প্যাপিরাস বনাম Papyrus

বছর কয়েক আগে আমাদের বিভাগ (পরিসংখ্যান) থেকে ‘প্যাপিরাস’ নামে একটি ত্রৈমাসিক পত্রিকা বের হতো। মাঝে বেশ কিছুদিন বন্ধ থাকার পর সম্প্রতি নতুন আঙ্গিকে আবার এটি প্রকাশিত হচ্ছে। দ্বিতীয় দফায় প্রকাশনার সময় থেকে পত্রিকাটির নাম বাংলা হরফে ‘প্যাপাইরাস’ লেখা হচ্ছে, যা আমার কাছে সঠিক মনে হয়নি।

প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতার অবদান প্যাপিরাস সম্পর্কে কমবেশি আমরা সবাই জানি। প্রাচীন মিশরে শব্দটি ঠিক কিভাবে উচ্চারিত হতো, তা আজ আর জানা যায় না। বহু ভাষা ঘুরে, বহু পরিবর্তনের পর আধুনিক ইংরেজি ভাষায় বর্তমানে এটি Papyrus হিসাবে পরিচিত।

[Origin of Papyrus:  p?-n-pr-?? (Unknown, Egyptian that of the time of Pharaoh) paparo (Coptic) papyrus (Classical Greek) papyrus (Classical Latin) Papirus (Middle English) Papyrus (Modern English).] 

আরবে ইসলাম প্রবর্তনের কয়েক শতকের মধ্যেই আরব ও পারস্য ধর্মপ্রচারকরা প্রাচ্য দেশে আসতে শুরু করেন। অবশ্য তারও অনেক আগে থেকেই এ অঞ্চলে আরব বণিকদের যাতায়াত ছিল। তখন থেকেই বাংলা ভাষার সাথে আরবি ও ফারসি ভাষার পরিচয়। পারস্যে ধর্ম প্রচারকদের হাত ধরে প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতার সাথে অনেক আগে থেকেই এ অঞ্চলের লোকদের জানাশোনা। পক্ষান্তরে, মিশরে কিংবা বাংলায় ইংরেজদের আগমন খুবই সাম্প্রতিক ঘটনা। কাজেই, প্যাপিরাস অথবা মিশর সম্পর্কিত অন্য কোন তথ্য এ অঞ্চলের মানুষ ইংরেজের থেকে পেয়েছে, এ ধারণা অমূলক।

বাংলা ভাষায় প্যাপিরাস শব্দটির অন্তর্ভুক্তির সঠিক দিন তারিখ আমার জানা নেই। তবে যুগ যুগ ধরে বাংলা ভাষায় শব্দটি যে ‘প্যাপিরাস’ হিসাবেই উচ্চারিত ও লিখিত হয়ে আসছে, এ ব্যাপারে আমি নিঃসন্দেহ। যে কোন বাংলাভাষী লেখক তাঁর লেখায় শব্দটি ব্যবহার করলে ‘প্যাপিরাস’ই লিখবেন।

এ প্রসঙ্গে আমি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের একজন বিজ্ঞব্যক্তি এবং একজন ইতিহাসবিদ এর সাথে আলাপ করেছি। তারা দু’জনই আমার সাথে এ ব্যাপারে সহমত পোষণ করেছেন যে, আলোচ্য শব্দটির বাংলা উচ্চারণ ‘প্যাপিরাস’ই হবে এবং এটিকে বাংলা হরফে এভাবেই লিখতে হবে। তাঁদের উভয়ের মতে বাংলা ভাষায় আগত নতুন কোন শব্দের বানান বা উচ্চারণের ব্যাপারে আলোচনা বা বিতর্ক হতে পারে, কিন্তু বহুল প্রচলিত এবং সাধারণের কাছে পরিচিত কোন শব্দ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তোলা অর্থহীন।

বাংলা একটি বহমান ভাষা। আরবি, ফারসি ছাড়াও যুগে যুগে বহু বিদেশী শব্দের অন্তর্ভুক্তি  আমাদের ভাষাকে সমৃদ্ধ করেছে। আমরা বাংলা বলার সময় শব্দগুলোকে নিজেদের মত করেই উচ্চারণ করি এবং সেভাবেই লিখি। একারণেই আমরা বোতলে (বটল? Bottle) পানি রাখি, মগে (মাগ? Mug) কফি খাই অথবা ফুটপাতে (ফুটপ্যাথ? Footpath) হাঁটি। আমরা যদি বাংলা ভাষায় অন্তর্ভুক্ত বিদেশী শব্দগুলো তাদের স্বউচ্চারণে বাংলা হরফে লিখতে বা তাদের মতো করে বলতে শুরু করি, তবে অচিরেই আমাদের কথা বলা ও লেখা উভয়ই বন্ধ করে রাখতে হবে। আমার নাম ‘সায়েমা’ আরবরা কিভাবে উচ্চারণ করে, আল্লাহ জানেন।

প্যাপিরাসের আবিষ্কার আমেরিকা কিংবা ইউরোপে নয়, প্রাচীন মিশরে, কাজেই বাংলা হরফে এর ইংরেজি উচ্চারণ লেখার চেষ্টা না করাই সঙ্গত।

সম্পাদকের বক্তব্য 

সন্দেহের অবকাশ নেই, papyrus প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতার অবদান। এই তথ্যটি Encyclopedia Britannica–তে পরিষ্কার ভাষায় উল্লেখ করা হয়েছে। তবে, প্রাচীন মিশরীয়রা papyrus গাছকে (গাছ না বলে ঘাস বলাই ভাল) বা এটা থেকে তৈরি দ্রব্যটিকে papyrus বলতো না, চতুর্থ ফারাও (সম্রাট)-এর নাম অনুসারে একে তারা বলতো wadj (ওয়াদ) (https://en.wikipedia.org/wiki/Papyrus এবং https://en.wikipedia.org/wiki/Wadj)। তাই papyrus শব্দটির সঠিক উচ্চারণ নিয়ে বিতর্কের সময় প্রাচীন মিশরের কথা অপ্রাসঙ্গিক।

আরব মুসলিমরা সপ্তম শতাব্দীতে মিশর জয় করে। তবে, তার আগে থেকেই মিশরের papyrus ইউরোপ ও অন্যান্য অঞ্চলে বাজার হারাচ্ছিলো। তার জায়গা দখল করছিলো পার্চমেন্ট, ভেলাম ইত্যাদি। পারস্য মুসলিমরা চীনা পদ্ধতির উন্নয়ন ঘটিয়ে স্বল্পমূল্যের কাগজ তৈরি শুরু করায় papyrus-এর বাজারে ধস নামে (The Washington Post-এ প্রকাশিত ‘When Papyrus Ruled’ প্রবন্ধটি দ্রষ্টব্য)।
(https://www.washingtonpost.com/archive/1998/04/08/when-papyrus-ruled/c397a099-4e55-4b67-ad7d-9f583227337c/?noredirect=on)

পারস্য মুসলমানেরা ভারতীয় উপমহাদেশে কাগজের প্রচলন শুরু করেছে। লক্ষণীয়, ‘কাগজ’ একটি ফার্সি শব্দ। কাগজের ইতিহাস শেখাতে গিয়ে কি তারা papyrus শব্দটি ব্যবহার করেছে? মোটেই না। তারা নিজেরা papyrus-কে বলতো bardi (বার্দি)। আরব মুসলিমরা বলতো waraq bardi (আরবি ভাষায় তো papyrus উচ্চারণ করার ‘প’-ই নেই)। তাছাড়া, কাগজ তৈরির পারস্য প্রযুক্তির সাথে মিশরের papyrus উপকরণ তৈরির পদ্ধতির কোন ধরণের মিল ছিল না। আরও লক্ষণীয়, ফার্সি শব্দ ‘কাগজ’-এর সাথে bardi বা papyrus শব্দগুলোর কোন মিল নেই।

মিশরীয়দের কাছ থেকে শিখে গ্রীক ও রোমানরা তাদের নিজেদের এলাকায় papyrus-এর ব্যবহার শুরু করে। গ্রীক লেখক থিওফ্রাস্টাস খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে papyrus গাছের ব্যবহার সম্পর্কে লিখেছেন। মজার ব্যাপার হলো, খাবার হিসেবে ব্যবহার লিপিবদ্ধ করতে গিয়ে তিনি গাছটিকে বলেছেন papyros, আবার লেখাসহ অন্য কাজে ব্যবহারের সময় একই গাছকে তিনি বলেছেন byblos – ­দুটি শব্দই ল্যাটিন ভাষা হয়ে ইংরেজি ভাষায় এসেছে। গ্রীক শব্দ papyros থেকে তৈরি হয়েছে ইংরেজি শব্দ papyrus, আর byblos থেকে তৈরি হয়েছে bible, bibliography ইত্যাদি (উইকিপিডিয়া)।

গ্রীক বা রোমানরা papyrus শব্দটি কীভাবে উচ্চারণ করতো তা সরাসরি জানা যায় না। তাই, ইংরেজি ভাষায় papyrus শব্দটির উচ্চারণই আমাদের বিবেচ্য। তাছাড়া, যেহেতু papyrus থেকে paper শব্দটি তৈরি হয়েছে, paper-এর ইতিহাস শিখতে গিয়ে আমরা papyrus সম্পর্কে জেনেছি – এটা ধরে নেয়াই যুক্তিসঙ্গত। অর্থাৎ, ইংরেজি ভাষা থেকে papyrus শব্দটি বাংলা ভাষায় এসেছে ধরে নেয়াটাই স্বাভাবিক (যদিও শতভাগ নিশ্চিত হওয়ার উপায় নেই)। উল্লেখ্য, papyrus শব্দটির ব্রিটিশ ও অ্যামেরিকান উচ্চারণ ‘প্যাপাইরাস’।

আমরা বাঙালীরা বিদেশী শব্দ বা শব্দগুচ্ছ ব্যবহারে সতর্ক থাকি না। এদেশের প্রায় সবাই বহুদিন ধরে ‘department store’ (a store with many departments) বাংলায় লিখতে গিয়ে ‘ডিপার্টমেন্টাল স্টোর’ (কোন একটি ডিপার্টমেন্টের নিজস্ব স্টোর) লিখে এসেছে। কেউ যদি সঠিকভাবে এটাকে ‘ডিপার্টমেন্ট স্টোর’ লেখে, তার নিশ্চয়ই ধন্যবাদ প্রাপ্য।

বাংলাদেশের বই-পত্রে, এমনকি স্কুল-কলেজের পাঠ্যপুস্তকেও, আফ্রিকান অ্যামেরিকানদেরকে ‘নি-’ (দু’ অক্ষরের শব্দ) লেখা হয়। শব্দটি এতই আপত্তিকর যে, পুরো শব্দটি এখানে লেখা হলো না। বহুদিন ধরে চলছে বলেই কি আমরা এটা চালিয়ে যাবো? তাহলে তো আমাদের ছেলেমেয়েরা বিদেশে গিয়ে শব্দটা উচ্চারণ করে বর্ণবাদী হিসেবে জেল খাটবে।

বহুদিন ধরে বাংলা ভাষায় ‘প্যাপিরাস’ লেখা হচ্ছে বলে কি কেউ ‘প্যাপাইরাস’ লিখতে পারবে না?

আমরা পত্রিকার নামকরণ বা নাম পরিবর্তনের সময় বাংলা হরফে ইংরেজি শব্দের উচ্চারণ লিখলে সমস্যা কী? মানুষের নাম হতে পারবে ‘সায়েমা’ বা ‘জাফর’ (বাংলা হরফে লেখা আরবি শব্দের উচ্চারণ), বাড়ির নাম হতে পারবে ‘রোজ গার্ডেন’ বা ‘ড্রিম ভ্যালি’ (বাংলা হরফে লেখা ইংরেজি শব্দের উচ্চারণ), তাহলে পত্রিকার নাম কেন ‘প্যাপাইরাস’ (বাংলা হরফে লেখা ইংরেজি শব্দের উচ্চারণ) হতে পারবে না?

এমন তো নয় যে, ‘প্যাপিরাস’ একটা বাংলা শব্দ হয়ে গেছে (বাংলা একাডেমীর ‘ব্যবহারিক বাংলা অভিধানে’ শব্দটি নেই) – এটা তো একটা নাম। বাংলাদেশের সব Sayema নামের মেয়েরা তাদের নাম ‘সায়মা’ (এ-কার ছাড়া) লিখলে কি আমাদের Sayema আপা তাঁর নাম ‘সায়েমা’ লিখতে পারবেন না?

পরিসংখ্যান বিভাগের পত্রিকার নাম পরিবর্তন করে ‘প্যাপাইরাস’ রাখায় বেশ কিছু লাভ হয়েছে। যেমন:

(ক)বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের নানা এলাকায় ‘প্যাপিরাস’ নামে দেয়াল পত্রিকা, আঞ্চলিক পত্রিকা ইত্যাদি রয়েছে। আমাদের পত্রিকার নাম ‘প্যাপাইরাস’ রাখায় দুই বাংলায় এটি এখন এই নামের একমাত্র পত্রিকা। গণিতের ভাষায়, নাম পরিবর্তনের মাধ্যমে আমরা uniqueness ও identifiability অর্জন করেছি।
(খ)প্রচলিত শব্দ ‘প্যাপিরাস’-এর বদলে নতুন শব্দ ‘প্যাপাইরাস’ শুনে মানুষের মনে কৌতূহল ও আগ্রহ সৃষ্টি হচ্ছে। বিজনেসের ভাষায়, পত্রিকার নামটাই বিজ্ঞাপনের কাজ করছে।
(গ)পত্রিকাটির কল্যাণে অনেকেই ইংরেজি শব্দ papyrus-এর সঠিক উচ্চারণ জানতে পারছে। এদের বেশীর ভাগই মনে মনে পত্রিকাকে ধন্যবাদ দিবে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, তাদের মনে প্যাপাইরাস পত্রিকার জন্য সহমর্মিতা সৃষ্টি হবে।
(ঘ)নামটির কারণে পরিসংখ্যানের অধ্যাপক সায়েমা আপাকে আমরা লেখক হিসেবে পেয়েছি। শুধু তাই নয়, তাঁর লেখা ঠিকমত ছাপা হলো কিনা বা আমরা তাঁর লেখার কী জবাব দিলাম, তা জানতে পত্রিকাটি না পড়ে তাঁর উপায় নেই। অর্থাৎ, আমরা তাঁকে পাঠক হিসেবেও পেতে যাচ্ছি।

প্যাপাইরাস পত্রিকার লেখক ও পাঠক হিসেবে সায়েমা আপাকে স্বাগত জানাই।

কমেন্ট করুন