে সাইকেলসহ বালুনদী পার হলাম। তখন পর্যন্ত ভালই ছিল সব কিছু। বিপত্তি ঘটলো তখন, যখন বুঝলাম “খানিকটা” রাস্তা মানে ১৫ কিলোমিটার ! ১৫ কিলোমিটার লাগলো কেবল পূর্বাচল পৌঁছাতে। ওখান থেকে আবার কলাবাগান যেতে হবে। তার উপর সূর্য ততক্ষণে অনেকটা মাথার উপর। আর রাস্তায় প্রচুর ট্রাফিক। পূর্বাচল থেকে বসুন্ধরা হয়ে বনানী মহাখালী ওই রুট দিয়ে অনেক কষ্টে টানা ২ ঘন্টা চালিয়ে বাসায় আসলাম। ১৫-২০ কিলোমিটারের রাইড দেয়ার কথা সেখানে আসা যাওয়া মিলিয়ে পথ পাড়ি দিলাম ৭২ কিলোমিটার। আমাদের এই ৩-৪ জনের সাইক্লিস্ট গ্রুপটা হওয়ায় এখন জীবন অনেক উপভোগ করি। বোর লাগলেই সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়ি। আর চমৎকার কিছু না কিছু ঘটেই। আমার এখনো সাইকেল কেনা হয়নি। কিন্তু আমার সাইক্লিস্ট জীবনটা ভালই কাটছে।

কমেন্ট করুন

তাওহীদুল মুনিম

সেশন: ২০১৪-২০১৫