জম্মু ও কাশ্মীর এবং বৃটিশ ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা : উত্তর সীমান্ত অঞ্চলের সমস্যা
(পূর্ববর্তী সংখ্যায় প্রকাশের পর)
১৮৯৩ সালের ডুরান্ড লাইন এবং ১৮৯৫ সালের ইংরেজ-রুশ পামির চুক্তি একত্রে উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্তের পরবর্তী ইতিহাস নির্মাণ করেছে। এক্ষেত্রে দু’টো সমস্যা দেখা গিয়েছিলো। প্রথমতঃ সারিকল পাবর্ত্য অঞ্চল কি প্রকৃতপক্ষেই রুশ সাম্রাজ্যের সম্মুখ সীমানা হিসেবে চিহ্নিত করা যেতো? কিংবা জারের রাজত্ব পূর্বদিকে এগিয়ে শিনঝিয়াং এর কাশগড় অঞ্চল পর্যন্ত পৌঁছাতে পারতো? দ্বিতীয়তঃ চাইনিজ এলাকা, এবং জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের দুই উত্তরাঞ্চলীয় পার্বত্য অঞ্চল, গিলগিট এজেন্সি ও এর অনুবর্তী রাজ্য, এবং লাদাখের মধ্যকার প্রকৃত সীমান্ত কোথায়? এ দুই সমস্যা বৃটিশদের কৌশলগত চিন্তায় জটিলভাবে একটি আর একটির সাথে জড়িয়ে ছিলো। এই জটিলতা ছিলো উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্তের ধরনে, যেটা বৃটিশ প্রয়োজনের দিক থেকে জুতসই ছিলো এবং এর প্রতিষ্ঠার গুরুত্বের দিক থেকেও অনেকটাই নির্ভর করছিলো – সীমানা চীন না রাশিয়ার সাথে হবে সে সম্ভাবনার উপর। যেমনটা ১৮৯৫ এর সেপ্টেম্বরে ভাইসরয় লর্ড এলগিন উল্লেখ করেন:
“সাম্প্রতিক প্রতিবেদন এ সম্ভাবনার উপর জোর দিচ্ছে যে, সারিকল বেশ অল্প দিনের মধ্যেই রাশিয়ার অধীনে যেতে পারে। এই মুহূর্ত কাশ্মীর, হুনজা ও আফগানিস্তানের সাথে চীনের সীমান্ত স্থাপনের উপযুক্ত সময় বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। এমন একটি সম্ভাব্য ব্যবস্থা কার্যকর করার বিষয়ে আমরা তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই যেখানে মুজতাঘ ও কারাকোরাম পর্বতের দিকে রুশ রাজত্বের সম্ভাব্য বিস্তারের ক্ষেত্রে একটি সুনির্দিষ্ট সীমা থাকবে যা কি না চায়নার ক্ষমতাসীনদের অধিকৃত পার্বত্য অঞ্চল পর্যন্ত।”৪০
এই উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্তের সংজ্ঞা নির্ধারিত হতো হুনজা এবং শিনঝিয়াং-এ চাইনিজ কর্তৃপক্ষের মধ্যকার সম্পর্কের ধরনের উপর।
বাৎসরিক নজরানা প্রদানের (যার পরিবর্তে অধিকতর মূল্যবান অনুদান পাওয়া) বাইরেও হুনজার মির চাইনিজ অংশে প্রধান জলবিভাজিকার উপর আরো চারটি অধিকার বজায় রাখতেন যা পরিত্যাগ করতে তাঁর চরম অনীহা ছিলো। প্রথমতঃ শিনঝিয়াং-এর সাথে হুনজার কিছু বাণিজ্যিক সুবিধা ছিলো যেটা একই সাথে ছিলো লাভজনক ও মর্যাদাপূর্ণ। দ্বিতীয়তঃ হুনজার জনগণ বেশ আগে থেকেই কারাকোরাম পর্বতের শিনঝিয়াং-এর দিকের কিছু নির্দিষ্ট ভূমিখন্ডে চাষাবাদের বিষয়ে অধিকার (যার বেশির ভাগ ১৮৯৫ এ স্থগিত হয়ে যায়) সংরক্ষণ করতো। এ অঞ্চলটি হচ্ছে রাসকাম, যেটা ইয়ারখন্দ নদীতে বয়ে যাওয়া উজান স্রোতধারার পাশে অবস্থিত শিমশাল পর্বতের পূর্বদিকের একটি পার্বত্য অঞ্চল। তৃতীয়তঃ মির তাঁর মেষ ও ইয়াক দল পর্বতের উত্তরাঞ্চলীয় ঢালে চরানোর জন্য স্বত্বপ্রাপ্ত ছিলেন; যেটা ছিলো কিলিক, মিনটাকা, খুনজেরাব ও অন্যান্য পার্বত্য অঞ্চল যা সাধারণতঃ তাগদুম্বাস পামির নামে পরিচিত। চূড়ান্তভাবে, হুনজার মির তাগদুম্বাস পামির ও সম্ভবতঃ এর উত্তরাঞ্চল থেকে (তাঁর পক্ষে নিয়োজিত স্থানীয় চাইনিজ কর্মচারী কর্তৃক) হুনজার অধিবাসী নয় (যেমন, সারিকলবাসী, স্থানীয় তাজিক যাযাবর) এমন যারা মৌসুমভিত্তিক গবাদি পশু চরাতে আসতো তাদের কাছ থেকে নজরানা আদায়ের অধিকারী ছিলেন।
এ সব অধিকারগুলো ছিলো চায়নার সাথে লেনদেন সংক্রান্ত সম্পর্কের অবিচ্ছেদ্য অংশ; এবং মির মনে করতেন যে তাদের টেকসহিতা নির্ভর করে কাশগড়ে তাঁর ধারাবাহিক বাৎসরিক নজরানা অভিযানের উপর। এ সময়ে বৃটিশরা হুনজার সাথে চাইনিজ সম্রাটের সম্পর্কের বিষয়ে তেমন ব্যগ্র ছিলো না। সে সময়ে এ ধরনের সম্পর্কের অস্তিত্ব রয়েছে এ বিষয়টি বৃটিশরা অস্বীকার করার কোন চেষ্টা করেনি, এবং তা প্রতিরোধ করার কোন চেষ্টাও করেনি। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ১৮৯২ সালে মির নাজিম খানের অভিষেক অনুষ্ঠানে শিনঝিয়াং কর্তৃপক্ষের পক্ষে দুইজন চাইনিজ কর্মকর্তাকে উপস্থিত থাকার বিষয়ে বৃটিশরা কোন আপত্তি করেনি।
বৃটিশ দৃষ্টিকোণ থেকে ১৮৯৫ এর মধ্যে এটি পরিষ্কার হয়ে যায় যে, কারাকোরাম চূড়ার উত্তরে হুনজা’র অধিকার প্রশ্নটি সীমান্ত সংজ্ঞা নির্ণয়ের যে কোন প্রচেষ্টার ক্ষেত্রে জটিলভাবে জড়িত। রাসকামের চাষাবাদ উপযোগী ভূমির বিষয়ে হুনজার দাবির বিশেষ গুরুত্ব ছিলো; গুরুত্বটা অনেকটা এমন যে, এ ভূমি ব্যবহারের মাধ্যমে কর আদায়ের চেয়ে এ অঞ্চলের প্রকৃত দখলই মূল উদ্দেশ্য। যদি এটা ধরে নেয়া যায় যে, হুনজা এ ভূমিগুলোতে নিয়মিত চাষাবাদ করবে তাহলে যে কোন সীমান্ত নিষ্পত্তি ব্যবস্থায় তারা হয় ভারতীয় পক্ষে একীভূত হতে পারতো অথবা যে কোন কিছুর বিনিময়ে দর কষাকষি করে বাইরে থাকতে পারতো।
ফলে ১৮৯৭ সালে যখন হুনজার মির রাসকাম এলাকায় নতুন করে চাষাবাদের সিদ্ধান্ত নেন তখন ভারত সরকার তাঁকে নিরুৎসাহিত করেনি। সত্যিকার অর্থে, ১৮৬০ এর দশক থেকে এ এলাকায় হুনজার লোকজনকে দেখা যায়নি (তারা তাদের অতিরিক্ত শক্তি সামর্থ বহু বছর যাবৎ লুটতরাজের কাজেই ব্যবহার করেছে); মিরের এ উদ্যোগ খুব সম্ভবত বৃটিশ পরামর্শেরই প্রতিচ্ছবি। এ সময় গিলগিটে রাজনৈতিক প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন ভারতীয় রাজনৈতিক কর্মের অন্যতম সীমান্ত বিশেষজ্ঞ ক্যাপ্টেন হেনরি ম্যাকমোহন, যিনি একদিন ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হন এবং পরবর্তীতে মিসরে সম্রাটের বাণিজ্য দূতের পদ লাভ করেন।৪১ স্যার জন আরডাঘ উত্থাপিত, প্রকৃতপক্ষে তিনি ফ্রান্সিস ইয়াংহাজব্যান্ড ও জর্জ ম্যাকার্টনি-কে সাথে নিয়ে সম্ভবতঃ এই বিষয়টিতে প্ররোচিত করেন যেটা ম্যাকমোহন তার দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে আলোচনায় তুলে ধরেন যে, বৃটিশ সীমান্ত কারাকোরাম জলবিভাজিকায় যেমন ছিলো তেমনই রাখা সম্ভব। তিনি হুনজার ইতিহাস বিষয়ে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেন এবং হুনজা অঞ্চলের দাবি বিষয়ে তাঁর বিশ্লেষণ নিঃসন্দেহে একটি উচ্চাভিলাষী সীমান্ত নীতির ভিত্তি গড়তে প্ররোচিত করে।৪২
আমরা ইতিমধ্যে জেনেছি যে, কারাকোরাম জলবিভাজিকার চাইনিজ অংশে হুনজার চাষাবাদ অধিকারের দাবি শিমসাল পাসের পূর্বে কিছু ভূমিখন্ডকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। সেখানে দু’টো প্রধান অঞ্চল রয়েছে। প্রথমটি হচ্ছে শিমসাল পাসের ঠিক পূর্বেই একটি স্রোতধারা (ব্রালদু), যেটা মুজতাঘ (বা সঙ্গম) নদীতে গিয়ে পড়ে উত্তরে বয়ে গেছে এবং পরে পূর্বে গিয়ে রাসকাম নদীর সাথে মিলে ইয়ারখন্দ নদীতে রূপ নিয়েছে। এখানে কিছু আশ্রয়স্থল রয়েছে যার মধ্যে সবচেয় বড়টি হচ্ছে দরওয়াজা (বা দরবান্দ), এটি শিমসাল পাস থেকে সোজা বারো মাইল দূরে। দ্বিতীয়টি হচ্ছে রাসকাম নদীর তীরে মুজতাঘ-রাসকাম সন্ধিস্থলের প্রায় পনের মাইল উজানে যেখানে অধিকাংশ মাঠ অবস্থিত (যেটা বোঝাতে রাসকাম নামটাই ব্যবহার হতো), ডান দিকের তীরবর্তী আজঘর এবং বাম দিকের তীরবর্তী কোকতাশ ও বাশ আন্দিজান নিয়ে সব মিলিয়ে প্রায় তিন হাজার একর ভূমি। আজঘর ছিলো শিমসাল পাসের পূর্বদিকে (অর্থাৎ চায়নার দিকে) সোজা ষাট মাইল দূরত্বে।৪৩
একটা সময়ে আজঘরে উল্লেখযোগ্য জনসমাগম ছিলো, কিন্তু ঊনবিংশ শতকে পর্যটকরা এখানে প্রচুর পরিমাণে পরিত্যক্ত আবাসভূমি ও চাষাবাদ দেখতে পান। কারা এখানকার অধিবাসী ছিলেন তা জানা যায়নি, তবে কারো কারো মতে এখানকার অধীবাসী ছিলেন হুনজা’র স্থানীয়; কিন্তু খুব সম্ভবতঃ এটা সঠিক নয়।৪৪ ১৮৯০ দশকের মধ্যে আজঘর কার্যতঃ জনশূন্য হয়ে পড়ে। আজঘর, কোকতাশ ও বাশ আন্দিজান যদি ভারতীয় সাম্রাজ্যে অন্তর্ভুক্ত হতো, তাহলে সীমান্ত মূল কারাকোরাম চূড়া থেকে বেশ দূরে গিয়ে পড়তো; এবং পশ্চিমাঞ্চলীয় ও পূর্বাঞ্চলীয় বাছাইকৃত সীমান্ত স্টেশনের উপর নির্ভর করে জলবিভাজিকার সীমানার ভিত্তিতে কয়েক হাজার বর্গমাইলের অঞ্চল চীনের মধ্যে গিয়ে পড়তো।
১৮৯৭ এর উদ্যোগ হিসেবে মির ছোট একটা দল (খুব সম্ভবতঃ ছয় জনের কম) আজঘরে চাষাবাদের জন্য পাঠিয়েছিলেন যারা গম ও বার্লি বুনে হুনজাতে ফিরে গিয়েছিলো শরতকালে ফসল না ওঠা পর্যন্ত; বাশ আন্দিজানে শুধুমাত্র দু’ জন পাহারাদার রেখে যাওয়া হয়েছিলো জমিগুলো দেখভালের জন। দু’ জন হুনজাবাসী উপস্থিতির খবর পেয়ে তারখন্দের উচ্চতর চাইনিজ কর্মকর্তা এদের তৎক্ষণাৎ গ্রেফতারের নির্দেশ দেন। তারা নিকটতম চাইনিজ প্রশাসনিক কেন্দ্র তাশকুরঘানে (তাক্সকোরগান তাজিকে) ছয় সপ্তাহের জন্য বন্দী থেকে মুক্তি পান। ভবিষ্যতে রাসকাম থেকে তাঁর লোকজনকে দূরে রাখতে মিরকে চাইনিজ তরফ থেকে জানানো হয়। তাদের মতে এটা মাঞ্চু সাম্রাজ্যের অংশ। কিন্তু এখানে অন্য লোকেরা যেমন, সারিকলবাসীরা চাষাবাদ করতে পারতো।
এভাবেই ধারাবাহিক রাসকাম সঙ্কটের শুরু হয়েছিলো যেটা খুব দ্রুতই নতুন আকৃতিতে জটিলতর হচ্ছিলো। বিতর্কিত ভূমিতে তাঁর অধিকার যৌক্তিক এবং জলবিভাজিকার ভারতীয় অংশে তাদের অধিকৃত জমির তুলনায় ভালোভাবে বেঁচে থাকতে তাঁর লোকদের চাষাবাদের জন্য বড় এলাকার প্রয়োজন এ যুক্তিতে এবং যথেষ্ট বৃটিশ সমর্থন ও উৎসাহে মির রাসকাম ভূমিতে অপরিহার্যভাবে তাঁর চাষাবাদের উদ্যোগ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। চাইনিজ কর্তৃপক্ষ মিরের সাথে এক ধরনের সমঝোতার ব্যবস্থা করলো যেখানে হুনজার চাষাবাদকে অনুমোদন করা হয়েছিলো খুব সম্ভবতঃ রাসকাম চায়নার অধীনে এবং শুধুমাত্র তাঁকে ভাড়ায় প্রদান করা যেতে পারে এমন আনুষ্ঠানিক স্বীকারোক্তির পরিবর্তে।৪৫ তবে এ সমঝোতার বিষয়টি যখন কাশগড়ের রুশ বাণিজ্যদূত পেত্রভস্কি উদ্ঘাটন করতে পারলেন তখন তিনি এমন সমাধানের বিষয়ে বেঁকে বসলেন। চাইনিজদের প্রতি তার বক্তব্য ছিলো যে, রাসকামের যে কোন স্থানে হুনজার চাষাবাদের অনুমোদন করার অর্থ হবে চূড়ান্তভাবে এ সম্পূর্ণ অঞ্চলে বৃটিশদের হস্তক্ষেপকে প্রসারিত করা; তাঁর যুক্তিতে সম্পূর্ণ রাসকাম বিষয়টি ছিলো বৃটিশ সাম্রাজ্য বিস্তার লাভ করানোর একটি প্রহসন মাত্র। পেত্রভস্কির ধারণানুসারে যদি বৃটিশরা রাসকামের উপর দখল নিতো তবে হয়তো রুশরা, সম্ভবতঃ তাশকুরঘান অঞ্চলে যেখানে তাদের নিজেদের অঞ্চল থেকে সারিকল পার্বত্য এলাকা অতিক্রম করে কাশগড়ের দিকে রাস্তা চলে গেছে সেখানে চাইনিজদের কাছ থেকে এর মূল্য বুঝে নিতে চাইতো।
এশিয়ার এক দূরবর্তী অংশের চাষাবাদ অধিকারের প্রশ্ন যেখানে একটা ধোয়াচ্ছন্ন ব্যাপার হতে পারতো তা পেত্রভস্কি’র হস্তক্ষেপে লন্ডন, সেন্ট পিটার্সবার্গ ও পিকিং-এ একটি গুরুত্বপূর্ণ কুটনৈতিক কর্মকাণ্ডে পরিণত হলো। বৃটিশদের সামনে দু’টা প্রধান পন্থা ছিলো। পরিস্থিতি বিচারে রাসকামে মিরের চাষাবাদের অধিকার ভারত সাম্রাজ্যের মধ্যে থাকার জন্য তারা গো ধরতে পারতো, অথবা তারা রাসকাম ও তার সাথে মিরের বিষয়ে আগ্রহ চীনকে ছেড়ে দিতে পারতো। সহজ কথায়, তাদের সিদ্ধান্ত নেয়ার বিষয় ছিলো যে, তারা কি আরডাঘ এর মতো জলবিভাজিকার উত্তরে বয়ে চলা উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্ত প্রকৃতই চায় (যার কারণে কাশগড়িয়ার যে কোন স্থানে রুশ চাহিদা মোতাবেক মূল্য দেয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে), না কি তারা চায় কারাকোরাম শৃঙ্গ বরাবর এমন একটি উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্ত যা শুধুমাত্র একটি ঢালু এলাকা অধিকার নয় বরং বিশাল ভূমির প্রতিরক্ষা বূহ্য হিসেবে কাজ করবে। ম্যাকমোহন সন্দেহাতীতভাবে প্রথম সমাধানের পক্ষে ছিলেন, কিন্তু তার উচ্চ পদস্থদের মত এমনটা ছিলো না।
কাশগড়ে জর্জ ম্যাকার্টনি থেকে যে গোয়েন্দা তথ্য আসতো সে মোতাবেক লর্ড অ্যালগিনের অধীন ভারত সরকারে মত ছিলো অনেকটা এমন যে, এক্ষেত্রে সর্বৎকৃষ্ট পন্থা হচ্ছে জলবিভাজিকা রেখা বরাবর থাকার বিষয়ে এবং কোন এক সময়ে ফসল ফলানোর ফলে হুনজা অধিবাসী কর্তৃক দেখভালকৃত রাসকাম পার্বত্য এলাকার এক খন্ড ভূমির উপর থেকে আঞ্চলিক দাবি পরিত্যাগ করার বিষয়ে দৃঢ় অবস্থানে থাকা। যদি সত্যিই হুনজার লোকজনের এখানে খামার করার প্রয়োজন হয় তবে তারা চাইনিজদের সাথে বিশেষ ব্যবস্থার মাধ্যমে তা করতে পারে। লর্ড অ্যালগিন বিশেষ করে রুশ অধ্যুষিত শিনঝিয়াং এর প্রত্যাশার বিষয়ে সতর্ক ছিলেন না। তিনি এটাও বিশ্বাস করতেন না যে, রাসকামের বিষয়ে নতজানু মনোভাব হুনজাতে বৃটিশ অবস্থানের বিষয়ে একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে আসতে পারে। উপরন্তু তিনি এটা সঠিকভাবে উপলব্ধ করেছিলেন যে, মূল কারাকোরাম জলবিভাজিকা বরাবর কম বেশি সীমানা, এর পেছনে অবশ্যম্ভাবী যেমন তেমন সীমানার তুলনায় প্রশাসনিকভাব অনেক সুবিধাজনক। একটি উচ্চাভিলাষী সীমান্তের বিষয়ে স্যার জন আরডাঘ এর যুক্তির উত্তরে তিনি যেমনটা বলেছিলেন:
সামরিক ক্ষেত্র বিবেচনায় স্যার জন আরডাঘ এর প্রস্তাবের সাথে আমরা সম্পূর্ণ এক মত হতে পারি না। সুউচ্চ পর্বতসারি যেটাকে আমরা আমাদের প্রাকৃতিক সীমানা হিসেবে বিবেচনা করি তিনি তা অতিক্রম করে পেছনে সীমান্ত নিয়ে যেতে মত দিয়েছেন এবং সেটা এ কারণে যে, সেখান থেকে প্রকৃত জলবিভাজিকা লক্ষ্য করা অসম্ভব। তাত্ত্বিকভাবে স্যার জন আরডাঘ নিসন্দেহে সঠিক, কিন্তু সাধারণভাবে পার্বত্য অঞ্চলের চূড়া ভালো সামরিক ঘাঁটি বা সীমান্ত হয় না। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে পর্বতশ্রেণি অতিক্রম করে পেছনে যাওয়ার বিষয়ে কৌশলগত কোন সুবিধা রয়েছে বলে মনে হয় না যেখানে এখন পর্যন্ত এ ধরনের বিরূপ অগ্রসরতার উদ্যোগ কখনো নেয়া হয়নি… যে সকল সামরিক কর্মকর্তা ঐ অঞ্চলে গিয়েছেন তাদের অভিজ্ঞতার আলোকে আমরা আমাদের আপত্তি তুলে ধরছি। বর্তমান পার্বত্য সীমানা খুব সম্ভবত বিশ্বের সবচেয়ে কঠিন ও দুর্গম এলাকা বলে তারা দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেছেন। পর্বতশ্রেণির পেছনের অঞ্চল অনুর্বর, পাথুরে এবং জনমাবনশূন্য। বৃটিশ ভারতের সীমানার এ ধরনের বিস্তার আমাদের নিজেদের ও আমাদের বহিঃ সামরিক চৌকির মধ্যে সবচেয়ে কঠিন ও দু্র্গম এলাকার দূরত্ব তৈরি করে ফেলতে পারে; এটা এক ধরনের অবিবেচনাপ্রসূত বিস্তার হতে পারে বলে মনে হয় এবং আমাদের মতে, কোন ধরনের সংশ্লিষ্ট সুবিধা নিশ্চিত না করেই এ ধরনের বিস্তার আমাদের সামরিক অবস্থানকে দুর্বল করে ফেলতে পারে।৪৬
(চলবে)
৪০. উদ্ধৃত অংশের জন্য দেখুন: A. Lamb, The China-India Border. The origin of the disputed boundaries, London 1964, p. 99.
৪১. ১৮৫২-১৯৪৯। স্যার চার্লস বেল-এর সাথে আসাম-হিমালয়ের ম্যাকমোহন লাইন সীমান্তের জন্যই শুধু তিনি দায়ী নন বরং কায়রোতে হাই কমিশনার হিসেবে তিনি আরবদের উপর বৃটিশ নীতির বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ করেন যা বর্তমানের মধ্যপ্রাচ্যের অশান্তির জন্যও অনেকটা দায়ী।
ম্যাকমোহন বালুচিস্তানে ভারত-আফগান সীমান্ত নিয়ে দায়িত্ব পালনের পর ১৮৯৭ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে স্যার জর্জ রবার্টসনের কাছ থেকে গিলগিট এজেন্সির দায়িত্ব গ্রহণ করে ১৮৯৮ সাল পর্যন্ত এ দায়িত্বে ছিলেন। ১৮৯৯ সালে তিনি দির, স্বাত ও চিত্রাল-এর তত্ত্বাবধান সহ মালাখন্দ এজেন্সির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
৪২. ১৮৯৮ এর ১০ মে কাশ্মিরের রেসিডেন্ট হিসেবে ম্যাকমোহন এর নথির সংযুক্তি এফও ১৭/১৩৬২, আইও এবং এফও ১১ আগস্ট ১৮৯৮ দ্রষ্টব্য। ম্যাকমোহন এর বিশ্লেষণ মির-এর সাথে চাইনিজদের সম্পর্কের তাৎপর্যকে নষ্ট করার উদ্যোগ নেয়। বরং এটি কারাকোরাম এর শিনঝিয়াং-এর দিকে হুনজার আঞ্চলিক অধিকার দাবিকে সামনে নিয়ে আসে। এখানের ম্যাকমোহনের অধিকাংশ কথাই অতিরঞ্জিত বলে ধরে নিতে হবে।
৪৩. এ অঞ্চলের ভূগোল বিস্তারিত বর্ণনা জানতে দেখুন: R.C.F. Schomberg, Unknown Karakoram, London 1936।স্কমবার্গ ১৯৩৪ সালে আজঘর অংশের দারওয়াজা ও রাসকাম ভূমিখন্ড ভ্রমণ করেন এবং তার তৈরি চার মাইল সমপরিমাণ এক ইঞ্চির মানচিত্রটি খুবই উপকারী।
৪৪. জন লালই একমাত্র ব্যক্তি নন যিনি হুনজা দাবির সপক্ষে প্রাচীন পেশাকে সূত্র হিসেবে তুলে ধরেন। দেখুন: Lall, Aksaichin, op. cit., p. 85।
৪৫. চায়নার অবস্থান আরো জটিল হয়ে পড়ে এ কারণে যে, অন্যরা যেমন, তাশকুরঘান অঞ্চল থেকে আগত সারিকলবাসীও (তাজিকবাসী) রাসকামে চাষাবাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রয়াস নেয়।
৪৬. Lamb, Ladakh, op., cit., p. 43 থেকে উদ্ধৃত।
সদস্য, সম্পাদনা পর্ষদ, প্যাপাইরাস
প্রাক্তন শিক্ষার্থী
পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
সেশন:১৯৯৯-২০০০
- রোকনুজ্জামানhttps://www.thepapyrus.org/author/%e0%a6%b0%e0%a7%8b%e0%a6%95%e0%a6%a8%e0%a7%81%e0%a6%9c%e0%a7%8d%e0%a6%9c%e0%a6%be%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%a8/বৃহস্পতিবার, জানুয়ারি 1, 2015
- রোকনুজ্জামানhttps://www.thepapyrus.org/author/%e0%a6%b0%e0%a7%8b%e0%a6%95%e0%a6%a8%e0%a7%81%e0%a6%9c%e0%a7%8d%e0%a6%9c%e0%a6%be%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%a8/বুধবার, জুলাই 1, 2015
- রোকনুজ্জামানhttps://www.thepapyrus.org/author/%e0%a6%b0%e0%a7%8b%e0%a6%95%e0%a6%a8%e0%a7%81%e0%a6%9c%e0%a7%8d%e0%a6%9c%e0%a6%be%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%a8/মঙ্গলবার, এপ্রিল 16, 2019
- রোকনুজ্জামানhttps://www.thepapyrus.org/author/%e0%a6%b0%e0%a7%8b%e0%a6%95%e0%a6%a8%e0%a7%81%e0%a6%9c%e0%a7%8d%e0%a6%9c%e0%a6%be%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%a8/বৃহস্পতিবার, মে 9, 2019
- রোকনুজ্জামানhttps://www.thepapyrus.org/author/%e0%a6%b0%e0%a7%8b%e0%a6%95%e0%a6%a8%e0%a7%81%e0%a6%9c%e0%a7%8d%e0%a6%9c%e0%a6%be%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%a8/বৃহস্পতিবার, মে 9, 2019











