মারাকেশ-এর মানব

(১)

ওউদের সুর, প্লেটভর্তি নাস্তা, হাতের ডানে এক গ্লাস ফ্রেশ অরেঞ্জ জুস, বামে অপেক্ষমাণ কাপ্পুচিনো – সর্বাঙ্গীণ সুন্দর আয়োজন বলা যায়। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর গত আড়াই ঘণ্টাই সর্বাঙ্গীণ সুন্দর কেটেছে সামির।

ভোর ছয়টায় বিছানা ছেড়ে ৬ঃ২০-এ সে দৌড়াতে বের হয়। মারাকেশ শহরের আকাশে তখন সবে আলোর রঙ লাগছে। নিউ ইয়র্ক-কাসাব্লাংকা-মারাকেশ ফ্লাইট ধরে কাল রাতেই পৌঁছেছে সে। ফ্লাইটে বসে গন্তব্যের মানচিত্র খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখা ওর বরাবরের অভ্যাস। ওর হোটেলটা পুরনো শহর, যেটাকে ওরা “মেদিনা” বলে, তার মাত্র এক কিলোমিটার দূরে।

এক ঘণ্টা বিশ মিনিটে সাড়ে তেরো কিলোমিটার দৌড়ে মেদিনার অনেকটাই এলোমেলোভাবে দেখা হয়ে গেছে সামির। মারাকেশ শহরের সব ভবন একই রঙের, রোদে পোড়া কাদামাটির মত লালচে। এটা সম্ভবত প্রাচীন শহরটার নিজস্বতা ধরে রাখতে করা হয়েছে। মরোক্কানদের শিল্পশৈলী অবিশ্বাস্য! মাঝেমধ্যে কিছু মামুলি বাসাবাড়ির দরজার কারুকাজ দেখেও ওকে দৌড় থামিয়ে দাঁড়িয়ে পড়তে হয়েছে।

হোটেলে ফিরে গোসল সেরে সকাল আটটার কিছু পরে ব্রেকফাস্ট রুমে ঢুকলো সামি। ঢুকেই মনটা খুশিখুশি হয়ে গেলো। এর একটা কারণ খাবারের আয়োজন। আমেরিকার বেশিরভাগ হোটেলে সকালের নাস্তা হয় অখাদ্য, একদম দায়সারা গোছের। প্রাচ্যের দেশগুলো এই ব্যাপারে সম্পূর্ণ বিপরীত। কিন্তু সামির খুশি হওয়ার মূল কারণ সেটা না। ক্যাফের এক কোণায় বসে ওউদ বাজাচ্ছে এক মরোক্কান বাজিয়ে। এই ইন্সট্রুমেন্টটা ওর খুব পছন্দ। ওউদের সুরে সে রহস্য, ব্যাকুলতা আর মরুর শূন্যতার মিশেল শুনতে পায়।

আধা ঘণ্টা সময় নিয়ে প্রচুর নাস্তা করলো সামি। কফির কাপটা হাতে নিয়ে সে ভাবলো বাদকের আরও কাছাকাছি বসে ওউদ আর কফির যুগলবন্দি  উপভোগ করা যাক। এই জায়গাটায় বিপত্তি বাঁধলো!

একটু এগিয়ে যেতেই বাদক মুখ তুলে সামির দিকে তাকালো, তারপর প্রশস্ত হাসি দিয়ে এতক্ষণ বাজানো সুন্দর সুরটা পাল্টে একটা বলিউড গানের টিউন বাজানো শুরু করলো। মনে মনে “ধুত্তেরি” বলে আবার আগের টেবিলে ফেরত গেলো সামি। ওর বাদককে বলতে ইচ্ছা করছিলো যে সে ভারতীয় না এবং সে আগের সুরটাই শুনতে আগ্রহী। কিন্তু মরোক্কানরা আরবি আর ফ্রেঞ্চ বোঝে। এর দুই ভাষার কোনটাই ওর জানা নেই।

সামি ফেরত গেলেও বলিউড টিউনের অত্যাচার জারি থাকলো। ভাগ্য ভালো যে মিনিট পাঁচেক পর একজন বেয়ারা এসে জানালো “ইওর ড্রাইভার ইজ হিয়ার, স্যার”।

যাক, বাঁচা গেলো।

(২)

বাইরে এক পা দিয়েই আবার দ্রুত পিছু হটলো সামি। সবেমাত্র সকাল নয়টা কিন্তু এর মধ্যেই রোদ উঠে চারদিক জ্বলজ্বল করছে। চোখে সানগ্লাস চড়িয়ে তারপর আবার বের হলো সে।

ড্রাইভওয়েতে সাদা রঙের হোন্ডা সিভিক গাড়ির পাশে দাঁড়ানো মাঝারি গড়নের, কাঁচাপাকা লম্বা দাড়িওয়ালা মধ্যবয়সী ড্রাইভার। তার গায়ে বাদামী রঙের লম্বা, ঢিলেঢালা কাফতান আর মাথায় সাদা টুপি। সামি এগিয়ে গিয়ে হ্যান্ডশেইকের জন্য হাত বাড়িয়ে দিলো।

“হাই! আই’ম সামিউল আমিন।“

“ওয়েলকাম টু মরক্কো মিঃ আমিন। মাই নেইম ইজ ইয়েসিন। আ’ল বী ইওর ড্রাইভার এন্ড গাইড ডিউরিং ইওর স্টে হিয়ার।“

সামির দিনটায় আরেকটা অপ্রত্যাশিত ব্যাপার যোগ হলো। বেশভূষায় একদম সাদামাটা ইয়েসিনের ইংলিশ নিখুঁত। উচ্চারণভঙ্গিটা আমেরিকান ধাঁচের। আরেকটা লক্ষণীয় ব্যাপার তার স্বচ্ছ, গভীর দৃষ্টি।

“তুমি আমাকে শুধু সামি বলতে পারো। তো শুরু করা যাক?”

সামির গন্তব্য আরেকটা হোটেল যেখানে মরোক্কান হেলথ মিনিস্ট্রির কয়েকজন কর্মকর্তা তার সাথে দেখা করবে। ওর মরক্কোতে আসার উদ্দেশ্য এই দেশের হেলথ মিনিস্ট্রি আর ক্যান্সার চিকিৎসা হয় এমন হাসপাতালগুলোর মধ্যে ক্যান্সার রিসার্চের জন্য ডেটা এক্সচেইঞ্জ সিস্টেম নিয়ে পরামর্শ দেয়া। গত তিন বছর ধরে ও নিউ ইয়র্কের একটা ক্যান্সার রিসার্চ ইন্সটিটিউটে কাজ করে। নিউ ইয়র্ক আর আশেপাশের কয়েকটা রাজ্যের হাসপাতালগুলোর সাথে ওদের ইন্সটিটিউটের এইরকম একটা ডেটা এক্সচেঞ্জ সিস্টেম আছে। সামি ওই প্রোজেক্টের টীম লিডার। মরোক্কান হেলথ মিনিস্ট্রি চাচ্ছে ওইরকম কিছু একটা দাঁড় করাতে।

“আচ্ছা বলো তো, মিনিস্ট্রির মূল অফিস রাবাত-এ, তাহলে মিটিং ওরা মারাকেশে নিলো কেন?”

ইয়েসিন রাস্তা থেকে চোখ না সরিয়ে উত্তর দিলো “কারণ মরোক্কান সরকার মারাকেশ দেখাতে পছন্দ করে। মানুষ হোক আর সরকার, সবাই চায় তার সুন্দর দিকটা দেখাতে।“

ইয়েসিন দেখা যাচ্ছে দার্শনিকও! এই মুহূর্তে গাড়ি সুপ্রশস্ত মোহাম্মেদ সিক্স এভেনিউ ধরে মসৃণ গতিতে ছুটে চলেছে।

(৩)

মধ্যে ঘণ্টা দুয়েকের লাঞ্চ ব্রেকসহ প্রথম দিনের আলোচনা বিকাল চারটা নাগাদ শেষ হলো। সামি বাদে আরও পাঁচজন ছিলো মিটিং-এ; মিনিস্ট্রির কর্মকর্তা আদেল, স্ট্যাটিসটিক্স ডিরেকটোরেট-এর সালাহ, আর মিনিস্ট্রির আইটি টিমের বয়সে তরুণ তিনজন স্টাফ আমজাদ, নাসরিন আর মুস্তাফা।

আদেল প্রোজেক্ট লিডার। চল্লিশের কোঠায় বয়স, জেল দিয়ে ব্যাকব্রাশ করা চুল। একদম ট্রিম্‌ড্‌, কেতাদুরস্ত লোক। কানাডায় মাস্টার্স করার ফলে ইংলিশ বলে সুন্দর। আমজাদ, নাসরিন আর মুস্তাফাও ইংলিশে কমবেশি আলাপ চালিয়ে নিতে পারে। একমাত্র সালাহই পুরা সময়টা চুপ থাকলো।

আদেল কিছুক্ষণ পরপর হাস্যরসাত্মক কিছু বলে। সে নিজে হাসেও চারদিক কাঁপিয়ে হোহো করে। আবার একইসাথে তার ব্যক্তিত্ব অত্যন্ত বসসূলভ। তরুণ তিনজনকে দেখে মনে হয় তারা আদেলের রসিকতায় হাসছেও একটু ভয়ে ভয়ে।

সামিকে নিয়ে হোটেলের লবির দিকে যেতে যেতে আদেল বললো “শোনো, মারাকেশটা ঘুরে দেখো। অনেক প্রাচীন শহর। মেদিনার অনেক এলাকা এক হাজার বছর ধরে প্রায় একইরকম আছে। খাবারদাবারগুলো চেখে দেখো। আমি সব বিদেশী বন্ধুকে বলি মিন্ট টী একটু কম খেতে কারণ ওটাতে আমরা চিনি কিছু বেশিই দেই। কিন্তু আমেরিকানদের কাছে ওটা মামুলি ব্যাপার। তোমাদের এক বোতল সোডার চিনি দিয়ে আমরা বাথটাবভর্তি মিন্ট টী বানাতে পারব।“

এটা বলেই আবার সেই ট্রেডমার্ক অট্টহাসি। সামিও হাসে। জাতীয়তায় এখন আমেরিকান হলেও সংস্কৃতিগতভাবে সে বাঙালি। সোডা সে বলতে গেলে একেবারেই খায়না।

লবিতে পৌঁছে ওরা দেখতে পেলো যে ইয়েসিন এর মধ্যে এসে অপেক্ষা করছে। আদেল ইয়েসিনের ঘাড়ে হাত দিয়ে বললো “ইয়েসিন কিন্তু আধা আমেরিকান। ইরাকে ইউএস আর্মির বাবুর্চি হিসেবে কাজ করেছে বহুদিন। সেই সূত্রে তোমাদের ইয়াংকি কালচারও জানে ভালো। তুমি যদি বেইজবল বা হলিউড নিয়ে আলাপ জুড়ে দাও ও চালিয়ে নিতে পারবে আশা করি।“

ইয়েসিন একটু অপ্রস্তুতভাবে হাসে।

রাস্তায় গাড়ি বের করতে করতে ইয়েসিন জিজ্ঞেস করে “কোথায় যাবে?”

“আমি সকালে একটু বের হয়েছিলাম। একটা জায়গা দেখেছি যেখানে চওড়া রাস্তার একপাশে খুব সুন্দর মিনারওয়ালা মসজিদ, আর অন্যপাশে বিশাল খোলা চত্বর। ওখানে চলো।“

“তুমি জেমা এল-ফনা এর কথা বলছো। চলো যাওয়া যাক।“

গাড়ি জলপাই গাছের ছায়ায় ঢাকা মওলা এল-হাসান এভেনিউতে মোড় দিতে সামি জিজ্ঞেস করলো “ইউএস মিলিটারির বাবুর্চি, হ্যাঁ? এইজন্য তুমি পাক্কা আমেরিকান কায়দায় ইংলিশ বলো?”

ইয়েসিন মুখ দিয়ে সম্মতিসূচক একটা শব্দ করলো কেবল। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে সে এই ব্যাপারে কথা বলতে আগ্রহী না।

(৪)

সুন্দর মিনারওয়ালা মসজিদটার নাম কুতুবিয়া। সামি প্রায় আধাঘণ্টা সময় নিয়ে বিভিন্ন দিক থেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে মিনারটা দেখলো। অসাধারণ নির্মাণশৈলী! সাতাত্তর মিটার উঁচু চারকোণা কাঠামোয় কয়েকটা নকশা করা জানালাওয়ালা কুঠুরি। চুড়ার দিকে দুই স্তরে সবুজ-সাদা মোজাইকের কাজ। এই মিনারের অনুকরণে মরক্কো আর স্পেইনে আরও বেশকিছু স্থাপত্য আছে। মারাকেশ শহরে এই মিনারের চেয়ে উঁচু করে কোনও বিল্ডিং বানানো যায়না। এই তথ্যগুলো ইয়েসিনের কাছ থেকে পাওয়া।

রাস্তা পার হয়ে ওরা জেমা এল-ফনা চত্বরের দিকে হাঁটা শুরু করলো। ঘড়িতে সময় তখন ছয়টা।

“জেমা এল-ফনা অর্থ জানো?” ইয়েসিন প্রশ্ন করলো।

“না।“

“এর অর্থ মৃতের সমাবেশ। এই চত্বরে এক সময় মৃত্যদণ্ড কার্যকর করা হত। এটাকে মেদিনার প্রাণকেন্দ্র বলতে পারো। এটাই মারাকেশের সবচেয়ে বড় খোলা বাজার।“

জেমা এল-ফনায় প্রাণপ্রাচুর্য উপচে পড়ছে। অসংখ্য অস্থায়ী দোকান, খাবারের কার্ট, হকার, গান-নাচ প্রদর্শনী মিলিয়ে জায়গাটা শব্দ, গন্ধ আর দৃশ্য দিয়ে ঠাসা। চত্বর সংলগ্ন বাজার, যেটাকে মরোক্কানরা “সুউক” বলে, সেখানে ঘণ্টাখানেক হাঁটাহাঁটি করার পর সামির বেশ খিদে পেলো। কোন রেস্টুরেন্টে খেতে যাওয়া যায় জানতে চাইলে ইয়েসিন বললো “চত্বরের পূর্ব প্রান্তে অনেক রেস্টুরেন্ট আছে। দাম একটু চড়া হবে কিন্তু তোমার জন্য হয়ত বেশি না। ভালো দেখে একটায় ঢুকে পড়ো। আমি বাইরে অপেক্ষা করব।“

“সেটা সম্ভব না, ইয়েসিন। আমার সাথের কাওকে রেখে আমি খেয়ে নিয়েছি এটা জানলে আমার মা কষ্ট পাবেন। আমার মা অতিথি আপ্যায়নের আশায় সবসময় প্রয়োজনের চেয়ে বেশি রান্না করেন।“

ওরা দুইজন “লা মারাকশি” নামের একটা রেস্টুরেন্টে ঢুকলো।

(৫)

ইয়েসিনের কথা সত্য। খাবারের বেশ ভালোই দাম। দুইজনের বিল প্রায় চল্লিশ ইউএস ডলারের মতো আসবে। কুসকুস আর ল্যাম্বের ডিশটা খেতে অবশ্য বেশ লাগছে। রেস্টুরেন্টের ঠিক মাঝখানটায় একটা ফোক গানের দল পারফর্ম করছে।

খাবারের প্রায় মাঝপথে আরেকটা পারফরমেন্স শুরু হলো। এবারেরটা গান নয়, নাচ। তিনজন বেলি ড্যান্সার আর দুইজন বাদকের একটা দল বিভিন্ন টেবিলে ঘুরে ঘুরে নাচছে। মেয়েগুলো কোমর পর্যন্ত খুবই স্বল্পবসনা। দলটা সামির টেবিলে পৌঁছালে সে একটু অস্বস্তিবোধ করতে থাকলো। তবুও সে মুখে একটু হাসি ধরে রেখে স্বাভাবিকতা বজায় রাখার চেষ্টা করলো। ইয়েসিন ব্যাপারটা সম্ভবত আঁচ করতে পেরেছে।

“এটাকে মাগরেবের সংস্কৃতি বলে মনে করো না। পশ্চিমা টুরিস্ট মাগরেবের সংস্কৃতিকে যেভাবে দেখতে চায় এটা হচ্ছে সেটা।“

মাগরেব মরোক্কোর পুরানা নাম। “পশ্চিমা টুরিস্ট কেন মাগরেবের সংস্কৃতিকে এভাবে দেখতে চায়?“

“সেটা ব্যাখ্যা করার মতো জ্ঞান আমার নেই। এডওয়ার্ড সাঈদের ওরিয়েন্টালিজম বইটা পড়ে দেখতে পারো। সে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেছে।“

সামির ড্রাইভার এডওয়ার্ড সাঈদ পড়া লোক। এখন মনে হচ্ছে যে চল্লিশ ইউএস ডলারের অন্তত অর্ধেক সুপাত্রে খরচ হচ্ছে। “আচ্ছা বলো তো, আমার হাতে মাত্র তিনদিন সময় আছে। এই সময়ের মধ্যে মাগরেবের সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা কিছুটা হলেও অর্জন করতে আমি কী করতে পারি?”

“উমম…হোটেল ছেড়ে দিয়ে কোনো রিয়াদে উঠতে পার।“

“রিয়াদ কি জিনিস?”

“রিয়াদের আক্ষরিক অর্থ বাগান। মেদিনার বেশকিছু পুরানা বাড়ি হোটেলে রূপান্তরিত করা হয়েছে। এগুলোকে রিয়াদ বলে। এই হোটেলগুলোর আসবাব, আতিথেয়তা আর খাবারদাবারে মাগরেবের সংস্কৃতির ছাপ থাকে।“

“দারুণ ব্যাপার তো! আজ রাতেই শিফট করা যায়?”

“রাতেই করতে চাও?” কিছুক্ষণ ভেবে ইয়েসিন বললো “সম্ভব হতে পারে। আমার পরিচিত একটা রিয়াদ আছে। আমি কথা বলে দেখি।“

নয়টার দিকে হোটেলে পৌঁছে আধাঘণ্টার ভিতর সব গুছিয়ে, চেক-আউট করে সাড়ে দশটার আগেই মেদিনার একটা রিয়াদে উঠে গেলো সামি। রিয়াদ বুস্তান নামের এই হোটেলটা মেদিনার বাব দোউক্কালা এলাকায়।

রিয়াদের কেয়ারটেকার রাশিদ ইয়েসিনের পরিচিত। পঁয়তাল্লিশের মতো বয়স হবে। একহারা গড়ন, ছোট করে ছাটা কোঁকড়া চুল, নীল চোখ। রাশিদ জাতিতে বারবার এবং এটা নিয়ে সে খুব গর্বিত বলে মনে হলো। চেক-ইন করে মালপত্র তিন তলার একটা ঘরে তুলতে যেটুকু সময় লাগলো এর মধ্যে সে তিনবার বলে ফেলেছে “আমি কিন্তু বারবার, আরব নই”।

রিয়াদে ওঠার ত্বরিত সিদ্ধান্তে সামি নিজের উপর খুবই সন্তুষ্ট। হোটেলে আছে বলে মনে হচ্ছে না একদমই। মনে হচ্ছে আত্মীয়ের বাসায় বেড়াতে এসেছে। রিয়াদগুলোর নকশা এমন হয় যে ঠিক মাঝখানটায় থাকে মোজাইক করা উঠান। ভবনগুলোর বাইরের দিকের দেয়ালে প্রবেশপথ ছাড়া শুধু জানালা থাকে। রুমগুলোর দরজা আর লাগোয়া ঘুরানো বারান্দা থাকে ভিতরের দিকে, উঠানের চারপাশে। এই ধরণের নকশা নাকি বাড়িটাকে ঠাণ্ডা রাখতে সাহায্য করে।

রাতে চমৎকার ঘুম হলো সামির।

(৬)

মিটিং-এর দ্বিতীয় দিনে সামির কাজ শুধু শোনা। প্রথম দিনে ওর ডেভেলপ করা ডেটা এক্সচেইঞ্জ সিস্টেম কীভাবে কাজ করে সেটা সে বুঝিয়েছে। আজকে আদেল আর সালাহ বলবে ওদের বর্তমান ডেটা ইনফ্রাস্ট্রাকচার সম্পর্কে। শেষ অর্থাৎ তৃতীয় দিনে সামির ইন্সটিটিউট কী ধরনের কনসালট্যান্সি সার্ভিস দিতে পারবে সেই ব্যাপারে সে একটা ড্রাফট প্রোপোজাল প্রেজেন্ট করবে।

সামির কাছে একটানা কথা বলার চেয়ে শোনার কাজটা কঠিন বলে মনে হয়। আজকে অবশ্য সে বেশ চাঙা। সকালে উঠে সে যথারীতি ঘণ্টাখানেক দৌড়িয়ে এসেছে। রিয়াদে ফিরে গোসল সেরে বারান্দা থেকে নিচে উঁকি দিতেই দেখতে পায় রাশিদ বিশাল একটা ট্রেতে নাস্তা সাজাচ্ছে। ওকে বারান্দায় দেখে সে গলা চড়িয়ে বলে “ছাদে যাও। আমি নাস্তা নিয়ে আসছি।“

ছাদে গিয়ে সামি রিয়াদে ওঠার পরামর্শের জন্য ইয়েসিনকে মনে মনে আরেকবার ধন্যবাদ জানায়। সকালের রোদে আলোকিত ছাদের একটা অংশ ছাউনি দিয়ে ছায়া দেয়া। গোলটেবিল আর চেয়ার লাগিয়ে সেখানে বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। রাশিদ টেবিলের উপর একটা সাদা কাপড় বিছিয়ে নাস্তার জন্য প্রস্তুত করে রেখেছে। দিনের শুরুটা এমন সুন্দর হলে আর কী লাগে?

সালাহকে এই প্রথম কথা বলতে শোনা গেলো। তার ইংলিশ খুব ভাঙা-ভাঙা। মাঝে কয়েকবার সে কিছু ফ্রেঞ্চ শব্দও বলে ফেলেছে। টেকনিকাল বিষয়ের একটা সুবিধা হলো ভাষা ছাড়াও এর বেশিরভাগটা বুঝে নেয়া যায়।

দ্বিতীয় দিনের আলোচনা বিকাল তিনটার মধ্যে শেষ করা গেলো। পরদিনের মিটিং-এর আগে ড্রাফট প্রোপোজালটা তৈরি করতে হবে তাই সরাসরি রিয়াদে ফিরে এলো সামি। তারপর কাপড় পাল্টে বারান্দায় ল্যাপটপ নিয়ে বসে পড়লো।

ওকে ঘরে পড়ার কাপড়ে দেখতে পেয়ে রাশিদ জানতে চাইলো “আজকে আর বের হবে না?”

“না। একটা কাজ শেষ করতে হবে।“

“আচ্ছা। আমি তাহলে তোমার জন্য মিন্ট টী বানিয়ে আনছি।“

“ধন্যবাদ, রাশিদ!”

মিনিট বিশেক পর সুন্দর কারুকার্য করা রুপালি কেটলিতে করে মিন্ট টী নিয়ে এলো রাশিদ। সাথে এক থালা পাকা ফিগ ফল। সামি এর আগে কখনো ড্রাইড ছাড়া ফিগ খায়নি। এমনকি ফিগ ফলটা দেখতে কেমন তাও সে জানতো না। একটা মুখে দিয়েই মুগ্ধ হয়ে গেলো। কাজ করতে করতে সবগুলো ফিগ আর প্রায় আধা কেটলি মিন্ট টী সে সাবাড় করে দিলো।

ঘণ্টা দুয়েক পর কেটলি আর থালা নিতে এলো রাশিদ। “আমি ভেবেছিলাম যে তুমি টুরিস্ট। এখন দেখছি তুমি আসলে কাজে এসেছো।“

“হ্যাঁ। তোমাদের সরকারের সাথে একটা কাজ।“

“মাশা আল্লাহ! একটু মন দিয়ে পড়ালেখা করলে হয়ত আমিও তোমার মতো ভালো কাজ করতে পারতাম। রিয়াদের কেয়ারটেকার হতে হতো না। আবার দেখো, ইয়েসিনকে দেখলে মনে হয় ভালই আছি। এত ভালো ছাত্র ছিলো। কাসাব্লাংকার সবচেয়ে ভালো ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হলো। অথচ এখন সে কিনা সরকারী ড্রাইভার।“

“ইয়েসিন ইউনিভার্সিটিতে পড়া লোক?”

“শুরু করেছিলো, শেষ করেনি। ইয়েসিন আর আমার বড়ভাই সমবয়সী। আমাদের বাড়ি কাসাব্লাংকার একই এলাকায়। ইয়েসিনই আমাদের এলাকা থেকে হাসান সেকন্ড ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হওয়া প্রথম লোক। কিন্তু শেষ না করেই সে লিবিয়ায় তার ভাইয়ের কাছে চলে যায়। ভাই কিছুদিন পর ফিরলেও ইয়েসিন আর ফেরেনি। তারপর বছর বিশেক তার কোনও খোঁজখবর ছিলোনা। গতবছর হঠাত মারাকেশে আবার আমার সাথে দেখা।“

নিউ ইয়র্ক থেকে প্লেনে উঠার সময় কি সামি ভাবতে পেরেছিলো যে মারাকেশে সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক বিষয়টি হবে তার ড্রাইভার?

(৭)

বেশ নির্ভার মেজাজে আছে সামি। মরোক্কান হেলথ মিনিস্ট্রির সাথে ওর মীটিং শেষ এবং সফল। রাত আটটার মতো বাজে। ও আর ইয়েসিন বসে আছে বাব দোউক্কালা সুকের ভিতরে একটা খুপরিমতো খাবারের দোকানে। একদম লোকাল মরোক্কান রেস্টুরেন্টের খাবারের স্বাদ কেমন সেটা জানার ইচ্ছা প্রকাশ করায় ইয়েসিন ওকে এখানে নিয়ে এসেছে।

শেষদিনের আলোচনা শেষ হতে প্রায় সাড়ে পাঁচটা বেজে যায়। আদেল আর সালাহর ফিডব্যাকের উপর ভিত্তি করে প্রোপোজাল বেশ কয়েক জায়গায় পরিবর্তন করতে হয়েছে। তবুও এটা ড্রাফট প্রোপোজাল। নিউ ইয়র্ক ফিরে ওর বসের সাথে আলোচনা করে ফাইনাল প্রোপোজাল আর বাজেট কুয়োটেশন পাঠাবে সামি।

রেস্টুরেন্টটা চালায় ২৩-২৪ বছরের নিরীহদর্শন এক যুবক আর তার বালক বয়সী সহকারী। খুব ছোট সাইজের একটা ছুরি দিয়ে মুরগী কেটে একটু আগে চুলায় চড়িয়ে দিয়েছে যুবক। এখন সে মরোক্কান সালাদ বানাতে কুচিকুচি করে টমেটো কাটছে। কাস্টমারদের বসার জন্য মাত্র তিনটা ছোট ছোট টেবিল। ওরা ছাড়া এই মুহূর্তে আর কোনও কাস্টমার নেই। ওরা এসে বসতেই ছোট ছেলেটা মিন্ট টী দিয়ে গেছে।

“এখানে খেতে তোমার অসুবিধা হবে না তো?” ইয়েসিন জিজ্ঞেস করে।

“এখানে খেতেই বরং আমি বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করব। আমার মনে হচ্ছে আমি আমার ইউনিভার্সিটির ডরমিটরি থেকে বের হয়ে পুরান ঢাকার কোন রেস্টুরেন্টে ঢুকে পড়েছি।“

“তুমি আমেরিকায় কতবছর ধরে আছো?“

“এইবছর সেপ্টেম্বরে আট বছর হবে। মাস্টার্স করতে এসেছিলাম। তারপর চাকরি পেয়ে যাওয়াতে থেকে যাই।“

“কেমন লাগে আমেরিকা?”

“বেশ ভালো। সত্যি বলতে দেশটার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। ঢাকার একদম সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে ওঠা আমার। সেখান থেকে পুরো ফান্ডিং নিয়ে মাস্টার্স করা, তারপর এই চাকরি, দেশটা আমেরিকা বলেই সম্ভব হয়েছে।“

“হুম, গড়া আর ভাঙার ক্ষমতাবলেই দেশটা দুনিয়া শাসন করে।“

ইয়েসিনের শেষ কথাটার সুরে এমন কিছু ছিলো যে আলাপটা আর হালকা মেজাজের থাকলো না। কিছুক্ষণের মধ্যেই খাবার চলে আসলো।

মরোক্কের ঐতিহ্যবাহী ডিশ তাজিন। অসাধারণ রান্না হয়েছে। রান্নায় কমলার মতো একটা ফল ব্যবহার করায় স্বাদটা টক-ঝাল আর একটু তেতো মেশানো হয়েছে। সবচেয়ে অবাক ব্যাপার দুইজনের খাবারের দাম মাত্র ছয় ইউএস ডলার। লোকেশনের সাথে দামের এই উঠানামার সম্পর্কটা বৈশ্বিক।

খাওয়া শেষ করে হেটে রিয়াদে ফিরলো সামি। ফিরতি ফ্লাইটের মারাক্কেশ-কাসাব্লাংকা অংশটা বাতিল করেছে সে। কাল মারাক্কেশ থেকে ট্রেইনে কাসাব্লাংকা গিয়ে ফ্লাইট ধরবে ঠিক করেছে। তাড়া কিসের? ইয়েসিন সকাল আটটায় আসবে ওকে ট্রেইন স্টেশনে নিয়ে যেতে।

(৮) 

ট্রেইনের টিকেট কেটে স্টেশন হাউজ থেকে বের হয়ে হেটে হেটে খোলা পার্কিং লটে ফিরে এলো সামি। গাড়ির ট্রাংকে মালপত্র নিয়ে ইয়েসিন সেখানে অপেক্ষা করছে। গাড়ির দরজা খুলে সামি প্যাসেঞ্জার সীটে বসলো। 

“এগারোটায় ট্রেন। হাতে পাক্কা দুই ঘণ্টা আছে।“ দুই ঘণ্টা হাতে রেখে দেয়ার কাজটা আসলে সামি ইচ্ছে করেই করেছে। 

“কি করতে চাও এখন?” 

“যদি তোমার আপত্তি না থাকে তাহলে এক কাপ কফি খেতে খেতে তোমার গল্পটা শোনা যায়। কাল যেমন আমারটা বললাম। তবে আমার বিশ্বাস তোমার গল্পটা আমারটার মতো এমন সোজাসাপ্টা না।“ 

ইয়েসিনের মুখে একটা উদাস হাসি ফুটে উঠলো “তোমার কৌতূহলের কারণটা আমি বুঝতে পারি।“ কিছুক্ষণ চুপ করে কী যেন ভাবলো সে “আচ্ছা চলো। কিন্তু একটা শর্ত আছে। কফির বিল আমি দিব।“ 

“আলবৎ!” 

(৯) 

ক্যাফে থেকে স্টেশন হাউজটা আড়াআড়ি দেখা যায়। মারাকেশের আর দশটা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার মতো স্টেশন হাউজটাও একটা নান্দনিক শিল্পকর্ম। ওরা ক্যাফের বাইরের একটা টেবিলে প্যাটিও আমব্রেলার নিচে বসেছে। ইয়েসিন দুইটা টার্কিশ কফি অর্ডার করলো। 

“যে গল্পটা বলতে যাচ্ছি কফি আসা পর্যন্ত তার জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে নিই। তুমিও প্রস্তুত হয়ে নাও।“

এটা বলার পর ইয়েসিন পাশের রাস্তার দিকে মুখ করে শূন্যদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো। কীসের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে সেটা সামির জানা নেই। সে একবার ইয়েসিন, একবার রাস্তা, আরেকবার স্টেশন হাউজের দিকে তাকিয়ে সময় পার করতে থাকলো।  

কফির কাপে চুমুক দিয়ে ইয়েসিন প্রথম যে কথাটা বললো সেটা শোনার প্রস্তুতি তো দূরের কথা, কল্পনা করার ক্ষমতাও সামির ছিলোনা। “আমি আসলে কখনোই ইরাকে ছিলাম না। ইংরেজি ভাষাটা আমি আমেরিকানদের বদৌলতেই শিখেছি। তবে সেটা ইরাকে নয়, গুয়ানতানামো বে-তে। আমি ওখানে ষোল বছর বন্দি ছিলাম।“ 

আশেপাশে একটা বোমা পড়লেও সামি এতটা চমকে যেত না। আমেরিকান সূত্রমতে গুয়ানতানামো বে ডিটেনশন সেন্টারে পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর সন্ত্রাসীরা বন্দি থাকে। কিন্তু ইয়েসিন যদি বিপজ্জনকই হবে তবে গত তিনদিনে কিছু না করে এই জনাকীর্ণ চৌরাস্তার মোড়ে সে এই কথাটা ফাঁস করবে কেন? 

“কী, ঘাবড়ে গেলে?” 

“না। তবে ধাক্কা খেয়েছি বুঝতেই পারছো। বলো, তোমার আপত্তি না থাকলে পুরাটাই শুনতে চাই।“ 

“আচ্ছা, তাহলে শুরু থেকে বলি। লম্বা গল্প তবে অল্প কথায় বলার চেষ্টা করব।“ 

সামির কোনও তাড়া নেই। প্রয়োজনে সে ট্রেইন মিস করবে।

“আমার জন্ম কাসাব্লাংকার একটা মধ্যবিত্ত পরিবারে। ছয় ভাইবোনের মধ্যে আমি চার নম্বর, ভাইদের মধ্যে সবার ছোট। বাবা হার্ডওয়্যারের ব্যবসা করতেন আর মা গৃহিণী। 

ছোটবেলা থেকেই বইয়ের পোকা আর মায়ের ন্যাওটা ছিলাম। মা যখন বাসার যেখানে কাজ করতেন, আমি তার এককোণে বসে বই পড়তে থাকতাম। জীবনের প্রথম উনিশ বছর প্রায় পুরো সময়টাই আমি বই হাতে কাটিয়ে দিয়েছি। স্কুলে খুব ভালো রেজাল্ট হতো তাই সবাই ভাবত একসময় খুব বড় কিছু হব। 

১৯৮৮ সালে কেমিস্ট্রি পড়তে হাসান সেকন্ড ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হলাম। মরক্কোতে তখন খুবই অস্থির রাজনৈতিক পরিবেশ। দেশ চালায় অত্যাচারী রাজা হাসান সেকন্ড, অর্থাৎ যার নামে আমার ইউনিভার্সিটি। ওই সময়টায় এমন জুলুমকারী শাসক পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টা ছিলোনা। 

হাসানের বিরোধী, এমনকি বিরোধী বলে সন্দেহ হলেও যে কাওকে বন্দী, টর্চার, গুম বা খুন করে ফেলাটা তখন নিত্যদিনের ব্যাপার। নিজের স্বার্থের জন্য যেকোনো কিছু করতে পারত লোকটা। পশ্চিমা শক্তিগুলোর সাথে খুব ভালো সম্পর্ক ছিলো তার। তার যাবতীয় কুকর্মে সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করত একটা পশ্চিমা পরাশক্তি। সেটা কোন দেশ ধারণা করতে পারো?” 

এই প্রশ্নটা সহজ। “আমেরিকা?” সামি উত্তর দিলো। 

“হুম। ইজরাইলী ইন্টেলিজেন্সের কাছ থেকেও অনেক সাহায্য পেত ওই রেজিম। 

ইউনিভার্সিটিতে আমি জামাত আল-আদল ওয়াল ইহসান নামের একটা সংগঠনের সাথে জড়িয়ে পড়লাম। ইন্টেলেকচুয়াল, সেক্যুলার টাইপের মানুষদের সংগঠন। আমরা অহিংস উপায়ে গণতন্ত্র অর্জনে বিশ্বাস করতাম। হাসান আর তার পশ্চিমা মিত্ররা অবশ্য আমাদের সন্ত্রাসী সংগঠন আখ্যা দিয়েছিলো, সেটা বলাই বাহুল্য। 

একদিন একটা স্টাডি সার্কেল থেকে আরও এগারোজনের সাথে আমি গ্রেফতার হলাম। চারমাস জেলে অনেক টর্চার সহ্য করলাম। জেল থেকে বের হওয়ার দুই সপ্তাহ পরে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়টা ঘটলো। আমার মা মারা গেলেন। 

মা মারা যাওয়ার পর আমি মরক্কো ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। আমার বরাবরের ইচ্ছা ছিলো উন্নত কোন দেশে গিয়ে মাস্টার্স আর পিএইচডি করার। প্রথম পছন্দ ছিলো কানাডা। আমেরিকার প্রতি ততদিনে বিতৃষ্ণা এসে গেছে। দেশটার কথায় আর কাজে কোনও মিল নেই। 

কিন্তু কানাডা যে যাব সেই টাকা কোথায় পাব? বড়ভাই লিবিয়া থাকতেন। লিবিয়া তখন উত্তর আফ্রিকার সবচেয়ে সমৃদ্ধ দেশ। ভাবলাম লিবিয়া গিয়ে কিছুদিন কাজ করলে হয়ত কিছু টাকা জমাতে পারব। যেখানেই যাই, মরক্কোতে আর থাকব না সেটা পণ করে ফেলেছিলাম। 

লিবিয়ায় গিয়ে বড়ভাইয়ের সাথে থাকতে শুরু করলাম। সাথে একটা সুপারস্টোরে চাকরি করি। এভাবে দুইবছর কেটে গেলো। বড়ভাই বিয়ে করে দেশে ফেরার ফেরার সিদ্ধান্ত নিলেন। আমি আশ্রয়হীন হয়ে পড়লাম। ত্রিপোলিতে ভাড়া দিয়ে থাকার মতো অবস্থা আমার নেই। সবচেয়ে হতাশার কথা, দুইবছরে আমি তেমন কোনও টাকা জমাতে পারিনি। আমার কানাডায় উচ্চশিক্ষার স্বপ্নটা অসম্ভব মনে হতে লাগলো। অনেকটা ডিপ্রেশনের মতো অবস্থা হয়ে গেলো আমার। 

সালটা তখন ১৯৯২। খবর পেলাম যে সুদানে অনেক বড় বড় প্রোজেক্টের কাজ হচ্ছে আর প্রচুর লোক নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। সাতপাঁচ না ভেবেই খার্তুমে চলে গেলাম। একটা চাকরিও জুটে গেলো। বিশাল একটা খামারে সূর্যমুখী ফুলের প্ল্যান্টেশনের ম্যানেজার। খামারের মালিক ওসামা বিল-লাদেন।“ 

“৯/১১-র ওসামা বিন-লাদেন?” গল্পের নাটকীয়তার সাথে তাল সামলাতে বেগ পাচ্ছে সামি। 

“ঠিক তাই। তোমাকে মনে রাখতে হবে যে ১৯৯২ সালে বিন-লাদেনকে পশ্চিমারা সন্ত্রাসী মনে করত না। সে তখন পশ্চিমের মিত্র, সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধের বীর যোদ্ধা, নন্দিত মুজাহিদীন।“ 

“হ্যাঁ, সেটা জানি।“ 

“আমার চোখে বিন-লাদেন তখন শুধুই সৌদি ধনী ব্যবসায়ী যার সুদানে প্রচুর বিনিয়োগ আছে। খামারের শ্রমিকদের মধ্যে আফগান যুদ্ধের অনেক সৈনিক ছিলো। এরা খামারের একটা অংশে নিয়মিত ট্রেইনিং করতো। আমি ওই সময়টা একটা জীবন্ত লাশের মতো কাটিয়েছি। কোনকিছুই লক্ষ করতাম না। 

চার চারটা বছর এভাবে কেটে গেলো। ১৯৯৬ সালের জুন মাসে হঠাৎ বেতন আসা বন্ধ হয়ে গেলো। আমি খোঁজখবর নিতে খার্তুম গিয়ে জানতে পারলাম যে বিন-লাদেনকে আমেরিকানদের নির্দেশ অনুযায়ী সুদান থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ইজিপ্টের হোসনি মোবারক হত্যাচেষ্টায় তার মদদ ছিলো। ওই স্বৈরশাসকও পশ্চিমের মিত্র। 

আমার জীবন-জীবিকা আরেকবার অনিশ্চিত হয়ে পড়লো। আমি তখন ভবিষ্যতের ব্যাপারে চূড়ান্তভাবে হতাশ। মরক্কোর অবস্থা তখন ভালোর দিকে কিন্তু আমি দেশে ফিরে পরিবারের বোঝা হতে চাইলাম না। সিদ্ধান্ত নিলাম যে বাকি জীবনটা সেবামূলক কাজ করে কাটিয়ে দিব। খার্তুম থেকে একদল মুসলিম মিশনারির সাথে তিনমাস যাত্রা শেষে আফগানিস্তান পৌঁছালাম।“ 

“আফগানিস্তান কেন?” সামির জন্য গল্পটা একটু বেশিই দ্রুতবেগে এগোচ্ছে। 

“সত্যি বলতে এর উত্তর আমার জানা নেই। আমি তখন একটা ভাসমান বস্তুর মতো। বলতে পার ভেসে ভেসেই আফগানিস্তান পৌঁছে গেলাম।  

১৯৯৬ এর অক্টোবর আর ২০০১ এর ডিসেম্বরের মধ্যে আফগানিস্তানের বেশ কয়েকটা জায়গায় অনেকগুলো চ্যারিটির হয়ে কাজ করলাম। শেষ যে কাজটা করতাম সেটা সেবামূলক হলেও আইনসিদ্ধ ছিলো না। আমরা আফগান শরণার্থীদের বর্ডার পেরিয়ে পাকিস্তান চলে যেতে সাহায্য করতাম। 

২০০১ এর ১৫ ডিসেম্বর এমন একটা দল নিয়ে আমরা খাইবার পাসের কাছ দিয়ে দিয়ে আফগান-পাকিস্তান সীমান্তের দিকে এগোচ্ছিলাম। কিন্তু পথে আমরা আমেরিকার মিত্র নর্দার্ন এলায়েন্সের হাতে বন্দি হলাম। আমাদের রুটের অল্প দূরে তোরা বোরা পাহাড়ে তখন ইউএস মিলিটারি আর বিন-লাদেনের বাহিনীর মধ্যে তুমুল যুদ্ধ হচ্ছে। আমাদের দলের নারী আর শিশু বাদে বাকিদের তালেবান যোদ্ধা বলে ইউএস মিলিটারির হাতে তুলে দেয়া হলো। 

এই পর্যায়ে আমি বুঝতে পারলাম আমার ভাগ্য আসলে কতটা খারাপ। আফগানিস্তানে আমি বিদেশি। আমেরিকান সূত্রমতে মরক্কোতে আমি একটা সন্ত্রাসী সংগঠনের সদস্য ছিলাম। সুদানে আমি বিন-লাদেনের চাকরি করেছি। আর এখন তোরা বোরা পাহাড়ের খুব কাছ থেকে আমাকে বন্দি করা হলো। 

আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হলো যে আমি একজন আল-কায়েদা কমান্ডার, বিন-লাদেনের এক্সপ্লোসিভ এক্সপার্ট। বামিয়ান বুদ্ধ ধ্বংস করতে এক্সপ্লোসিভ নাকি আমিই লাগিয়েছিলাম। অথচ আমি কখনো বামিয়ান ভ্যালিতেই যাইনি। 

প্রথমে কান্দাহার, পরে ২০০২ সালের ৩ মে আমাকে আরও কয়েকজন বন্দির সাথে গুয়ানতানামো বে-তে নিয়ে আসা হলো। এরপর শুরু হলো অত্যাচার। তোমরা দেশ যেমন উন্নত, তোমাদের টর্চারের কায়দাও উন্নত। খুব নৃশংস বিষয়ের নিরীহ নাম দেয়ায় তোমাদের জুড়ি নেই। টর্চারকে বলো এনহ্যান্সড ইন্টারোগেশন। সিভিলিয়ান হত্যা করে বলো কোলাটেরাল ড্যামেজ।“ 

“ইয়েসিন, তোমার জানা উচিত যে আমি আমেরিকান ফরেন পলিসি সমর্থন করিনা। আমার নিজের জাতিটাও এর ভুক্তভোগী।“ সামি চেষ্টা করলো ওর অবস্থানটা পরিষ্কার করতে। 

“আমি বাংলাদেশের ইতিহাস জানি। 

যাহোক, গুয়ানতানামোতে প্রথম দুইবছর অনেক অত্যাচার করা হলো। ওয়াটারবোর্ডিং, নগ্ন করে রাখা, রুমের তাপমাত্রা একবার প্রচণ্ড গরম আবার হাড়-কাঁপানো ঠাণ্ডা করে দেয়া, উজ্জ্বল আলো জ্বেলে ফুল ভলিউমে হেভি মেটাল মিউজিক ছেড়ে দিনের পর দিন ঘুমাতে না দেয়া এগুলো বিরতিহীনভাবে চলতো। আমার প্রায়ই মনে হতো যে পাগল হয়ে যাচ্ছি। 

আমার কাছে জানতে চাওয়া হতো আল-কায়েদার কমান্ডার কারা, আমার ইউনিটে কে কে ছিলো, বামিয়ান বুদ্ধ ধ্বংস করতে আমার সহযোগী কারা ছিলো ইত্যাদি। দুই বছরে আমার কাছ থেকে ওরা কিছুই জানতে পারেনি। বলব কী? আমি নিজে জানলে তো বলবো। 

একসময় অত্যাচারের মাত্রা কমে আসলো। সময় কাটাতে আর নিজের উন্মাদ হয়ে যাওয়া ঠেকাতে আমি আবার আমার পুরনো অভ্যাসের আশ্রয় নিলাম। আবার পড়তে শুরু করলাম। প্রথমে ইংরেজি ভাষাটা আয়ত্ত করলাম। তারপর হাতের কাছে যা পেতাম, তাই পড়তাম। সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন কিছুই বাদ দিলাম না। 

আচ্ছা, তুমি কি আরেক কাপ কফি নিবে?” ইয়েসিনের কফি শেষ। সে ইশারায় বেয়ারাকে ডাকলো। সামির কাপ এখনও অর্ধেকের বেশি ভরা। সে আসলে চুমুক দিতেই ভুলে গিয়েছিলো। সামি মাথা নেড়ে মানা করলো। বেয়ারাকে আরেক কাপ কফি আনতে বলে ইয়েসিন আবার শুরু করলো। 

“২০০৬ সালে আমার এক সহবন্দির কাছ থেকে জানতে পারলাম যে আমেরিকার একটা চ্যারিটি ল ফার্ম গুয়ানতানামো বন্দিদের আইনি সহায়তা দিচ্ছে। আমি ওদেরকে একটা চিঠি লিখলাম। আমাকে একজন লইয়ার দেয়া হলো। একজন কমবয়সী হিস্প্যানিক মেয়ে, নাম এলেনা গঞ্জালেস মোরালেস। এলেনার প্রতি আমি সারাজীবন কৃতজ্ঞ থাকব। ওর সাথে আমার এখনও নিয়মিত যোগাযোগ হয়। 

চার বছর অমানুষিক পরিশ্রম করে এলেনা প্রমাণ করলো যে আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর আসলে কোনও প্রমাণ নেই। ২০১১ সালে আমি পিরিওডিক রিভিউ বোর্ডের মুখোমুখি হলাম।“ 

“পিরিওডিক রিভিউ বোর্ডটা কি?” এই নামটা সামির কাছে নতুন। 

“প্যারোল বোর্ডের মতো। গুয়ানতানামোতে কিন্তু আমেরিকান আইন চলে না। ওখানে আসলে পৃথিবীর কোনও দেশের আইনই চলে না। আইন আর মানবাধিকার এড়াতেই ডিটেনশন সেন্টারটা ওখানে বানানো হয়েছে। 

এই বোর্ডের ব্যাপারটাও হাস্যকর। যদিও আমার বিরুদ্ধে কোনও প্রমাণ নেই, তবুও মুক্ত হতে চাইলে আমাকে এই বোর্ডের কাছে সব অভিযোগ স্বীকার করে নিয়ে ক্ষমা চাইতে হবে। আমি জীবনে প্রথমবারের মতো বড় মিথ্যা বললাম। কিন্তু কপাল দেখো, সেই মিথ্যাটা বলতে হলো এমন দোষ স্বীকার করতে যা আমি করিনি। 

কিন্তু এতকিছুর পরেও আমার মুক্তির সিদ্ধান্তটা ঝুলে রইলো। কারণ ইউএস সেক্রেটারি অফ ডিফেন্স মুক্তির কাগজে সই করতে চাইলো না। একজন নিরপরাধ মানুষকে তারা দশ বছর ধরে বন্দি করে রেখেছে জেনেও সে তার ক্যারিয়ারের ঝুঁকিটাকেই বড় করে দেখলো। এলেনা আবারও আটঘাট বেঁধে নামলো।  

২০১৬ সালে ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে আমার মুক্তি আরও কঠিন হয়ে পড়লো। কিন্তু এলেনা হাল ছাড়লো না। হাজারটা সুপারিশ, পিটিশন, ক্যাম্পেইনের পর অবশেষে ২০১৮ সালে একটা বিশেষ ফ্লাইটে করে আমাকে রাবাতে নিয়ে আসা হলো। 

মরক্কোতে ফিরেও আমি মাস-দুয়েক মরোক্কান গোয়েন্দাদের তত্ত্বাবধানে কাটালাম। ১৯৯০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত আমি কোথায় ছিলাম, কী করেছি সেই ব্যাপারে তারা একটা বিশদ গল্প তৈরি করে আমাকে দিয়ে সেটা মুখস্থ করানো হলো। ইরাকে ইউএস মিলিটারির বাবুর্চির চাকরির গল্পটা ওদেরই তৈরি করা। এই সংক্রান্ত জাল কাগজপত্রও বানিয়ে দিয়েছে ওরা। তারপর মিনিস্ট্রির এই চাকরিটা ওরা জুটিয়ে দিলো। 

আমার গল্প শেষ।“ 

“অবিশ্বাস্য!” সামির মুখ দিয়ে শব্দটা নিজে থেকেই বেরিয়ে এলো।  

“ট্রুথ ইজ স্ট্রেঞ্জার দ্যান ফিকশন। মার্ক টোয়েইন। গুয়ানতানামোতে পড়েছিলাম।“

(১০)

প্ল্যাটফর্ম ধরে ট্রেইনের নির্দিষ্ট কামরার দিকে এগোচ্ছে ওরা দুইজন।

“তোমাকে শেষ একটা প্রশ্ন করতে চাই।“

ইয়েসিন হেসে বললো “কী? এতকিছু আমি তোমাকে কেন বললাম?”

এই লোক নির্ঘাত অন্তর্যামী! “হ্যাঁ। পুরো ব্যাপারটাই নিশ্চয় ক্লাসিফাইড।“

“হ্যাঁ। সেটা আমার নিজের ভালোর জন্যই। ষোল বছর কারাগারে থাকতে হলে মানুষ চেনার ক্ষমতা তৈরি হয়ে যায়। আমি জানি যে তুমি গোপনীয়তা রক্ষা করতে পার। তুমি গতকাল আমেরিকার প্রতি তোমার কৃতজ্ঞতার কথা বলছিলে। ভাবলাম আমার দেখা আমেরিকার কথাও তোমাকে বলি।“

এই কথাটা সত্য। সামির কাছে অসংখ্য মানুষের গোপন কথা গচ্ছিত আছে।

ছোট স্যুটকেস দুইটা ওর আসনের উপর তুলে রেখে সামি ট্রেইনের দরজার কাছে ফেরত আসলো।

“ইয়েসিন, আমি ধর্মকর্ম তেমন একটা করিনা। কিন্তু নিউ ইয়র্ক ফিরে আমি তোমার জন্য জায়নামাজে বসবো। আমি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করব তিনি যেন তোমার সব ইচ্ছা পূরণ করেন।“

“শুকরান ব্রাদার! মা’ আসসালামা!”

ইয়েসিন ঘুরে হাঁটতে শুরু করলো। এমনটা সামির সচরাচর হয়না, সে অনুভব করলো তার চোখ ভিজে উঠে দৃষ্টি ঘোলা হয়ে যাচ্ছে।

কমেন্ট করুন
প্রাক্তন শিক্ষার্থী | পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সেশন: ২০০২ - ২০০৩

হাবিবুর রহমান খান

সেশন: ২০০২ - ২০০৩

0