দ্যা চিলমারী রেইড

‘বাংলাদেশ’ নামটির মূল পরিচয় নিহিত রয়েছে ‘মুক্তিযুদ্ধ’ শব্দটির মধ্যে। মাতৃভূমি বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য বাঙালি জাতিকে পার করতে হয়েছে রক্তক্ষয়ী নয়টি মাস।  বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অবতীর্ণ হতে হয়েছে অসংখ্য ছোট-বড় যুদ্ধে। আত্মত্যাগী বীরযোদ্ধাদের বহু ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন নয়টি মাস ছিল বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য প্রবল সংগ্রাম মুখর।  নিজেদের জীবন বাজি রেখে তাদের ঝাঁপিয়ে পড়তে হয়েছে মুক্তিসংগ্রামের যুদ্ধে।  আজ বলতে যাচ্ছি ঐতিহাসিক চিলমারী যুদ্ধের কথা যা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে অমর অক্ষয় হয়ে থাকবে চিরকাল। এ যুদ্ধকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্র বাহিনীর ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেয়ার যুদ্ধের সাথে তুলনা করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এ যুদ্ধের গুরুত্ব ছিল অনেক।  

চিলমারী ব্রহ্মপুত্র নদের পশ্চিম তীরের এলাকা ও বন্দর। চিলমারীর কয়েক মাইল দক্ষিণে তিস্তা ব্রহ্মপুত্রের সাথে মিলিত হয়েছে। চিলমারীর সাথে উত্তরবঙ্গের নৌপথ ছাড়াও সড়ক ও রেল যোগাযোগ রয়েছে। ব্রহ্মপুত্রের পূর্বপাশেই রৌমারীর অবস্থান যা একেবারে মেঘালয়ের সীমান্তবর্তী। রৌমারী ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের শক্ত ঘাঁটি। ভারত থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশের জন্য রৌমারীকে মুক্ত রাখার গুরুত্ব ছিল অপরিসীম এবং মুক্তিবাহিনী যুদ্ধের শুরু থেকে রৌমারীকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছিল। রৌমারী ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের অবাধ বিচরণভূমি ও বিস্তীর্ণ মুক্তাঞ্চল। যখন অস্থায়ী মুজিবনগর সরকারকে রৌমারীতে স্থাপনের পরিকল্পনা চলছিল তখন মেজর জিয়ার জেড ফোর্স অঞ্চলটিকে সুরক্ষিত করে। তাই পাকিস্তানি বাহিনী চিলমারীতে বিপুল সৈন্য সমাবেশ করে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলে। তাদের সাথে ছিল বিশাল রাজাকার বাহিনী যারা রাজভিটা মাদ্রাসা ও জোড়গাছ জুনিয়র স্কুলে ক্যাম্প স্থাপন করেছিল। চিলমারীতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর দুইটি কোম্পানি, দুই প্লাটুন পুলিশ ও রাজাকার বাহিনী অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে দুর্ভেদ্য ঘাঁটি গড়ে তুলেছিল। সাথে নিয়মিত দুই প্লাটুন সেনা মোতায়েন ছিল। চিলমারী হাই স্কুল, রেলস্টেশন ও ওয়াপদাতে ছিল পাকিস্তানিদের মূল জমায়েত।

কৌশলগত নানা কারণে চিলমারী উভয় পক্ষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। রৌমারী তখন ১১ নং সেক্টরের মানকারচর সাবসেক্টরের অধীন। মেজর তাহের সেক্টর কমান্ডার ও লেঃ হামিদুল্লাহ খান সাবসেক্টর কমান্ডার। রৌমারী থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত যোদ্ধাদের দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করা, জামালপুর-টাঙ্গাইল হয়ে ঢাকা অগ্রসর হওয়া, চিলমারীর জনসাধারণের ওপর রাজাকারদের অসহনীয় নির্যাতন, সবকিছু মিলিয়ে চিলমারী আক্রমণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কামালপুরে ছিল পাকবাহিনীর শক্ত ঘাঁটি যা ঢাকা অগ্রসর হবার ক্ষেত্রে প্রধান বাঁধা হিসেবে কাজ করত। চিলমারী ঘাঁটিও কামালপুরের নিকটবর্তী হওয়ায় ঢাকা অগ্রসর হবার আগে চিলমারী আক্রমণের পরিকল্পনা করেন মেজর তাহের।

প্রায় এক মাস ধরে পাকবাহিনীর অবস্থান, রাজাকারদের কার্যক্রম, শত্রুর গোপন তথ্য সংগ্রহ, শত্রুর প্রাত্যহিক গতিবিধি, ভারি অস্ত্রের অবস্থান রেকি করে সার্বিক তথ্য সংগ্রহের কাজ করেন ১১ নং সেক্টরের গোয়েন্দা অফিসার শফিক উল্লাহর নেতৃত্বাধীন একটি দল। তিনি শত্রুর বিস্তারিত বিবরণ হুবহু মাটির নকশা করে সেক্টর কমান্ডারকে অবহিত করেন। এতে চিলমারী এলাকার মুক্তিযোদ্ধা অধিনায়ক, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবুল কাশেম চাঁদ তাকে সহযোগিতা করেন। ১৭ অক্টোবর ভোর চারটায় একযোগে শত্রুর সকল অবস্থানে আক্রমণ করার এক অনন্য রণকৌশল তৈরি করেন সেক্টর ও সাবসেক্টর কমান্ডারগণ।

মুক্তিযোদ্ধারা মূলত চারটি দলে বিভক্ত হন। ইপিআর সুবেদার আব্দুল মান্নানের নেতৃত্বে একটি দল নিযুক্ত হয়েছিল রেলস্টেশন, ওয়াপদা ও জোড়গাছ রাজাকার ক্যাম্প দখলের জন্য। আবুল কাশেম চাঁদের নেতৃত্বে দলটি যায় পুলিশ স্টেশন, বালাবাড়ী রেলস্টেশন ও রাজভিটা রাজাকার ক্যাম্প দখলের উদ্দেশ্যে। ওয়ারেন্ট অফিসার শফিক উল্লাহর নেতৃত্বে দলটির দায়িত্ব থাকে কাটঅফ  পার্টির। অর্থাৎ তারা চিলমারী ও উলিপুরের মাঝামাঝি গোপনে অবস্থান নেবে যেন শত্রুরা যোগাযোগ করতে না পারে। আর মেজর তাহের এর অধীনে কিছু যোদ্ধা থাকেন রিজার্ভ পার্টি হিসেবে।

আক্রমণ শুরু করতে প্রচুর চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয় মুক্তিযোদ্ধাদের। এই যুদ্ধে রৌমারীতে স্থাপিত ক্যাম্পে প্রশিক্ষিত যোদ্ধাদের কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যারা কিনা স্বীকৃত ক্যাম্প ব্যতীত মাত্র ১৫ দিনের প্রশিক্ষণে বিনা অস্ত্রে যুদ্ধ করবে। তাছাড়া এত বিপুলসংখ্যক যোদ্ধার জন্য নৌকার ব্যবস্থা করা, প্রায় তিন মাইল প্রশস্ত ব্রহ্মপুত্র নদ পাড়ি দিয়ে শত্রুর দৃষ্টি এড়িয়ে চিলমারী প্রবেশ করা ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। আক্রমণ সুদৃঢ় করার জন্য চারটি কামানকে তিন মাইল নদ ও চর ঠেলে চালিয়াপাড়ায় স্থাপন করাও ছিল খুবই দুঃসাহসী ও কষ্টসাধ্য একটি কাজ। অত্যন্ত দক্ষ রণকৌশলে সকল পরিকল্পনারই যথাযথ বাস্তবায়ন করতে সমর্থ হয়েছিল মুক্তিযোদ্ধারা। মূল আক্রমণ শুরু হবার আগেই ওয়ারেন্ট অফিসার শফিক উল্লাহর নেতৃত্বাধীন কাটঅফ  পার্টি অভূতপূর্ব সাফল্য দেখায়। তারা শুধু সড়ক ও রেলব্রিজ গুলো ভেঙে দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি বরং জায়গায় জায়গায় রেললাইন তুলে ও রাস্তা কেটে শত্রুর চলাচলকে কয়েকদিনের জন্য বন্ধ করে দেয়।

১৬ অক্টোবর মধ্যরাত। ভোর চারটায় মান্নান ও চাঁদের নেতৃত্বাধীন দলদুটি একযোগে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে আক্রমণ চালায়। মুক্তিবাহিনীর টানা আক্রমণে রাজাকার ও পাকবাহিনী দিশেহারা হয়ে পড়ে। দুইটি রাজাকার ক্যাম্পই সফলভাবে দখল করে নিতে সক্ষম হয় এবং বিপুল পরিমাণ রাজাকার আত্মসমর্পণ করে। সকল স্থানে অত্যন্ত সফলতার সাথে অভিযান পরিচালিত হয়। কিন্তু ওয়াপদাতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক যোদ্ধা প্রবল আক্রমণ চালালেও কিছুতেই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হচ্ছিল না। যদিও শত্রুপক্ষ আউটার ডিফেন্স পেরিমিটার ছেড়ে ইনার ডিফেন্সে পিছু হটতে বাধ্য হয়।

এদিকে পুলিশ স্টেশন দখলকারী দলটি যথাসময়ে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়। কিন্তু আক্রমণ শুরু হয়ে যাওয়ায় কমান্ডার চাঁদ মাত্র ২ জন যোদ্ধা সাথে নিয়ে থানা ঘেরাও করেন এবং চিৎকার করে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেন। গোলাগুলির শব্দে ভীত দারোগা ২০ জন পুলিশ ও ৪০-৫০ জন রাজাকারসহ আত্মসমর্পণ করেন। অন্যদিকে রেলস্টেশন দখল করতে যাওয়া দলটি যোদ্ধা ও অস্ত্র সংকটে পড়লে মেজর তাহের নিজে এসে যোগ দেন। ওয়্যারলেসে আর্টিলারি ফায়ারের নির্দেশ দিলেও তা কার্যকরী দূরত্বে না থাকায় সম্ভব হয়নি। আর্টিলারি ফায়ার ছাড়া শত্রুর মূল অবস্থানের কোনো পরিবর্তন করা যাবে না বুঝতে পেরে মেজর তাহের সারাদিন আক্রমণ শেষে ১৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় বাহিনী প্রত্যাহার করার নির্দেশ দেন। অন্যান্য দলগুলো সফল হামলা শেষ করে রৌমারীতে ফিরে আসে। এ যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর ছয়জন শহীদ এবং দুই জন আহত হন।

এ অভিযানে শত্রুর ঘাঁটির পতন না হলেও শক্তিশালী এ ঘাঁটি বস্তুত অকার্যকর হয়ে পড়ে। প্রচুর পাক সেনা হতাহত হয়, বিপুল পরিমাণ অস্ত্র জব্দ হয়, অসংখ্য রাজাকার ও পুলিশ আত্মসমর্পণ করে যাদের অনেকেই পরবর্তীতে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেয়। যুদ্ধবন্দী হিসেবে রাজাকার কমান্ডার ওয়ালি মাহমুদ ও পাচুমিয়াকে হত্যা, রাজাকার বাহিনী গঠন ও লুণ্ঠনের অভিযোগে জনগণের আদালতে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। ওয়ালি মাহমুদ ও পাচুমিয়ার নির্দেশে রাজাকাররা জনসাধারণের ওপর অবর্ণনীয় অত্যাচার চালিয়েছিল।

এ যুদ্ধে শত্রুর ঘাঁটি অকার্যকর হয় এবং রাজাকাররা আত্মসমর্পণ করে। এতে মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল বহুগুণ বেড়ে যায়। এ যুদ্ধের কৌশল যোদ্ধাদের সাহসকে সুদৃঢ় করে এবং দ্বিগুণ উৎসাহে পরবর্তী যুদ্ধগুলোতে অংশ নেয়। এ যুদ্ধের কয়েকটি বিষয় অত্যন্ত দক্ষতা ও বুদ্ধিমত্তার সাথে সম্পন্ন করা হয় যা এই যুদ্ধকে বিশেষ মর্যাদায় আসীন করে। বিশেষ করে ডিঙিনৌকা পাশাপাশি জোড়া দিয়ে তিন মাইল প্রশস্ত ব্রহ্মপুত্র নদ পাড়ি দিয়ে কামানগুলো দুর্গম স্থানে স্থাপন করা ছিল এক দুঃসাহসী ও অসাধ্য পদক্ষেপ। অধিনায়কদের উপস্থিতি যুদ্ধক্ষেত্রে যোদ্ধাদের উজ্জীবিত ও অনুপ্রাণিত করে। অস্ত্র ও ফায়ারিং সাপোর্টের স্বল্পতা সত্ত্বেও বিপুল পরিমাণ ক্ষতিসাধন ও রাজাকার বাহিনীর আত্মসমর্পণ ছিল পাক বাহিনীর নৈতিক পরাজয়। এতে পাকবাহিনী মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। সর্বোপরি মুক্তিযোদ্ধারা বিজয়ীর বেশে ফিরে আসে।

ঐতিহাসিক এ যুদ্ধের সকল মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি রইল সশ্রদ্ধ সালাম।

তথ্যসূত্র-
১. মুক্তিযুদ্ধে সামরিক অভিযান – পঞ্চম খণ্ড
২. লেঃ কর্নেল আবু তাহের এর সাক্ষাৎকার, বাংলা একাডেমীর দলিলপত্র, ১৯৭১
কমেন্ট করুন
শিক্ষার্থী | পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সেশনঃ ২০১৫-২০১৬

সায়েম শাফিন

সেশনঃ ২০১৫-২০১৬

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.