ঢাকা – আ ডেড সিটি

টিএসসির ক্যাফেটেরিয়ায় ঢুকে প্লাস্টিকের চেয়ারে বসতে না বসতেই পকেটে রাখা মোবাইল ফোনটা বেজে ওঠে। অনেকক্ষণ ধরে আমার জন্য ওয়েট করা বন্ধু ও বান্ধবীকে ‘এক্সিউজ মি’ বলে কল রিসিভ করি।

হ্যালো।

আমি জায়েদ। তুই কই?

আমি টিএসসিতে। কেন?

খালেদের মা মারা গেছে। ধানমণ্ডি ৭-এ। গণস্বাস্থ্যের পাশে একটা কিডনি হাসপাতাল আছে ওখানে। তুই চলে আয়। আমি ওখানে যাচ্ছি। এখন শাহবাগে আছি বাসের মধ্যে।

এটুকু বলেই আমাকে কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়ে ফোনটা কেটে দেয় জায়েদ।

জায়েদ ও খালেদ আমার ছোটবেলার বন্ধু। বহুবছর আগে মাদ্রাসায় একসঙ্গে আমরা পড়েছি। জায়েদের সাথে যোগাযোগ ও দেখাসাক্ষাৎ দু-তিন বছরে একবার করে হলেও খালেদের সাথে আমার দেখা হয় না এক যুগেরও বেশি। এই শহরে পথ চলতেও দেখা হয় নাই। আচমকা সামনাসামনিও হই নাই কোনদিন। ফোনেও কথা হয় নাই। সত্যি বলতে কী, সৌজন্যতার খাতিরেও দেখাসাক্ষাতের দরকার হয় নাই কখনো।

মাদ্রাসায় আমরা বেশ কয়েক বছর এক সাথে লেখাপড়া করেছি। কিন্তু খালেদ আমার সহপাঠী হলেও বন্ধুত্ব আমার সাথে তেমন গাঢ়ভাবে গড়ে ওঠেনি। সত্যি বলতে, খালেদকে আমার তেমন ভালও লাগত না। পড়াশোনায় খুবই কাঁচা। একেবারে নিচু সারির ছাত্র ছিল। ক্লাসের পড়া ঠিকমত বুঝত না। প্রায়ই আমার কাছে আসত পড়া বুঝে নিতে। আমি বিরক্ত হতাম না। যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েই ওকে সব বুঝিয়ে দিতাম। পরীক্ষায় সারাজীবন জায়েদের পেছনে বসে দেখে টুকলিফাই করত। একবার তো জায়েদের চেয়ে বেশি নম্বরও পেয়ে যায়। আমরা ব্যাপারটা নিয়ে অনেকদিন মজা করেছিলাম।

মাদ্রাসায় পড়লেও খালেদের ভেতর মাদ্রাসার ব্যাপারে তেমন ভক্তি-শ্রদ্ধা দেখতাম না। খুব ছোটবেলায় বাবা মারা যাওয়ার পর ওকে নাজাতের উসিলা হিসেবে মাদ্রাসায় পাঠানো হয়। স্কুলে না পড়ার কারণে বাংলা-টাংলাও ভাল পারত না। তবে আমি একটু চেষ্টা-তদবির করে ওকে কয়েকটা ক্লাসিক বাংলা সাহিত্য পড়িয়েছিলাম। হুমায়ূন আহমেদের সহজ গদ্য ওর নাকি সবচেয়ে বেশি ভাল লাগত। মেমসাহেব বইটি পড়ে খালেদের মন বিষণ্ণ ছিল বেশ কিছুদিন এটা আমার মনে আছে। মাদ্রাসার দুষ্টু পোলাপানের সাথে ও মেলামেশা বেশি করত। ওদের একটা গ্যাং ছিল। একসাথে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে মাদ্রাসা ফাঁকি দিয়ে সিনেমা হলে গিয়ে বস্তাপচা বি গ্রেডের বাংলা মুভি দেখা, রাতের আঁধারে সিগ্রেট ফোঁকা এবং এলাকার পরিচিত কোন সিডির দোকানে টিভি ভাড়া করে ব্লু-ফিল্ম দেখা ছিল ওদের নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। এলাকার ‘বড় ভাই’দের সাথেও দহরম-মহরম ছিল কাঁঠালের আঠার মত। ছিনতাইয়ের হাত থেকে একবার খালেদ বেঁচে যায় সেই ভাইদের দোহাই দিয়ে। খালেদের মা সপ্তাহান্তে মাদ্রাসায় আসতেন ছেলেকে দেখতে। সাথে আনতেন হাতে বানানো হরেক পদের পিঠা। খালেদের খাওয়া-দাওয়ার প্রতি তেমন টান বা আকর্ষণ ছিল না। ফলে আমরাই সেইসব পিঠা ভাগ-বাটোয়ারা করে সাবাড় করে দিতাম। বাপ মরা ছেলে খালেদের হাতখরচও ছিল আমাদের চেয়ে বেশি। মাসে মাসেই দেখতাম নতুন নতুন দামি কাপড়ের ডিজাইন করা পাঞ্জাবি বানাতো। ওর বড় ভাই সৌদি আরবে থাকত। তিনিই সংসারের দেখভাল করতেন। ছোট ভাইয়ের আব্দার বড় ভাই ফেলতে পারতেন না। মাদ্রাসা থেকে পাস করে খালেদ লেগে যায় ব্যবসায়। বাড়ির সাথেই বিশাল মুদির দোকান। কেনাবেচা খুব চাঙ্গা। বিয়ে-থাও করে। সম্ভবত একটা বাচ্চাও আছে। মাদ্রাসা ত্যাগ করার পর এসবই আমি জায়েদের কাছে শুনেছি।

টিএসসির ক্যাফেটেরিয়া থেকে বের হয়ে বাইরে আসতেই ঝুম বৃষ্টি শুরু হলো। বৃষ্টিতে বের হওয়ার মানেই হয় না। গাড়ি নাই। রিকশা নাই। হাতে ছাতাও নাই যে হেঁটেই রওনা দেব। অবশ্য যে জোরে বৃষ্টি পড়ছে ছাতা মাথায় থাকলেও প্রবল বর্ষণের ছাট আটকানো যেত কিনা সন্দেহ। আনুমানিক ত্রিশ মিনিট ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকলাম বৃষ্টি থামার অপেক্ষায়। বৃষ্টি যখন থেমে গেল তখনও দেখি রিকশা নাই। অগত্যা পায়ে হেঁটেই শাহবাগ চলে এলাম। এবার তো আমার মাথায় বাজ পড়ার মত অবস্থা। শাহবাগের মোড়ে দাঁড়িয়ে হতাশ হয়ে দেখি সবগুলো রাস্তায়ই দৃষ্টিসীমা পর্যন্ত জ্যাম। টিপটিপ বৃষ্টি তখনও পড়ছে। কাঁটাবনের রাস্তায় শ্রান্তিহীন জ্যাম একটু মোচড় দিয়ে নড়েচড়ে উঠতেই সারিবদ্ধ গাড়িগুলো বিকট হর্ন বাজিয়ে সর্পিল গতিতে এগুতে থাকে। ঝিরঝির বৃষ্টির পানিতে মাথার চুল সব ভিজে জবজব করছে। মাথায় বৃষ্টির পানি শুকিয়ে গেলে ঠাণ্ডা লেগে যাবে। ঝিরঝিরে বৃষ্টির মতই মৃদু গতিতে চলতে থাকা মোহাম্মদপুরগামী একটা বাসে উঠতে যাব তখনই বাসটা থেমে যায়। আবার ট্রাফিক সিগন্যাল শুরু হয়েছে। বাসের হেল্পার বাসের দরজা থেকে নেমে ফুটপাতেই বসে পড়ে বিশ্রাম নিতে।

বুঝলেন মামা। পুরা রাস্তাডিই জ্যাম। গাড়ির চাক্কা ঘুরেই না। মতিঝিল থেকে আইতে লাগছে দেড় ঘণ্টা।

এখানে কতক্ষণ দাঁড়ায় আছেন? আমি জিজ্ঞেস করি।

বেশি না। মাত্র পনের মিনিট। বলেই পকেট থেকে সিগ্রেট ও লাইটার বের করল ভেজা হাতেই। পিটপিট বৃষ্টির মধ্যেই ধোঁয়া ছাড়তে লাগল। বড়ই মনোরম দৃশ্য।

হেঁটে যাব না বাসে চড়ে বসব বুঝতে চেষ্টা করি। আচমকা বৃষ্টির তোড় বেড়ে যাওয়ায় চটপট বাসে উঠে পড়ি। ঝপঝপ বৃষ্টিতে আর কতক্ষণ হাঁটা যায়। চারপাশের গাড়ির জ্বলন্ত লাইট ও আশপাশের দোকানপাটের সজ্জিত ইলেকট্রিক বাল্বের আলো এসে পড়ছে বাসের সামনের গ্লাসে আটকে থাকা ফোঁটায় ফোঁটায় বৃষ্টিতে। রাতের শত শত জোনাক পোকার মত বৃষ্টির ফোঁটাগুলো ঝিকমিক করছে। বাসের ভেতর আসন ফাঁকা থাকলেও আমি দরজার কাছে লোহার হাতল ধরে দাঁড়িয়ে থাকি। বসতে মন চাচ্ছে না। ছয়/সাত মাসের অধিক সময় না কাটা মাথার প্রলম্বিত চুলগুলোতে বৃষ্টির পানি জমে আছে। সেখান থেকে পানি ঝরছে মুখে, ঘাড়ে ও কাঁধের ওপর। ট্রাফিক একটু ক্লিয়ার হলে বাস কয়েক কদম এগিয়ে আবার দাঁড়িয়ে পড়ে। আমি নেমে পড়ি বাস থেকে। কাঁটাবনের কাছে দেখি আরো বিশাল বড় জ্যাম। চারদিকের গাড়ি আটকে আছে ট্রাফিক পুলিশের নির্দেশের অপেক্ষায়। কিন্তু তিনি এক হাতে ছাতা আর অন্য হাতে মজবুত একটা ডাণ্ডা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন নির্বিকার ও অবিচল।

কাঁটাবন সিগন্যাল পার হয়ে আমি এলিফেন্ট রোড়ের দিকে হাঁটতে থাকি। ভেজা চামড়ার স্যান্ডেল পায়ে টিপটিপ বৃষ্টিতে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে যাই সায়েন্স ল্যাবের মোড়ে। যানবাহনের আশায় আর বসে থাকা বৃথা। চলেই তো এসেছি প্রায়। মিনিট পাঁচেক হাঁটলেই সেই কিডনি হাসপাতাল, যেখানে রুহ বের হয়ে যাওয়া খালেদের মা’র ডেড বডি শায়িত আছে। ঢাকার আত্মীয়স্বজন দেখতে আসবে। তাদের দেখাদেখি ও সমবেদনার পর্ব খতম হলে খালেদের মাকে নিয়ে যাবে গ্রামের বাড়িতে। সেখানেই তাকে চিরতরে দাফন করা হবে। মৃত্যুর পর আমরা আর কাউকে নাম ধরে ডাকি না। বলি অমুকের ডেড বডি।

পাশ দিয়ে ভিড়ের ভেতর একটা এম্বুলেন্স কর্কশ চিৎকার করতে করতে বেরিয়ে যায়। হতে পারে এটাতেই খালেদের মা’র ডেড বডি নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আমার জন্য আর ওরা এত সময় বসে থাকবে কেন? আমি ওদের কে? বড় কোন আত্মীয় নাকি খুব কাছের বন্ধু? কেউই না। ইনফ্যাক্ট, খালেদ হয়ত জানেও না যে আমি আসছি। আমাকে তো খবর দিয়েছে জায়েদ।

প্রায় দেড়/দুই ঘণ্টা পর আমি যখন কিডনি হাসপাতালের সামনে পৌঁছলাম তখন দেখলাম জায়েদ, মাহবুব, হুসাইন, রাকিব ও আরো কয়েকজন পুরোনো বন্ধু দাঁড়িয়ে আছে। এদের সাথে বহুবছর আগে মাদ্রাসায় পড়তাম। আমাকে দেখেই জায়েদ বলে উঠল, আরে তুই লেট করে ফেলেছিস দোস্ত। পাঁচ মিনিট আগে আসলেই দেখতে পারতি। একটু আগেই এম্বুলেন্স বের হয়ে গেল। লাশ এত সময় রাখা যায় নাকি? সেই বিকেলে মারা গেছেন আন্টি। আত্মীয়-স্বজন আসার আর কেউ নাই। আমরা তোর অপেক্ষায় বাইরে দাঁড়াই আছি। তোকে ফোন দিছি সেই দুই ঘণ্টা আগে। এত দেরি করলি ক্যান?

আমি আর কী বলব। কিছু বললাম না। কথা বলতে মন চাচ্ছিল না। এই শহরের শোক, শ্রাবণের অঝোর বৃষ্টি আর অনিয়ন্ত্রিত ট্রাফিক জ্যাম লাল-নীল-সবুজ-হলুদ বাতির মত আমার নিউরনে জ্বলছিল। আমি পকেট থেকে মার্লবোরোর প্যাকেট বের করে একটা সিগ্রেট ধরালাম। আমাকে সিগ্রেট খেতে দেখে আমার মাদ্রাসার বন্ধুদের মধ্য থেকে দুজন এগিয়ে এসে হাতের প্যাকেট থেকে সিগ্রেট বের আমার সাথে ধূমপানে যোগ দেয়।

সিগ্রেট বের করে খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে কুশল বিনিময় ও পারস্পরিক জানপেহচান হয়ে গেলে পাশে অপেক্ষারত তিনটা মোটরবাইকে চড়ে ওরা খালেদের মা’র লাশবাহী এম্বুলেন্স অনুসরণ করে। ভোরের আগেই খালেদের গ্রামের বাড়ি গিয়ে পৌঁছে জানাজায় শরিক হতে হবে।

কমেন্ট করুন
শিক্ষার্থী | বিশ্ব ধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সেশনঃ ২০১৪ - ২০১৫

মাহমুদুল হাসান

সেশনঃ ২০১৪ - ২০১৫